দেশে উৎপাদিত কাঁচা পাট রফতানি নিয়ে একদিকে বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) ও বাংলদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) এবং অন্যদিকে কাঁচা পাট রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ) সরকারের কাছে পরস্পরবিরোধী দাবি উত্থাপন করেছে।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দেশে পাট শিল্প বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় কাঁচা পাট রফতানিতে প্রতি টনে ২৫০ মার্কিন ডলার শুল্কারোপসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পেশ করেছে বিজেএমএ ও বিজেএসএ। অন্য প্রস্তাবগুলো হলো নিম্নমানের পাট রফতানি বন্ধ, লাইসেন্সবিহীন ‘অসাধু’ ব্যবসায়ীদের কেনাবেচা ও মজুদ থেকে বিরত রাখা, লাইসেন্সধারী ডিলার, আড়তদাররা এক হাজার মণের অতিরিক্ত পাট এক মাসের বেশি মজুদ রাখলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ও সামুদ্রিক বন্দরের মাধ্যমে কাঁচা পাট রফতানি করা। প্রস্তাবের সমর্থনে যেসব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো হলো: এক. দেশে বছরে সাধারণত গড়ে ৭৫ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদিত হয়। তবে খরা, অতিবন্যা ও করোনা মহামারীর কারণে এ বছর উৎপাদিত হবে প্রায় ৫৫ লাখ বেল। অথচ দেশে পাট শিল্পের জন্যই প্রয়োজন হবে ৬০ লাখ বেল কাঁচা পাট। আর গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য ৫ লাখসহ মোট ৬৫ লাখ বেল পাটের প্রয়োজন। এই চাহিদার নিরিখে ১০ লাখ বেল কম উৎপাদন হবে। পাশাপাশি অব্যাহত আছে রফতানি। এতে আগামীতে এক ধরনের অশনিসংকেত বয়ে আসছে এ শিল্পে। দুই. ভারত বাংলাদেশী পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করলেও কাঁচা পাটের ওপর শুল্কারোপ করেনি। পাটপণ্য উৎপাদনে প্রয়োজন উন্নত মানের কাঁচা পাট। এ বছর ভারতে কাঁচা পাটের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কম হওয়ায় তারা আমাদের উন্নত মানের কাঁচ পাট পেতে উত্সুক হয়ে আছে। এজন্য পাট রফতানিতে শুল্কারোপ করা হলে একদিকে তারা আমদানি কমাবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের সঙ্গে পাটপণ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে। তিন. কাঁচা পাট সরবরাহ ঘাটতির কারণে পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রেতারা পাটপণ্য ব্যবহার থেকে সরে দাঁড়াবে, তা হবে দেশের পাট শিল্পের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। চার. দেশে ২৫৯টি পাটকল রয়েছে। এতে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কাজ করছে। চাষীসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতে চার কোটি মানুষ জড়িত। পাটের অভাবে শিল্প বন্ধ হলে শ্রমিক চাকরি হারাবে। এতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিসহ অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এ খাতে অর্থায়নকারী ব্যাংক ও বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও।
অন্যদিকে বিজেএ কাঁচা পাট রফতানির ওপর কোনো শুল্কারোপ না করার এবং কাঁচা পাটকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করে এর রফতানিতে আর্থিক প্রণোদনার জন্য সরকারে কাছে দাবি উত্থাপন করেছে। দাবির সমর্থনে তারা যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন সেগুলো হলো: এক. এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এ দেশ থেকে কাঁচা পাট রফতানি হচ্ছে এবং কাঁচা পাট রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত হচ্ছে। দুই. দেশে উৎপাদিত পাটের দুই-তৃতীয়াংশ অভ্যন্তরীণ জুট মিলে ব্যবহূত হওয়ার পর অবশিষ্ট অব্যবহূত কাঁচা পাট বিদেশে সরাসরি রফতানি করা হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। তিন. কাঁচা পাট রফতানি করা না হলে পাটের দাম কমে যাবে। এতে পাটচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং পাট চাষে নিরুৎসাহী হয়ে পড়বেন।
যে ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ গঠিত, প্রাচীনকাল থেকে সেখানে উন্নত মানের পাট চাষ হয়ে আসছে এবং বিশেষ করে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পাট উৎপাদন বেড়ে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত পাটের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক শূন্য ৯ লাখ বেল, যা ৮ দশমিক ৩৮ লাখ টনের সমান। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পাট উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫ দশমিক ৫৮ লাখ বেলে, যা টনের আকারে ১৩ দশমিক ৭৪ লাখ টন। ব্রিটিশ আমলে তত্কালীন পূর্ববাংলা উত্কৃষ্ট মানের কাঁচা পাটের প্রধান উৎপাদনকারী হলেও বাংলায় প্রথম পাটকল স্থাপিত হয় পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর তীরে কলকাতার কাছে বিশড়ায়, অর্থাৎ ডান্ডিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাটের সুতা পাকানোর কাজ শুরুর ২০ বছর পরে। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান নাম নিয়ে পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। সব পাটকল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়ায় পূর্ব পাকিস্তান কাঁচা পাট বাজারজাত করার ব্যাপারে সমস্যার সম্মুখীন হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ী বাওয়া গ্রুপ এবং আদমজী পরিবার পঞ্চাশের দশকের শুরুতে নারায়ণগঞ্জে পাটকল স্থাপনের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান বহুলাংশে খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৫১-৭০ সময়কালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত পাট ও পাটজাত সামগ্রী পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাটকল মালিকরা মূলত পাকিস্তানি হওয়ায় এসব পাটকল রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। বেসরকারি খাতে পাট ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া হয়। অভ্যন্তরীণভাবে পাট কেনা ও পাটপণ্য উৎপাদনের দায়িত্ব বর্তায় নবগঠিত বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) ওপর। পাট রফতানির একচেটিয়া দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ পাট রফতানি সংস্থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্যে অনভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তাদের এসব পাটকলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রদান, দুর্নীতি, মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর উদ্ভব এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এ খাতে বিপর্যয় দেখা দেয়। ১৯৭৫-পরবর্তী সরকার বিজেএমসির আওতাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু করে, যা পরবর্তীকালে অব্যাহত থাকে। আশির দশকে বেসরকারি খাতকে পাটকল স্থাপন ও পাট ব্যবসার অনুমতি দেয়া হয়। ক্রমাগত লোকসানের কারণে সরকার ১ জুলাই থেকে বিজেএমসির আওতাধীন ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে। এগুলো কী পদ্ধতিতে এবং কখন চালু করা হবে তা অনিশ্চিত, যদিও সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এর আগে একাধিকবার বলেছিলেন যে এগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) চালু করা হবে। বর্তমানে শুধু বেসরকারি খাতে পাটকল ও পাট ব্যবসা চালু রয়েছে।
ওপরের বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হলো, আশির দশক থেকে বেসরকারি খাতে পাটকল স্থাপন এবং এগুলোর সংখ্যা বর্তমানে ২০০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় পাট উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও তা দেশীয় পাটকলের চাহিদা মিটিয়ে রফতানির জন্য তেমন অবশিষ্ট থাকে না। দ্বিতীয়ত, পাট খাত ব্যবস্থাপনায় আমাদের দক্ষতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছায়, এ খাত থেকে আমরা আশানুরূপ সাফল্য পাচ্ছি না।
পাটজাত পণ্যের ব্যবহার পরিবেশবান্ধব হওয়া, পাটপণ্যের উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা এবং পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০ ও বিধিমালা ২০১৩ বাস্তবায়নের ফলে দেশে ও বিদেশে পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বিশেষ করে পাটপণ্য রফতানি থেকে আয় বেড়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে আয় হয় মোট ৪০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৩০২ মিলিয়ন আসে পাটজাত পণ্য থেকে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি করে মোট আয় হয় ১ হাজার ২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৮৭০ মিলিয়ন পাটজাত পণ্য থেকে। এ প্রসঙ্গে বিজেএসএর সূত্রের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন শুধু বস্তা, চট ও থলে নয়, পাটসুতাসহ পাটের তৈরি নানা ধরনের পণ্য বাংলাদেশ থেকে রফতানি হচ্ছে। করোনা মহামারীর কারণে পরিবেশের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় বিশ্বে পাটপণ্যের চাহিদা নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। এ সুযোগ যদি নেয়া যায় তাহলে এ খাতের রফতানি অনেক বাড়বে। এই মহামারীর বছরেই পাটের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। তাই বিজেএমএ ও বিজেএসএ কাঁচা পাট রফতানি বন্ধে বা রফতানির ওপর শুল্ক আরোপের যে প্রস্তাব সরকারের কাছে, তাতে সারবত্তা রয়েছে।
বিজেএ কাঁচা পাট রফতানির ওপর কোনো শুল্কারোপ না করার সমর্থনে যেসব যুক্তি দেখিয়েছে সেগুলো, বিশেষ করে কাঁচা পাট রফতানি করা না হলে পাটের দাম কমে যাবে এবং এতে পাটচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ও পাট চাষে নিরুৎসাহী হয়ে পড়বেন, বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলাদেশ থেকে সাধারণত ভারত, ব্রাজিল, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশে পাট রফতানি হয়। এটা স্বীকার করতে হয় যে বেশি পরিমাণে কাঁচা পাট রফতানিতে পাটচাষীরা ভালো দাম পায় পান। চলতি মৌসুমে পাটচাষীরা ভালো দাম পাচ্ছেন। মণপ্রতি ৩ হাজার টাকা দাম উঠেছে, যা তাদের আগামী বছরে বেশি করে পাট চাষে উৎসাহ জোগাবে।
কাঁচা পাট রফতানিতে শুল্কারোপ বা রফতানি বন্ধের ব্যাপারে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। মিডিয়ার খবর অনুযায়ী বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেছেন, কাঁচা পাট রফতানি বন্ধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও পরামর্শ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পাটচাষীর উন্নতি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তাই সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে পাটচাষী ও পাটকল মালিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষা পায়।
মো. আবদুল লতিফ মন্ডল: সবেক সচিব










