মুজিব বর্ষে স্বাধীন বাংলাদেশ সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। কাকতালীয়ভাবে হলেও দেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১ সালে এর গৌরবোজ্জ্বল শতবার্ষিকী উদযাপন করবে। এরই মধ্যে অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন একটি শক্ত খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে। বর্তমান করোনা-জর্জরিত বিশ্বে বাংলাদেশ মাত্র গুটি কয়েক দেশের ইতিবাচক বার্ষিক সামষ্টিক আয় প্রবৃদ্ধির অন্যতম। পৃথিবীর তিন বা মতান্তরে পাঁচটি সর্বোচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০২০ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ (আইএমএফ), এমনকি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে। মাথাপিছু জিডিপিতে এ বছর ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ, সে সুখবরও আইএমএফই দিল। ইকোনমিস্ট সাপ্তাহিকীর মতে, (১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সংখ্যা) বাংলাদেশ সে বছরই জিডিপি বা বার্ষিক সামষ্টিক আয় বৃদ্ধির দিক থেকে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। সারা বিশ্বে সমাদৃত ওই সাময়িকীতে এও জানানো হয় যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি আয় ভারত ও পাকিস্তানের সম্মিলিত রফতানি আয়ের সমতুল্য। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ১ টাকার বিনিময়ে ভারতের ৪৫ পয়সা পাওয়া যেত, আর পাকিস্তানি রুপির ৭৫ পয়সা। ২০২০ সালে এসে বাংলাদেশের ১ টাকার বিনিময়ে ভারতের ৮৭ পয়সা এবং পাকিস্তানের ২ টাকা পাওয়া যায়।
৪৯ বছরে বিশেষ করে গত ১২ বছরে অর্জনের তালিকা বেশ মনোমুগ্ধকরভাবেই দীর্ঘ হলেও বিশেষ করে আয়, সম্পদ ও সুযোগ বৈষম্যে, দুর্নীতিতে এবং অর্থনৈতিক খাতে বিশৃঙ্খলার ব্যর্থতা সেই অর্জনের ঔজ্জ্বল্যকে বেশ খানিকটা ম্লান করেছে, তা বলা বাহুল্য। তবে সে আলোচনা আজ নয়। এখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন, সে কথা স্মরণে রেখে কিছু বলা প্রয়োজন।
ইস্পাতকঠিন সংকল্পে অটল থেকে হিমালয়সম বাধা-বিপত্তি, অত্যাচার, জেল-জুলুম, ফাঁসির বিপদ উপেক্ষা করেও শেখ মুজিব কোনো দিনও স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে পিছপা হননি। ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ বিতাড়নের পর থেকেই তিনি স্বাধীনতার ছক কষেছেন। সহযোদ্ধা ও আপামর জনগণের মাঝে উদ্দীপনা ছড়িয়েছেন এবং পাকিস্তান নামের অদ্ভুত আদর্শে লালিত কৃত্রিম দেশটিকে ঘায়েল করার অহিংস সমর কৌশল নির্ধারণ করে দীপ্ত শপথে বলীয়ান থাকেন। মাঝে মধ্যেই কৌশল পরিবর্তন করেছেন বটে, তবে মূল লক্ষ্য স্বাধীনতার পথ থেকে ২৪ বছরের আধা ঔপনিবেশিক বর্বর পাকিস্তানি অপশাসনে একবারের জন্যও মত পাল্টাননি। সে পথে মায়ের ভাষার আন্দোলন; (অলি আহাদ বলেছেন, আগের রাতে মুজিব ভাই ঢাকায় এসে ফজলুল হক হলে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নেতৃত্ব না দিলে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের হরতাল, পিকেটিং, মিছিল কিছুই হতো না), চুয়ান্নর ভূমিধস পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন (একুশ দফা প্রণয়নসহ), ১৯৫৫ সালে গণপরিষদে জোরালো বক্তব্য, ‘মাননীয় স্পিকার, আমি লক্ষ করেছি আপনার লোকজন আমাদের পূর্ব পাকিস্তান বলে ডাকে। এটা কখনো সত্য হতে পারে না। আমরা পূর্ব বাংলা ...’; ১৯৫৮ সালে সারা দেশে প্রতিশ্রুত সাধারণ নির্বাচন না দিয়ে সামরিক আইন জারি ও গ্রেফতারসহ শেখ মুজিবের ওপর অত্যাচারের খড়্গ চালানো; ১৯৬২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে পত্র পাঠানো এবং ১৯৬৩ সালের মার্চে আগরতলা গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র চন্দ্র সিনহার মারফত একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা ও লন্ডনে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠন করা হলে ভারতের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা; [(১) এস.এ. করিম বিরচিত শেখ মুজিব-ট্রায়ামন অ্যান্ড ট্র্যাজেডি (২) শেখ মুজিবের একান্ত সুহূদ ও আজীবন সংগ্রামের সাথী মোয়াজ্জম আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে নিবন্ধকারের আলোচনা]; ১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে স্বাধীনতার বিষয়ে আলোচনা; রাজনীতির বাইরে বুদ্ধিদীপ্ত দেশপ্রেমিকদের নিয়ে ‘নিউক্লিয়াস’ গঠনের দাবি (কাজী আরিফ আহমেদ ও রওশন জাহান সাথী বিরচিত ‘বাঙালির জাতিসত্তা’); ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের লাহোরে (পাঞ্জাবি শোষকদের রাজধানী) বাংলা ও বাঙালির মুক্তিসনদ এবং প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার ইশতেহার ছয় দফা ঘোষণা; ১৯৬৮-৬৯-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে অবলীলাক্রমে ‘নওজোয়ান, নওজোয়ান বিশ্বে জেগেছে নওজোয়ান’ কোরাস গাওয়া (বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সদ্য প্রয়াত কর্নেল শওকত আলীর কাছ থেকে নিবন্ধকারের পাওয়া তথ্য); ’৬৯-এর অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান—জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব—গগনবিদারী স্লোগান; প্যারোলে পিন্ডির আইয়ুব খানের আহূত গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের অস্বীকৃতি (বেগম মুজিবেরও সে রকম পরামর্শই ছিল, আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতাই প্যারোলে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন); আগরতলা মামলার বিচারকের কেন্দ্রীয় সার্কিট হাউজ থেকে চোরের বেশে সন্তর্পণে তেজগাঁও বিমানবন্দরে পলায়ন; স্বাধীনতা-মুক্তির দীপ্তশিখা বাঙালির হূদস্পন্দন মুজিবের মুক্তি এবং কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভূষিত হওয়া; অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তায় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বাধীনতার দীপন হিসেবে সত্তরের নির্বাচনের প্রস্তুতি (এক ব্যক্তি এক ভোট নীতি গ্রহণ করে সেনাপতি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর কৃপালাভে সচেষ্ট ছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার, এলএফওর মতো সম্মানহানিকর ব্যবস্থাধীনে নির্বাচনে যান—অবশ্যম্ভাবী বিজয়ের পর এলএফও এক ফুত্কারে উড়িয়ে দেবেন সেই আত্মবিশ্বাসে); ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভয়াল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কয়েক লাখ লোক (অনুমান ৫ থেকে ১৫ লাখ) প্রাণ হারালে বঙ্গবন্ধু তার কর্মী বাহিনী (আওয়ামী লীগের নেতা শুধু তিনিই, বাকি সবাই কর্মী হিসেবে কৃতার্থ) উপকূলীয় এলাকায় কয়েক দিন অবস্থান করে দুস্থদের পাশে দাঁড়ান ত্রাণসামগ্রী ও হূদয়ের ভালোবাসাসহ; ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশের দুস্থ মানবতাকে তুচ্ছ করে তাদের আকাশ বেয়ে চীন চলে যান তার প্রভুদের যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দূতিয়ালি করতে; ইয়াহিয়া খানের গোয়েন্দাদের—সব গোয়েন্দার মতোই রাষ্ট্রপতি যা শুনতে চাইছিলেন সে ভাষায়, ‘শেখ মুজিব খুবই বড় নেতা, অনেক আসন পাবেন কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অন্য বড় নেতারাও দলেবলে নির্বাচিত হয়ে ৩০০ আসনের সংসদে পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩১ জন সংসদ সদস্যের সঙ্গে মিলে ‘মিলঝিল কর হুকুমাত বানায়েঙ্গে শেখ মুজিবকো বাহার রাখকে’ আশ্বাস একেবারেই মিথ্যা প্রমাণিত করে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের পাকিস্তান গণপরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে সাতটি সংরক্ষিত নারী আসনসহ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে বিজয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন; গণতান্ত্রিক ন্যায়নীতির তোয়াক্কা না করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি; গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী করে ইয়াহিয়া খান তার আতাতের অংশী ৮৮ আসনে বিজয়ী সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর পরামর্শে ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রস্তাবিত তারিখের পরিবর্তে ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানীর নিয়মিত ক্রমের ঢাকায় গণপরিষদের অধিবেশন ডাকা; পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো সদস্য সেই অধিবেশনে যোগ দিলে তাকে গুঁড়িয়ে ও পুড়িয়ে দেয়ার হুমকির মুখে ১ মার্চ সে অধিবেশন স্থগিত করা (স্মরণে রাখা ভালো যে পশ্চিম পাকিস্তানের ৩৫ জন সদস্য ঢাকায় অধিবেশনে যোগ দিতে এরই মধ্যে ঢাকায় এসে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে আটজন সদস্য—সিন্ধুর আইয়ুব খুরো ও তালপুর, সীমান্তের ওয়ালী খান ও মাওলানা হাজারভি, বেলুচিস্তানের গওস বকশ বেজেঞ্জা, আতাউল্লা খান মোঙ্গল ও খায়ের বক্শ মারি এবং খোদ পাঞ্জাবের পিপলস পার্টির সদস্য আহমদ রাজা কাসুরী—শেখ মুজিবের ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধানের সমর্থন করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন); অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণায় বাংলাদেশে অগ্নস্ফুিলিঙ্গের সৃষ্টি; অসহযোগ আন্দোলন; ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং তার অনুপস্থিতে কীভাবে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ চলবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রদান; সেই ভাষণে পুনরায় ডাকা সংসদে যোগদানের যে চারটি শর্ত বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন, তাতে এবং ছয় দফাভিত্তিক সংবিধানে বাংলাদেশ যে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয়ে যেত, সে উপলব্ধি; দখলদার বাহিনীর পালের গোদা ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ১৭-২৪ মার্চ আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানিদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং আওয়ামী লীগের যুদ্ধ মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত পথের কৌশল নির্ধারণ এবং বর্বর বাহিনী কর্তৃক ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগসহ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে অগ্নি, হত্যা, লুণ্ঠন ও ধ্বংসলীলা শুরু করা এবং ২৫-২৬ মার্চের রাত ১২টা ১ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার সংবাদ কমবেশি সবারই জানা। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর নামে, আদর্শে এবং নির্দেশিত ছকেই সংগঠিত হয়। ১৯৭১ সালে ৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে দিল্লিতে ভারতের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একটি প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতে ছয় দফার ভিত্তিতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের যে স্বাধীনতা ঘোষণা করার সংবিধানসম্মত একমাত্র পথ ছিল, তা বোঝাতে সক্ষম হন। সেই থেকে কূটনৈতিক, নৈতিক, অস্ত্রাদি, প্রশিক্ষণ এবং এক কোটি দেশান্তরে বাধ্য মানুষকে আশ্রয়দান করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বিরাট ভূমিকা রাখে ভারত। এদিকে ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলায় নিবন্ধকারের বাড়ি থেকে তিন মাইল দক্ষিণ-পূর্বে তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর কমান্ডারদের প্রথম সভায় কর্নেল ওসমানী এমপি, লে. কর্নেল আব্দুর রব এমপি, মেজর কে এম সফিউল্লাহ, মেজর চিত্তরঞ্জর দত্ত, মেজর খালেদ মোশারফ প্রমুখের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় ১১টি সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ চালানোর দীপ্ত শপথ গ্রহণ করেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের বীরগাথা লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং হচ্ছে। ২৫ মার্চের রাতে জাতীয়তাবাদী বঙ্গবন্ধু পালিয়ে যাননি, কারণ তিনি নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামে বিশ্বাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে চাননি, তাকে খোঁজার নাম করে বর্বর পাকিস্তানিদের অত্যাচারে জনগণ আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা তিনি চাননি। এতে যে রাজনৈতিক হিসাব ছিল, তা হচ্ছে তাকে যদি কসাই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ফাঁসিকাষ্ঠে হত্যা করে ফেলেন, তাহলে বিশ্বনিন্দা ও সমর্থন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিশোধ স্পৃহায় বহুগুণে বেশি শক্তিতে স্বাধীনতা যুদ্ধ করার সম্ভাবনা তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। তবে ঝানু পোড় খাওয়া প্রত্যয়ী শেখ মুজিব নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন তার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এত ন্যায়ভিত্তিক ছিল যে জাগ্রত বিশ্ববিবেক কিছুতেই তার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে দিত না। বাস্তবে হলোও তাই। অতঃপর আগুনের পরশমণি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্যকিরণে স্নাত হলো ১৬ ডিসেম্বর পরাজিত পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে।
সগৌরবে বীরের বেশে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরলেন, বাংলার মাটিকে সস্নেহে গভীর আবেগে শ্রদ্ধায় স্পর্শ করলেন আর রেসকোর্সের ময়দানে সর্ববৃহৎ জনসভায় ঘোষণা করলেন, ‘আমার কোনো অপূর্ণ সাধ নাই, দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমি মুক্ত স্বাধীন মানুষের কাছে ফিরে এসেছি।’ কবিগুরুকে উদ্দেশ করে সম্মানের সঙ্গেই বললেন, “ওই যে আপনি বলেছেন,
‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি’—এসে দেখে যান বীর বাঙালিরা আপনাকে ভুল প্রমাণিত করেছে।”
৪৯ বছরের অর্জন ও অপূর্ণতা নিয়ে গবেষণা চলছে, চলছে লেখালেখিও। তবে মোটাদাগে কয়েকটি কথার অবতারণা না করলেই নয়। প্রবৃদ্ধি আর সামাজিক রূপান্তরের অতিরিক্ত যে বিশাল স্বীকৃতি এল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে আমার মায়ের ভাষা বাংলার, তার তুলনা নেই। বিশ্বব্যাংকের অন্যায় ঘাওরামির মুখে নিজেই তার ঋণ বাতিল করে জনবন্ধু শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থাৎ মডেল নকশা, করিগরি, ব্যবস্থাপনা ও শ্রমজীবী নিয়ে প্রায় চার মাইল লম্বা পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন, তাতে বিশ্ববলয়ে দেশের ভাবমূর্তি অনেক অনেক উজ্জ্বল হয়েছে। অতিরিক্ত অগ্রাধিকারে রেলের কাজ ত্বরান্ব্বিত করে জুন ২০২২-এ যদি একযোগে সেতু, সড়ক ও রেলপথ চালু হয় তাহলে অর্থনৈতিক সংযুক্তির মাধ্যমে বার্ষিক সামষ্টিক আয় প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক শূন্য ২ থেকে ১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ যোগ হবে; হবে কর্মসংস্থান; পণ্যের বেশি মূল্য পাবেন কিষান-কিষানীরা, পর্যটনের ঢেউ আসতে পারে। প্রতি বছর দারিদ্র্য হ্রাস পাবে শূন্য দশমিক ৮৪ থেকে ১ শতাংশ। কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, বাংলাদেশব্যাপী নদী ড্রেজিং, রেলের ব্রডগেজীকরণ ও বিদ্যুাতায়ন ইত্যাকার মেগা প্রকল্প অভ্যাসে পরিণত হওয়া সময় ও খরচ বাড়ানোর দুর্নীতিতে লাগাম দিতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক রূপান্তরে আরো গতি আসবে। মহান স্বাধীনতার পরেই কিন্তু অর্জনের দিক থেকে শীর্ষস্থানে আছে জাতিসংঘসহ বিশ্বময় শেখ হাসিনার অকুতোভয়, উদ্ভাবনী এবং অসাধারণ নেতৃত্ব। এটি পদ্মা সেতু নির্মাণের পর আরো বেড়েছে, যেমনটি ইতিবাচক হয়েছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।
বঙ্গবন্ধুর কাঙ্ক্ষিত এবং প্রদর্শিত পথে যে দুটো কাজ করা হয়নি, তার একটি হচ্ছে সমবায় ব্যবস্থা প্রবর্তন। তিনি সুস্পষ্টভাবেই গ্রামীণ সমবায় সমিতি গঠন এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সম্পদ বিতরণের কথা বলে গেছেন। উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতি গঠন, তাদের সাশ্রয়ী সুদে (৩-৪%) ঋণদান, খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষমতা বৃদ্ধি, এতে অগ্রাধিকারভিত্তিক সমবায়ী ধান, চাল, পেঁয়াজ, আলু রাখার ব্যবস্থা করা হলে উৎপাদনকারীরা নিজের ফসল সমবায় মাধ্যমে নিজেই কিনে গুদামজাত করবেন এবং সারা বছর তা বিক্রি করে নিজেরা এখনকার চেয়ে বেশি দাম পাবেন এবং ক্রেতারা কম দামে কিনতে পারবেন। মূল্য থাকবে স্থিতিশীল। শুধু লোকসান হবে ১ হাজার ২০০ মিল মালিক আর তাদের দোসর কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার। মিল মালিকরা হুমকি দিচ্ছেন, সরকার দাম না বাড়ালে তারা সরকারের কাছে ধান, চাল বিক্রি করবেন না। দেশদ্রোহিতা নয় তো! খবর নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ ৫ দশমিক ৫ লাখ টন; আতঙ্ক না হলেও ভয় লাগতেই পারে। কারণ, আমনের সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হয়নি, তার মূল কারণই হচ্ছে মিল মালিক ও দুর্নীতিবাজদের কারসাজি। তথ্যানুসন্ধান বলছে, আউশের ফসল সামান্য কমে ১৫ দশমিক ৭ লাখ টন হলেও শুধু সংগ্রহমূল্য বাজারমূল্যের কম ধার্য করার ফলে (অন্তর্ঘাত নয় তো!) সংগ্রহ একেবারেই ছিটেফোঁটা। স্মর্তব্য যে ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে যে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তারও মূল চাবিকাঠি ছিল মধ্যস্বত্বভোগীদের গুজব সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ভাষায়, রংপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইলের কয়েকটি এলাকার অনেক জনের ‘এনটাইটেলমেন্ট’ চলে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার অভাবে। সামগ্রিকভাবে দেশে খাদ্যশস্যের অভাব ছিল না। মঙ্গা (শেখ হাসিনা সরকার মঙ্গা শব্দটি বাংলার অভিধান থেকে উঠিয়ে দিতে পেরেছে) এলাকার চাল-গম পরিবহনের কোনো পরিকল্পনাই করা হয়নি। বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে সংযুক্ত হয় মার্কিনিদের সংগত কারণে দুটো খাদ্যবোঝাই জাহাজ আগস্টের বদলে নভেম্বরে আসার কারণে। পরিকল্পনা কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল পিএল-৪৮০-এর শর্তাধীনে বাংলাদেশের মতো মার্কিনি খাদ্য মঞ্জুরি গ্রহণকারী দেশ সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবায় পাট রফতানি করলে খাদ্য মঞ্জুরি বাতিল হয়ে যাবে, সে সম্পর্কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে অবগত করা। তারা মোটেও হোমওয়ার্ক করেনি।
কভিড-১৯-এর সর্বশেষ যে ভাইরাস যুক্তরাজ্যে দেখা দিয়েছে, সে কারণে ফ্রান্স ছাড়া বাকি সব দেশ ওই দেশের সঙ্গে সব রকম যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো রহস্যজনক কারণে বাংলাদেশ এখনো ফ্লাইট বন্ধ না করে বারবার ব্যর্থ হওয়া কোয়ারেন্টিন ভরসা করছে, তা মোটেও বোধগম্য নয়। দুর্নীতি, সমন্বয়হীনতা, ঠিকাদারি আদলে (মিঠু, শাহেদ, রাজ্জাক, সাব্রিনা, গাড়িচালক, ভ্যানচালক) চলা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্কার যে অতি জরুরি, একটি ঘটনা থেকেই তা স্পষ্ট—সেই এপ্রিলে সরকারপ্রধান কর্তৃক ঘোষিত ফ্রন্টলাইনের সৈনিক ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছিলেন, সংবাদপত্রের সূত্রমতে ওই সেদিন পর্যন্ত মাত্র একজন ডাক্তার সে সুবিধা নিতে পেরেছেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, তিতিক্ষা, সর্বোচ্চ আত্মবলিদানে আমরা মাথা উঁচু করে সসম্মানে জনবন্ধু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বদরবারে গৌরবের আসনে আসীন। সে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা (ক) ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রণয়নপত্র নিলেন, (খ) মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাদানকারী বিদেশী বন্ধুদের স্বর্ণের মেডেলে ভেজাল ঢুকিয়ে দিলেন এবং (গ) মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ঘৃণিত নীল নকশার অন্যতম মূল হোতা মেজর শরিফুল হক ডালিমও সেই মহা ভয়ংকর রিসালদার মোসলেমউদ্দিনসহ (২ নভেম্বর দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চারজন সিপাহসালার জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম. মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে গুলি করে হত্যাকারী) চারজন খুনিকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় সংযুক্ত এবং মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক এর বিরুদ্ধে মত দেয়ার আগে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি; সেখানেও কি সংস্কার জরুরি নয়! অন্য সব মুসলিম দেশে ভাস্কর্য থাকতে পারলে এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামে অন্য নেতাদের ভাস্কর্য থাকলেও জাতির পিতার ভাস্কর্য নিয়ে যারা অন্যায় আপত্তি করছে, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে বিজয়ের মাসে তাদের জানাবোঝা উচিত বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন; বঙ্গবন্ধুকে আঘাত করা বাংলাদেশকে ক্ষতবিক্ষত করা এবং এটি অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য
অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মী










