কয়েক দিন আগে দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশে মিথেনের স্তর দেখা গেছে বলে খবর প্রকাশ করা হয়েছে। বিদেশী পত্রিকায় যেখানে এটিকে রহস্যময় স্তর (Mysterious Plume) বলে আখ্যা দিয়েছে, সেখানে দেশী একটি পত্রিকা এক ধাপ এগিয়ে এটিকে মিথেনের বিশাল স্তর (Huge Plume) হিসেবে প্রচার করেছে, যা পড়ে একদিকে আমি অবাক হয়েছি এবং অন্যদিকে আতঙ্কিত হয়েছি। কারণ এই মিথেন গ্যাস নিঃসরণের জন্য কৃষি তথা ধান উৎপাদনকে দায়ী করা হয়েছে। আমার আতঙ্কিত হওয়ার কারণটি এখানেই। কারণ যখন বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে যাচ্ছে এবং চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে উদ্বৃত্ত হয়েছে, তখন এ ধরনের বিশ্লেষণহীন অবৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বৈ কিছু নয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) পক্ষ থেকে এর প্রকৃত ব্যাখ্যা পাঠকের কাছে তুলে ধরা দরকার বলে মনে করি। কেননা ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ সাফল্য দেশে ও দেশের বাইরে অনেকের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যারা এ দেশকে ব্যর্থ এবং আজীবন পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়।

এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা শুধু এই প্রথম নয়। আমরা যখন খাদ্য তথা চাল উৎপাদনে ২০১৩ সালে উদ্বৃত্ত হলাম এবং শ্রীলংকায় চাল রফতানির পদক্ষেপ নেয়া হলো, ঠিক তখনই বাংলাদেশের চালে আর্সেনিক আছে বলে বেশকিছু পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। ব্রি থেকে তথ্যসহ প্রতিবাদ দেয়ায় তারা হালে পানি পায়নি। তাই বলে তা থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে খবর প্রকাশিত হলো, ভাত খেলে ডায়াবেটিস হয়, মানুষ মোটা হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই বলে যখন আমরা ব্রি থেকে প্রতিবাদ করেছি এবং গবেষণা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে যে ভাত খেলে ডায়াবেটিস এবং মোটা তো হয়েই না, বরং যেসব দেশ ভাত খায়, সেসব দেশে মোটা বা ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবণতা অন্যান্য দেশের চেয়ে কম। আমরা প্রমাণস্বরূপ দেখিয়েছি যে প্রতি ১০০ গ্রাম চালে ফ্রি-সুগারের পরিমাণ থাকে মাত্র ১০০ মিলিগ্রাম, যেখানে গমে ৩০০ মিলিগ্রাম, ভুট্টায় ৬০০ মিলিগ্রাম, আলুতে ৮০০ মিলিগ্রাম, গাজরে ৪ হাজার ৭০০ মিলিগ্রাম এবং অন্যান্য খাবারে ভাতের চেয়ে অনেক গুণ বেশি থাকে (ইউএসডিএর পুষ্টি ডাটাবেজ)। অতএব আজকে যে বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, তারও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েই প্রমাণ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। কারণ যে হীন উদ্দেশ্যে এ খবর প্রকাশ করা হয়েছে, তা যেন বাস্তবায়ন না হতে পারে এবং দেশের মানুষ যাতে আসল সত্যটি জানতে পারে।

সত্যটি হলো, বাংলাদেশের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ জমিতে ধান চাষ করা হয়। এসব জমি থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস-মিথেন (CH4), কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) ও নাইট্রাস অক্সাইড (N2O) যেমন নিঃসরিত হয়, তেমনি ধান গাছ তার শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড ফর্মে এসব গ্যাস শোষণ করছে। কিন্তু প্রচারণার সময় শুধু নিঃসরণের তথ্যটি খুব কৌশলে তুলে ধরা হয়, অথচ নিঃসরণের চেয়ে যে বেশি পরিমাণ শোষণ করা হয়, তা উল্লেখ না করে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা হয়। আজকের আলোচনা এ নিঃসরণ ও শোষণের হিসাব নিয়ে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ ২০১৩ সাল থেকে এর ওপর গবেষণা করে আসছে। যেখানে তারা দেখেছে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে ৬৬৬ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড, ৫৩ গ্রাম মিথেন এবং শূন্য দশমিক ৫ গ্রাম নাইট্রাস অক্সাইড ধানক্ষেত থেকে নিঃসরিত হয়। অন্যদিকে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে ধান গাছ ২ হাজার ২০০ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড ফটোসিনথেটিক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে। এছাড়া মিথেন বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস ও হাইড্রোজেন গ্যাসে রূপান্তরিত হয়, যা ধান ও অন্যান্য গাছ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে। একইভাবে নাইট্রাস অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়াম ও হাইড্রোজেন গ্যাস উত্পন্ন করে এবং এই অ্যামোনিয়াম বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়ায় রূপান্তরিত হয় এবং বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে আসে, যা গাছ গ্রহণ করে। এক্ষেত্রেও ধান গাছের অ্যারেনকাইমা চ্যানেল দিয়ে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ধান গাছের শিকড়ের মাধ্যমে মাটিতে আসে, যা মিথেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে মিথানোট্রফিক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা কার্বন ডাই-অক্সাইড উত্পন্ন করে, যা গাছ গ্রহণ করে এবং এ প্রক্রিয়া বায়ুমণ্ডলে মিথেন নিঃসরণে বাধা দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ধান চাষাবাদে ধান গাছ মাত্র ৫-১০ শতাংশ মিথেন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, বাকি ৯০-৯৫ শতাংশ মিথেন মাটি থেকে আসে। জলাবদ্ধ জমিতে লেবাইল জৈব কার্বন এবং মিথানোজেনিক ব্যাকটেরিয়া মিথেন উত্পন্ন করে। অতএব দেখা যায়, ধান চাষের চেয়ে পতিত জমি মিথেন নিঃসরণের জন্য বেশি দায়ী।

বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো এ তিন মৌসুম মিলিয়ে পাঁচ কোটি টনের অধিক ধান উৎপাদন হয়। সে হিসাবে মোট পাঁচ কোটি টন ধান উৎপাদনে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ ৩৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন, মিথেন ২ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন টন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য ২৫ মিলিয়ন টন। গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়াল ফর্মুলা অনুযায়ী এ তিনটি গ্রিনহাউজ গ্যাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণের পরিমাণ ১০৬ দশমিক ২ মিলিয়ন টন। অন্যদিকে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ধান গাছ ২ হাজার ২০০ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। অতএব মোট পাঁচ কোটি টন ধান উৎপাদনে প্রায় ১১০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে শোষিত হয়। উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী ধান আবাদ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের তুলনায় ৩ দশমিক ৮ (১১০.০-১০৬.২) মিলিয়ন টন বেশি গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডল থেকে শোষণ করে। ফলে ধান চাষ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের চেয়ে অনেক বেশি শোষণ করে বরং বায়ুমণ্ডলকে পরিচ্ছন্ন করছে।

স্যাটেলাইট ইমেজে বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডলে যে মিথেন গ্যাসের ধোঁয়া শনাক্ত করেছে বলে দাবি করেছে জিএইচজিস্যাট ও কায়রোস, তার উৎস সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত না হওয়ায় বিষয়টিকে ‘রহস্যময়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর উদ্ভব বাংলাদেশ থেকে হয়েছে কিনা, তার কোনো প্রমাণ নেই। মিথেনের সম্ভাব্য উৎস বাংলাদেশ বলা হলেও এসব উেসর পরিমাণ ও ব্যাপ্তি বাংলাদেশের তুলনায় সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় অনেক গুণ বেশি। সুতরাং মিথেন গ্যাসের ধোঁয়া যেকোনো জায়গা থেকে দেশে আসতে পারে।

এক্ষেত্রে কম-বেশি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সব দেশে ধান চাষ, জলাভূমি ভরাট ও কয়লার মজুদ জাতীয় কার্যক্রম রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ চীন-ভারতসহ আঞ্চলিক দেশগুলো আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ধান চাষ করে। বাংলাদেশে যেখানে একটি কয়লা খনি আছে, সেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রায় ১ হাজার এবং চীনে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কয়লা খনি আছে, যেগুলো মিথেনের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। সুতরাং প্রতিবেদনটিতে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের যথেষ্ট ঘাটতি আছে এবং সামগ্রিকভাবে এটি গ্রহণযোগ্য প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচিত নয়। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এ মিথেনের উৎস সম্পর্কে জানতে কার্বন আইসোটোপ বিশ্লেষণ জরুরি। সেটি না করে একটি দেশের বায়ুমণ্ডল নিয়ে এমন নেতিবাচক প্রচারণা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।

যেখানে দেশে এক বছরের ওপর করোনা পরিস্থিতির জন্য শিল্প-কারখানা বন্ধ প্রায়, শুধু কৃষিই একমাত্র স্বাভাবিক গতিতে চলমান রেখে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা হচ্ছে, সেখানে এ ধরনের প্রচারণা প্রকারান্তরে কৃষিকেই পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী করা হচ্ছে কৃষিতে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরির জন্য। এটি ছোট সময়ে পড়া নেকড়ে ও মেষশাবকের গল্পের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যা কৃষিকেই ইঙ্গিত করে এবং খাদ্য সংকট তৈরির জন্য বিদেশীদের মোক্ষম সুযোগ হাতে তুলে দেয়া; যার আশঙ্কা আমি শুরুতেই করেছিলাম।

বাস্তবতা হচ্ছে, গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলো সবসময় জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দোষারোপ করার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রতিবেদনে যে চারটি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে গ্যাস পাইপলাইন ফুটো মিথেন নির্গমনের একটি প্রধান উৎস হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস পাইপলাইনে লিক বা ফুটো হয়েছে, এমন ঘটনার নজির নেই। তাছাড়া বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বাংলাদেশের একমাত্র বড় শহর ঢাকা এবং এখানে মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদন প্রতিবেশী দেশের বড় বড় শহরের তুলনায় অনেক কম।

একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মহারাজপুর বিল। বিলটিতে আবাদি জমির পরিমাণ দুই হাজার বিঘার বেশি। পাশেই পশ্চিম মহারাজপুর। সেখানে জমির পরিমাণ ছয় হাজার বিঘার মতো। লবণাক্তপ্রবণ ওই বিলসহ আশপাশের বিলে একসময় মাত্র একটি ফসল হতো। আর সেটি হলো বর্ষায় আমন ধান। এরপর পুরো বছরই জমি পড়ে থাকে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গরম বাতাস আর ধূলিঝড় ছিল সেখানে নিত্যকার ঘটনা। কিন্তু ২০১৭ সালে ব্রি বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো পূর্ব মহারাজপুর বিলে বোরো ধানের চাষ করেন কৃষকরা। বর্তমানে মহারাজপুর গ্রামে প্রায় প্রতিটি বিলেই ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯, বিনাধান-১০সহ অন্যান্য ধান চাষাবাদ হচ্ছে, যেখানে আগে কখনো বোরো ধান আবাদই হতো না। ওই জমিতে কৃষক বিঘাপ্রতি ২২ থেকে ২৫ মণ ফলন পাচ্ছেন, উপরন্তু যেখানে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গরম বাতাস আর ধূলিঝড়ের কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারত না; নারীরা দিনের বেলায় চুলা জ্বালাতে পারতেন না। আর এখন ধান চাষের কারণে ধূলিঝড় নেই, পরিবেশও আগের তুলনায় অনেক ঠাণ্ডা ও নির্মল হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি ধান চাষই এ বিলের বায়ুমণ্ডলকে পরিচ্ছন্ন করেছে। এ ধরনের অনেক উদাহরণ খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকায় রয়েছে।

দ্বিতীয় গল্পটি রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের। যেখানে রাজশাহীতে মরুকরণ ঠেকানোর জন্য কত পরিকল্পনা, কত প্রকল্প নেয়া হলো কিন্তু যখন থেকে বোরো ধান চাষাবাদ শুরু হলো, তখন থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে আগের ধূলিও নেই, এত গরমও নেই; যা ধান আবাদেরই সুফল। অধিকন্তু দেশের খাদ্য উৎপাদনের বিশাল একটি অংশ আসে বরেন্দ্র অঞ্চলের বোরো আবাদ থেকেই। প্রসঙ্গক্রমে এখানে বলে রাখা ভালো, যে বিষয়টি এখন খুব জোর প্রচারণা হচ্ছে, বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল অনেকটাই নিমজ্জিত হবে; এর সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ এখানেও ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে হবে। বাংলাদেশ নামক ব-দ্বীপটি কীভাবে তৈরি হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। যেখানে প্রতিনিয়ত দক্ষিণে নতুন নতুন চর জাগার মাধ্যমে বাংলাদেশের আয়তন বাড়ছে, সেখানে ডুবে যাওয়ার বিষয়টি আরো চিন্তা করে প্রচার করতে হবে। মূলকথা হলো, উত্তরে হিমালয় যতদিন আছে ততদিন বাংলাদেশের আয়তন বাড়বে বৈ কমবে না।

যে বিষয়টির প্রতি আমাদের সবচেয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন তা হলো, সবকিছু ঠিক রেখে কীভাবে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমানো যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং তা বাস্তবায়নে বেশকিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে। যেমন ব্রি এমন জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কাজ করছে, যা বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। কারণ আমরা জানি ধান একটি C3 উদ্ভিদ। বায়ুতে CO2-এর পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধান বেশি পরিমাণে CO2 শোষণ করে বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট উত্পন্ন করে। ফলে ধানের ফলন বৃদ্ধি পায়। অধিক CO2 শোষণকারী জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে এরই মধ্যে ব্রি জিন ব্যাংকে সংরক্ষিত জার্মপ্লাজম থেকে পরীক্ষণের মাধ্যমে এমন জাত শনাক্ত করেছে, যাদের CO2-এর প্রতি Responsiveness বেশি এবং অধিক উৎপাদনক্ষম। ভবিষ্যতে অধিক CO2 শোষণকারী এবং অধিক উৎপাদনক্ষম জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে এ জার্মপ্লাজমগুলো ব্যবহার করা হবে। এছাড়া ধান চাষ থেকে আরো কম গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতি ব্যবহার, পরিমিত ও ব্যালান্স সার ব্যবহার, ইউরিয়া সার ছিটিয়ে ব্যবহারের পরিবর্তে মাটির গভীরে প্রয়োগ এবং গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস ব্যবহারের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এবং বাংলাদেশ এরই মধ্যে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ আশাতীত কমে যাবে বলে আমি মনে করি, কেননা এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রিসিশন এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস নিশ্চিত হবে। জেনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে গ্রিনহাউজ গ্যাস শোষণকারী কাঙ্ক্ষিত জাত উদ্ভাবন এবং ন্যানো টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমেও নিঃসরণ কমানো যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব হবে, লবণাক্ততা নিরোধ প্রক্রিয়া সহজতর হবে এবং  সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং আশাহত না হয়ে আশান্বিত হয়ে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করাই শ্রেয়।

পরিশেষে বলতে চাই, দেশ সম্পর্কে বিশেষ করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদন বা এর কোনো নেতিবাচক বিষয় নিয়ে লেখার আগে অবশ্যই সবাইকে এর  পেছনে কী উদ্দেশ্য এবং সুদূরপ্রসারী কী কুফল ভেবে দেখতে হবে। গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের ন্যায় যেকোনো নেতিবাচক বিষয় নিয়ে প্রচার-প্রচারণার আগে সেটি বিজ্ঞানসম্মত ও তথ্যনির্ভর কিনা নিশ্চিত হতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের জন্য প্রয়োজনে যারা এ-সংক্রান্ত গবেষণা করেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করাই সমীচীন।

 

ড. মো. শাহজাহান কবীর: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট