বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারে চিকিৎসাসেবা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে চিকিৎসায় অবহেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত্যুর ঘটনায় শাস্তি কিংবা ক্ষতিপূরণে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। চিকিৎসায় অবহেলা হচ্ছে পেশাদারদের মাধ্যমে প্রতিশ্রুত স্বাস্থ্য অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অবহেলার সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত ত্রুটিও জড়িত। বিষয়টি রোগীকে ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। চিকিৎসা প্রদানকারীদের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুল ও চিকিৎসার প্রক্রিয়াগত মান বজায় না রাখার বিষয়টি অবহেলার পর্যায়ে পড়ে। নিবন্ধিত পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ থাকার পরও চিকিৎসায় অসদাচরণ হচ্ছে নির্ধারিত মান অনুযায়ী সেবা প্রদানে ব্যর্থতা। বেশির ভাগ ঘটনা থেকে যায় শাস্তির বাইরে। ফলে প্রায়ই তা সহিংস রূপ নেয়। ফলে চিকিৎসাসেবার বিষয়ে মানুষের ধারণা দিন দিন নিম্নমুখী হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা অবহেলাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও বিধিমালা তৈরি জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় এটি গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণত ডাক্তারদের ভুল ও অবহেলার প্রশ্ন ওঠে যখন কোনো রোগীর চিকিৎসার এক পর্যায়ে জটিলতা বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় শুধু তখনই। চিকিৎসায় ‘অবহেলা’ বা ভুলজনিত কারণে রোগীর মৃত্যুর বেশকিছু অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। বরাবরের মতো এ নিয়ে রোগীর লোকদের সঙ্গে হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের গোলযোগ, হাতাহাতি ঘটেছে, থানা পুলিশ জড়িত হয়েছে এবং হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও নার্সদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এতে সমস্যা আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের প্রতিকারের জন্য দেশে কিছু বিচ্ছিন্ন আইনি ব্যবস্থা থাকলেও পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। অবহেলার প্রতিকারের জন্য দণ্ডবিধির কয়েকটি ধারা বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের অধীনে মামলার আশ্রয় নেয়া সহজ নয়। ফলে একদিকে চিকিৎসায় অবহেলার শিকার রোগীরা প্রতিকার পাচ্ছে—এমন উদাহরণ কম, অন্যদিকে প্রকৃত অবহেলা থাকুক বা না থাকুক চিকিৎসকরা রোগী বা তার আত্মীয়-স্বজনদের আক্রোশের শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের আক্রোশের একটি কারণ হচ্ছে তারা জানে আইনে প্রতিকার পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) মাধ্যমে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ করা যায়। তবে এর জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং প্রক্রিয়াটিও জটিল। এ পর্যন্ত খুব কম অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে পেরেছে বিএমডিসি। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ডাক্তারদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় রোগীর সুবিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটি সরকারিও নয়। ফলে তাদের বিচার নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে।
বিদ্যমান চিকিৎসা অবহেলা বা চিকিৎসাসংক্রান্ত যে আইনগুলো রয়েছে সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তেমন অবগত নয়। তাই ওই আইনগুলো যুগোপযোগী করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশে চিকিৎসা অবহেলার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইন এখন পর্যন্ত প্রণয়ন করা হয়নি। তাই সরকারের উচিত চিকিৎসা অবহেলাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন দ্রুত প্রণয়ন করা। চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যেসব পেশাজীবী জড়িত তাদের জবাবদিহির অভাব রয়েছে। ফলে চিকিৎসায় অবহেলা প্রায়ই হচ্ছে। এজন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসায় অবহেলা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বিএমডিসির তেমন কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না, যা দুঃখজনক। এক্ষেত্রে বিএমডিসির উচিত চিকিৎসায় অবহেলা কমিয়ে আনার জন্য আরো শক্ত ভূমিকা পালন করা।
বাংলাদেশে ২০১৬ সালে “রোগী এবং স্বাস্থ্যসেবা দানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন” নামে একটি আইন প্রস্তাব করে সরকার। কিন্তু আইনটি এখনো পাস হয়নি। আইনটির খসড়া প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই এর সমালোচনা শুরু হয়েছে এই নিয়ে যে এতে রোগী নয়, বরং চিকিৎসকদের সুরক্ষার দিকে বেশি নজর দেয়া হয়েছে। ভুল চিকিৎসার অভিযোগে রোগীর আত্মীয়দের সঙ্গে চিকিৎসকদের নানা সময়ে যে বিবাদ, ভাংচুরের ঘটনা ঘটে, সে বিষয়টিই নজর পেয়েছে বেশি। আইনটি এখনো সংশোধনীর মধ্যেই আটকে রয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন এখনো পাস করতে না পারা দুঃখজনক। দ্রুতই সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে একটি বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়ন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে আইন আছে। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা ও তাদের পর্যবেক্ষণের কাজটি করে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল (জেএমসি)। এটি চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে তারা রোগীদের স্বার্থের বিষয়টিও দেখাশোনা করে। দক্ষতা, যোগ্যতা ও রোগীদের কল্যাণ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান যাচাইপূর্বক লাইসেন্স ও নিবন্ধন দেয়া হয়। লাইসেন্স বহাল রাখা হবে কিনা সে বিষয়ে প্রতি বছর চিকিৎসকের সেবা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করে জেএমসি। চিকিৎসা-সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধে রোগী ও চিকিৎসক অভিযোগ করতে পারে জেএমসিতে। অভিযোগ তদন্তে জেএমসির নিজস্ব তদন্ত দল রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়। পেশাগত ভুল, অবহেলা কিংবা অন্য কোনো অপরাধ বিবেচনায় চিকিৎসকের লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগে রোগীকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, তবে চরম অবহেলার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
টর্ট আইন বাংলাদেশে তেমন প্রয়োগ করা হয় না। কিন্তু উন্নত দেশগুলোয় চিকিৎসা অবহেলার জন্য বেশির ভাগ মামলা টর্ট আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। এতে খুব কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ওই আইন যত বেশি ব্যবহার করা হবে ততই ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ লাভবান হবে। তার জন্য বিচারক, আইনজীবী ও বিচার প্রক্রিয়াসংশ্লিষ্ট সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তদন্ত প্রক্রিয়ায় যারা যুক্ত আছেন তাদের চিকিৎসা অবহেলা এবং এর আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাদের শিক্ষা, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির অভাব রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ যথাযথ প্রতিকার পায় না। তাই বিচার বিভাগ ও পুলিশ বিভাগের সদস্যদের চিকিৎসা অবহেলা সংক্রান্ত বিষয়ে আরো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। চিকিৎসা অবহেলাসংক্রান্ত রিট বা জনস্বার্থে মোকদ্দমার ক্ষেত্রে অনেক সময় সরকারপক্ষের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এর জন্য সরকারপক্ষের আরো সহযোগিতা করা উচিত, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ সঠিক প্রতিকার পায়। চিকিৎসাসেবা সংক্রান্ত মামলার জন্য বাংলাদেশে আলাদা কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল এখন পর্যন্ত গঠন হয়নি। যে হারে চিকিৎসা অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার ঘটনা ঘটছে তাতে সরকারের উচিত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বিশেষায়িত আদালত বা ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সাধারণ জনগণের চিকিৎসা অবহেলার আইনি প্রতিকার সম্পর্কে যথাযথ ধারণা বা তথ্য নেই। এক্ষেত্রে সভা, সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদির আয়োজন বেশি বেশি করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমও এ প্রচারণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে চিকিৎসা অবহেলার প্রতিকার পাওয়ার জন্য সাংবিধানিক, দেওয়ানি, ফৌজদারি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থায় নানা ধরনের সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চিকিৎসা অবহেলার প্রতিরোধ বা প্রতিকারের জন্য সরকারের আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। চিকিৎসায় সতর্কতা অবলম্বনের মান নির্ধারণ, অবহেলার প্রকৃতি, প্রকার এবং তা পরিমাপ ও নিরসনের কার্যকর পদ্ধতি ঠিক করে সমস্যাটি যথাযথভাবে মোকাবেলার জন্য একটি পরিপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা উচিত। সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতালগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসার সুবিধাদি ও সার্বিক মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে চিকিৎসায় অবহেলার সুযোগও কমে আসবে।










