হকাররা ফুটপাতের
জায়গা অবৈধভাবে
দখল করে
ব্যবসা করেন।
নগরপতিরা হকারদের
অনাহূত ভাবেন।
তাদের রাস্তা
থেকে সরে
যেতে বলেন।
কিন্তু হকাররা
হয়তো বেয়াদব।
নিয়ম-নীতি
মানতে চান
না। অথবা
তাদের কোনো
বিকল্প থাকে
না। তাই
তারা ফুটপাত
কামড়ে পড়ে
থাকেন। কিন্তু
এটা তো
সরকারি জায়গার
ওপর নগর
কর্তৃপক্ষের একচ্ছত্র
কর্তৃত্বের ওপর
সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
তাছাড়া কর্তৃপক্ষ
শহর পরিচ্ছন্ন
আর নিরাপদ
রাখতে বদ্ধপরিকর।
দখলদারদের হাত
থেকে নগর
রক্ষা করতে
চায়। তাই
হকারদের উচ্ছেদ
করা হয়।
আড়ম্বরপূর্ণ এসব
উচ্ছেদ অভিযানে
কোনো হকারের
সবেধন পুঁজি
নিঃশেষ হয়ে
যায়, কারো
বহুকষ্টে গড়া
টুকলি ভেঙে
ফেলা হয়।
এমনকি কাউকে
কাউকে জেলে
যেতে হয়।
এর পরও
তারা ফিরে
ফিরে আসেন
সেই ফুটপাতে।
হকার সমস্যা
মূলত নগরকেন্দ্রিক।
প্রাকৃতিক বিভিন্ন
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তের
পাশাপাশি ভূমিতে
অধিকারহীনতা আর
অর্থনৈতিক স্থবিরতার
কারণে গ্রামীণ
দরিদ্ররা শহরমুখী
হয়। অর্থনীতিবিদ
আবুল বারকাতের
হিসাব অনুযায়ী;
দেশের মোট
পরিবারের প্রায়
৬০ শতাংশের
হাতে জমি
আছে ৪
দশমিক ২
শতাংশ, অথচ
৬ দশমিক
২ শতাংশ
পরিবারের কাছে
জমি আছে
৪০-৪৫
শতাংশ। এ
রকম পরিস্থিতিতে
নির্মলেন্দু গুণের
কবিতায় গরিব
কৃষক আশা
করে; ‘খোদার
জমিন ধনীর
দখলে গেছে,
আইনের জোরে/
আমাগো জমিন
অইব, যেদিন
আইনের চাকা
ঘোরে’।
কিন্তু আইন
আর তাদের
দিকে ঘুরে
না। বিপরীতে,
জীবিকার সন্ধানে
তারা নগরের
প্রধানত ঢাকার
দিকে ঘুরতে
বাধ্য হয়।
ঢাকায় প্রতিদিন
১ হাজার
৭০০-র
বেশি লোক
প্রবেশ করে।
নগর উন্নয়ন
তাত্ত্বিকদের মতে,
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর
মেগাসিটিতে অর্থনীতির
গতির তুলনায়
জনসংখ্যা দ্রুত
বৃদ্ধি পায়।
‘চাকরিবিহীন
প্রবৃদ্ধি’র
ফলে তখন
অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক
খাতগুলো সবার
জন্য কাজের
সংকুলান করতে
পারে না।
তাতে করে
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে
অংশগ্রহণ বেড়ে
যায়। হকারি
হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক
খাতের অন্যতম
বড় ও
দৃশ্যমান খাত।
এ খাতে
নগদ টাকার
লেনদেন সবচেয়ে
বেশি হয়।
২০১৯ সালের
এক জরিপে
দেখা যায়,
ঢাকার হকাররা
বছরে ৩০০
কোটি টাকা
চাঁদা দেন।
মূলত স্বল্প
শিক্ষা আর
দক্ষতার প্রয়োজন
কম বলে
সহজেই এ
ব্যবসায় প্রবেশ
করা যায়।
এছাড়া ন্যূনতম
পুঁজিতেও হকারিতে
ভালো লাভের
সম্ভাবনা একটি
বড় প্রণোদনা।
উন্নয়নশীল কিছু
দেশের মেগাসিটি
হকার পুনর্বাসনে
সফল হলেও
ঢাকা এক্ষেত্রে
ব্যর্থ। ঢাকায়
হকার সমস্যা
প্রকট হওয়ার
অন্যতম প্রধান
কারণ এটি
পৃথিবীর সবচেয়ে
জনঘনত্বপূর্ণ শহর।
ফলে এখানে
স্পেস বা
জায়গার ওপর
নিয়ন্ত্রণ একটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জায়গার নিয়ন্ত্রণ
নিয়ে বিভিন্ন
স্বার্থান্বেষী দলের
মধ্যে প্রতিযোগিতাও
বেশি হয়।
যদিও জায়গার
ওপর নগরীর
সবার সমান
অধিকার রয়েছে,
কিন্তু ক্ষমতাবলয়ের
কাছাকাছি থাকা
ও সম্পদশালী
গুটিকয়েক জায়গার
নিয়ন্ত্রণ নিয়ে
নেয়। ক্ষমতাহীন
ও সচেতনতার
অভাবে হকাররা
কোনোভাবেই নগরীতে
জায়গার ভাগীদার
হতে পারেন
না। তাছাড়া
কর্তৃপক্ষ ১৯৮৩
সালের অর্ডিন্যান্সের
মাধ্যমে হকারিকে
অবৈধ ঘোষণা
করে।
এতে করে
একটা জিনিস
প্রতীয়মান হয়,
বাংলাদেশে আয়
সমতা নিশ্চিত
করার ক্ষেত্রে
ভূমির অধিকার
একটি গুরুত্বপূর্ণ
নিয়ামক। সেটা
শহরে বা
নগরে। গ্রামীণ
দরিদ্ররা ভূমিহীন
হয়ে শহরে
আসেন জীবিকার
সন্ধানে। তাদের
অনেকে হকারিকে
পেশা হিসেবে
নেন। কিন্তু
সেসব হকার
নগরীরও জায়গার
ওপর অধিকার
থেকে বঞ্চিত
হন। এভাবে
হকাররা কোথাও
কোনো অধিকার
পান না।
নাগরিক অধিকারের
মধ্যে জায়গার
ওপর অধিকার
একটি গুরুত্বপূর্ণ
উপাদান। এ
অধিকার থেকে
বঞ্চিত হওয়ার
মাধ্যমে তারা
‘নগরবিহীন
নাগরিকে’ পরিণত
হয়।
এ রকম
নিষ্ঠুর পরিস্থিতির
মুখে পড়ে
তারা তখন
বিকল্প মাধ্যমের
দ্বারস্থ হন।
জায়গা পাওয়ার
জন্য হকাররা
স্থানীয় রাজনৈতিক
নেতা, মাস্তান
ও আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর সমন্বয়ে
তৈরি একটি
গোষ্ঠীকে ‘ম্যানেজ’
করে। এ
গোষ্ঠীকে নিয়মিত
নির্দিষ্ট পরিমাণ
চাঁদা দেয়ার
মাধ্যমে হকাররা
তাদের জীবনযাত্রার
জন্য উপার্জনের
ব্যবস্থা করেন।
হকারের সবচেয়ে
বড় আর
প্রসিদ্ধ জায়গা
হচ্ছে গুলিস্তান।
১৯৭৫ সালে
এখানকার হকারকে
ঢাকার তিনটি
ভিন্ন ভিন্ন
স্থানে প্রথমবারের
মতো পুনর্বাসন
করা হয়।
কিন্তু ১৯৭৮
সালে কোনো
নতুন ব্যবস্থা
না করেই
তাদের সেখান
থেকে উচ্ছেদ
করা হয়।
পুনর্বাসনবিহীন এ
উচ্ছেদ প্রক্রিয়া
এখনো হকারের
জীবনে এক
অবিচ্ছেদ্য অংশ
হয়ে আছে।
অধিকাংশ হকার
তার পরিবারের
প্রধান উপার্জনক্ষম
ব্যক্তি। তারা
কখনো স্বেচ্ছায়
তাদের পরবর্তী
প্রজন্মকে এ
পেশায় জড়াতে
চান না।
ফলে সন্তানের
শিক্ষার ব্যাপারে
তাদের আগ্রহ
রয়েছে। কিন্তু
দেখা যায়,
প্রতিবারের উচ্ছেদের
বিপরীতে তাদের
প্রায় দুয়েক
মাসের আয়ের
টাকার সমপরিমাণ
ক্ষতি হয়।
উচ্ছেদের পরের
সময়ের বেকার
জীবন আর
নতুন করে
ব্যবসা শুরুর
জন্য তাদের
ঋণগ্রস্ত হওয়া
ছাড়া অন্য
কোনো উপায়
থাকে না।
এছাড়া উচ্ছেদের
ক্ষতি কাটিয়ে
উঠতে সঞ্চয়ের
টাকা ব্যবহার,
এমনকি মাঝেমধ্যে
তারা সম্পত্তি
বিক্রি করতেও
বাধ্য হন।
এ অবস্থায়
পরিবারের সবার
জন্য খাদ্য
নিশ্চিত ও
সন্তানের শিক্ষার
ব্যয় বহন
করে চলা
এক দুরূহ
ব্যাপার হয়ে
দাঁড়ায়। এভাবে
হকাররা বঞ্চনার
এক অমোঘ
দুষ্টচক্রে পতিত
হন।
এ পরিস্থিতি
থেকে উত্তরণে
সুষ্ঠুভাবে হকার
পুনর্বাসনের কোনো
বিকল্প নেই।
এক্ষেত্রে ঢাকার
হকার সংগঠনগুলো
সাধারণত হকারির
জন্য নির্দিষ্ট
জায়গা ঠিক
করা, হকারদের
লিস্ট করা,
তাদের লাইসেন্স
দেয়া ও
উচ্ছেদের যথাযথ
প্রক্রিয়া মেনে
চলা ইত্যাদি
ব্যবস্থার কথা
বলে। ২০১৪
সালে এ
বিষয়গুলো নিশ্চিত
করার জন্য
ভারতে আইনও
প্রণয়ন করা
হয়। ফলে
রাষ্ট্রও নির্দিষ্ট
রাজস্বের সুবিধা
পাবে। বাংলাদেশে
হকার পুনর্বাসনে
বেশ কয়েকবার
জায়গা বরাদ্দ
দেয়া হলেও
শেষ পর্যন্ত
তা ক্ষমতাশালীদের
হাতে চলে
যায়। প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয় থেকে
ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলের
পাঁচটি জায়গা
হকার পুনর্বাসনে
নির্ধারিত হলেও
তার বাস্তবায়ন
হয়নি। মোটা
দাগে রাষ্ট্রীয়
উদ্যোগ সত্ত্বেও
এ ব্যর্থতার
সঙ্গে দুটি
বিষয় জড়িত।
প্রথমত, নগর
কর্তৃপক্ষ হকার
সমস্যা সঠিকভাবে
অনুধাবন করতে
পারেনি। তারা
হকার সমস্যাকে
পরিচ্ছন্ন নগরের
ভাবমূর্তির বিপরীতে
দাঁড় করিয়েছে।
এটি মূলত
পশ্চিমা ‘আধুনিকায়ন
নীতি’ দ্বারা
প্রভাবিত, যেখানে
নগরীর মডেলে
‘পরিচ্ছন্নতা’
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কিন্তু উন্নয়নশীল
রাষ্ট্রে নগরীর
ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের
কারণে এ
ধারণা কার্যকর
নাও হতে
পারে। ফরাসি
দার্শনিক ফ্রানৎস
ফানোঁ বলেছিলেন;
ঔপনিবেশিক মন
তার ‘ভাবমূর্তি’
নিয়ে সদা
সতর্ক থাকে।
আমরা দেখি;
ঢাকায় উচ্ছেদ
অভিযানগুলো চালানো
হয় মূলত
নগরীর উজ্জ্বল
ভাবমূর্তি রক্ষার
জন্য। যেমন
আন্তর্জাতিক খেলা
বা সম্মেলনের
সময় অথবা
ভিআইপিদের যাতায়াতের
স্থলে। অথচ
এর বিপরীতে
রাস্তা দখল
করে যত্রতত্র
পার্ক করা
উচ্চ শ্রেণীর
ব্যক্তিগত গাড়ির
বিরুদ্ধে কোনো
ব্যবস্থা নিতে
দেখা যায়
না। এলিটকেন্দ্রিক
এসব নীতিমালার
বাস্তবায়ন বাংলাদেশের
রাষ্ট্রের উদ্ভবের
দার্শনিক ভিত্তির
সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দ্বিতীয়ত, নিজেদের
অধিকার সম্পর্কে
হকারের সচেতনতার
অভাব। বাংলাদেশে
হকার সংগঠনগুলো
নির্দিষ্ট রাজনৈতিক
দলভিত্তিক হওয়ায়
তারা তাদের
দাবিগুলোয় বৃহত্তর
রাজনৈতিক এজেন্ডায়
পরিণত করতে
পারেনি। লাতিন
আমেরিকা ও
ভারতের হকার
সংগঠনগুলো এক্ষেত্রে
ব্যতিক্রম বলেই
সেখানে সফলভাবে
পুনর্বাসন ও
আইন প্রণয়ন
সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে
‘ক্লায়েন্ট-পেট্রন’
রিলেশনশিপ গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে রাষ্ট্রীয়
অধিকারগুলোও দেনা-পাওনা
যেমন ভোট
বা অর্থনৈতিক
সুবিধার ভিত্তিতে
বিনিময় করা
হয়। এ
রকম পরিস্থিতিতে
হকারদের সংগঠিত
হওয়া এবং
নিজেদের দাবির
পক্ষে বড়
আন্দোলন গড়ে
তোলা সত্যিই
কঠিন ব্যাপার।
হকারের ওপর
দীর্ঘকাল ধরে
চলে আসা
এ নিপীড়ন
ও উচ্ছেদের
বিরুদ্ধে নাগরিক
সমাজের জোরালো
প্রতিবাদ না
করার মাধ্যমে
হকারের নাজুকতাকে
সামাজিক ও
সাংস্কৃতিকভাবে স্বীকৃতি
দেয়া হয়েছে।
এ অবস্থায়
রাষ্ট্র হয়তো
সাময়িক প্রত্যক্ষ
কোনো ক্ষতির
সম্মুখীন হবে
না, কিন্তু
সামগ্রিকভাবে টেকসই
উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা
অর্জন ও
সবার যথোপযুক্ত
কাজের নিশ্চয়তা
দেয়ার ক্ষেত্রে
ভবিষ্যতে এক
গুরুতর চ্যালেঞ্জের
সম্মুখীন হবে।
এজন্য অর্থনীতির
বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে
নতুন নতুন
কর্মসংস্থান সৃষ্টি,
ক্রমান্বয়ে হকারকে
বিভিন্ন কর্মসংস্থানে
পুনর্বাসন ও
রাষ্ট্রীয় নীতিমালার
কেন্দ্রে হকারসহ
প্রান্তিক মানুষের
প্রয়োজনীয়তাকে অগ্রাধিকার
দেয়ার রাজনৈতিক
সদিচ্ছা প্রকাশের
মাধ্যমে এ
সমস্যা কাটিয়ে
ওঠা সম্ভব
হবে।
আতাউর রহমান
মারুফ: গবেষণা সহযোগী
হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি)










