বিশ্ব অর্থনীতি কভিড থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছে এবং অনেক অনিশ্চয়তার মাঝেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখছে বা অন্তত কভিডকে সঙ্গে নিয়েই জীবন ও জীবিকার পথ বেছে নেয়ার প্রক্রিয়ার মাঝে সংগ্রাম করছে। এ প্রচেষ্টা আমাদের স্বাভাবিক আচরণ। তবে সবচেয়ে জরুরি বিষয়, আমরা কি কভিড মোকাবেলার মধ্যেই আমাদের প্রচেষ্টা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছি, নাকি এ সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করে তার সমাধানের পথও অনুসরণের প্রক্রিয়ার মাঝে আছি? মূলত কভিড মানবজাতির প্রকৃতিবিরুদ্ধ আচরণের ফলাফল, যা স্বীকৃত। সুতরাং এই জটিল সমস্যা থেকে শিক্ষা নেয়ার কাজটা করছি কিনা, সেটাই সবচেয়ে জরুরি বিষয়।

যুগে যুগে এ ধরনের প্রাণঘাতী জীবাণুর আগমন এবং মানবজাতির উন্নয়ন ধারাকে থামিয়ে দেয়া বা বাধাগ্রস্ত করার প্রক্রিয়া বারবার হয়েছে, অনেকবার হয়েছে। ফলস্বরূপ, মানবজাতি স্বল্প সময়ের জন্য তাদের প্রকৃতিবিরুদ্ধ আচরণকে সংযত করলেও গতানুগতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেনি। সার্বিক ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে কভিড আগের সব প্রাণঘাতী জীবাণুকে হার মানিয়েছে এবং মানবজাতিকে জানান দিয়েছে যে ভবিষ্যতের এ ধরনের সমস্যা বা পরবর্তী কভিড মোকাবেলায় আমাদের মূল উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে, সংযত আচরণে অভ্যস্ত হতে হবে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে।

কীভাবে আমরা বারবার এ ধরনের প্রাণঘাতী জীবাণুকে আমাদের মাঝে টেনে এনেছি? উন্নয়ন ও নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির ধবংসযজ্ঞ সমানতালে এগিয়েছে। নিজেদের বাসস্থান তৈরি করেছি, সাজিয়েছি বন্য পশুদের বাসস্থান ধ্বংস করে। ফলে বন্য পশু-পাখিদের মাধ্যমে জীবাণু সংক্রমণের সুযোগ তৈরি করেছি আমরা নিজেই। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানবজাতি শুধু নিজেদের কাছাকাছি আসেনি, বন্য পশুদেরও বিশ্বভ্রমণে সঙ্গী করেছে এবং জীবাণুর বিস্তার সহজতর করেছে। সাম্প্রতিক সময়ের অনেক গবেষণা প্রমাণ করেছে, আমাদের গতানুগতিক উন্নয়ন ধারার মাঝেই কভিডসহ আমাদের পরিচিত প্রাণঘাতী জীবাণুগুলোর জন্মরহস্য ও তাদের বিস্তারের কারণ পরিষ্কার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা মতে, করোনার মতো বিশ্বের প্রাণঘাতী অসুখগুলোর সঙ্গে আমাদের জীবনযাপন, সামাজিকতা, খাদ্যাভ্যাস, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি পরিবেশ ও প্রকৃতির সম্পর্ক আছে, আর তাই এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন না আনলে কভিড আর অন্যান্য প্রাণঘাতী জীবাণু থেকে মুক্তির উপায় নেই।

যুগে যুগে পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানবজাতির কল্যাণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে যেসব গবেষণার ধারা উন্মোচন করা হয়েছে, সময় বলে দিয়েছে আর কভিড সতর্ক করছে কঠিন ভাষায়—‘তা অর্জন সম্ভবপর নয়।’ বরং প্রকৃতিকে পাশে নিয়ে এবং পরিবেশের প্রতি যত্নবান হয়ে মানবজাতির সবচেয়ে বেশি কল্যাণ করা সম্ভব। আর এভাবেই গড়ে তোলা যাবে পরিবেশ ও প্রকৃতিবান্ধব একটি টেকসই পৃথিবী। সেজন্য অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর লোভ সংবরণের মাধ্যমে উন্নয়নের দ্রুততায় লাগাম টানতে হবে। পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক, বাণিজ্য ও আর্থিক খাতের লক্ষ্য ও কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে।

কভিড পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর কাজ হবে বিশ্বনেতৃত্বের। জিডিপি লক্ষ্য অর্জনের ধারায় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। জিডিপি বা জিএনপি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সূচক। তবে এসব সূচকে পরিবেশ ও প্রকৃতির সংরক্ষণ বা দীর্ঘকালীন টেকসই উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণের দিকগুলো প্রতিফলিত হয় না। বছরের পর বছর পরিবেশ ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করে আমরা সারা বিশ্বের দেশগুলোর উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রেখেছি এবং জিডিপি বা জিএনপি লক্ষ্য অর্জনের ‘সংখ্যা প্রতিযোগিতা’য় অবতীর্ণ হয়েছি। সাধারণভাবে জাতিসংঘ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দেশের উদ্যোগে পরিবেশ ও সমাজের অবহেলিত বর্গের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্যোগ আছে। তবে টেকসই উন্নয়নের মূল দিকগুলো কখনই উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত হয়নি এবং বিশেষ উদ্যোগ বা উন্নয়নক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। সময় এসেছে এ বিষয়গুলোকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার। জিডিপি বা জিএনপি নয়, দেশের উন্নয়নের মূল সূচক হওয়া উচিত আইজিজি অর্থাৎ  ‘ইনক্লুসিভ গ্রিন গ্রথ’ বা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ উন্নয়ন’ সূচক; যা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশসংক্রান্ত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সন্নিবেশ ও ইঙ্গিত করে। সামাজিক ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়, সেটাই প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন। বিশেষ করে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনে মানবজাতি যে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে, তা থেকে সম্পূর্ণ সরে আসার বিকল্প নেই যদি ভবিষ্যতের কভিড থেকে মুক্ত হতে চায় আমাদের সভ্য সমাজ (স্বঘোষিত)। অন্তত প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সভ্যতার প্রদর্শন আমরা করিনি, বরং বিলুপ্ত হয়ছে অস্যংখ্য প্রজাতি। কভিড থেকে শিক্ষা নিয়ে একটা বড় ইতিবাচক অগ্রগতি হতে পারে আইজিজির মতো একটি সূচকের ব্যবহার ও প্রচলনের মাধ্যমে।

সাধারণভাবে শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সামাজিক ও পরিবেশের বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে উৎসাহিত হয় না। শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্রে আমরা সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় কিছু লোকহিতৈষী কর্মকাণ্ড দেখতে পাই, যা মূলত বিপণন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ক্ষেত্র থেকে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় বড় কিছু আশা করা ঠিক বলে মনে হয় না। বিষয়গুলোকে আজকের এ অবস্থায় কোনো ব্যক্তি, দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়ার সুযোগ নেই। বিশ্ব তথা দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিধিবদ্ধ কাঠামোর আওতায় প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় প্রণোদনার সময় আর নেই, দরকার কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা। গতানুগতিক লাভ নয়, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও দরকার আইজিজির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এক বা একাধিক সূচকের ব্যবহার ও প্রচলন।

নীতি ও পন্থাগত বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন আর্থিক খাতে। আশির দশক থেকে উন্নত এবং কিছু উন্নয়নশীল দেশে সবুজ অর্থায়ন গ্রহণযোগ্য হতে শুরু করে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিশেষ কিছু উন্নয়ন খাতে। তবে সবুজ অর্থায়ন বা সবুজ ব্যাংকিং আর্থিক কার্যক্রমের মূলধারা হয়ে ওঠেনি, বরং পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং বা অর্থায়ন কার্যক্রম আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিপালন কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রমে অংশ নিয়ে থাকে। আজকের জটিল সমস্যার সমাধানে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকার ও নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান শুধু নিজেদের পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না, অন্যান্য ব্যবসা ও শিল্প-কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় এমন কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে, যাতে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করেই কেবল অর্থায়নের সুযোগ গ্রহণ করা যায়। আর এ ধরনের পরিবর্তন মানে হলো, আর্থিক পরিচালন ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার, যেখানে ‘ব্যাংক মানেই সবুজ ব্যাংক’, ‘অর্থায়ন মানেই সবুজ অর্থায়ন’, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান মেনেই পরিবেশবান্ধব আর্থিক প্রতিষ্ঠান’।

কভিডমুক্ত এ ধরনের একটি নতুন পৃথিবীর ভিত্তি রচনা করতে হবে চলমান পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মাঝেই, বিশ্বনেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়েই। দরকার হবে সমন্বিত স্বার্থ সংরক্ষণের দৃঢ় অঙ্গীকার।

কেমন হতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির কভিড-পরবর্তী উন্নয়ন ধারা?

কভিডের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য আরো জোরেশোরে গতানুগতিক উন্নয়ন ধারায় ফিরে আসা এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির ধবংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়া। ফলে স্বল্পকালীন উন্নয়নের ঊর্ধ্বগতি হয়তো অর্জিত হবে বেশ সহজে, তবে পরিবেশ ও প্রকৃতি মানবজাতির মুখোমুখি অবস্থান নেবে আরো দৃঢ়ভাবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রাস্তা তৈরি হবে আর এক ভয়ানক কভিডের।

অথবা কভিড থেকে প্রকৃত শিক্ষা নিয়ে সবুজ অর্থনীতি, পরিবেশবান্ধব ব্যবসা-বাণিজ্য আর সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে নতুন এক উন্নয়ন ধারার সূচনা করা হবে। এতে হয়তো উন্নয়নের গতি শ্লথ হবে। তবে সে যাত্রায় প্রকৃতি ও পরিবেশকে পাওয়া যাবে সহযাত্রী হিসেবে; টেকসই হবে এ পৃথিবী, আমাদের জন্য, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।

পূর্ব অভিজ্ঞতা অবশ্য প্রথম বিকল্পের দিকে ইশারা করে। এরই মধ্যে তার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। নিরাশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট যুক্তি বিদ্যমান। তার পরও দ্বিতীয় বিকল্পের আশা ছাড়তে চাই না।

 

ড. শাহ মো. আহসান হাবীব: বিআইবিএমের অধ্যাপক ও পরিচালক প্রশিক্ষণ