বিশ্বজুড়ে আবারো
দাবানলের মতো ছড়িয়ে
পড়ছে কভিড-১৯
সংক্রমণ। অতি সংক্রামক
ওমিক্রন ধরন আশঙ্কাজনকহারে
বাড়িয়ে তুলছে
প্রাদুর্ভাব। সংক্রমণের
সঙ্গে পাল্লা
দিয়ে বাড়ছে
হাসপাতালে ভর্তি
ও মৃতের
সংখ্যাও। কয়েক
সপ্তাহ ধরে এ
ঢেউ এসে পড়েছে
বাংলাদেশেও। সংক্রমণ
থেকে শুরু
করে শনাক্তের
হার সবকিছুই
ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এ অবস্থায়
কঠোর স্বাস্থ্যবিধি
পরিপালনই আমাদের
ওমিক্রন মোকাবেলায়
এগিয়ে রাখতে
পারে। এক্ষেত্রে
সরকারেরও কঠোর
হওয়া ছাড়া
পরিস্থিতি ভয়াবহ
রূপ নিতে
পারে।
কয়েকদিন ধরে
সরকারের পক্ষ
থেকে প্রাদুর্ভাব
নিয়ন্ত্রণে রাখতে
বিধিনিষেধ আরোপের
কথা বলা হচ্ছিল।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে
সোমবার উন্মুক্ত
স্থানে রাজনৈতিক,
সামাজিক, ধর্মীয়
অনুষ্ঠান ও সামবেশ
বন্ধ রাখাসহ
১১ দফা বিধিনিষেধ
জারি করে সরকার।
আগামী বৃহস্পতিবার
থেকে দেশবাসীকে
এ বিধিনিষেধগুলো
মেনে চলতে
হবে। দেশে
ওমিক্রন শানাক্তের
পর থেকেই
বিষয়গুলো নিয়ে
সব মহলে
আলোচনা চলছে।
প্রস্তুতি নিতে
শুরু করেছে
দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও।
আগাম এসব সতর্কতা
খুবই ইতিবাচক
খবর। প্রাথমিক
পর্যায়েই কঠোর
স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের
মাধ্যমে তৃতীয়
ঢেউয়ের ভয়াবহ
পরিস্থিতি এড়ানো
যেতে পারে।
এক.
স্বাস্থ্যবিধি মানতে
পারলে দুই ধরনের
ইতিবাচক প্রভাব
রয়েছে। প্রথমত
কঠোর স্বাস্থ্যবিধি
মেনে চলতে
পারলে আমাদের
নাজুক স্বাস্থ্যব্যবস্থা
ভেঙে পড়ার
মতো পরিস্থিতি
এড়ানো যায়।
এতে সংক্রমণের
গতিও ধীর হয়ে
যায়। নির্দিষ্ট
সংখ্যক সংক্রমণ
ও অসুস্থতায়
হাসপাতালগুলো রোগীদের
সেবা দিয়ে
সারিয়ে তোলার
সুযোগ পায়।
কমে যায় চিকিত্সার
অভাবে মৃত্যুর
ঝুঁকিও।
অন্যদিকে কঠোর
স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি
লকডাউন আরোপ
থেকেও বাঁচাতে
পারে। ২০২০
সালে লকডাউনের
প্রভাব আমরা
দেখেছি। আমদানি-রফতানি
বাণিজ্যসহ সব ধরনের
কার্যক্রম বন্ধ
হয়ে স্থবির
হয়ে পড়ে অর্থনীতি।
ব্যবসায়ীরা এখনো
সেই প্রভাব
পুরোপুরি কাটিয়ে
উঠতে পারেনি।
আয়ের পথ বন্ধ
হয়ে দরিদ্র
মানুষের করুণ
দশা প্রত্যক্ষ
করতে হয়েছে।
দারিদ্রসীমার নিচে
চলে গেছে
লাখ লাখ মানুষ।
পুনরায় এ পরিস্থিতি
এড়াতেই কঠোর
স্বাস্থ্যবিধি মানতে
মনোযোগী হতে হবে।
দুই.
পূর্বের অভিজ্ঞতা
বলে আমরা
পদক্ষেপ নিতে
অনেক দেরি
করি। পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণের বাইরে
যাওয়ার আগে পর্যন্ত
স্বাস্থ্যবিধি মানতে
খুব বেশি
আগ্রহ দেখা
যায় না। পরিস্থিতি
খারাপ হওয়ার
পর শুরু
হয় স্বাস্থ্যবিধি
পরিপালনের তোড়জোড়।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই
আমরা মহামারীর
তীব্রতা এড়াতে
পারি না। এবার
আগেভাগে স্বাস্থ্যবিধি
নিয়ে কথাবার্তা
শুরু হলেও
এখন পর্যন্ত
জনসাধারণের মধ্যে
তেমন আগ্রহ
দেখা যাচ্ছে
না। মানুষজনে
ঠাসা ভিড় নিয়েই
চলছে গণপরিবহনগুলো।
সামাজিক দূরত্ব
তো পরের
কথা, মাস্ক
ব্যবহারের ক্ষেত্রেও
রয়েছে অনীহা।
হাতেগোনা কয়েকজন
ছাড়া বেশিরভাগ
মানুষের মুখেই
মাস্ক দেখা
যাচ্ছে না। সব
ধরনের পাবলিক
অনুষ্ঠান চলছে।
তুমুল আনন্দ-উত্সাহে
চলছে স্থানীয়
সরকার পর্যায়ের
নির্বাচনও। এগুলো
সংক্রমণ ছড়িয়ে
দেয়ার ক্ষেত্রে
‘সুপার স্প্রেডার’
হিসেবে কাজ করতে
পারে। এজন্য
স্বাস্থ্যবিধি মানতে
কঠোর নজরদারির
কোন বিকল্প
নেই। প্রয়োজনে
সরকারকে আইন প্রয়োগে
মনোযোগ দিতে
হবে।
যদিও এটি কেবল
সরকারের পক্ষে
বাস্তবায়ন করা কঠিন।
বরং প্রতিটি
পর্যায় থেকে
স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনে
জোর দিতে
হবে। সতর্কতা
জারি করতে
হবে প্রতিটি
প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন
থেকেও। নিজেদের
প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই
কর্মীদের সামাজিক
দূরত্ব, নিয়মিত
হাত ধোয়া
ও মাস্ক
পরতে উত্সাহিত
করতে হবে।
আমাদের হাতে
হয়তো আর খুব
বেশি সময়ও
নেই। মার্চ-এপ্রিলের
দিকে সংক্রমণ
শীর্ষে উঠতে
পারে। এজন্য
যা করার
আমাদের এখনই
করতে হবে।
তিন.
কয়েকদিন আগে
একজন মুদি
দোকানির সঙ্গে
কথা হচ্ছিল।
কথা বলে বুঝলাম
দুই ডোজ টিকা
নিয়ে তিনি
খুবই আত্মবিশ্বাসী।
কভিড ধারেকাছেও
যেতে পারবে
না বলে তার
দৃঢ় বিশ্বাস।
এ ধরনের
‘বিভ্রান্তি’ অনেক
মানুষের মধ্যেই
বিদ্যমান। টিকা
নিয়ে তারা
নিজেকে অনেক
বেশি সুরক্ষিত
বলে মনে করছেন।
এজন্য স্বাস্থ্যবিধি
মানার ক্ষেত্রে
তাদের মধ্যে
অনিহাও বেশি।
এ আত্মবিশ্বাসকে
বিভ্রান্তি বলার
অনেক কারণ
আছে।
প্রথমত, টিকা
নেয়ার পর একজন
মানুষ সংক্রমিত
এবং হাসপাতালে
ভর্তির মতোও
অসুস্থ হতে পারেন।
যদিও সে হার
অনেক কম। দ্বিতীয়ত,
টিকা নেয়া
ব্যক্তিরা সংক্রমণ
ছড়িয়ে দেয়ার
ক্ষেত্রে বাহক
হিসেবে কাজ করতে
পারেন। এজন্য
টিকা নেয়া
ব্যক্তি নিজে
অসুস্থ না হলেও
তিনি পরিবার
বা আশেপাশের
টিকা না নেয়া
ব্যক্তি যেমন
শিশুদের ঝুঁকির
মুখে ফেলছেন।
তৃতীয়ত, দুই ডোজ
টিকা ওমিক্রন
মোকবেলায় খুব বেশি
কার্যকারিতা দেখাতে
পারছে না। ফলে
টিকা নিয়ার
পরও আমাদের
স্বাস্থ্যবিধি মানতে
শিথিলতার কোন সুযোগ
নেই। এ বিভ্রান্তি
দূর করতে
আমাদের দেশজুড়ে
প্রচার চালাতে
হবে। উদ্যোগ
নিতে হবে এ
বার্তা আপামর
জনসাধারণের মাঝে
ছড়িয়ে দিতে।
চার.
দেশে টিকাদানের
হার বাড়াতে
দ্রুত উদ্যোগ
নিতে হবে।
চলতি বছরের
মাঝামাঝি পর্যন্ত
দেশের ৮০ শতাংশ
মানুষকে টিকার
আওতায় আনতে
চায় সরকার।
যদিও এখন পর্যন্ত
পূর্ণ ডোজের
টিকা নিয়েছেন
মাত্র ৩০ শতাংশ
মানুষ। টিকাদানের
এ নিম্নহার
নভেল করোনাভাইরাসের
সংক্রমণকে আশঙ্কাজনকহারে
বাড়িয়ে তুলতে
পারে। এজন্য
আরো কয়েকবার
গণপরিষরে টিকাদান
কার্যক্রম হাতে
নেয়া প্রয়োজন।
সংক্রমণ বাড়ার
আগে টিকাদান
হার বাড়াতে
পারলে পরিস্থিতি
কিছুটা হলেও
নিয়ন্ত্রণে রাখা
যাবে।
এরই মধ্যে
দেশে বুস্টার
ডোজ দেয়ার
কার্যক্রম শুরু
হয়েছে। ৬০ বছরের
বেশি বয়সীদের
দেয়া হচ্ছে
কভিড-১৯ প্রতিরোধী
টিকার তৃতীয়
এ ডোজ।
ওমিক্রনের সংক্রমণ
মোকাবেলায় এ ডোজ
অনেক বেশি
কার্যকরী। এজন্য
বেশি বয়সীদের
বুস্টার ডোজ দেয়ার
কার্যক্রমও ত্বরান্বিত
করতে হবে।
পাঁচ.
বর্তমানে নতুন
চ্যালেঞ্জ হিসেবে
দেখা দিয়েছে
টিকা গ্রহণে
অনাগ্রহ। প্রথমদিকে
টিকা নিতে
মানুষদের মধ্যে
তুমুল আগ্রহ
দেখা গেলেও
এখন সেটাতে
ভাটা পড়েছে।
এখন পর্যন্ত
টিকার নিবন্ধন
করেছে প্রায়
৮ কোটি
মানুষ। এখনো
বড় একটি
অংশ নিবন্ধনই
করেননি। নিবন্ধনের
সংখ্যা বাড়ার
ক্ষেত্রেও ধীরগতি
দেখা দিয়েছে।
সুতরাং খুব দ্রুত
এ পরিস্থিতি
থেকে বেরিয়ে
আসতে হবে।
আবার আরেকটা
দিক বিবেচনায়
নিতে হবে যে
সুরক্ষা ওয়েবসাইটে
নিবন্ধন করার
প্রযুক্তি সবার
কাছে নেই।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের
মানুষদের জন্য
টিকা নেয়ার
ক্ষেত্রে এটি প্রধান
বাধা হিসেবে
কাজ করে।
এজন্য গণটিকা
কার্যক্রম বাড়ানোর
কোন বিকল্প
নেই। তবে উপজেলা
পর্যায়ে অন-স্পট
নিবন্ধনেরও সুযোগ
রয়েছে। যদিও
এ বিষয়টা
খুব কম মানুষই
জানে। বিষয়গুলো
ব্যাপক আকারে
প্রচার ছাড়া
বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীকে
টিকার আওতায়
আনা সম্ভব
নয়।
পরিশেষে বলতে
হয়, আমরা
এক অনিশ্চিত
ভবিষ্যতের সামনে
দাঁড়িয়ে আছি।
সংক্রমণ পরিস্থিতি
প্রতিদিনই জটিল
হচ্ছে। আশেপাশের
দেশ যেমন
ভারতেও সংক্রমণ
ভয়াবহতার দিকে
এগুচ্ছে। এ অবস্থায়
নিজ নিজ সতর্কতা
সবচেয়ে বেশি
কার্যকরী ভূমিকা
রাখতে পারে।
আর নিজেদের
স্বার্থেই এটি গুরুত্বপূর্ণ।
শপিং মল, রেস্তোরাঁ
ও গণপরিবহন
সংশ্লিষ্টরা এখন স্বাস্থ্যবিধি
না মানলে
তাদেরই বন্ধের
মুখে পড়তে
হবে। সুতরাং
লকডাউনের মতো পরিস্থিতি
এড়াতে সকলের
জন্য স্বাস্থ্যবিধি
মানা জরুরি।
মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব ও বার বার হাতধোয়ার অভ্যাস নিজের পাশাপাশি পরিবারের সুরক্ষা তৈরি করতে পারে। তাই নিজের, পরিবার, সমাজ ও দেশের কথা বিবেচনা করে চলুন আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানতে তত্পর হই।
লেখক: সংবাদকর্মী










