৯ অক্টোবর ছিল এ বছরের বিশ্ব ডিম দিবস। ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক ডিম কমিশনের (আইইসি) ভিয়েনা সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ কমিশন বিশ্বব্যাপী ডিম শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে। বিশ্ব ডিম দিবস পালনের সিদ্ধান্তটি ডিমের উপকারিতা এবং মানুষের পুষ্টিতে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করার জন্য নেয়া হয়েছিল।
ডিম স্মরণাতীত কাল থেকে বাচ্চা-বুড়ো-যুবা নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষের পুষ্টির জোগানে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের কাছে ডিম গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়ে আসছে। এটি প্রকৃতির সর্বোচ্চ মানের একটি প্রোটিন উৎস, যাতে শরীরের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সব অ্যামিনো অ্যাসিড নিহিত রয়েছে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ডিমে সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় আরো অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যথা—লুটেইন ও জেক্সানথিন, যা চোখের জন্য উপকারী; কোলিন যা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর জন্য দরকারি। এছাড়া আছে বিভিন্ন ভিটামিন (এ, বি ও ডি)। বস্তুত, ডিম সাশ্রয়ী মূল্যে শীর্ষমানের প্রোটিনসমৃদ্ধ এবং বহুমুখী এমন একটি অনন্য ফুড প্যাকেজ অফার করে, সহজলভ্যতা ও এর অসাধারণ স্বাদ বিবেচনায় নিলে যার কোনো তুলনা হয় না। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার আইটেম। বাংলাদেশে আপনি কদাচিৎ এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাবেন, যারা তাদের নিয়মিত খাবারের তালিকায় ডিম রাখতে চায় না।
এই যে বহু গুণে গুণান্বিত ‘ডিম মহাশয়’, তিনি কি আপনার জন্য কোনো বিপদ ডেকে আনতে পারেন? সাধারণভাবে ডিম খেলে কিংবা অতিরিক্ত খেলে তা কি কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে? অন্যভাবে বলতে পারেন, দিনে বা সপ্তাহে কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ বিবেচিত হতে পারে? বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মধ্যে বহুকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে, যা এখনো শেষ হয়নি। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ডিমে উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরলের উপস্থিতি। প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি আপনার রক্তের বাজে কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে? হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কিংবা এমন ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে? এসব বিবেচনায় দীর্ঘকাল এ ধরনের রোগ বা তার ঝুঁকিতে আছে এমন লোকদের জন্য ডিম, বিশেষ করে এর ‘হলুদ অংশ’ এক রকম অপাঙেক্তয়ই বিবেচিত হয়ে আসছিল। তবে বহু বছরের গবেষণামূলে বিজ্ঞানীরা এ রকম অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে রক্তের কোলেস্টেরল প্রধানত খাদ্যের সম্পৃক্ত ফ্যাট ও ট্রান্স-ফ্যাট থেকে লিভারে তৈরি হয়, এখানে খাবারের মাধ্যমে নেয়া কোলেস্টেরলের ভূমিকা নেই বললেই চলে। বলা ভালো, ডিমে খুব সামান্য পরিমাণ সম্পৃক্ত ফ্যাট থাকে, কোনো রকম ট্রান্স-ফ্যাট থাকে না।
এতে ডিমের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের চোখে সুদীর্ঘ কাল ধরে ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত ডিমের এক রকম প্রত্যাবর্তন ঘটতে চলেছে বলে মনে হয়। এ বিষয়ে আজ আমাদের জ্ঞান যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার সার নির্যাস হলো: বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দিনে একটি ডিম হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা অন্য কোনো ধরনের কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি বাড়ায় না। তবে আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে, অন্য কোনো কারণে (যেমন ধূমপান) হূদরোগের ঝুঁকিতে থাকেন কিংবা এরই মধ্যে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে সপ্তাহে তিনটির বেশি ডিম খাওয়া উচিত হবে না। হ্যাঁ, আপনি ডিমের সঙ্গে আর কী কী খাচ্ছেন, তাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্য খাবারগুলোয় আপনি কতটা স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ট্রান্স-ফ্যাট গ্রহণ করছেন, তা বিবেচনায় নিতে হবে। তবে মাত্রাতিরিক্ত ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতার বিকল্প নেই। যেমনটি সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অতিরিক্ত অর্ধেক ডিম অর্থাৎ সপ্তাহে সব মিলিয়ে তিন থেকে চারটি অতিরিক্ত ডিম খাওয়ার ফলে একজন ব্যক্তির হূদরোগের ঝুঁকি ৬ শতাংশ ও অসময়ে মৃত্যু ঝুঁকি ৪ শতাংশ বাড়তে পারে।
ডিম নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ, এর মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া, বিশেষ করে সালমোনেলার সংক্রমণ এবং তার ফলে ফুড পয়জনিং হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে রোগীকে হসপিটালাইজ করা লাগতে পারে। এসব রোগীর ক্ষেত্রে সালমোনেলা সংক্রমণ অন্ত্র থেকে রক্তপ্রবাহে এবং পরবর্তী সময়ে শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিশেষে, সময়মতো ও যথাযথ চিকিৎসা ও পরিচর্যা না পেলে এমনকি রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। ডিমের খামারে বা বাড়ির পেছনে তৈরি মুরগির ঘরে সম্ভাব্য অনেক সূত্রেই সালমোনেলা সংক্রমণ হতে পারে। সাধারণত এসব জীবাণু আক্রান্ত মুরগির মলমূত্র থেকেই ডিমের গায়ে লাগে। পরবর্তী সময়ে ডিমের খোলসে বিদ্যমান সূক্ষ্মাতিসূক্ষ ছিদ্রপথে ভেতরে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধিও করতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ সমস্যার সমাধান কী? কেউ হয়তো বলবেন, খামারিরা ডিম ভালো মতো ধুয়ে বাজারজাত করলেই তো হয়। তবে এতে বরং হিতে বিপরীত হতে পারে। ডিমের গায়ে একটা পাতলা আবরণ থাকে, যা খোলসের সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলো বন্ধ করে রাখে এবং এভাবে ডিমের বাইরে থেকে ভেতরে জীবাণু প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ডিম ধুলে আবরণটি চলে যায়, ফলে ডিমের ভেতরে জীবাণুর প্রবেশের দ্বার উন্মোচিত হয়। তাহলে উপায়? এখানে খামারিদের দায়িত্ব্বটা সবচেয়ে বেশি। মুরগির থাকার জায়গা, বিশেষ করে যেখানে ডিম পাড়ে, সেটা নিয়মিত ভালোভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা চাই। আর ভোক্তা হিসেবে আপনার করণীয় হলো, ডিম ধরার আগে-পরে আপনার হাত ও তৈজসপত্র ভালোমতো সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলবেন। ডিম ভালোমতো সিদ্ধ করে নিলে এসব জীবাণু মারা পড়ে। অর্ধসিদ্ধ কিংবা কাঁচা ডিম অথবা যেসব খাবারে এরূপ অবস্থায় ডিম ব্যবহার করা হয়েছে, তা পরিহার করতে হবে। বাচ্চা, বুড়ো, গর্ভবতী নারী এবং ডায়াবেটিস কিংবা অন্য কোনো রোগের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল এমন লোকদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) মতে, কক্ষ তাপমাত্রায় ডিমের গায়ে জলকণা ঘনীভূত হতে পারে, যা ডিমের খোলস ভেদ করে ভেতরে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের পথ সুগম করে দেয়। ডিম রেখে দিলে সময়ের সঙ্গে এই ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। কারণ যত সময় গড়ায়, ডিমের সুরক্ষাদানকারী বাধার প্রাচীর ক্রমে দুর্বল হতে থাকে। কাজেই আপনাকে ডিম ফ্রিজে রাখতে হবে এবং ‘সর্বোত্তম মেয়াদ’ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই খেয়ে ফেলতে হবে। উল্লেখ করা যেতে পারে, আমাদের দেশে এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ডিম বিপণনের ক্ষেত্রে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখের পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে মনে হয় না।
যেহেতু পুরো সমস্যার প্রধান উৎস হচ্ছে খামার পর্যায়ে ডিমের জীবাণু-দূষণ, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। খামারিদের সচেতন করার জন্য যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় এবং তাদের কার্যক্রম নিয়মিত মনিটর করা হয়, তাহলে ডিমের মাধ্যমে এ ধরনের সংক্রমণ বিস্তারের সম্ভাবনা বহুলাংশে কমে আসবে।
ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন: অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










