মানুষ সামাজিক জীব। একা থাকতে পারে না। এটা কেবল এ কারণে নয় যে তার দৈহিক ও জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য অন্যের সহায়তা দরকার, বরং তার মনোজগতের স্থিতি ও সজীবতার জন্যও সমাজসঙ্গ অপরিহার্য। দেখতেই পাচ্ছেন, করোনা মহামারীর শুরুতে যখন সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হলো, সমাজের একটি বিপুল অংশ এসব উপদেশ শুনতেই চাইল না। আরেকটি অংশ প্রথম প্রথম বিষয়টি নীরবে মেনে নিলেও কয়টা দিন যেতে না যেতেই বিদ্রোহ করতে চাইল।
একাকিত্ব মানুষের মনোজগতে প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় একা থাকতে হলে মানুষ রীতিমতো পাগল হওয়ার জোগাড় হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে সমাজবিচ্ছিন্নতাকে মানসিক বৈকল্যের একটি লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে মরুচর কিংবা বন-জঙ্গলই হোক কিংবা সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুযোগ-সুবিধাসংবলিত আলোকোজ্জ্বল নগর-মহানগর, যেখানেই মনুষ্য বসতি রয়েছে, আপনি দেখে থাকবেন সবখানেই মানুষ দলবদ্ধভাবে বাস করছে।
সমাজবদ্ধতা মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে এক ধরনের দয়া-মায়া ও আবেগ-ভালোবাসার নিগড়ে আবদ্ধ করে। সমাজের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা শেয়ার করে নেয়। বিয়ে-শাদি, ঈদ-পার্বণে সবাই মিলে আনন্দ-উল্লাস, হৈ-হল্লা করে। একজনের বিপদে অন্যজন এগিয়ে আসে। সময়ে অসময়ে একে অন্যকে টাকা-পয়সা, ধার-দেনা দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করে। ফুরসত পেলেই ছেলে-বুড়ো সবাই সমবয়সীদের সঙ্গে পাড়া-মহল্লায়, ক্লাব-রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে খেলাধুলা কিংবা আড্ডায় মেতে ওঠে। মাঝেমধ্যে বাসাবাড়ি, কোনো রেস্টুরেন্ট কিংবা কমিউনিটি সেন্টারে গেট টুগেদারের আয়োজন করে। একসঙ্গে কয়েকজন মিলে দূর-দূরান্তে বেড়াতে যায় কিংবা পিকনিক-বনভোজনের আয়োজন করে। অনেককেই দেখবেন, এমনি এমনিই এক শপিংমল থেকে অন্য শপিংমলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সে ফ একটু মেন্টাল রিলাক্সেশনের জন্য।
মনুষ্য সমাজের এই দলবদ্ধ বিচরণের উল্টো পিঠও আছে। সমাজের হাজারো মানুষের মধ্যে সামগ্রিকভাবে ঐকতান থাকলেও একসঙ্গে চলতে গিয়ে অনেক বিষয়েই মতবিরোধ তৈরি হয়, সৃষ্টি হয় হিংসা-বিদ্বেষ, স্বার্থের সংঘাত। একে অন্যকে ঠকানো, অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন, বিনা কারণে অন্যের ওপর চড়াও হয়ে নিজের মাতব্বরি ফলানো কিছু লোকের পেশা ও নেশায় পরিণত হয়। অনেক সময় এরা ছোট ছোট দল তৈরি করে সাধারণ মানুষের ওপর নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করে। কখনোবা এসব দল-উপদল পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে ছাড়ে। এসব আচরণ সাধারণ্যে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় এগুলো সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবেই পরিগণিত হয়। কিন্তু সমাজে যখন অশুভ শক্তি প্রাধান্য লাভ করে, আমজনতাকে এসব সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড নীরবে হজম করতে হয়।
সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় ঘটে, তখন মানুষের পরস্পরের মধ্যে মায়া-মমতা, সহমর্মিতা, সৌভাতৃত্ববোধ কমে যায়। হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, কুটনা-কুটনি এসব প্রবল রূপ ধারণ করে। সমাজের সদস্যরা একে অন্যের ভালো দেখতে পারে না। সুযোগ পেলেই একে অন্যকে ল্যাং মারতে চায়। কেউ বেপথু হলে অন্যরা তার জন্য কোনো দরদ অনুভব করে না। তাকে সুপথে আনার চেষ্টা চালানোর কোনো তাগিদ কাজ করে না। যে যার মতো সে ফ সমালোচনা করেই দায় সারে। অনেকেই আবার নিছক অভ্যাসবশে কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে কারো কোনো দোষ খুঁজে পেলে তা ফলাও করে প্রচার করে বেড়ায়। উদ্দেশ্য যতটা না অপকর্মের প্রতিবাদ করা, তার চেয়েও বেশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দুর্নাম রটানো এবং তাকে সমাজের কাছে হেয়প্রতিপন্ন করা।
বাঙালি সমাজে কারো কোনো দোষ পাওয়া গেলে, বিশেষ করে তা যদি একটু দৃষ্টিকটু ও সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হয় তাহলে এটা নিয়ে দশ কান করা আর রসিয়ে রসিয়ে একে-ওকে বলে বেড়ানোর বেশ চল আছে। সামাজিক এসব নিন্দা-মন্দর অবশ্য একটা ভালো সোস্যাল ইমপ্যাক্ট আছে। মানুষ সতর্ক হয়, সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে এ ধরনের কাজ এড়িয়ে চলে। তবে এসবই সমাজের নিরীহ গোছের ছা-পোষা মানুষের জন্য। জাঁদরেল পালোয়ান কিসিমের প্রভাবশালী লোকজন প্রকাশ্যে অপকর্ম করে বেড়ায়। এতে তাদের কোনো লাজলজ্জা কাজ করে না। বরং এটাকে তারা নিজেদের অহংকার বলে বিবেচনা করেন, বুক ফুলিয়ে বলে বেড়ান। আপনি দেখবেন, সোসাইটি তাদের ব্যাপারে আড়ালে-আবডালে ফিসফাস করলেও প্রকাশ্যে মুখে কুলুপ এঁটে থাকে।
মনুষ্য সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধে ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মাচারের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তাদের জীবনাচারে আলেম-উলামা, পীর-দরবেশদের বিরাট প্রভাব রয়েছে। আপনি আলেম-উলামাদের সঙ্গে উঠা-বসা করলে বুঝে থাকবেন, ইসলাম কিছু ব্যতিক্রমী সিচুয়েশন বাদে কারো নিন্দামন্দ করে বেড়ানোকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে। সম্ভবত একটি কারণ এই যে এতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো মহৎ উদ্দেশ্য কাজ করে না, সমাজের সদস্যদের পারস্পরিক সৌহার্দে চিড় ধরে, সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সামাজিকভাবে অনেকটা নিজের অগোচরেই হেয় হন। আপনি তাবলিগ জামাতের লোকজনের সাহচর্যে এলে দেখবেন, তারা যে কয়টি বিষয়ের ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেন, তার একটি হলো অন্যদের সম্মান করা। এটার দীনি গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা পবিত্র কোরআনের একটি বাণীর রেফারেন্স দেন, যার অর্থ হলো, ‘আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি।’
ইদানীংকালে সমাজে একদিকে কিছু দুর্বৃত্তের দুরাচার যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে এসবের প্রতিক্রিয়ায় সমাজের পরিমিতিবোধেও যেন বিশেষ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে, সমাজে দুষ্কর্মের ব্যাপকতায় মানুষের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি, যা তাদের অসহিষ্ণু করে তুলেছে। প্রায়ই দেশের কোনো না কোনো জায়গা থেকে রোমহর্ষক সব অপরাধকাণ্ডের খবর আসছে, যা মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভকে আরো ঘনীভূত করছে। দেশে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার ব্যাপক প্রসারের পাশাপাশি সোস্যাল মিডিয়ার আগমন মানুষকে তাদের ধূমায়িত রোষ সহজে প্রকাশ করার বিশেষ সুযোগ এনে দিয়েছে। ফলে অনেক সময় দেখে থাকবেন, অনেকেই সংঘটিত ঘটনার গভীরে না গিয়েই হুটহাট মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।
সম্প্রতি জাবির এক অধ্যাপিকার একটি ঘটনা নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় যেরূপ তুলকালাম হয়ে গেল, তা আমাদের সামগ্রিক অসহিষ্ণুতা রূপায়ণে একটি উদাহরণ হতে পারে। অভিযোগ, তিনি দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার বাস জার্নিতে একটি অল্প বয়সী কাজের মেয়েকে সিটের ব্যবস্থা না করে দাঁড়িয়ে নিয়ে গেছেন। বিষয়টি একই গাড়িতে সহযাত্রী এক সংবাদকর্মীর চোখে পড়বে। এটি তার কাছে খুবই অসসহনীয় মনে হচ্ছিল এবং এ কারণে ৯৯৯-এ কল দিয়ে তিনি পুলিশকেও এ বিষয়ে অবগত করেন। পুলিশের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে এক পর্যায়ে তিনি ভদ্রমহিলাকে নিজেই চার্জ করেন। তখন এ নিয়ে তাদের মধ্যে কিছুটা তর্ক-বিতর্কও হয়। এটা নিয়ে পরে ওই সংবাদকর্মী সোস্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট দেন। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার লাভ করে।
যে বিষয়টি আমাকে অবাক করছে তা হলো, অভিযোগে যেমনটি বলা হচ্ছে, ভদ্রমহিলা বাচ্চা মেয়েটিকে পুরো ৮ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে নিয়ে গেলেন আর বাসের ড্রাইভার-কন্ডাক্টরসহ এতগুলো যাত্রীর কেউই মেয়েটির একটু বসার ব্যবস্থা করতে পারলেন না? এত্তটুকুন একটি বাচ্চা মেয়েকে কেউ তো চাইলে নিজের কোলে তুলে নিয়েও ভদ্রমহিলাকে শিক্ষা দিতে পারতেন। ছোটখাটো মোড়াজাতীয় একটা কিছুর ব্যবস্থা করে সারির মাঝখানেও তো মেয়েটিকে বসানো যেত। যদিও ভদ্রমহিলার একটি ব্যাখ্যা সংবাদমাধ্যমে এসেছে, এটাকে অনেকেই কানে তুলতে চাইছেন না। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া ভদ্রমহিলা সিটের ব্যবস্থা না করে মেয়েটিকে তার দীর্ঘ যাত্রায় সঙ্গে নিয়ে গিয়ে থাকলে কাজটি যে নিন্দনীয় হয়েছে, তাতে কি সন্দেহের অবকাশ আছে? কিন্তু যেভাবে বিষয়টি সোস্যাল মিডিয়ায় ফলাও করা হয়েছে, তা কি শুধুই প্রতিবাদস্বরূপ? সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মী হয়তো তার পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকেই ঘটনাটি প্রচারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন, কিন্তু আপনি খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন, যারা ঘটনাটি সোস্যাল মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারে বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছেন, তাদের অনেকেই আগে থেকে কোনো না কোনো কারণে ভদ্রমহিলার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং তাকে শায়েস্তা করার জন্য সুযোগটি লুফে নিয়েছেন।
এখানেই আমাদের উদ্বেগের কারণ। এ সমাজে আমরা সবাই পারস্পরিক মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। এখানে কেউ অন্যায় কিছু করলে তাকে অবশ্যই আমরা ধরব, তিনি যদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে থাকেন প্রয়োজনে তাকে শাস্তির আওতায়ও আনব। এজন্য শাস্তি ছাড়াও নিন্দা-মন্দেরও ভাগীদার তিনি অবশ্যই হবেন। তবে সমালোচনা যেন কুৎসা রটনায় পর্যবসিত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার। মনে রাখা চাই, সমাজের দায়িত্ব বিপথগামী সদস্যদের সুপথে আনা, তাদের প্রতি কোনো রকম বিদ্বেষ পোষণ কিংবা তাদের সম্মানহানি হতে পারে এমন কিছু করে বেড়ানো নয়। আমাদের এ আপ্ত বাক্যটি মনে রাখা দরকার: ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।’
ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন: অধ্যাপক
ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










