নাইজেরীয় সেনাবাহিনীর চৌকস সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইদ্রিস আবদুল কাদির বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর অত্যন্ত মর্যাদাবান প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের’ (এনডিসি) একটি কোর্সে (ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০১৭) আমার সতীর্থ ছিল। আমরা বেশ কিছুদিন পাশাপাশি বসতাম, থাকতাম চন্দ্রমল্লিকা বিল্ডিংয়ে। একই একাডেমিক অ্যাডভাইজারের অধীনে গবেষণাও করেছি। নানা বিষয়ের মধ্যে একদিন বিখ্যাত নাইজেরীয় লেখক চিনুয়া আচেবের ‘থিংকস ফল অ্যাপার্ট’ উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনায় মগ্ন হয়েছিলাম। সেদিন ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি ব্রিগেডিয়ার কাদিরকে (কোর্স চলাকালীন কর্নেল) বহনকারী বিমানটি (২২ মে ২০২১) নাইজেরিয়ার কাদুনা বিমানবন্দরের কাছে দুর্ঘটনায় হঠাৎ ভেঙে পড়বে। আর সেই সর্বনাশা দুর্ঘটনায় অকালে মৃত্যুবরণ করবে কোর্সের প্রিয় মুখ আবদুল কাদির।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন (৩০ জানুয়ারি, ১৯৭২) মিরপুরের উত্তর দিকে গড়ে উঠেছে মিরপুর সেনানিবাস। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকার এনডিসি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৮ সালের ১০ জানুয়ারি তত্কালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এনডিসির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৯৯ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে প্রথম ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স শুরু হয়। এনডিসির প্রতিষ্ঠাকালীন কমান্ড্যান্ট ছিলেন মেজর জেনারেল আবুল মুনিম মনসুর আহমেদ। এটি মিরপুর সেনানিবাসের ‘মিরপুর সামরিক শিক্ষা পল্লী’র অভ্যন্তরে সেনানিবাসের একেবারে প্রবেশদ্বারে অবস্থিত। মিরপুর সামরিক শিক্ষা পল্লীর অন্যান্য প্রতিষ্ঠান হলো ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (১৯৭৭), মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (১৯৯৮) এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (২০০৮)।

ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ হলো জাতীয় নিরাপত্তা, স্ট্র্যাটেজি (কৌশল) ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় উত্কর্ষ সাধনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এ কলেজের মূলমন্ত্র হলো ‘জ্ঞানে নিরাপত্তা’ (সিকিউরিটি থ্রু নলেজ)। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. আকবর হোসেন। বর্তমানে এখানে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স, আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স ও ক্যাপস্টান কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি দেশে ও বিদেশে এর মান, উত্কর্ষ ও খ্যাতির প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়। ২০০৩ সাল থেকে বিদেশী অফিসারদের জন্য কলেজের প্রশিক্ষণ উন্মুক্ত করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর পরিচিতি ঘটে।

প্রায় ১১ মাসব্যাপী ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স (এনডিসি)-২০১৭ শুরু হয়েছিল ২৯ জানুয়ারি, ২০১৭ থেকে। দুজন নারী কর্মকর্তাসহ (জয়েন্ট সেক্রেটারি) বাংলাদেশী কোর্স সদস্য ছিলেন ৫৩ জন (সশস্ত্র বাহিনী, সিভিল সার্ভিস, পুলিশ বাহিনী ও ফরেন সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা)। অন্যদিকে আমেরিকাসহ ১৩টি দেশের ২৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। এটি ছিল বৈচিত্র্যময় ৮০টি রঙিন ফুলের এক অনন্য বাগান। এ কোর্সের উদ্দেশ্য ছিল উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় উচ্চতর দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত করা।

এ কোর্সের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল নিরাপত্তা, কৌশল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে দেশী ও বিদেশী বিখ্যাত ব্যক্তি/বিশেষজ্ঞ/দিকপালদের বক্তৃতা। লক্ষ করতাম, আমার পাশে বসা কাদির ওই বক্তৃতাগুলো অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে শুনত।

প্রতি বছর নাইজেরীয় সামরিক বাহিনী থেকে প্রায় ১০-১২ জন কর্নেল পদবির অফিসার এনডিসিতে অংশ নিয়ে থাকেন। সাধারণভাবে নাইজেরীয় কর্মকর্তারা পেশাগতভাবে দক্ষ, মেধাবী, পরিশ্রমী ও উদার মনের অধিকারী। ব্যক্তিগতভাবে নাইজেরীয়রা আন্তরিক, বন্ধুত্বপূর্ণ ও বেশ ভদ্র স্বভাবের। কাদির ছিল তাদের মধ্যে একজন উজ্জ্বলতম সদস্য। উচ্চতায়ও প্রায় সর্বোচ্চ।

গবেষণা এনডিসির কোর্স সদস্যদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরো কোর্সে তাদের ইনডিভিজুয়াল রিসার্চ পেপার, গ্রুপ রিসার্চ পেপার, সেমিনার ইত্যাদি গবেষণা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। কাদিরের গবেষণার বিষয় ছিল বাংলাদেশের পর্যটন। অত্যন্ত পরিশ্রম করে লিখিত কাদিরের গবেষণাপত্রটি বিদেশী ছাত্রদের মধ্যে ‘দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ’ বিবেচিত হয়েছিল।

কোর্সের বিভিন্ন পর্যায়ে (এক্সারসাইজ, প্রেজেন্টেশন, সেমিনার, সিন্ডিকেট ডিসকাশন) ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক সংযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা চলত। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, কৌশল ও নিরাপত্তামূলক ইস্যুগুলোর আলোচনা ছিল অধিকতর প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য, যেখানে ভারত,  পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকার কর্মকর্তারা প্রায় মুক্তভাবে আলোচনা ও মতবিনিময় করতেন। এখানে ‘চ্যাথাম হাউজ রুল’ অনুসরণ করা হয় বলে কোর্স মেম্বাররা মুক্তভাবে আলোচনায় অংশ নিতে উৎসাহিত হতেন। এখানেই এনডিসির অনন্যতা। বাংলাদেশের বেশকিছু বিষয়ে কাদিরের মুগ্ধতা ছিল। বিশেষত শিল্পায়ন, সামরিক প্রতিষ্ঠানের উত্কর্ষ ও পারিবারিক বন্ধন নিয়ে।

কোর্সের একটি পর্বে (ইন্টারনাল স্টাডি ট্যুর) কোর্স সদস্যরা বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত হয়ে থাকেন। বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিষয়ে কাদের প্রশংসা করেছিলেন। কলেজের বাইরে কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভিজিটে গেলে বেশ মজার ঘটনাও ঘটত। ১৪টি দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্য হলেও আমাদের ইউনিফর্ম ছিল ২৪-২৫ রকমের।

কোর্সের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেমন আইস ব্রেকিং, পিঠা উৎসব, পহেলা বৈশাখ, ঈদ উৎসব, গালা নাইট, নদী ভ্রমণ, গলফ টুর্নামেন্টে বিদেশী সদস্যরা সানন্দে অংশগ্রহণ করতেন। বিদেশীদের আয়োজিত ‘অ্যালায়েড অফিসার্স নাইট’ ছিল খুব উপভোগ্য ও ইন্টারেস্টিং একটি ইভেন্ট। নিজ নিজ দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে বিদেশীরা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গান, আবৃত্তি, কৌতুক ইত্যাদি উপস্থাপন করেছিলেন। ওইদিন বিদেশী কোর্স সদস্যরা নিজেদের দেশকে উপস্থাপনের জন্য চমত্কারভাবে স্টলও সাজিয়েছিলেন। নাইজেরিয়ার আকর্ষণীয় স্টলটিতে ঢুকেই দর্শনার্থীদের হঠাৎ চোখে পড়েছিল সাদা আলখেল্লা ও রঙিন টুপি শোভিত ১০-১২ জন দীর্ঘদেহী সুপুরুষ। বিশেষত বঙ্গললনাদের চোখে তখন বিস্ময় ও চাপা কৌতূহল।

কাদিরের সহধর্মিণী ইমান টেমিটোপ তাদের তিন রাজকন্যা নিয়ে একবার মাসখানেকের জন্য মিরপুর সেনানিবাসে (চন্দ্রমল্লিকা) ছিলেন। ঐতিহ্যগতভাবে কোর্স সদস্যদের সহধর্মিণীরা লেডিস ক্লাবের মাধ্যমে বেশকিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিয়ে থাকেন। এ সময় অনেক বিদেশিনী ঢাকার গাউছিয়া মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্দান্ত ‘বিপণি অভিযানে’ অংশ নিয়েছিলেন।

ওভারসিজ স্টাডি ট্যুরের অংশ হিসেবে আমাদের একটি দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) পরিদর্শনে গিয়েছিল। সেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) যৌথ ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল আমাদের জন্য অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। এদিকে কাদির তখন অন্য একটি দলের সঙ্গে বিপ্লবের দেশ রাশিয়ায়।

নাইজেরীয় বন্ধুদের সঙ্গে নাইজেরিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতো। বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়া ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। বাংলাদেশ ১৯৭৭ সালে নাইজেরিয়ার রাজধানীতে আবাসিক ডিপ্লোম্যাটিক মিশন চালু করলেও সেই বছরই মিশন বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে ২০০০ সালে নাইজেরিয়া ঢাকায় আবাসিক মিশন খুললেও পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে দিল্লিতে নাইজেরিয়ার দূতাবাস রয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ পুনরায় রাজধানী আবুজায় হাইকমিশন খুলেছে। এ সময় রাষ্ট্রদূত ছিলেন মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ। বর্তমানে মাসুদুর রহমান রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। উল্লেখ্য, তিনি ২০১৮ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ থেকে এনডিসি সম্পন্ন করেন।

বিশ্বের ষষ্ঠ তেল উৎপাদনকারী দেশ নাইজেরিয়া আফ্রিকার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি এবং দ্বিতীয় সামরিক শক্তি। দুই দেশের সম্পর্কে অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখন পর্যন্ত তেমন নেই, যেহেতু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা এখনো সেই পর্যায়ে হয়নি। তবে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। নাইজেরিয়ায় রয়েছে প্রায় ২০ কোটি মানুষের বাজার। যেখানে অধিকাংশ পণ্যই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বাংলাদেশের ওষুধ, নিটওয়্যার, সিমেন্ট, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল পণ্য, সমুদ্রগামী জাহাজ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া, প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদি নাইজেরিয়ার বাজারে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পণ্য বলে বিবেচিত। এছাড়া কৃষি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, আইসিটি ও শিক্ষা খাতে  বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা নাইজেরিয়ায় বিনিয়োগ করতে পারেন। শুধু নাইজেরিয়া নয়, আফ্রিকার অনেক দেশেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ-নাইজেরিয়ার সামরিক সহযোগিতা অনেক এগিয়ে আছে। নাইজেরিয়া থেকে প্রতি বছরই বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক কর্মকর্তা এনডিসি, স্টাফ কলেজসহ সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কোর্সে অংশগ্রহণ করে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকেও একজন করে সামরিক কর্মকর্তা (২০১৭ থেকে) নাইজেরিয়ার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে আসছেন। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতি এখানে চমত্কার দৃশ্যমান।

উল্লেখ্য, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে কয়েক হাজার নাইজেরীয় সৈনিক ব্রিটিশ বাহিনীর অংশ হিসেবে (৮১ ওয়েস্ট আফ্রিকান ডিভিশন) বার্মা ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছিলেন। এ ডিভিশন প্রথমে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় মোতায়েন হয়ে পরবর্তী সময়ে বার্মার অভ্যন্তরে (আরাকান অঞ্চলে) সমরাভিযান পরিচালনা করে। নাইজেরিয়া আফ্রিকার আঞ্চলিক শান্তিরক্ষী অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ। অন্যদিকে আফ্রিকার দেশগুলোয় (১৬টি দেশে) আমাদের সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর শান্তিরক্ষীরা, বিশেষত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা অসাধারণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

আফ্রিকার সঙ্গে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্যও এসেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে যখন দক্ষিণ এশিয়ার বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি, তখন গাম্বিয়া, নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকার অন্যান্য দেশ বাংলাদেশকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিল। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নাইজেরিয়া আফ্রিকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পদ সংস্কারের জন্য অনেক দিন ধরে কথা চলছে। ধারণা করা হয়, ভবিষ্যতে আফ্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে নাইজেরিয়া এখানে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তাই দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে আরো সক্রিয় হয়ে এগিয়ে আসাটা বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘বাংলাদেশ নাইট’ অনুষ্ঠানের নামটি ছিল খুবই অর্থবহ। ‘আবার কি হবে দেখা? ‘উই ডিপার্ট টু মিট অ্যাগেইন’। ২০১৭-এর ১৮ ডিসেম্বর আমাদের গ্র্যাজুয়েশন সেরিমনি অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ কোর্সের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী সতীর্থদের মাঝে বন্ধুত্ব ও সৌহার্দের সোনালি সেতুবন্ধ গড়ে উঠেছিল। অবশেষে ২০ ডিসেম্বর মিরপুরের মিলনমেলা শেষ হয়ে এল। সম্মিলন শেষে আমরা আবার ছড়িয়ে পড়লাম নিজস্ব পৃথিবীর পথে। তবে আমাদের মাঝে অন্তর্জালের দুনিয়ায় যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব অব্যাহত রইল নতুন আলোয়।

গত ২২ মে আবুজায় জাতীয় সমাধিক্ষেত্রে কাদিরকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকালে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকালীন আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়, ‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাদির বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন।’ এভাবেই নাইজেরিয়া থেকে ৫ হাজার ৫০০ মাইল দূরের তার ‘প্রিয় বাংলাদেশ’ ও ‘প্রিয় ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ’ জীবনের শেষ অনুষ্ঠানেও উচ্চারিত হয় সম্মানের সঙ্গে। কাদির পরিণত হয় বাংলাদেশ-নাইজেরিয়ার অমলিন বন্ধুত্বের প্রতীকে।

কাদির এখন জীবনের ওপারে। তাদের মিষ্টি কন্যারা ঢাকায় চন্দ্রমল্লিকা (অ্যাপার্টমেন্ট) ছাড়া কিছুই চিনত না। কাদিরের চন্দ্রমল্লিকা উচ্চারণও ছিল বিশেষ ধরনের। আমাদের স্মৃতির বাগানে ব্রিগেডিয়ার কাদির চন্দ্রমল্লিকার মতোই ফুটে থাকবে।

 

মো. বায়েজিদ সরোয়ার: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল