বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকি থেকে বের হতে পারেনি বলে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন কিছুটা অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে আছে। এজন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে পুরোপুরি দায়ী কর যায় না। বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির অবনমন—এ দুটোর মিশ্রণ দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম। এ জায়গা শক্তিশালী হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আমদানি নিজস্ব অর্থায়নে করা সম্ভব হতো। আবার ইদানীং আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। কিন্তু গত তিন-চার বছরে ক্রমান্বয়ে টাকার অবমূল্যায়ন করা হয়নি। এ অবস্থায় এখন একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ৫০-৬০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে করোনাসৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্যোগে পর্যুদস্ত ছিল বিশ্ব অর্থনীতি। যদিও দুর্যোগের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল সমৃদ্ধির পথে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তেজি ভাব ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশের রফতানি ছাড়ায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে হঠাৎ করেই চোরাবালিতে ঠেলে দিয়েছে। টাকার মূল্য হারিয়েছে দ্রুত, মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ঘরে, খেলাপি ঋণ বাড়ছে কিন্তু বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান বাড়ছে না। সব মিলিয়ে নানামুখী ঝুঁকির মুখে দেশের অর্থনীতি। এখান থেকে টেকসই উত্তরণ ঘটাতে হলে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি বাড়ায় চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২ শতাংশে আটকে থাকতে পারে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রকৃত মজুরি ও সঞ্চয় কমায় ভোক্তাব্যয় শ্লথ হয়ে আসতে পারে। বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে চাহিদা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা, বৈশ্বিক ও স্থানীয় অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং মূলধনি পণ্যের বর্ধিত দাম। আবার টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং কিছু ভোক্তাপণ্যের ওপর আমদানিতে শুল্কবৃদ্ধি সামনের দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাকেও বাড়িয়ে তুলেছে। উচ্চমূল্যস্ফীতি একই সঙ্গে এখন দারিদ্র্য বিমোচনকেও ঝুঁকিতে ফেলছে। আবার দেশের রফতানি আয়কে চাপে ফেলতে পারে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি। দেশে এখন ডলারের একাধিক বিনিময় হারের জটিল এক পদ্ধতি চালু রয়েছে। এর কারণে রফতানি ও রেমিট্যান্স আয় নিরুৎসাহিত হচ্ছে। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে বিনিময় হারকে নিয়ন্ত্রণ করায় দেশে এখন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে। আবার রফতানিকারকদের আয় নির্ধারণ হচ্ছে বাজারের চেয়ে কম বিনিময় হারের ভিত্তিতে। ফলে তারাও এখন এ আয় দেশে আনার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী না। বর্তমান বাস্তবতায় বাণিজ্য সংস্কারের দিকে এগোতে হবে সরকারকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি কমার কোনো লক্ষণ নেই। কারণ চাহিদা ও জোগান দুদিক থেকেই সমস্যা রয়েছে। জোগানের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। ব্যাংক খাত সংস্কারের মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার এটি সত্য। কিন্তু যে ধরনের দ্রুততার সঙ্গে ও গভীরভাবে এসব সংস্কার করার কথা ছিল সেটা হচ্ছে না। সমস্যা মোকাবেলার জন্য সরকার যে ধরনের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটেনি। ফলে ঝুঁকিগুলো রয়ে গেছে।
অর্থনীতির ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অধিকাংশ সমস্যার সৃষ্টি দুর্বল ব্যবস্থাপনা থেকে। এক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ আরো মসৃণ করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে দিতে হবে বিশেষ নজর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিক থেকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার প্রতি নজর দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ কৃষি ও শিল্পোৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। মজুদদারি, কালোবাজারি, অতিমুনাফালোভীদের অপতৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। ব্যাংকের আমানতের সুদের হার অনেক আগেই মূল্যস্ফীতির নিচে চলে গেছে। তাছাড়া ঋণের সুদ কমিয়ে রাখার সুবিধা গ্রহণ করে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ঋণখেলাপিদের প্রদত্ত সুবিধা প্রত্যাহারপূর্বক খেলাপি ঋণ আদায়ে আরো কঠোর ও তৎপর হতে হবে। দেখা যায়, ব্যাংকগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট ঋণ আদায়ে বেশ তৎপর, অথচ চিহ্নিত খেলাপিদের ঋণ আদায়ে তেমন উদ্যোগ নেই। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। খেলাপিদের স্বার্থের চেয়ে আমানতকারীসহ অন্যান্য গ্রাহকের স্বার্থের দিকে নজর দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অসাধু খেলোয়াড়দের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। কার্ব মার্কেটের দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবাসী আয়ের বিনিময় হার নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন, যাতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো হয়। তাছাড়া রেমিট্যান্সের সম্ভাবনাময় যেসব দেশে বাংলাদেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজ নেই, সেসব দেশে ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। নানা পন্থায় বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। ওভার-ইনভয়েসিং এবং আন্ডার-ইনভয়েসিং রোধে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে। বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও অর্থ পাচারের কথা শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।
দেশে ডলারের একাধিক বিনিময় হারের জটিল এক পদ্ধতি চালু রয়েছে। এর কারণে রফতানি ও রেমিট্যান্স আয় নিরুৎসাহিত হচ্ছে। টাকার অবমূল্যায়ন নিয়ন্ত্রণে ২০২১ সালের জুন থেকে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমান বাস্তবতায় বাণিজ্য সংস্কারের দিকে এগোতে হবে সরকারকে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাণিজ্য খাতে সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি কমার কোনো লক্ষণ নেই। কারণ চাহিদা ও জোগান দুদিক থেকেই সমস্যা রয়েছে। জোগানের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। জোগানের ক্ষেত্রে আর্থিক নীতিমালা বাজেট ঘাটতি কমাতে কোনো কাজে লাগছে না। পণ্যবাজারের দামের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল আবার কিছুটা অস্থিরতাও রয়েছে। ডলার নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হলে ডলারের বিনিময় হারেও অস্থিরতা দেখা যেতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য আমাদের কিছু সামষ্টিক নীতি সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে যে শ্লথগতি দেখা যাচ্ছে সেটিকে আরো বেগবান করতে হবে। এছাড়া আমাদের বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সংস্কার করতে হবে। দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি চাইলে অবশ্যই নীতিমালার ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোয় কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে; আমাদের সংশ্লিষ্ট নীতিমালাকে পরিবর্তিত ও পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলানো প্রয়োজন। দেশের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়কে সহজতর পথে মুনাফা অর্জন করার সুযোগ দিয়ে জাতীয় সম্পদ সৃজনে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের অধিক হারে বৈশ্বিক জোগান ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দেয়ার পাশাপাশি তারা যেন আন্তর্জাতিক বাজারের সাময়িক ওঠানামা থেকে অধিকতর লাভ নিশ্চিত করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
জ্বালানি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার ও বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলেছে। বিশ্ব অর্থনীতির সাম্প্রতিক মন্দার প্রভাবে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রবণতা, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যশস্যের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং সরকারের ব্যয়ের সঙ্গে রাজস্ব আয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকা চিন্তার কারণ। জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোয় সরকারের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি কিছুটা কমলেও সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষভাবে বেড়েছে কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়। সেই ধারাবাহিকতায় নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে কৃষি, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রয়োজনীয় খাতে ভর্তুকি জরুরি। আমরা মনে করি, অর্থনীতির এ সংকট কাটাতে সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নিয়ে ব্যাংক, রাজস্ব ও আর্থিক খাতগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সামনে এগোতে হবে।










