খিদে থেকে ভোগ। ভোগ থেকে উৎপাদন। উৎপাদন থেকে লোভ। লোভ থেকে সঞ্চয়। মানুষকে প্রকৃতি ব্যবহারে প্রলুব্ধ করতে বাধ্য করেছে। সেজন্য দিনে দিনে মানুষ প্রকৃতির কোনো সৃষ্টিকে সংরক্ষণ করে ভোগ করার চেয়ে নিজের লাভের ধারাপাত ষোলোআনা আদায় করতে গিয়ে কখন যেন প্রকৃতিকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে, তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। কিন্তু এ কারণে প্রকৃতি যখন বিগড়ে গেছে, মানুষ তখন বুঝতে পেরেছে এখন সে নিরুপায়! দুর্যোগ তাদের চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে। এখান থেকে বের হওয়ার এখন আর কোনো উপায় নেই। দিন দিন মানুষ প্রকৃতির সৃষ্টিকে নিজের মতো করে ভোগ করতে গিয়ে কখন যেন ভুলে গেছে যে প্রকৃতিও মানুষের আচরণে রুষ্ট হয়ে পড়েছে। প্রকৃতির রুঢ় আচরণের জন্য মানুষ তার অস্তিত্ব হারাতে পারে। পৈশাচিক ও বেসামাল আচরণে মানুষ প্রকৃতির ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু একটিবারের জন্য তারা এ ক্ষয় ও ব্যথার উপলব্ধিকে অনুভব করতে পারেনি। প্রকৃতি তার সৃষ্টির আচরণে এতটাই বিচলিত হয় যে সে সরাসরি বলতে না পারলেও রুঢ় ও পরিবর্তিত আচরণ দিয়ে, এমনকি প্রতিশোধ নিয়ে বুঝিয়ে দেয়। যা কিনা প্রাণিকুলের জন্য মোটেও সুখকর হয়নি। জলবায়ুর বিক্ষিপ্ত আচরণে নদী বিক্ষুব্ধ। লোকালয় ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। কৃষিজমি, জনপদ বিলীন হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত হচ্ছে মানুষ। মানুষের কাছে নদী তার দখলের জমি ফেরত চায়। তার জল শুদ্ধ চায়। নদীর জলে বর্জ্য এত পরিমাণ যে তার আবর্জনার ঠিকানা গিয়ে থেমেছে সাগর পর্যন্ত। সাগরের জলে ২০১৪ সালে সূর্যের আলোর যে গভীরতায় ছিল, তা ২০২০ সালে এসে কমে যেতে বাধ্য হয়েছে। কারণ এই নিত্যপ্রবাহিত বর্জ্য। বর্জ্য দিয়ে জল বিশুদ্ধ মানতে চায় না নদী। নদী তার জলের জীবের স্বাভাবিক বাসস্থান চায়। জলজ জীব কেন বংশ হারাবে মানুষের কারণে। নদীর বুকের বালি তুলে তার দেহকে কেন মানুষ ক্ষতবিক্ষত করে। নদীভাঙনে মানুষ সেজন্যই দিশেহারা। নদী যখন তার সে াত হারিয়ে ফেলেছে, তখন পলি আর বালির পরত বেড়েছে অনেক। দাবানল মাটি, মানুষ, বৃক্ষ-বনকে পুড়িয়ে ছাড়খার করে  দিচ্ছে। মাটিতে মিথেন গ্যাস বাড়ছে কেন? বাতাসে স্বাভাবিক অক্সিজেন নেই কেন? এই মানুষের জন্য তাই দাবানল আজ দুর্বিষহ পর্যায়ে। খরা আজ পরিবেশকে মরুময় করে তুলেছে। মাটি ফেটে চৌচির হচ্ছে, ক্ষেতে কোনো ফসল হচ্ছে না। মাটির জৈব উপাদান পরিমাণ অনেক কমেছে। অনুজীব হারিয়ে গেছে মাটি থেকে। মাটিতে গাছের পর্যাপ্ত খাবার নেই। খরা মাটি থেকে রস শুষে নিচ্ছে। মাটির নিচে জল নেই। উপরে জল নেই, যা আছে তা বিষে ভরা। ২০১৪ সালে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ডাসকোর সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার এক সমীক্ষা বলছে, দুই থেকে তিন দশক আগেও রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভের ৬০ থেকে ৭০ ফুট নিচে জল পাওয়া যেত। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এখানে শত শত গভীর নলকূপ স্থাপন করার ফলে ওই সময়ে ১০০ থেকে ১৭০ ফুট গভীরে জল মিলত কিন্তু এখন এ অঞ্চলে কূপ খনন করেও জল মিলছে না। তারপর বহুজাতিক কোম্পানির কেমিক্যাল পেস্টিসাইড পড়ে পুড়ছে মাটি। মাটিতে আজ কেঁচো নেই, ফড়িং ওড়ে না। ইঁদুর, সাপ, ব্যাঙ বাসস্থান হারিয়ে বিলুপ্তির তালিকায় নাম লিখিয়েছে। পাখি মাটি থেকে খাবার খেতে ভয় পায়। আবার ফসল বেয়ে রাসায়ানিক বিষ ঢুকে পড়ছে মানুষের শরীরে। রোগাক্রান্ত মানুষ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকছে দিনের পর দিন। মানুষের জন্য বায়ুদূষণে। শব্দের চিত্কারে তার কান নষ্ট। নির্মল বায়ুর অভাবে শ্বাসকষ্ট। নিরুপায় মানুষ তার কৃত কাজের ফলেই এই দুর্বিষহ জীবনের মুখোমুখি। মানুষ বেঁচে থাকতে পারলৌকিক সুখের স্বপ্নে বিভোর হলেও প্রকৃতিকে সাজিয়ে রেখে ইহকালে জীবন উপভোগের চিন্তা করে না। বিজ্ঞানীরা চার দশক ধরে এ সমস্যার কথা বলে আসছেন কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে তা সমাধানের জন্য মিটিং-সিটিং আর ইটিং ছাড়া কিছুই হয়নি। কেননা বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশের শাসক আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কোনো উদ্যোগ না থাকায় সমস্যা দিন দিন প্রকট হলেও সমাধানের কোনো পথ তৈরি হয়নি। দিন যতই যাচ্ছে ততই সমস্যা যে বাড়ছে, তাতে সমস্যার গহিনে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ বা জীবকুল। গেল ৪০ বছরের ব্যবধানে উষ্ণতা যেভাবে বাড়ছে, সে লক্ষণ মোটেও সুখকর হতে পারে না। সময় যত এগোচ্ছে ততই তাপ বৃদ্ধির সময় ব্যবধান কমে আসছে। প্রকৃতি যে উপকরণ বা উপাদান নিয়ে আপন গতির দিকে স্বাভাবিক নিয়মে এগোয়, তা মানুষের কারণেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে রুক্ষ মূর্তিতে ধেয়ে পড়ছে। চণ্ডলিকা দাহিকায় তছনছ করে তুলেছে স্বাভাবিকতাকে। ব্যত্যয় বা বিপত্তিটা ঠিক এখানেই। তাপ বৃদ্ধির জন্য প্রাণির জীবন দুর্বিষহ। শুধু কি তাই, এছাড়া এজন্য জীববৈচিত্র্যে, অবকাঠামোগত, স্থাপনাগত, চিকিৎসাসহ বিদ্যুতের মতো সেবা খাতের আরো স্তরে আঘাত দিয়েছে। এ অবস্থার মুক্তির জন্য মানুষ দিনে দিনে মাইগ্রেট হচ্ছে। যার সংখ্যাগত পরিমাণ ২০৫০ সাল নাগাদ ২১ কোটিতে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমরা বলতে পারি, ‘মানুষের অনিয়মের ধারাপাতে প্রকৃতি চলতে পারছে না নিরাপদে।’

আজ প্রকৃতির জলবায়ু সংকটের যে ধারা, সেজন্য এ সময়ের মানুষের মধ্যে শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটও দৃঢ় হয়েছে। এত সব বিবেচনা ও মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তা স্বার্থগত কারণে বাস্তবায়ন না করতে পারায় এখন এ পৃথিবীর মানুষ এবং জীবের প্রাপ্তি হলো আগত প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে, পৃথিবী মৃতপ্রায় অবস্থায় এগিয়েছে, আমরা প্রকৃতি থেকে যা পাচ্ছি তা ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে চলতে বাধ্য করেছি।  

 

গৌতম কুমার রায়: গবেষক ও সরকারি পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবেশ ব্যক্তিত্ব