নজরুল ইসলাম শিক্ষাবিদ, নগর গবেষক, প্রাবন্ধিক ও ভূগোলবিদ। শহরকেন্দ্রিক নানা গবেষণার জন্য তিনি সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাংককের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে চার বছর নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৭-১১ সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যানের। এর আগে (১৯৯৯-২০০২) ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। নগরের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন

গত দুই দশকে ঢাকার নাগরিক সেবায় কী পরিবর্তন এসেছে? সেটা কি ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক?

প্রথমে আমরা মহানগর ঢাকা আর রাজধানী ঢাকা—এ দুটির প্রভেদ বুঝে নিই। মহানগর ঢাকা হলো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট এলাকা। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদী আর উত্তরে টঙ্গী খালের মধ্যবর্তী এলাকা হলো ঢাকা মহানগর এলাকা, তথা ঢাকা মেট্রোপলিটান এলাকা। এর মোট আয়তন প্রায় ৩৫০ বর্গকিলোমিটার। স্থায়ী লোকসংখ্যা ১ কোটি ২৫ লাখের কাছাকাছি। আর রাজধানী ঢাকা, যেটা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনার অন্তর্গত এলাকা, সেটা বিশাল। ১ হাজার ৫৩০ বর্গকিলোমিটার। সেখানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও তারাবো উপজেলাসহ অসংখ্য ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত বিশাল এলাকা, এটা ঢাকা মেগাসিটি। এখানের জনসংখ্যা দুই কোটিরও বেশি। 

আমরা যদি ঢাকার নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি-হ্রাস নিয়ে কথা বলতে চাই তাহলে জানতে হবে সিটি করপোরেশনগুলোর দায়িত্ব কী? সিটি করপোরেশনের অনেক রকম দায়িত্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় কাজ নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, স্বাস্থ্যসম্মত রাখা। রাতে সড়ক আলোকিত রাখার কাজও তাদের। পুলিশের পাশাপাশি নির্বাচিত কাউন্সিলরদের মাধ্যমে জননিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বও তাদের। গণপরিসর তথা মাঠ ও পার্ক ব্যবস্থাপনা সিটি করপোরেশনের বড় কাজ। পার্ক কয়েক ধরনের হতে পারে। শিশুপার্ক, লেডিস পার্ক, বয়স্কদের পার্ক ইত্যাদি। একসময় সদরঘাটে লেডিস পার্ক ছিল। এখন এ কনসেপ্টই নেই। 

গত দুই দশক বা এক দশকে সিটি করপোরেশনে বসবাসকারী নাগরিকরা কেমন সেবা পাচ্ছে? 

এক কথায় বলতে গেলে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কোনো সেবাই যথার্থভাবে দিতে পারছে না। বরং আগের চেয়ে নগরজীবনে দুর্ভোগ অনেক বেড়েছে। এর অবশ্য অনেক কারণ আছে। আমরা যদি স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সালের কথা বলি, তখনকার ঢাকায় নাগরিকদের সংখ্যা কম ছিল, নাগরিক সেবা তুলনামূলক ভালো ছিল। ওই সময় ঢাকা মহানগর এলাকায় জনসংখ্যা ছিল মাত্র নয় লাখ। সে একই এলাকায় এখন জনসংখ্যা ১ কোটি ২৫ লাখ। ১৩-১৪ গুণ বেশি। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেবার চাহিদাও বেড়েছে। একটা কথা মনে রাখা দরকার, সিটি করপোরেশন নাগরিকদের সেবা দেয় স্থায়ী নাগরিকদের পৌরকর ইত্যাদির জোরে। কিন্তু সোয়া কোটি মানুষ সবাই কর দিচ্ছে না, উপরন্তু যারা শহরে দিনান্তের যাত্রী বা ‘‌ ডেইলি কমিউটার’ তারা নানাভাবে পৌর সুবিধাদি ভোগ করে, কিন্তু প্রত্যক্ষ কোনো কর দেয় না। এদের সংখ্যাও বিপুল। 

সেবার চাহিদায় কি কোনো পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন? 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বেড়েছে। এতে বৈচিত্র্যও এসেছে। আগে শুধু বিত্তশালীদের সেবার চাহিদা বেশি ছিল। আগের চেয়ে ঢাকায় বিত্তশালী অনেক বেড়েছে। এদের বড় একটা চাহিদা আছে। মধ্যবিত্তের চাহিদাও কম না। নিম্নমধ্যবিত্তের চাহিদাও আছে। নিম্নমধ্যবিত্ত বা বিত্তহীনেরও চাহিদা আছে, তবে তা খুবই সীমিত। ৫০ বছর আগে বিত্তবান ছিল কম, গাড়ির চাহিদা ছিল কম। রাস্তাঘাট তেমন চওড়া দরকার ছিল না। পুরান ঢাকায় বলতে গেলে কোনো চওড়া রাস্তাই ছিল না। গত ৫০ বছরে বিত্তবানদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। বিত্তবানদের চাহিদা বাড়া মানে বাড়িঘর বড় বড়, গাড়ির চাহিদা বাড়া। এর জন্য রাস্তা দরকার। গরিব মানুষের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি লাগে না। আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে জনসংখ্যা ও জনসংখ্যার বিত্ত পরিচয়ের কথা। যতই বিত্তবানদের সংখ্যা বাড়বে, ততই চাহিদা বাড়বে। তাদের পানির চাহিদা বেশি, বিদ্যুতের চাহিদা বেশি (অবশ্য পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ইত্যাদি সরবরাহের দায়িত্ব এখন আর দুই সিটি করপোরেশনের নয়), বর্জ্য বেশি। সত্তরের দশকে ছয়জনের একটি পরিবার যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি করত এখন তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি বর্জ্য তৈরি করছে। একটি মধ্যবিত্ত পরিবার দৈনিক যে পরিমাণ প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যবহার করে, তার পরিমাণ বিশাল। যা-ই হোক, ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সিটি করপোরেশন চাহিদা অনুযায়ী মাঠ, পার্কের ব্যবস্থা করতে পারছে না, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও আশানুরূপ হচ্ছে না। সঠিক পরিবেশ সুরক্ষায় সফলতা দেখাতে পারছে না। 

চাহিদা অনুযায়ী দুই সিটি করপোরেশন নাগরিক সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে কেন? 

সিটি করপোরেশনের কাছে আমাদের অভিযোগ কী? সবচেয়ে বড় অভিযোগ সব বর্জ্য পরিষ্কার করতে পারে না। রাস্তাঘাট যেগুলো সিটি করপোরেশন তৈরি করে সেগুলো যথেষ্ট চওড়া রাখতে পারছে না। গাড়ি-ঘোড়া বেড়ে গেছে, রাস্তায় নাগরিকরা স্বচ্ছন্দে চলতে পারছে না। ট্রাফিক কন্ট্রোলের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের না হলেও ফুটপাত নির্মাণ ও এর ব্যবস্থাপনা কিন্তু সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্ব। এখানে সিটি করপোরেশন অনেকটাই ব্যর্থ। পুরান ঢাকায় তো পর্যাপ্ত ফুটপাত নির্মাণ সম্ভবই না। করলেও দুই বা তিন ফুটের হতে পারে। রাস্তাই তো ১২-২০ ফুটের। ফুটপাতের সেবা সিটি করপোরেশন দিতে পারছে না। জায়গাই নেই। আর যেখানে সিটি করপোরেশন ফুটপাত নির্মাণ করেছে, সেটাও মানসম্মত নয়। সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে নাগরিকদের বড় অভিযোগ এটাই যে কোনো সেবা তারা মানসম্মতভাবে দিতে পারছে না। যেমন ফুটপাতের কথাই বলি। নগরীতে পর্যাপ্ত ফুটপাত নেই। আর যেখানেই আছে সেটার ব্যবস্থাপনাও যথাযথ নয়। এমনকি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত এলাকায়ও ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন অনেকটাই ব্যর্থ। বেশির ভাগ ফুটপাতই বেদখল। ফুটপাত দোকান, ভ্যান দিয়ে বেদখল করা হয়েছে। জনগণের টাকা খরচ করে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডে এত সুন্দর ফুটপাত সিটি করপোরেশন করে দিয়েছে, তার ওপর হকার বসছে, মোটরসাইকেল, সাইকেল, রিকশা চলছে, শুধু মানুষ নিরাপদ চলতে পারে না। নাগরিকরা রাস্তায় চলতে গেলে শিশুদের নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়, দুর্ঘটনার শিকার হয়। কেন? সিটি করপোরেশনের ম্যানেজমেন্ট দুর্বলতার কারণে। সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা তো আছেই। অবাক করা ব্যাপার হলো, মূল সড়কেও হকার বসে গেছে এবং অসংখ্য ভ্যান-দোকান। সিটি করপোরেশন কোন হকার উচ্ছেদ করতে পারছে না এটা তাদের ব্যাপার, কিন্তু আমি নাগরিক হিসেবে, নগর বিশ্লেষক হিসেবে বলব, এটা তাদের বিরাট ব্যর্থতা। যদি ফুটপাতে হকার রাখতে হয় সেটা প্ল্যান করে রাখতে হবে। ফরমাল হোক, ইনফরমাল হোক, প্ল্যান অনুযায়ী ফুটপাত ও হকার ব্যবস্থাপনা করতে হবে। উত্তর সিটি করপোরেশন সুন্দরভাবে দু-এক জায়গায় তা করেছে।

গণপরিসরকে আয়ের খাত হিসেবে বিবেচনা করছে দুই সিটি করপোরেশনই। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

বিষয়টি নিয়ে ইদানীং পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। পাকিস্তান আমলে লালমাটিয়া, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে বেশ পরিকল্পিতভাবেই নগরায়ণ হয়েছে। এক একটা পাড়ায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ছিল। এখন তার অনেকগুলোই আর নেই। অনেক পার্ক সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সংস্কার করা হয়েছে। এ সংস্কার প্রক্রিয়াটাও সবসময় খুব গ্রহণযোগ্য নয়। তিন বছর ধরে টিনের দেয়াল দিয়ে আটকে রাখা হচ্ছে। এত কী দরকার? সাধারণভাবে করলেই তো হয়। এত পয়সা নষ্ট করার তো কোনো মানে হয় না। পাকিস্তান আমলেই এ মাঠগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন শুধু এগুলোর ভালো ব্যবস্থাপনা করাই যথেষ্ট। আগে একটা মাঠ ছিল ১০০ মানুষের জন্য, এখন অবশ্য সেটা ১০ হাজার মানুষের জন্য হয়ে গেছে। এটা একটা বড় সমস্যা। পার্কের সংখ্যা তো তেমন বাড়েনি। মাঠের সংখ্যাও বাড়েনি। জায়গা তো নেই। শুরুতেই যে কথা বলেছি, জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সেবাগুলো সেভাবে পর্যাপ্তভাবে দিতে পারছে না। গণপরিসরে দোকান বসানো হচ্ছে। এত সুন্দর একটা জায়গা করে দিয়েছিল, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর, সেখানে খালি জায়গাটাই দিয়ে দিল দোকানের জন্য। এখন দোকানসর্বস্ব হয়ে গেছে জায়গাটা। ওখানে নিশ্চয় বয়স্ক কারো যাওয়ার পরিবেশ নেই। আশপাশের বাড়িগুলোর অবস্থা বিবেচনায় নেয়া হলো না। হইচই ও গভীর রাত পর্যন্ত আলো জ্বলছে, এর ভুক্তভোগী হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। সিটি করপোরেশন বলছে, তাদের পয়সা দরকার। পার্ক-খেলার মাঠ থেকে তো পয়সা আয় করার কথা না। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ফান্ড আছে। তাদের বাজেটে জন্মলগ্ন থেকেই পার্ক-খেলার মাঠ সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকে। এখন কেন এটা দরকার হলো। আয় বাড়ানোর পদ্ধতি এটা হওয়া উচিত নয়। আমি জোরেশোরে এর প্রতিবাদ করি। এটা হওয়া উচিত নয়। গণপরিসর গণপরিসরের মতো থাকবে। এখানে পাবলিক টয়লেট লাগবে। অতিপ্রয়োজনীয় দু-একটা দোকান থাকতে পারে, যেমন পানির দোকান, বা এক কাপ চা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হালকা কিছু খাওয়া যেতে পারে; বসে না। বসলেই ভিড় হবে। ফার্স্ট এইড সেবা থাকতে পারে। মানুষের সুবিধা হবে। কিন্তু এখন যা হয়েছে, ধানমন্ডি লেকের চারদিকে দোকানের জন্য মানুষ হাঁটতে পারে না। সবচেয়ে আপত্তিকর যেটা দেখলাম, বাহাদুরশাহ পার্ক। ঐতিহাসিক পার্ক, ছোট্ট একটা জায়গা। সেখানে আবার রেস্টুরেন্ট? এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একে একে সবগুলোকেই বাণিজ্যিক করছে। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব গণপরিসরের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা। কিন্তু তারা খুব বেশি বাণিজ্যিক আচরণ দেখাচ্ছে, তা দুঃখজনক। I