চলমান
লোডশেডিং কি
সমস্যা, না
সমাধান—এ
নিয়ে যতই
বিতর্ক হোক
না কেন,
সর্বস্তরের জনগণ
বিদ্যুৎ সংকটের
আশু সমাধান
চায়। বিশ্ববাজারে
মূল্যবৃদ্ধি বিবেচনায়
বিদ্যুৎ উৎপাদনের
অন্যতম কাঁচামাল
জ্বালানি তেল
ও তরলীকৃত
প্রাকৃতিক গ্যাস
(এলএনজি) আমদানি
কমানোর সিদ্ধান্ত
নেয় সরকার।
একই সঙ্গে
বিদ্যুতের ব্যবহার
কমাতে সরকারের
পক্ষ থেকে
বেশ কয়েকটি
সিদ্ধান্ত ও
প্রস্তাবনা গৃহীত
হয়েছে। এর
মধ্যে উল্লেখযোগ্য
দিক হলো,
রুটিন লোডশেডিং,
জ্বালানি খাতের
বাজেট বরাদ্দের
২০ শতাংশ
কম ব্যবহার,
সরকারি সব
দপ্তরে বিদ্যুতের
ব্যবহার ২৫
শতাংশ কমানো
ও রাত
৮টার পর
সব মার্কেট
বন্ধ রাখা।
এ ধরনের
সাশ্রয়ী পদ্ধতি
সাময়িকভাবে সংকট
কমাতে পারে,
কিন্তু সার্বিকভাবে
কতটুকু ফলদায়ক
হবে সে
আশঙ্কা থেকেই
যায়।
আমাদের সক্ষমতা
আর বাজার
ব্যবস্থাপনা কতটুকু
জনবান্ধব হয়েছে,
সে প্রশ্ন
আলোচনার টেবিলে
আনতে হবে।
আমরা কি
বিদ্যুৎ উৎপাদনের
সক্ষমতাকে স্থায়ী
রূপ দিতে
পেরেছি, না
নির্ভরশীলতার ছকে
আবদ্ধ করেছি,
তা দেখা
দরকার। প্রথমেই
ক্যাপাসিটি পেমেন্টের
কার্যকারিতা যাচাই
করা দরকার।
তথ্যমতে, গত
নয় মাসে
৯০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে
১৬ হাজার
৭৮৫ কোটি
টাকা ক্যাপাসিটি
পেমেন্ট করতে
হয়েছে। বিদ্যুৎ
উৎপাদন ক্ষমতার
৪০-৪৮
শতাংশ অব্যবহূত
থাকার পরও
কেন্দ্র ভাড়া
বাবদ বড়
অংকের টাকা
দিতে আমরা
বাধ্য হচ্ছি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের
চুক্তির নবায়ন
না করে
পূর্বতন নীতি
বহাল রাখার
কারণে এমন
হচ্ছে।
এরপর বিদ্যুৎ
উৎপাদনের কাঁচামাল
হিসেবে ডিজেল
ও তরলীকৃত
গ্যাস আমদানি
কমানোর কারণ
যাচাই করা
দরকার। সার্বিক
হিসেবে দেখা
যাচ্ছে, আমাদের
বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ কমে
দাঁড়িয়েছে প্রায়
৪০ বিলিয়ন
ডলার, যা
দিয়ে কয়েক
মাস আমদানি
ব্যয় বহন
সম্ভব। জাতীয়
রাজস্ব বোর্ড
জানায়, গত
অর্থবছরের প্রথম
১০ মাসে
(জুলাই-এপ্রিল)
পণ্য আমদানিতে
ব্যয় হয়েছে
৭ হাজার
৩৪৩ কোটি
মার্কিন ডলার,
যা আগের
বছরের একই
সময়ের চেয়ে
প্রায় ৪১
শতাংশ বেশি।
অথচ এর
বিপরীতে মাত্র
৩ শতাংশ
কম পরিমাণ
পণ্য আমদানি
হয়েছে। অত্যধিক
আমদানি ব্যয়
আর অতি
মাত্রায় আমদানিনির্ভরতার
কারণে আমাদের
বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ এখন
সংকটের মুখে।
রিজার্ভ সংকট
যত বাড়বে,
তত বেশি
মাত্রায় বিদ্যুৎ
ঘাটতির মধ্যে
আমাদের থাকতে
হবে। রিজার্ভের
পরিমাণ বাড়াতে
হলে রফতানি
আয় বৃদ্ধি
ও আমদানি
ব্যয় কমানো
অত্যাবশ্যক।
এক্ষেত্রে সবার
আগে প্রয়োজন
ব্যাপক কৃষি
উৎপাদন। অথচ
এ সময়
কৃষক আমান
ধানের আবাদ
করতে পারছেন
না। এমনিতেই
বৃষ্টি নেই,
খরা চলছে;
অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে
বিদ্যুৎ সংকট
এতই প্রকট,
অধিকাংশ সময়
বিদ্যুৎ না
থাকায় সেচ
পাম্প অনেকটাই
অকার্যকর হয়ে
আছে। ফলন
কমে গেলে
রফতানি করতে
হবে অন্তত
বাঁচার জন্য।
রিজার্ভ কম
থাকলে তখন
খাদ্য আমদানির
দিকে গুরুত্ব
দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে
ডিজেল ও
তরলীকৃত গ্যাস
আমদানি আরো
কমে যেতে
পারে। এমন
পরিস্থিতি কীভাবে
সামাল দেয়া
হবে সেটা
ভাবার সময়
এখনই। কেননা,
বিদ্যুতের ব্যাপক
ঘাটতি হলে
শিল্প-কারখানায়
পণ্য উৎপাদন
কমে যাবে,
তখন আরো
বাড়বে আমদানিনির্ভরতা।
রিজার্ভ ঘাটতি
বেড়ে গেলে
সে আমদানির
সঙ্গে সমন্বয়
করা কঠিন
হয়ে পড়বে।
এর মানে
বিদ্যুৎ সংকট
সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায়
সমন্বয়হীনতার ফল।
সে জায়গায়
সংস্কার না
করলে সংকট
হতেই থাকবে।
যে বিষয়টিকে
গুরুত্ব দেয়া
দরকার তাহলো,
বৈদেশিক মুদ্রা
আয় বাড়ানোর
উদ্যোগ নেয়া।
বৈদেশিক মুদ্রা
আয় বাড়লে
আর বৈদেশিক
মুদ্রা ব্যয়
কমাতে পারলে
আমাদের রিজার্ভ
বাড়বে। রফতানি
আয়, প্রবাসী
আয় বা
রেমিট্যান্স, বিদেশী
বিনিয়োগ এবং
বৈদেশিক মুদ্রায়
ঋণ ও
অনুদান বাড়লে
দেশের বৈদেশিক
মুদ্রা আয়
বাড়বে। এর
বিপরীতে আমদানি,
বৈদেশিক ঋণ
পরিশোধ, বিদেশ
ভ্রমণ ও
বিনিয়োগের বিপরীতে
লভ্যাংশ বিদেশে
বেশি মাত্রায়
চলে গেলে
বৈদেশিক মুদ্রা
ব্যয় বাড়বে।
বাস্তবে আমাদের
বৈদেশিক মুদ্রা
আয়ের চেয়ে
ব্যয় বেশি
হওয়ার কারণে
রিজার্ভের পরিমাণ
কমছে। কেন
এমনটি হচ্ছে
তা বোঝা
জরুরি।
সমাজবিজ্ঞানী ও
উন্নয়নতত্ত্ববিদ সামির
আমিন চলমান
এ সমস্যাকে
পুঁজিবাদী বিশ্বকাঠামো
অনুসৃত নির্ভরশীলতার
ছককে দায়ী
করেন। সামির
আমিন বলেন
(১৯৭৪), কেন্দ্র-রাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের
নামে বৈদেশিক
পুঁজির ওপর
প্রান্তিক রাষ্ট্রকে
নির্ভরশীল রাখার
ছক অংকন
করে। এর
মধ্য দিয়ে
কেন্দ্র-রাষ্ট্র
প্রান্তিক রাষ্ট্রের
ওপর অর্থনৈতিক
আধিপত্য অব্যাহত
রাখতে পারে।
বিভিন্ন উন্নয়ন
প্রকল্প হাতে
নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে
কেন্দ্র রাষ্ট্রগুলোর
দেয়া ঋণ
চক্রে আমরা
বেঁধে যাই।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ
বিভিন্ন সংস্থা
ঋণ চক্রে
বাঁধতে গিয়ে
আমাদের সক্ষমতার
সম্ভাবনাকে নষ্ট
করে দেয়।
ফলে সুদসহ
বৈদেশিক ঋণ
পরিশোধে বড়
অংক ব্যয়
করতে আমরা
বাধ্য হচ্ছি।
শুধু তা-ই
নয়, তাদের
দেয়া শর্ত
মানতে আমরা
এতই বাধ্য,
নিজের পায়ে
দাঁড়ানোর শক্তি
হারাতে হচ্ছে।
আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত
প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের
কাজ পেট্রোলিয়াম
অনুসন্ধান ও
উৎপাদন। খনিজ
ও তেল
উৎপাদনের জন্য
রয়েছে আরেকটি
সরকারি প্রতিষ্ঠান
পেট্রোবাংলা। এ
দুটি প্রতিষ্ঠানের
কাজের সক্ষমতা
আমরা কতটুকু
বাড়াতে পেরেছি?
কেন্দ্র-রাষ্ট্র
যেসব কোম্পানিকে
প্রেসক্রাইব করবে
আমরা যেন
তা মানতে
বাধ্য হই,
তা নিশ্চিত
করার সঙ্গে
ঋণ ছাড়ের
সম্পর্ক আছে।
এ ধরনের
নির্ভরশীলতার ছক
মেনে চলার
কারণে আমরা
নিজেদের সক্ষমতাকে
কাজে লাগাতে
পারছি না।
যদি বাপেক্স
ও পেট্রোবাংলাকে
উচ্চমানের ট্রেনিং,
বড় বড়
মাপের ইঞ্জিনিয়ার
ও কারিগরি
দক্ষদের নিয়োগ
এবং ক্ষমতায়নের
মাধ্যমে সমন্বয়
করে পরিকল্পনামাফিক
অগ্রসর হতাম,
আমরা প্রাকৃতিক
সম্পদে অনেক
সমৃদ্ধ হতে
পারতাম। এতে
করে আমাদের
উত্তোলিত প্রাকৃতিক
গ্যাস, কয়লা
ও তেলের
সুষ্ঠু ব্যবহার
বৃদ্ধি পেত,
কমে যেত
আমদানিনির্ভরতা। বিদ্যুৎ
উৎপাদন একটা
শক্ত ভিত্তির
ওপর দাঁড়াতে
পারত কিন্তু
কেন্দ্র-রাষ্ট্র
এমনটি চাইবে
না। সামির
আমিন (১৯৭৪),
এ বিষয়ে
বলেন, কেন্দ্র-রাষ্ট্র
চায় প্রান্তিক
রাষ্ট্রের মধ্যকার
অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর
মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক
ও সমন্বয়
যেন প্রতিষ্ঠিত
না হয়।
এতে করে
কেন্দ্র-রাষ্ট্র
এসব প্রতিষ্ঠানের
ওপর নিয়ন্ত্রণ
পাকাপোক্ত করতে
সমর্থ হবে।
আরেকটি কারণ
আমরা অগ্রাহ্য
করতে পারব
না। আমাদের
অন্তর্নিহিত সমস্যা।
ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির
ফলে আমাদের
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে
আমরাই দুর্বল
করে ফেলছি।
প্রকল্পের জন্য
বড় অংকের
ঋণ নেয়ার
পর সেই
ঋণকে কাজে
লাগাতে পারছি
না দুর্নীতির
কারণে। সেজন্য
ধাপে ধাপে
প্রকল্প ব্যয়
বাড়ানোর পথে
আমরা হাঁটছি।
আর বড়
অংকের লোন
শোধ করছি
রিজার্ভ থেকে।
শুধু তা-ই
নয়, বড়
দুর্নীতিবাজরা কোটি
কোটি ডলার
বিদেশে পাচার
করছে, ফলে
দুর্নীতির টাকা
কাজে লাগাতেও
আমরা ব্যর্থ
হচ্ছি। সুইস
ব্যাংকে রেকর্ড
পরিমাণ টাকা
পাঠিয়েছে আমাদের
দুর্নীতিবাজরা। ঋণখেলাপিরাও
এর মধ্যে
যুক্ত হয়েছে।
উন্নয়নতাত্ত্বিক গুন্ডার
ফ্রাঙ্ক এদের
বলেছেন লুম্পেন
বোর্জেয়া। এদের
কারণেই উন্নয়নশীল
দেশের উন্নয়ন
হচ্ছে না।
নিয়মিত সুষ্ঠু
তদারকের অভাবে
দুর্নীতির এ
বহুমাত্রিকতা কালচারের
অনুষঙ্গ হয়ে
উঠেছে। এটিও
কেন্দ্র-রাষ্ট্রের
ছকবহির্ভূত কিছু
নয়। সামির
আমিন (১৯৭৪),
এ প্রসঙ্গের
উল্লেখ করে
বলেন, তথাকথিত
‘কেন্দ্র’
রাষ্ট্র প্রান্তিক
রাষ্ট্রকে এমনভাবে
রূপায়িত করতে
চায়, যাতে
করে প্রান্তিক
রাষ্ট্রের জনগণের
মধ্যে বড়
মাত্রার অসমতা
বিরাজ করে।
অথচ কেন্দ্র-রাষ্ট্র
তার উন্নয়নকে
সুস্থির করার
জন্য নিজেদের মধ্যকার
অসমতা কমিয়ে
ফেলে। আমাদের
দেশে দুর্নীতি
বাড়লে আর
তাদের টাকা
সুইস ব্যাংকে
জমা বা
বিদেশে পাচার
হলে দেশের
জনগণের মধ্যে
অসমতা বাড়বে,
সার্বিক সক্ষমতাও
কমবে। এটাই
চায় কেন্দ্র
রাষ্ট্রগুলো।
মূলত অতিনির্ভরশীলতা
আর দুর্নীতির
হাত থেকে
নিষ্কৃতি না
হলে উন্নয়ন
তার স্থায়িত্ব
হারাবে। উন্নয়ন-তাত্ত্বিক
গুন্ডার ফ্রাঙ্ক
(১৯৮৪) এ
থেকে নিষ্কৃতির
জন্য বিশ্ব
ব্যবস্থায় যে
শোষণ কাঠামো
সক্রিয় তা
থেকে সরে
আসার প্রতি
গুরুত্বারোপ করেন।
দৃশ্যমান উন্নয়ন
কোনো স্থায়ী
উন্নয়ন নয়,
আসল ও
স্থায়ী উন্নয়ন
নির্ভর করে
আমাদের জাতীয়
সংস্কৃতি, জনবান্ধব
রাজনীতি ও
সামাজিক মূল্যবোধের
গুণগত মানের
ওপর। নিজেদের
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা
ও দক্ষতা,
আমলাতান্ত্রিক স্বচ্ছতা,
বিচার ব্যবস্থায়
নিরপেক্ষতা, দুর্নীতির
বিরুদ্ধে প্রশাসনিক
দৃঢ়তা, আমদানিনির্ভর
অর্থনীতির সংস্কার
ও নির্ভরশীলতার
ছক থেকে
বেরিয়ে আসার
জন্য সার্বভৌম
সিদ্ধান্তই আমাদের
উন্নয়নের ভিত্তিকে
শক্তিশালী করতে
পারবে। সাময়িক
সমাধানের সঙ্গে
সঙ্গে স্থায়ী
সমাধানের পথে
আমাদের হাঁটতেই
হবে।
ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা










