কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম হলেও আধুনিক সভ্যতার বিস্তার ও নগরায়ণের ফলে ক্রমে কৃষিজমি কমছে। আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিজমি রক্ষায় গৃহীত উদ্যোগ সে অর্থে কাজে আসছে না। ফলে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে জমিতে বছরে একাধিক ফসল আবাদে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে জনসংখ্যার চাপে কৃষিজমি কমলেও বিভিন্ন খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছে। এক্ষেত্রে ফসলের নিবিড়তা অর্থাৎ মোট জমি এবং তাতে চাষের অনুপাতের শতকরা হারকে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও সাধারণভাবে শস্য নিবিড়তা বলতে প্রকৃত চাষের জমিতে বছরে কত মেয়াদি ফসল ফলানো হচ্ছে সেটি বোঝায়।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ কৃষিশুমারি অনুযায়ী ফসলের নিবিড়তার হারে ফরিদপুর সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ফরিদপুরের পরই ফসলের নিবিড়তার হার বেশি রাজবাড়ী জেলায়। ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর পরই রয়েছে ভোলা জেলা। এসব জেলার কৃষিজমিতে বছরে গড়ে প্রায় তিনটি করে ফসল আবাদ করা হয়। এছাড়া ফসলের নিবিড়তার হারে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও। এসব জেলার আবাদি জমিতে গড়ে আড়াই থেকে তিনটি ফসল আবাদ হয়। মূলত এ জেলাগুলোয় উঁচু জমি বেশি থাকায় বছরের অধিকাংশ সময়েই কৃষকরা ফসল আবাদ করতে পারেন। 

অবশ্য বিবিএসের তথ্যের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফসলের নিবিড়তার হারে অনেক ব্যবধান দেখা গেছে। জেলাগুলোর তথ্যেও দেখা গেছে গরমিল। বিবিএসের দেয়া হারের তুলনায় জেলাগুলোয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফসলের নিবিড়তার হার অনেক কম পাওয়া গেছে। তবে তথ্যগত বিভ্রাট থাকলেও ফরিদপুরে জমি খুব একটা খালি থাকে না। ফরিদপুরে বেশির ভাগ উঁচু জমি হওয়ায় সারা বছরই ফসল আবাদ করা যায়। জেলাটিতে তিন ফসলি ও চার ফসলি জমিও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

কৃষিবিদদের মতে, উঁচু জমিতে সারা বছরই ফসল আবাদ করা যায়। যেমন পেঁয়াজের সঙ্গে আমন ধান আবাদ হয়। অনেক জায়গায় পেঁয়াজের আবাদ দুবার করা হয়। সাধারণত তিন ফসল উৎপাদন করলে জমির ক্ষতি হয় না। উৎপাদনশীলতা ঠিক থাকে, তবে সারের ব্যবহার বাড়াতে হয়। এক্ষেত্রে কৃষিবিদরা জৈব সার প্রয়োগে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। 

শস্যের নিবিড়তায় কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এরই মধ্যে রংপুরে এ পদ্ধতিতে উৎপাদন করা আলু বিদেশে রফতানি শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বিষমুক্ত ফসল আবাদে জোর দিয়েছেন। মাটির গুণাগুণ বজায় রেখে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানোর তাগিদও দিয়েছেন তারা।

অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সরেজমিন গবেষণা বিভাগের পিরোজপুর-গোপালগঞ্জ-বাগেরহাট সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বারি বিজ্ঞানীদের সদ্য উদ্ভাবিত উন্নত জাতের ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট, তৈলবীজ, ডাল, বিটি বেগুন, সামার টমেটো ও মসলা বীজ প্রদান করে। চাষাবাদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে উচ্চফলনশীল বীজ পেয়ে কৃষকরা দ্বিফসলি জমিকে তিন ফসলি ও তিন ফসলি জমিকে চার ফসলি জমিতে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়। অধিক ফসল উৎপাদনের ফলে তাদের আয় বাড়ে। এলাকার নারী ও শিশুর মৌসুমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ফলে অনেক কৃষক এ ধরনের লাভজনক চাষাবাদে ঝুঁকে পড়েন। এ ধরনের প্রকল্প তিন জেলার কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। 

তবে সার্বিকভাবে সেচ সুবিধাসহ কৃষি উপকরণের অপ্রতুলতা, জমির মালিকের অনুপস্থিতি, জমির অতিরিক্ত মালিকানা, বর্গা চাষ, অকৃষি খাতে উপার্জন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা কারণে জমিতে শস্য নিবিড়তা আশানুরূপ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তাছাড়া অনেক কৃষকের ধারণা, ক্রমাগত আবাদ না করে জমিকে একটু বিশ্রাম দিতে হয়। সাধারণত মাঝারি ও বৃহৎ মালিকের জমিতে শস্য নিবিড়তা কম হয়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক তার পরিবারের প্রয়োজনে নিজস্ব জমিতে ধানের পর অন্য যেকোনো শস্য আবাদ করে, এজন্য শস্য নিবিড়তা তুলনামূলক বেশি হয়। এছাড়া যেসব এলাকায় পানি সেচের ব্যবস্থা শুধু বৃষ্টি বা ভূ-উপরিস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব স্থানে শস্য নিবিড়তা তুলনামূলকভাবে কম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকারিভাবে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানি সেচের ব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করা হলেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় ভূ-উপরিস্থ পানি সেচের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনের প্রচেষ্টা জোরদার হওয়ার প্রমাণ মেলে না। অন্যদিকে বর্তমানে বেশি শস্য নিবিড়তাসম্পন্ন জেলাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানেও বিগত কয়েক বছর শস্য নিবিড়তা বাড়েনি। তাই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলও কৃষির জন্য পরিবেশ অনুযায়ী অঞ্চলভিত্তিক লাগসই ফসল নির্বাচন ও ফসল বিন্যাস নির্ধারণের মাধ্যমে শস্যের নিবিড়তার ওপর জোর দিয়েছে।

কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শস্য নিবিড়তা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষিজমির সর্বোত্তম ব্যবহারের বিকল্প নেই। বস্তুত আমাদের জমি বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই, বরং প্রতিনিয়ত কৃষিজমি কমছে। এ কারণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য শস্যবিন্যাস পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। যেসব জেলায় ফসলের নিবিড়তার হার কম সেখানেও বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরাও বলছেন, খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হলে ফসলের নিবিড়তা বাড়াতে হবে। কিন্তু এতে মাটির স্বাস্থ্যের ওপর এরই মধ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু সরকারের সামনেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ উইংয়ের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রশিক্ষণে সয়েল রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) পক্ষ থেকে সারের যে নির্ধারিত ডোজ সেটি প্রয়োগের বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে। যেন জমিতে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। পাশাপাশি কৃষিজমির জৈব পদার্থগুলো ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করা হচ্ছে বলা হয়েছে।

বস্তুত অব্যাহত কৃষিজমি হ্রাসের বিপরীতে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ফসলের নিবিড়তার বিকল্প নেই। এজন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি যেসব জেলায় ফসলের নিবিড়তার হার কম, সেসব জেলায় নিবিড়তার হার বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোকে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হোক—আমরা সে প্রত্যাশাই করি।