রাজনৈতিক
সংস্কৃতির সঙ্গে
যূথবদ্ধ সাম্প্রতিক
দুটো ঘটনা
মানুষের মনোজগেক
এমনভাবে নাড়া
দিয়েছে যে
অনেকেই এর
আশু সমাধান
খুঁজে পাচ্ছেন
না। প্রথমটি
বুয়েটের শিক্ষার্থী
আবরার ফাহাদকে
নৃশংসভাবে হত্যা
ও তত্সংশ্লিষ্ট
বিচারকে কেন্দ্র
করে। আর
দ্বিতীয়টি খুলনা
বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের
(কুয়েট) অধ্যাপক
সেলিম হোসেন
স্যারের অনাকাঙ্ক্ষিত
ও অকালমৃত্যুর
ঘটনাকে ঘিরে।
দুটো ঘটনাই
আপাতদৃষ্টিতে মাইক্রো
মনে হলেও
আসলে ম্যাক্রো
বা বড়
পরিসরের রাজনৈতিক
কাঠামোর সঙ্গে
অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
বুয়েটের শেরেবাংলা
হলের ছাত্র
আবরার ফাহাদকে
দুই বছর
আগে হত্যা
করা হয়।
এ হত্যাকাণ্ড
নির্মমতা আর
নৃশংসতার সব
সীমারেখা অতিক্রম
করেছে। ফলে
সুষ্ঠু বিচার
ও আসামিদের
শাস্তির দাবিতে
ব্যাপক আন্দোলন
গড়ে ওঠে।
ঘটনাটি দুই
বছর আগের
হলেও ৮
ডিসেম্বর দ্রুত
বিচার ট্রাইব্যুনাল
থেকে রায়
ঘোষিত হয়।
এ রায়ে
২০ জন
আসামিকে মৃত্যুদণ্ড
ও পাঁচজনকে
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
দেয়া হয়।
অনেকেই এতে
খুশি হলেও
আসামিদের পরিবার
অখুশি হতেই
পারে। লাঠির
আঘাতে হত্যা
করার জন্য
২০ জন
বুয়েট ছাত্রের
ভাগ্যে মৃত্যুপরোয়ানা
মেনে নেয়া
কঠিনই বটে।
বিশ্বজিৎ হত্যা
মামলায় আটজনের
ফাঁসির রায়
হয়েছিল, কিন্তু
উচ্চ আদালতের
চূড়ান্ত রায়ে
ছয়জন রেহাই
পেয়ে যায়,
আর ১৩
আসামি আত্মগোপনে
থাকে। আমার
প্রশ্ন হলো,
যে রাজনৈতিক
সংস্কৃতির বেড়াজালে
ছাত্ররাজনীতি আবদ্ধ,
সেই জাল
কি অক্ষতই
আছে? নাকি
এর কোনো
লক্ষণীয় পরিবর্তন
দৃশ্যমান? যদি
লক্ষণীয় পরিবর্তন
না আসে,
তাহলে বুয়েটের
মতো মেধাবী
ছাত্রদের এই
করুণ পরিণতির
জন্য কি
প্রচলিত রাজনৈতিক
ব্যবস্থাপনাই দায়ী
নয়? উচ্চশিক্ষালয়ের
হলগুলোয় যদি
ছাত্র-ছাত্রীরা
ভয়ে, আতঙ্কে
ও নিরাপত্তাহীনতায়
বাস করেন,
তাহলে সেই
শিক্ষালয় থেকে
ছাত্র-ছাত্রীদের
মানসিক ও
বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ
কী করে
হবে?
এক্ষেত্রে হল
রাজনীতির হালচাল
বোঝা জরুরি।
আবরারকে পিটিয়ে
হত্যা করাটা
শুধু হত্যাকাণ্ড
নয়। কেননা
আবরারের অপরাধ
সে কেন
পানি বণ্টন
ইস্যুতে সমালোচনা
করে ফেসবুকে
পোস্ট দিল?
যদি তা
অপরাধ হয়,
তার বিচার
আদালতে না
করে কেনইবা
হলের টর্চার
সেলে করা
হলো। এর
মানে আইনগত
পদ্ধতিকে তোয়াক্কা
না করে
স্টুডেন্টস হলে
টর্চার সেল
গঠন করার
অনুমতি কোথা
থেকে পেল?
এগুলো দেখভালের
জন্য কেউ
কি ছিলেন
না? এর
দায়িত্বে প্রক্টর
ও হল
প্রভোস্ট আছেন
সত্য, কিন্তু
কেনইবা তাদের
দেখভালের স্বাধীনতা
দুর্বল হয়ে
পড়ে? এ
বিষয়গুলো এটা
বোঝায় না
যে ছাত্ররাজনীতিতে
ছাত্রদের ক্ষমতা
প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের
চেয়ে বেশি।
আসল কারণ
হলো, উচ্চ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক
ব্যবস্থাপনা উচ্চশিক্ষাকে
কেন্দ্র করে
গড়ে ওঠেনি।
বরং চলমান
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
শিক্ষাবহির্ভূত রাজনীতির
সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে
জড়িয়ে গেছে।
এর একটা
বড় উদাহরণ
বলে দিচ্ছে
উচ্চশিক্ষালয়ে রাজনৈতিক
সংস্কৃতি সেই
পুরোনা কায়দায়
চলছে। গত
৩০ নভেম্বর
কুয়েটের লালন
শাহ হলের
প্রভোস্ট অধ্যাপক
সেলিম হোসাইন
স্যারের হার্ট
অ্যাটাকে মৃত্যুর
ঘটনাটি আবারো
নাড়া দিয়েছিল
শিক্ষা কাঠামো
ও বুদ্ধিবৃত্তিক
জগেক। স্যার
বাসায় ফিরে
তার স্ত্রীকে
বললেন, ‘ছাত্ররা
ধরে নিয়ে
গেছে...দায়িত্বই
ছেড়ে দেব।’
অতঃপর বাথরুমে
স্যার হার্ট
অ্যাটাক করে
মারা যান।
এর মানে
এটি আসলে
হার্ট অ্যাটাক
নয়, এটি
ছাত্ররাজনীতির সেই
বেহালকে স্মরণ
করিয়ে দেয়,
যার কোপানলে
শুধু আবরারদের
মতো ছাত্ররাই
পড়েন না,
বিবেকবান শিক্ষকরাও
পড়ে যান।
কতটা মানসিক
যন্ত্রণায় পড়লে
আর কতটা
অযাচিত চাপের
মধ্যে থাকলে
একজন অধ্যাপক
অসহায় হয়ে
তার অসহায়ত্ব
শুধু তার
স্ত্রীকে বলতে
পারেন! অতঃপর
মৃত্যুর মধ্য
দিয়ে দায়িত্বের
ইতি টানতে
হয়! এর
মানে একজন
অধ্যাপক অযাচিত
চাপের মধ্যে
পড়লে সেই
চাপের কথা
ব্যক্ত করা
এবং এ
ব্যাপারে বিচার
চাওয়ার কোনো
পরিবেশ কি
প্রশাসন সৃষ্টি
করতে পারেনি?
এর মানে
কি এই
নয় যে
ছাত্ররাজনীতি উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট
রাজনীতি থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে
শিক্ষাবহির্ভূত রাজনীতির
সঙ্গে মিশে
গেছে? সেই
জায়গা থেকে
বলতে পারি,
গতানুগতিক সেকেলে
রাজনৈতিক কালচারের
সংস্কার না
করে বিচার
প্রক্রিয়া দিয়ে
সাময়িক মীমাংসার
পদ্ধতি ফলদায়ক
তেমন কিছু
পরিবর্তন আনতে
পারবে না।
ধরলাম, আবরার
খুনের আসামিদের
ন্যায়ানুগ শাস্তি
হলো অথচ
হলগুলোর টর্চার
সেল আগের
মতোই রয়ে
গেছে। আগের
মতো যদি
পলিটিক্যাল ছাত্র-ছাত্রীদের
অর্ডার মতো
সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা
চলতে বাধ্য
হয়, যাদের
লেখাপড়ার দিকে
ঝোঁক নেই,
তাদের নির্দেশে
শিক্ষার্থীদের মিছিল-মিটিংয়ে
যেতে হয়,
আগের কালচার
বহাল রেখেই
যদি নতুন
ছাত্র-ছাত্রীদের
বাজে ও
অশ্লীল ভাষার
ব্যবহারে র্যাগিং
করা হয়,
তাহলে হল
সামাজিকীকরণ নির্মমতা
আর আধিপত্য
বিস্তারের কৌশল
ছাড়া অন্য
কিছু শেখাতে
পারবে না।
এই সামাজিকীকরণ
থেকে যে
তিক্ত অভিজ্ঞতার
জন্ম হয়,
তাতে জাতি
উপকৃত হওয়া
তো দূরের
কথা, বরং
বিরাট ক্ষতির
মধ্যে পড়বে।
কেননা হলের
চলমান রাজনৈতিক
কালচারে মেধাবীরা
নিয়ন্ত্রিত হয়
তাদের হাতে,
যারা মেধার
চেয়ে পেশিশক্তিকে
অধিক গুরুত্ব
দেয়। মেধা
ও গবেষণার
ব্যবহার যদি
মেধাহীন কালচারের
জালে আবদ্ধ
হয়, তাহলে
আমরা কী
করে ভালো
মানের একটা
ব্যুরোক্র্যাসি আশা
করব? এতে
আমাদের উচ্চশিক্ষার
ধরন ও
কৌশল যদি
ব্যুরোক্র্যাসির হাতে
নিয়ন্ত্রিত হয়,
আমাদের অবাক
হওয়ার কিছু
থাকবে না।
এ থেকে
পরিত্রাণের জন্য
বড় ধরনের
সংস্কারের চিন্তা
করতেই হবে।
উচ্চশিক্ষালয়ের শিক্ষা
ও গবেষণাসংশ্লিষ্ট
বিষয়াদিকে একটা
মানে দাঁড়
করাতে হলে
ভালো মানের
ব্যবস্থাপনা থাকতেই
হবে। এটাকেই
আমরা শিক্ষাবিষয়ক
রাজনীতি বলতে
পারি। শিক্ষাবিষয়ক
রাজনীতিকে আমলাতান্ত্রিক
প্রভাব থেকে
মুক্ত করা
যেমন জরুরি,
তেমনি দরকার
রাজনৈতিক স্বকীয়তা
ও প্রশাসনিক
স্বাতন্ত্র্য। শিক্ষা
ও গবেষণাবান্ধব
পরিবেশ সৃষ্টি
করতে হলে
হল কাঠামোয়
চলমান পদ্ধতি
বাতিল করলেই
হবে না,
প্রশাসনিক সংস্কার
আনতে হবে।
প্রতিটি হল
পরিচালনার দায়িত্বে
থাকা হল
প্রভোস্টকে সহযোগিতার
জন্য মেধা
ও নেতৃত্বের
গুণাবলিসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের
মধ্য থেকে
২০ জনকে
প্রাথমিকভাবে সিলেকশন
করতে হবে।
হল শিক্ষার্থীদের
ভোটের মাধ্যমে
১০ সদস্যের
কমিটি এক
বছরের জন্য
নির্বাচিত করবে।
নির্বাচিত সদস্যদের
কাজ হলো
ব্যবস্থাপনায় হল
কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা
করা।
এ ধরনের
সিদ্ধান্তে আমরা
তখনই পৌঁছতে
পারব যখন
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়
তার প্রশাসনিক
কর্মপন্থা স্বাধীন
ও উচ্চতর
মানদণ্ডে নির্ধারণ
করতে সক্ষম
হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের
জ্ঞান ও
গবেষণার স্বাধীনতা
অর্জন করতে
হলে প্রশাসনিক
স্বকীয়তা নিশ্চিত
করতেই হবে।
এই প্রশাসনিক
স্বকীয়তা মানে
এই নয়
যে এটিকে
কেন্দ্রীয় রাজনীতির
বিরুদ্ধে প্রস্তুত
করা। এ
স্বকীয়তা মানে
বিশ্ববিদ্যালয়বহির্ভূত কারো
অযাচিত হস্তক্ষেপ
বন্ধ করা।
এ স্বকীয়তা
অর্জনের জন্য
আমি দুটো
পরিষদ গঠন
করার প্রয়োজনীয়তা
অনুভব করি।
একটা হলো
বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবক
পরিষদ (ইউজিএ)।
এ পরিষদ
গঠিত হতে
পারে সব
ফ্যাকাল্টির মধ্য
থেকে ২০
জন সিনিয়র
অধ্যাপককে নিয়ে,
যাদের গবেষণার
মান সবার
ওপরে এবং
এ গ্রেডের
অধ্যাপক। এ
পরিষদের দায়িত্ব
চেয়ারম্যান, ডিন,
হল প্রভোস্ট
ও ভার্সিটি
শিক্ষার্থী কাউন্সিলের
(ইউএসসি) সঙ্গে
আলোচনা সাপেক্ষে
উদ্ভূত সমস্যাগুলোর
সমাধান পেশ
করা। প্রতিটি
ভার্সিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্র-ছাত্রী
কাউন্সিল (ইউএসসি)
গঠন করা
প্রয়োজন। প্রথমে
মেধা, রেজাল্ট
ও সততার
আলোকে ৫০
জন ছাত্র-ছাত্রীকে
সিলেকশন করবে
বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবক
পরিষদ। ছাত্র-ছাত্রীদের
ভোটের ভিত্তিতে
সেই ৫০
জন থেকে
২০ জনকে
কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচিত
করা হবে।
ফ্যাকাল্টি অনুযায়ী
২০ জনের
মধ্যে দায়িত্ব
ভাগ করা
হবে। নির্বাচিত
সদস্যদের কাজ
ছাত্র-ছাত্রীদের
সমস্যা সিনেটে
তুলে ধরা
এবং ডিনসের
সহযোগিতায় সমাধানের
উদ্যোগ নেয়া।
আমরা যদি
এভাবে শিক্ষাবিষয়ক
রাজনৈতিক ও
প্রশাসনিক সংস্কার আনতে
পারি তাহলে
ছাত্র-ছাত্রীদের
জ্ঞান, গবেষণা
ও জীবনবোধ
উচ্চমানের হতে
পারে। আমরা
চাই রাজনৈতিক
সংস্কৃতির আমূল
পরিবর্তন। এটা
এখন গণদাবিতে
পরিণত হয়েছে।
ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী
অধ্যাপক
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়










