২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ২৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে হলে তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী-ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার দেশের রাষ্ট্রপতি দ্বারা নিয়োগকৃত হতে হবে। এই তিনজন প্রধানত প্রশাসনিক কাজ করবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকনির্দেশনা দেবেন। জবাবদিহিতার এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধার জন্য এই ব্যবস্থা।
কিন্তু দেশের ১০৫টির মধ্যে ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই সেই নিয়ম মেনে চলছে না: এদের কোনোটায় ভিসি, প্রো-ভিসি আর কোনোটায় ট্রেজারার নেই! মোট ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ভিসিই নেই, ৮২টিতে প্রো-ভিসি নেই, এবং ৫৫টিতে ট্রেজারার নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০-১৫ বছর ধরেই চলছে এই অব্যবস্থা! মাত্র ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি পদই সরকারি অনুমোদনসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ দিয়ে চলছে!
উন্নত দেশগুলোর কথা বাদ থাকুক, উন্নয়নশীল, এমনকি বেশির ভাগ অনুন্নত দেশেও এমন বেহাল অবস্থা খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। বছরের পর বছর সরকারের এই নিয়ম ভঙ্গ করে এতগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু থাকে কী করে? এ ব্যাপারে সরকারি তত্ত্বাবধায়করা কী করছেন? সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করে, উপযুক্ত লোক নিয়োগ না করে, সনদসর্বস্ব সার্টিফিকেট বিতরণ করে ছাত্রদের শিক্ষার যে ক্ষতি করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং এর ফলে যেভাবে প্রতারিত হচ্ছেন অভিভাবকরা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বৃহত্তর সমাজ, তার বিধান কে করছে? এ কোন ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ! (মুক্তিযুদ্ধ, হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়...)।
নিয়ম ভেঙে, যোগ্যতাহীন, কম খরচের অনোনুমোদিত লোক দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ চালিয়ে যাওয়া আমাদের সমাজে নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই শুধু নয়, দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি-ব্যবসা-সেবামূলক—সব প্রতিষ্ঠানেই এই সমস্যা। আমাদের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এই সাধারণ নিয়ম না মানার ফল হয়েছে সর্বস্তরে শিক্ষার মানের দুর্বিষহ রকমের অবনতি, অবক্ষয় এবং বিশেষজ্ঞ দূরে থাকুক, সাধারণ মানুষের হিসাবেও অদূরভবিষ্যতে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ।
শিক্ষার এই মানের অবনতির ফলে আমাদের সমাজে সামগ্রিক যে ক্ষতি হচ্ছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া যাক: ১. নীতিনির্ধারকরা না থাকার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকরা যেমন না পড়িয়েই পার পেয়ে যান, শিক্ষার্থীরাও তেমনি শেখার কষ্ট করতে চান না। জ্ঞান বিতরণ ও অর্জনের প্রতি শিক্ষক-ছাত্র দুই পক্ষেরই মহা-অনীহা হওয়ায় মাঝখান থেকে পড়াশোনার বেজে গেছে বারোটা এবং উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি হাতে করে কাজ করতে অক্ষম লাখ লাখ ছেলেমেয়ে বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজের বোঝা হয়ে আজ; ২) এই অক্ষম তরুণসমাজকে দিয়ে কোনো কাজ না হওয়ায় দেশের ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের মালিকরা প্রতি বছর ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা—এসব দেশ থেকে লাখ লাখ লোক নিয়ে আসছেন কাজ করাতে। ফলে ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, বছর শেষে নিজেদের এবং দেশের কষ্টার্জিত প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ টাকা (প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা) চলে গেছে বিদেশে, বিশেষ করে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা থেকে নিয়ে আসা দক্ষ কর্মচারীদের বেতন হিসেবে; ৩) এরই মধ্যে দক্ষতার অভাবে কাজ পাওয়ার জন্য বা কর্মহীন হওয়ার ভয়ে আমদের যুবসমাজের মধ্যে অসৎ-অসাধু কাজে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে; ৪) উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে দেখে সব ধরনের উচ্চশিক্ষার প্রতি সমাজে অনীহার মনোভাব বাড়ছে এবং ৫) হতাশাগ্রস্ত তরুণসমাজে বিভিন্ন অসামাজিক এবং ক্ষতিকর (যেমন নেশা, আত্মহত্যা) অভ্যাসের প্রবণতা বাড়ছে।
আমাদের সনদসর্বস্ব শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান যে প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল গত মাসের ‘২০২০ গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স’ নামের একটি সমীক্ষায়—বিশ্বের ১৩৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। এই জরিপ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে—ছয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ #৬! অর্থাৎ আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যবহারে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের তুলনায় বেশিদূর এগোয়নি। এবং এটা যে একেবারে নতুন ঘটনা তাও নয়। বছরের পর বছর ঘটে যাচ্ছে একই ঘটনা। ২০১৯, ২০১৮, ২০১৭—এই বছরগুলোয়ও বাংলাদেশের অবস্থা ছিল প্রায় এই একই অবস্থানে। প্রতি বছর যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ঠিক করে জরিপের ফলাফল জানানো হয়, তখন আমাদের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়: এত খারাপ অবস্থা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার? আমাদের সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থাকে বহির্বিশ্বের হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে। এটা নিয়ে আমাদের গর্ব করার কিছু থাকে না। প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক মশিউল আলম ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তার ‘চাকরি নেই, না দক্ষ লোকের অভাব’ নিবন্ধে জানতে চেয়েছিলেন, আমাদের এই অবস্থার জন্য দায়ী কে: ‘পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি, রাষ্ট্র ব্যবস্থা?’ প্রশ্নটি আলংকারিক হলেও কথাটা জোর দিয়েই বলা দরকার: হ্যাঁ, আমাদের এই দুরবস্থার জন্য শুধু শিক্ষা ব্যবস্থাই নয়, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, এবং, সর্বোপরি আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো দায়ী।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যদিও আশাতীত রকমের উন্নতি হয়েছে গত দশকে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটি আগাগোড়াই এখনো রয়ে গেছে সমস্যায় জরাজীর্ণ। সাম্প্রতিক এই উন্নতির ক্রমবর্ধমান অবস্থা দেখতে হলে, সমাজকে আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে এখন আমাদের প্রাথমিক দায়িত্ব হতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঠিক করা।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়ম মেনে না চলার সম্ভাব্য কারণ:
১. এই সমস্যার প্রধান কারণ হলো আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তারা তাদের ব্যবসার প্রসারিত শাখা হিসেবে ব্যবহার করেন এবং এগুলোকে নিজেদের কব্জায় রাখতে চান। যুক্তিসংগত কারণেই মালিকরা এর আয়-ব্যয়ের ওপর নজর রাখতে চাইবেন, খরচ কমাবেন, অল্প বিনিয়োগে বেশি লাভের চেষ্টা করবেন ইত্যাদি। সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারদের সম্মানজনক বেতন এবং অল্প হলেও প্রশাসনিক দায়িত্ব দিতে হয়। তার চেয়ে বেশি বিপদ হলো, তারা যদি মালিকদের ইচ্ছেমতো কাজ না করতে চান তাহলে তাদের কাজ থেকে বরখাস্ত করার কোনো উপায় নেই। ফলে ট্রাস্টি বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট মালিকরা বিভিন্ন ধরনের তালবাহানা করেন, ইউজিসির নির্দেশ সত্ত্বেও নামের লিস্ট না পাঠিয়ে চুপচাপ বসে থাকেন, বেশি চাপাচাপি করলে অভিজ্ঞতা, শিক্ষা—এসবে কোনোভাবেই মনোনয়ন দিতে পারবে না এমন লোকদের লিস্ট পাঠিয়ে দেন। তখন সরকার বাধ্য হয়ে নতুন প্রার্থী চেয়ে পাঠায়! এসব করে এক যুগেরও বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছে এমন বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যাবে কয়েক ডজন;
২. ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার—এ পদগুলোয় ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো লাভজনক পদে থাকার নিয়ম না থাকলেও লোভনীয় পারিশ্রমিক ও সীমাহীন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার জন্যও মালিকপক্ষের নিজেদের লোকজনকে এই পদগুলোয় নিয়োগ করা হয়;
৩. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নানের মতে, দেশে এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় চলার মতো উপযুক্ত লোক পাওয়াও কঠিন। কথাটা প্রণিধানযোগ্য। এসব কাজ যারা করতে পারেন, তারা বিদেশে চলে যান। তার একটা কারণ হলো, সাধারণত এদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেয়া হয় না (এখানেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকদের হাত থাকে) বা বিদেশের পারিশ্রমিকের সঙ্গে দেশের বেতনের মিল হয় না। এছাড়া কাজের জায়গায় বিভিন্ন রকমের নোংরামি, স্থানীয় প্রতিযোগীদের সঙ্গে পেরে না ওঠা—এগুলোও সক্ষম লোক না পাওয়ার কারণ;
৪. এই পদগুলো পূরণ করার ব্যাপারে সরকারের যে নিয়ম, সেগুলো যেমন যুগোপযোগী নয়, তেমনি ঢিমেতালে চলা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাও এই অচলাবস্থার জন্য দায়ী। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই দুর্বলতার সুযোগ নেয়;
৫. বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ২০১০-এ শিক্ষা কমিশনকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে শুধু ‘মতামত’ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু কেউ আইন না মানলে তাকে বাধ্য করানোর অধিকার দেয়া হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সাধারণত এসব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সময়ক্ষেপণ করে;
এ সমস্যাগুলোর সমাধান সরকার চাইলে অনায়াসেই করা সম্ভব। যেমন
১. কোনো একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে (সেটা শিক্ষা কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় হোক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানই হোক) যথাযথ ক্ষমতা, লোকবল, অর্থ এবং অন্য সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক কাজের দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেয়া এবং ছাত্র-শিক্ষকদের সব রকমের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়ভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দেয়া; এবং এই প্রতিষ্ঠানের কাজ সুচারুভাবে হচ্ছে কিনা, কোনো রকমের অনিয়ম থেকে যাচ্ছে কিনা—এসব দেখার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় অথবা স্বশাসিত একটি কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া;
২. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যমে প্রার্থী অনুমোদনের ব্যাপারটিকে সহজ, দ্রুততর এবং একটি সীমিত সময়ের মধ্যে করার ব্যবস্থা নেয়া এবং
৩. নিয়ম না মানা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষামূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা, যাতে বাকিরা এ ধরনের কাজে উৎসাহ না পায়।
গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোর উন্নতি হয়েছে আশাতীত রকমের এবং আশা করা যাচ্ছে বাংলাদেশ কয়েক বছরের মধ্যেই একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এই শুভ সময়ের সন্ধিক্ষণে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত মানের করতে হবে, বিশেষ করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্মানজনক পর্যায়ে পৌঁছতে হবে। এই কাজটির সুফল হবে বহুমাত্রিক: ১) আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি দীর্ঘস্থায়ী হবে; ২) আমাদের সমাজ একটি বাসযোগ্য অবস্থানে পৌঁছবে; ৩) যারা এই কাজ করবেন, কৃতজ্ঞ জাতি বারবার তাদের দেশ চালানোর অধিকার দেবে এবং সব শেষে ৪) আমরা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্নপূরণের সম্ভাবনা দেখতে পাব।
হালিমুর রশিদ খান: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক শিক্ষানীতি
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র
সাবেক ডিরেক্টর, প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়










