শিক্ষা জীবনে বদরুদ্দীন উমর মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ না থাকায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৭ সালে দর্শনের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। শিক্ষক হিসেবেও তিনি শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত অবস্থানে ছিলেন। তাকে ঘিরে অনেক স্মৃতি রয়েছে। তার মধ্যে একটা হলো বদরুদ্দীন উমরের লেখার সঙ্গে পরিচয়ের সময়টা। তখন ষাটের দশক। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হতো ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকা। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। সেই সময় এ পত্রিকায় তার একাধিক লেখা প্রকাশিত হয়। সেই লেখাগুলোর জন্যই তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক হিসেবে সবার মনে স্থান করে নেন। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন, আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেই তিনি পরম সত্য কথা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে লিখেছেন। সাম্প্রদায়িকতা, সংস্কৃতির সংকট বইগুলো ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। তৎকালীন সরকার এ বইগুলোর প্রকাশককে পাকিস্তান দণ্ডবিধি অনুসারে শোকজের নোটিসও দিয়েছিল। সেই সময়ের প্রতিটি লেখা, বিশেষ করে তরুণদের কাছে একান্ত প্রিয় ছিল। তিনি পাকিস্তানের শাসন কাঠামোর ভেতর থেকেই পূর্ব বাংলা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলেছেন এবং সম্মানিত হয়েছেন।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকাকালীন পূর্বমেঘ পত্রিকায় প্রকাশিত বদরুদ্দীন উমরের প্রবন্ধগুলো পড়েছি। এছাড়া সেই সময় আরো অন্যান্য পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হয়েছে। পাকিস্তান আমলের শেষ পর্যায়ে তার লেখা এ দেশের তরুণ সমাজকে, এমনকি প্রবীণদেরও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। পাকিস্তানের আদর্শগত ভিত্তি তিনি খণ্ডন করেছেন। বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করেছেন। তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখা ও বক্তব্য আছে। যদিও বাস্তবে সেগুলোর সেভাবে প্রয়োগ হয়নি। তার সংগ্রামের ও কাজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে দেশবাসী অনেক বেশি উপকৃত হতে পারত। সময়ের ব্যবধানে তার ব্যাখ্যা আমাদের জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তার কাজগুলো বেশি সময় নিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
তৎকালীন সরকারের দিক থেকে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি থেকে অপসারিত করার চাপ ছিল। বদরুদ্দীন উমরও সেটি জানতেন। একসময় তিনি নিজেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কমরেড মণি সিংয়ের নেতৃত্বে থাকা কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বেরিয়ে যান বদরুদ্দীন উমর। তার সঙ্গে আরো সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোয়াহা, কমরেড আবদুল হক বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্র কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। এ পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে অনেকদিন তিনি কাজ করেছেন। কিন্তু পার্টির সঙ্গে তার মনঃক্ষুণ্নতা ঘটে। নানা ঘটনা পরিক্রমায় কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ভাঙন দেখা দেয়। তবু বদরুদ্দীন উমর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। পরবর্তী সময়ে তিনি ভিন্ন একটা পার্টি গড়ে তুলেছেন এবং সেটা এখনো আছে। কিন্তু ততদিনে তার চিন্তাধারাও অনেক বদলে গেছে। পৃথিবীজুড়েই তখন রাজনীতি সুস্থ ধারায় বিকশিত হচ্ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়নও ভেঙে যায়। এ বাস্তবতার মধ্যেও শেষ পর্যন্ত তিনি পরম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে কাজ করেছেন। ১৫-২০ বছর একান্তভাবে গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির গঠন বা কেন্দ্রীয় বক্তব্য কী হবে, কোন সময় কী বক্তব্য দিতে হবে, প্রচার-প্রচারণার কাজ করেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে কোনো কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠেনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালেও কমিউনিস্ট গ্রুপগুলো সাফল্যের দিকে যেতে পারেনি। বদরুদ্দীন উমর কয়েক বছর বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সংগঠিত করতেও চেষ্টা করেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সফল হননি। পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষ, তর্ক-বিতর্ক এগুলো বুঝতে চেষ্টা করেছেন। তার আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, চেষ্টা এগুলোর জন্যই তিনি শ্রদ্ধাযোগ্য। কমিউনিস্ট পার্টিতে বিপর্যয় দেখা দিলেও জনগণের জন্য ভালোবাসা, বিশেষ জনমানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা এগুলো তার চিন্তায় ছিল। তার লেখার মধ্যে এসব বিষয় উঠে এসেছে। তার আত্মত্যাগ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অন্যায়কারীদের দমন করতে হবে—এ ধারণা তার মধ্যে ছিল। শ্রেণী সংগ্রামের বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন। তার লেখা পড়ে বোঝার চেষ্টা করলে এবং বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের রাজনীতির ধারায় পরিবর্তন আসতে পারে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক: শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি










