কর ফাঁকি অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও একটি বড় সমস্যা। নানা পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও কর ফাঁকির প্রবণতা বন্ধ হচ্ছে না। এক্ষেত্রে আইনের যেমন দুর্বলতা রয়েছে, তেমনি আছে আইন প্রয়োগে প্রশাসনের উদাসীনতা। কর ফাঁকির কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর ক্ষতির পরিমাণ ২ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে সোমবার গবেষণা সংস্থা সিপিডি এক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে জানিয়েছে। এ উদ্বেগজনক তথ্যে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দৈন্য চিত্র ফুটে উঠেছে। ব্যক্তি বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান—যেই কর ফাঁকি দিক না কেন তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
কর প্রদানে মিথ্যা ঘোষণা অনেক দিন ধরে চলে আসছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় করের ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অনেক ব্যবসায়ী তাদের বিক্রয় ও লাভের পরিমাণ কম দেখায়। আবার আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণায় এবং ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শুধু তা-ই নয়, বিদেশে অর্থ পাচারের একটা বড় অংশ যায় আমদানি-রফতানি দ্রব্যমূল্যের ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। ব্যবসাভিত্তিক অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং ধরা পড়লে উচ্চহারে করারোপ ও জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাতেও এটি বন্ধ হচ্ছে না। কারণ আইনের প্রয়োগ স্বচ্ছ নয়। কাস্টমস আইন ও কর আইন সংশোধন ও যুগোপযোগী করার জন্য কয়েক বছর ধরে কাজ চলছে। বর্তমানে কাস্টমস আইন, আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগের ভেটিংয়ের জন্য পরীক্ষাধীন রয়েছে। নতুন কর আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। উভয় আইন বলবৎ হলে ব্যবসা, কর সংগ্রহ ও রাজস্ব প্রশাসনে সুশাসন ফিরে আসতে পারে।
সিপিডির গবেষণায় কর ক্ষতি হওয়ার জন্য বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো দুর্নীতি, জনবলের অভাব, কম ডিজিটালাইজেশন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় কম লেনদেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাতে শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে উপরে আছে বাংলাদেশ। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের কম। জিডিপির অনুপাতে করের পরিমাণ ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হলে বছরে আড়াই লাখ কোটি টাকা বাড়তি আয় করতে হবে। বাংলাদেশে কর এড়ানো ও কর ফাঁকির কারণে যে পরিমাণ কর ক্ষতি হয়, তা আদায় করা সম্ভব হলে কর-জিডিপি অনুপাত প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছে যেত। কর ফাঁকির পেছনে প্রশাসনিক অদক্ষতা বা দুর্নীতিই মূল বাধা। দুর্নীতি তো আইন সংস্কার করে কমানো বা বন্ধ করা যাবে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে অটোমেশন, কিন্তু অটোমেশন হলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে তা-ও না। ই-জিপি দেখলে সেটাই বোঝা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্নীতি বন্ধের চেষ্টা করতে হবে। করদাতা যে পরিমাণ টাকা দেন আর সরকারি কোষাগারে যে পরিমাণ টাকা জমা হয়—এ দুটোর মধ্যে বিরাট পার্থক্য।
গ্রাহক হয়রানি এড়াতে নব্বইয়ের দশকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমে অটোমেশন শুরু হয়। এজন্য একাধিক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কিন্তু ব্যক্তিশ্রেণীর টিআইএন নেয়া ছাড়া আর কোনো সেবা পান না করদাতারা। অনলাইনে রিটার্ন জমার সুযোগ তৈরির জন্য বিরাট খরচের একটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়। তবে ২০১৬ সালে চালুর চার বছর পর তা বন্ধ হয়ে যায়। সব ভ্যাট কমিশনারেটেও অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দেয়ার ব্যবস্থা করা যায়নি। শুল্ক কার্যক্রমও পুরোপুরি অটোমেশনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সামগ্রিক ডিজিটাইজেশনের ব্যাপারটি চলছে অনেকটা ঢিমেতালে। বৈশ্বিক পর্যায়ে করপোরেট ট্যাক্স হার কমে আসছে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে তা বেড়েছে। করপোরেট করহার কমিয়ে করজাল বাড়িয়ে ট্যাক্স আদায় করা দরকার।
করহার বাড়ানোর ফলে প্রচুর কালো টাকা থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে করপোরেট ট্যাক্সে রেট দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। কিন্তু ট্যাক্স জিডিপি রেশিও আফগানিস্তানের পর সর্বনিম্ন। পার্সোনাল ও সেলস ট্যাক্স কম নয়, কিন্তু সেটাও আদায় করা যাচ্ছে না। জনগণ উচ্চকরহার প্রদান করলেও তার সুফল ভোগ করতে পারছে না। কর কমিয়ে দিলে রাজস্ব বাড়ে, সেটারও নিশ্চয়তা নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় ট্যাক্স জিডিপি রেশিও এবং করহারের মধ্যে ব্যবধান বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, ৬৮ শতাংশ মানুষ করযোগ্য আয় করার পরও আয়কর দেন না। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর দেয়ার যোগ্য হওয়ার পরও কর দেয় না। বিপুল পরিমাণ কর আওতার বাইরে থেকে যাওয়া কর জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি না হওয়ার বড় কারণ। বাংলাদেশে আমদানি-রফতানির নামে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। আমদানির সময় কোনো পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে বাড়তি অর্থ পাচার করছেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী। আবার রফতানির সময় কোনো পণ্যের দাম কম দেখিয়ে অর্থ পাচার করছেন তারা। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, এর প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি-রফতানির মাধ্যমে হয়ে থাকে বলে তথ্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। এছাড়া বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য দেশে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কর প্রদানে জনগণের ‘ভয় ও দ্বিধা’ দূর করে সক্ষম করদাতা ও ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে কর প্রদানে আগ্রহী করে তুলতে হবে। সেজন্য কর কর্মকর্তাদের সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। কর অফিসে ‘হয়রানি’ দূর করতে হবে। রিটার্ন দাখিল ফর্ম ও জমাদান প্রক্রিয়াটি যথাসম্ভব সহজ করতে হবে। কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন সহজ, গ্রহণযোগ্য ও বাধ্যতামূলক করতে হবে। কর আইন এমনভাবে যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে ব্যবসা সহজ ও কর আদায় বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন ও বিধির স্পষ্টতা থাকলে আইন অমান্য করা কিংবা হয়রানির সুযোগ থাকবে না। রাজস্ব প্রশাসনে দক্ষতা আনয়নের জন্য দেশ-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের নীতি-নৈতিকতার প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। এনবিআরের অধীন কর এবং ভ্যাট ও কাস্টমস ক্যাডারের সম্প্রসারণ এবং কর ও শুল্ক অফিস সম্প্রসারণ করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে রাজস্ব উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। বন্দরের শুল্ক অফিসের আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং পর্যাপ্ত স্ক্যানার স্থাপন করে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সব ধরনের ফাঁকি ও অনিয়ম বন্ধ করে স্বচ্ছতা আনতে হবে। সর্বোপরি কম্পিউটারাইজেশন, ডিজিটালাইজেশন, আধুনিকায়ন, অটোমেশন যা-ই বলি না কেন এতে এনবিআর কর্মকর্তাদের শতভাগ সম্পৃক্ততা ও অংশীদারত্ব থাকতে হবে। এ ধরনের যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যাতে কর্মকর্তারা প্রক্রিয়াটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে পারেন সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিতে ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিভাগীয় কর্মকর্তারা কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অটোমেশনে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের বিশেষ মনোযোগী ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।










