খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী ২২ ডিসেম্বর সরকারি গুদামে চালের মজুদ দাঁডিয়েছে ৫ লাখ ৪৩ হাজার টনে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। সরকারি গুদামে চালের মজুদ তলানিতে ঠেকায় বাজারে সব ধরনের চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আমনের ভরা মৌসুমে সরকারি গুদামে চালের মজুদ তলানিতে পৌঁছার কারণ এবং অবস্থার উন্নতির জন্য সরকারের এখন কী করা উচিত, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

চলতি আমন কাটা-মাড়াইয়ের মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সাড়ে আট লাখ টন ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সিদ্ধান্ত হয় ২৬ টাকা কেজি দরে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে দুই লাখ টন ধান, চালকল মালিকদের কাছ থেকে ৩৭ টাকা কেজি দরে ছয় লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহের। ৭ নভেম্বর থেকে ধান ও ১৫ নভেম্বর থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হয়ে আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ সংগ্রহ অভিযান চলার কথা। যেসব বিষয় সরকারকে অনেক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহ এবং দাম নির্ধারণে প্রভাবিত করে আসছে, সেগুলো হলো: এক. ধান কাটা মৌসুমে ধানচাষীরা উৎসাহ মূল্য পান এবং অধিক পরিমাণে ধান উৎপাদনে উৎসাহী হন; দুই. সরকারি গুদামে পণ্যটির পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা; তিন. বাজারে চালের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে স্থিতিশীল রাখা এবং বাজারে চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে গেলে সরকারি মজুদ থেকে খোলাবাজারে (ওএমএস) ও ন্যায্যমূল্যের দোকানে চাল বিক্রির মাধ্যমে দাম স্থিতিশীল রাখা; চার. সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় সরবরাহ অব্যাহত রাখা; পাঁচ. সরকারের লক্ষ্যমুখী খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা; ছয়. কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদন ও চালকল মালিক পর্যায়ে চাল তৈরির খরচ বিবেচনায় নিয়ে সংগ্রহ মূল্যনির্ধারণ করা।

নির্ধারিত দামে সরকারের কাছ ধান বিক্রিতে কৃষকদের অনাগ্রহ এবং নির্ধারিত দামে চাল সরবরাহে চালকল মালিকদের অসহযোগিতায় সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সাফল্য অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজারে ধানের দাম বেশি হওয়ায় ধানচাষীরা সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে আগ্রহী নন। গত বোরো মৌসুমেও একই অবস্থা হয়েছিল। ধানচাষীদের কাছ থেকে আট লাখ টন বোরো ধানের বিপরীতে সংগ্রহের পরিমাণ ছিল কমবেশি দুই লাখ টন। আর সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় লাখ টনের কিছুটা বেশি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে দুই লাখ টন ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত ধানের পরিমাণ মাত্র ২৬৯ টন। আর সাড়ে ছয় লাখ টন চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ওই তারিখ পর্যন্ত সংগৃহীত চালের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৩ টনে। ১৯ ডিসেম্বর একটি দৈনিকের (যুগান্তর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে দাম বেশি হওয়ায় ধানচাষীরা নির্ধারিত মূল্যে সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে আগ্রহী নন। আর ধানের দাম বেশ হওয়ায় চালকল মালিকরা নির্ধারিত দামে সরকারকে চাল দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। চুক্তির সময় বাড়িয়েও মিল মালিকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পায়নি খাদ্য মন্ত্রণালয়। আর সাড়ে ছয় লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চালকল মালিকদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪০ হাজার টনের।

এদিকে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের (চাল, গম) মজুদ অনেকটা তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২২ ডিসেম্বর চাল মজুদের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৩ হাজার টন এবং গমের মজুদ ২ লাখ ৬ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। অথচ গত বছর এ সময়ে সরকারের গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ১৩ লাখ ৮৬ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ১০ লাখ ৫৪ হাজার এবং গম ৩ লাখ ৩২ হাজার টন।

সরকারি খাদ্যগুদামে চালের মজুদ বৃদ্ধিসহ বাজারে চালের দাম সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) ভার্চুয়াল সভায় চলতি অর্থবছরে তিন লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। অবশ্য এর আগে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রস্তাবে ‘প্রয়োজনীয় পরিমাণ’ চাল আমদানির অনুমতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি খাদ্য সচিব বলেছেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় চালের মজুদ বাড়ানোর জন্য সব ধরনের বিকল্প উপায় সচল রেখেছে। মন্ত্রণালয় অভ্যন্তরীণ ও আমদানি উভয় বাজার থেকে চাল সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এরই মধ্যে এক লাখ টন চাল আমদানির টেন্ডার হয়েছে। আরো এক লাখ টনের টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে (বণিক বার্তা, ১৭ ডিসেম্বর)।

সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে খোলাবাজারে ধানের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকদের সরকারি গুদামে চাল বিক্রিতে অনীহা কিংবা ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় চুক্তিবদ্ধ মিল মালিকদের সরকারকে চাল সরবরাহে অসহযোগিতা চাল আমদানির সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেললেও চাল আমদানির পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

এক. ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) চালের উৎপাদন হ্রাস এবং গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে চালের উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও অন্যান্য রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৬২ লাখ ৭৯ হাজার টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩ কোটি ৬৪ লাখ টন পূরণ হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, চালের উৎপাদন ৩ কোটি ৭০ লাখ টনে দাঁড়াবে। তবে গত ৮ নভেম্বর মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ৩ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে উপর্যুপরি বন্যা এবং নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চলতি অর্থবছরে আমন চালের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় বেশকিছুটা হ্রাস পাবে। তাছাড়া চলতি অর্থবছরে বোরোর উৎপাদন গত অর্থবছরের ১ কোটি ৯৪ লাখ টনের তুলনায় এক লাখ টন কমতে পারে। তবে আউশের উৎপাদন গত বছরের ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন থেকে বেড়ে ২৭ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। সাকল্যে গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছর চালের উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে সাড়ে পাঁচ লাখ টন। এদিকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দফা বন্যার কারণে গত অর্থবছরে উৎপাদিত ১ কোটি ৫৫ লাখ আমন চালের তুলনায় চলতি অর্থবছর আমন চালের উৎপাদন ১৫ লাখ টন কমে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮০ হাজার টনে দাঁড়াতে পারে (বণিক বার্তা, ২৩ ডিসেম্বর)।

দুই. বাজারে চালের দাম সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় ওএমএস পরিচালনার মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণ। সরকারি গুদামে চাল মজুদে স্বল্পতার সুযোগ নিয়ে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা বাড়াচ্ছে সব শ্রেণীর চালের দাম। কেজিপ্রতি মোটা চালের দাম ২০১৭ সালের ৫০ টাকা ছুঁই ছুঁই করছে, যা গরিব ও নিম্নবিত্তের মানুষের জীবনে দুর্ভোগ বয়ে এনেছে।

তিন. বৈশ্বিক করোনা প্রাদুর্ভাবের স্থায়িত্ব দীর্ঘায়িত হলে এবং প্রকোপ বাড়লে আন্তর্জাতিক চালের বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা। শীতের আগমনে ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। সেসব দেশে বেড়ে চলেছে করোনাভাইরাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। ইউরোপের কয়েকটি দেশে শুরু হয়েছে লকডাউন। করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়তে পারে। এতে বিশ্ব ও আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে। বিশ্ববাজারে চালের দাম ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বমুখী। রফতানিযোগ্য চালের মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সপ্তাহে ভিয়েতনামের বাজারে রফতানিযোগ্য চালের দাম বেড়ে নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। থাইল্যান্ডে রফতানিযোগ্য চাল গত প্রায় চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারতে রফতানিযোগ্য চালের দাম টনে সর্বোচ্চ ২ ডলার বেড়েছে (বণিক বার্তা, ১৯ ডিসেম্বর)। বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ চাল রফতানিকারক দেশগুলোয় আঘাত করলে এবং বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেন ভেঙে পড়লে আমাদের চাল সংগ্রহে সংকট সৃষ্টি হতে পারে। ফলে দেশে বর্তমানে উচ্চমূল্যে বিক্রি হওয়া চালের দাম আরো বেড়ে যাবে, যা নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বিশ্বে অতি গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। অন্য এক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে ২ কোটি ২৯ লাখ অতি গরিব মানুষ আছে।

চার. আগামী বছরে বিশ্বজোড়া দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলে সম্প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আগামী বছর (২০২১) চলতি বছরের চেয়ে খারাপ হবে। ২০২১ সালে হানা দেবে বিশ্বজোড়া দুর্ভিক্ষ।

উপর্যুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার চাল আমদানির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক ও সময়োপযোগী হয়েছে। তবে এখন সরকারকে আরো দু-একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছর দেশে চাল উৎপাদন সাড়ে পাঁচ লাখ টন হ্রাস পাওয়ার ইউএসডিএর পূর্বাভাস, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা, চলতি বছরে কমপক্ষে ২০ লাখ নতুন মুখের খাদ্যে ভাগ বসানো ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চাল আমদানির পরিমাণ ছয়-সাত লাখ টনে উন্নীত করা সমীচীন হবে। সরকারের পক্ষে একা এ পরিমাণ চাল আমদানি করায় অসুবিধা থাকলে বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে উৎসাহ জোগাতে চালের আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনা যেতে পারে। স্মর্তব্য, ২০১৭ সালে চাল সংকট সমাধানে বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে চালের আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

 

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল: সাবেক সচিব, কলাম লেখক