তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, বীর বিক্রম রচিত জীবনের জয়রথ: মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি ও জেল জীবন বইটি লেখকের Chariot of Life: Liberation War, Politics and Sojourn in Jail শীর্ষক বইটির বাংলা অনুবাদ। মোট চার অধ্যায়ে ৩৬৫ পৃষ্ঠার ঢাউস বই। আমাদের ইতিহাসের বিরল সব উপকরণের সঙ্গে ব্যক্তি, পরিবার ও পেশাগত জীবনের এক দারুণ মিশেল। একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধে লেখকের হিরন্ময় অভিজ্ঞতার নির্মোহ বর্ণনা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে এক-এগারো সরকারের আমলে কারাবাসের নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার উপাখ্যান। এটা এক ভিন্ন স্বাদের উপন্যাস। সাড়ে তিন দশকের বর্ণাঢ্য জীবন স্মৃতি ও জীবন্ত চরিত্র চিত্রণের এক নতুন হাইব্রিড ডকু ফিকশন। গোগ্রাসে পড়ে শেষ করা যায়। ঝকঝকে ছাপা। প্রচ্ছদও আকর্ষণীয়। চিন্তামগ্ন তৌফিক চৌধুরীর সপ্রতিভ অবয়ব প্রথমেই চোখে পড়ে।
বইয়ের সূচনা পর্বে সুখময় পারিবারিক পরিমণ্ডল ও তার সঙ্গে নগরের গৃহাঙ্গনে পাখ-পাখালি বৃক্ষরাজি পত্রপুষ্পের মিঠেল বর্ণনা। সেই সঙ্গে ‘প্রাঙ্গণে
মোর শিরীষ শাখে’ গানের কলিতে কবিগুরুকে টেনে আনা। গল্প বলার ঢঙটাই আলাদা। অবসর জীবনের শুরুতে অভ্যস্ত ছন্দের বিচ্যুতিকে
প্রাধান্য না দিয়ে কর্মকে বেছে নিয়েছেন তিনি। প্রকৃতির রঙ-রসের স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করেছেন। যেমন
জীবনের অভিজ্ঞতাকে ‘কুড়িয়ে পাওয়া মূল্যবান পাথরের
মতো’ তুলনা করে ‘যা দিয়ে আমার সিন্দুক ভরে উঠেছিল’ বলেছেন। দারুণ মেটাফোর, যার
ব্যবহারে লেখক বেশ দক্ষতা দেখিয়েছেন। ‘কাবা শরিফে অসুস্থ শিরীষ
গাছটির জন্য দোয়া করা’ আরেকটি মেটাফোর, যা কেবল প্রকৃতি প্রেম নয়, মানব জাতিসহ সমগ্র
প্রাণিজগতের প্রতি লেখকের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির নমুনা ফুটে উঠেছে। যেমনটি প্রকাশ পেয়েছে
প্রচণ্ড ঝড়ের রাতে বস্তির পান্তা বুড়ির কুঁড়েঘর ধসে পড়ার দুর্দশাকে
বর্ণনা করতে গিয়ে।
রাজনীতির আলোচনায় লেখক পরিমিতি বোধের প্রমাণ দিতে পেরেছেন। এক-এগারোর পূর্ববর্তী
সরকারের আমলে সামাজিক দ্বিধাবিভক্তি, আমলাতন্ত্র ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর দলীয়করণ, ‘লুণ্ঠনমূলক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ’ করা এবং দুর্নীতির বিস্তারকে এক-এগারো সরকারের
উত্থানের প্রেক্ষাপট হিসেবে যথার্থ চিহ্নিত করা হয়েছে।
একপর্যায়ে ওই সরকার কর্তৃক
গ্রেফতারের আলোচনা বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। অজানা
তথ্যসমৃদ্ধ। জানাশোনা প্রিয়জনদের সঙ্গে পত্রালাপের সংশ্লেষগুলো লেখকের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণকে
আরো সমৃদ্ধ করেছে।
জেলখানার ভেতরের পরিবেশ, খাওয়া-দাওয়া, ভিআইপি ও সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে সজ্জন ব্যবহার এবং
ইমারতের গাঘেঁষে বনবীথির নির্জনতার ফাঁকে ফাঁকে সূর্য-তারা ও আলো-আঁধারির প্রাঞ্জল বর্ণনায় যে কেউ মনের অজান্তে জেলখানায় ঢুকে যেতে পারেন। গল্পের গতি ধরে রাখতে
জেলখানার সহবন্দি নিখিল ও জাফরকে
শ্রোতা চরিত্রে দাঁড় করিয়েছেন। আলাপচারিতার ঢঙে পুন্ড্রবর্ধন,
মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, মোগল, বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান, চাণক্যের ‘অর্থশাস্ত্র’, আলেকজান্ডার, আশোক ইত্যাদি চুম্বক উপাখ্যানের চৌকস বর্ণনা অনায়াসেই
পাঠককে টেনে নেয় আমাদের ইতিহাসের গভীর থেকে গভীরে। এখানেই লেখকের নতুন আঙ্গিকে গল্প
বলার মুন্সিয়ানা। তার বিরুদ্ধে করা মামলার অসারতা বোঝাতে তিনি শেক্সপিয়ারের হেমলেট থেকে
উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘Something
is rotten in the state of Denmark’ (কোথায়
যেন পচন ধরেছে)। একদিন মেঘে ঢাকা সূর্যকে দেখে লেখক বলছেন, ‘যেন ঘোমটা দিয়ে লোভাতুর
দৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য একটা হিজাব’। জ্বলন্ত সত্যকে ঢাকা দেয়ার সাময়িক অপচেষ্টা
বোঝাতে আরেকটি লাগসই মেটাফোর, যা পাঠককে বিষয়ের অন্তর্নিহিত সত্য উদ্ঘাটনে সাহায্য
করে।
বইটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে লেখকের সক্রিয়
অংশগ্রহণ ও তার আগে-পরের বিস্তারিত বর্ণনা বিধৃত
হয়েছে। কীভাবে লেখক বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের
ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে মেহেরপুরের এসডিও পদ বর্জন করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান
করলেন, কীভাবে সরকারি কোষাগার থেকে ট্রাংক ভর্তি টাকা ও অস্ত্রশস্ত্রসহ সীমান্তের ওপারে চলে গেলেন এবং কীভাবে মেহেরপুর আম্রকাননে মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের
আয়োজনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন—এসবের চিত্তাকর্ষক
বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটের মতো। এছাড়া কী কায়দায় সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ ও যুদ্ধ
কৌশল ঠিক করে গ্রামগঞ্জে খানাখন্দে জীবন বাজি রেখে গেরিলা যুদ্ধ করেছিলেন এবং দু-একবার
সম্মুখ যুদ্ধে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিলেন তার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতাও ফুটিয়ে তুলেছেন বইটিতে। এমনকি বেসামরিক
ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার নির্ভীক কথোপকথন ও রণকৌশল বিষয়ে
মতান্তরেরও উল্লেখ করেছেন।
লেখকের কারাজীবনের বেদনার্ত ঘটনার বহুমাত্রিক বর্ণনার মধ্যে
রয়েছে জেলখানায় আপনজনদের সঙ্গে কড়া পাহারায় ঘড়ি মাপা সাক্ষাৎ, নির্জন প্রকোষ্ঠে একাকীত্বের
যন্ত্রণা, জামিন হয়েও পরক্ষণেই তা অদৃশ্য হাতের ঈশারায় বাতিল হওয়া—এসব ইতিবৃত্তের বর্ণনা। হাজিরার দিন আদালতে আসা-যাওয়ার পথে দুপাশে উৎসুক মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি, প্রিজন ভ্যানের ক্ষুদ্র অলিন্দ গলে বাইরের পৃথিবীর
আলো-বাতাসের স্বাদ নেয়া—সব কিছুর অনবদ্য প্রকাশ রয়েছে গল্পের মসলায়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে একই মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে আসা সাবেক প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্ত কথোপকথন ও মতবিনিময়। তার মাঝে লেখক দেখেছেন একজন মমতাময়ী
সংবেদনশীল রমণী এবং একজন ধীর
ও সাহসী জননেত্রীকে। অনেক পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয়ও এসেছে তাদের আলাপনে। দেশের উন্নয়ন
ভাবনা, দারিদ্র্য ক্ষুধা নিবারণ, অর্থনীতি ও রাজনীতি, সোনার বাংলা গড়া ইত্যাদি অনেক
বিষয়েই জননেত্রীর ভাবনা ও আগ্রহের বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন বইয়ে, যা থেকে শেখ হাসিনার দেশ ও সমাজ বিনির্মাণ সম্পর্কে প্রাগ্রসর
চিন্তার আভাস পাওয়া যায়। দেশ-বিদেশে প্রকাশিত
অনেক সমসাময়িক বইয়ের তাৎপর্য তুলে ধরেছেন এবং গল্পের সংশ্লেষে এসব প্রকাশনার সঙ্গে
পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এটা এ বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ইতিকথায় লেখকের
তাক লাগানো উক্তি, ‘বাংলাদেশের নবযাত্রার পরিকল্পনা তৈরিতে মগ্ন থেকে শেখ হাসিনা তার
পীড়নকারীদেরও মুগ্ধ করেছেন’। শেখ হাসিনা ‘প্রগতি ও সমৃদ্ধিকে দেখেন অন্তর্নিহিত একটি
অ্যালগরিদমের মতো, যা নিচ থেকে
শক্তি সংগ্রহ করে’। লেখকের এ অ্যালগরিদম চিত্রকল্পটি
অনন্য, যা মনোযোগী পাঠককে আরো ভাবতে শেখাবে।
বইটি শেষ হয়েছে কারাগার থেকে মুক্তির আশা-নিরাশার দুলুনিতে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পাওয়ায় তার কৃতজ্ঞতার
সুরের সঙ্গে প্রচণ্ড আশাবাদের পরিচয় মেলে বইয়ের সর্বশেষ উক্তিতে, ‘কোনো ভালো কাজের
শেষ নেই’। ‘জীবনের জয়রথ’ শিরোনামটিও চমৎকার।
বইয়ের সার্থকতা থাকে পাঠক হৃদয়ে তা কতটা অতৃপ্তি সৃষ্টি করতে
পেরেছে। এ বইয়েও অতৃপ্তি সৃষ্টি হয় যখন লেখক গল্প বলার মধ্যে প্রধানত কেবল ইতিহাস ও
দর্শনকে টেনে এনেছেন নানা আঙ্গিকে। সত্য যে গল্পের শৃঙ্খলার স্বার্থে তিনি সীমাবদ্ধ থাকতে চেয়েছেন রণাঙ্গন, জেলজীবন
আড্ডা, আদালতে আসা-যাওয়া, শীর্ষ নেতৃত্বের সান্নিধ্য ও কথোপকথনের মাঝে। তবুও গল্পের চিত্রপট পরিস্ফুটনে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ আরো শিক্ষণীয় নিজস্ব
কিছু আলাপচারিতার বর্ণনা দিতে পারতেন বলে অতৃপ্তি রয়ে যায়।
এম. এ. সাত্তার মন্ডল: ইমেরিটাস প্রফেসর ও সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।










