২০২১-২২ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির আমলনামার মূল দিকগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে অর্থনীতি একটা সংকটের গিরিখাতে পতনের কিনারায় উপনীত হয়েছে। আগামী বছরগুলোয় যদি সরকার যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয় তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ওই পতন থেকে রক্ষা পাবে না। জাতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের ৪ জুলাই ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত আমলনামার এ মূল গতি-প্রকৃতিগুলো উল্লেখ করা যাক:

বাংলাদেশের রফতানি আয় ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২০-২১ অর্থ বছরের ৩৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের রফতানি আয় ৪০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছার পর করোনাভাইরাস মহামারীর আঘাতে ২০১৯-২০ অর্থবছর তা ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে রফতানি আয় আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। সেখান থেকে ১ বছরে তা ৫২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পাওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়, কারণ বছরের শুরুতে ২০২১-২২ অর্থবছরের রফতানি আয়ের লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে লক্ষ্য ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ অতিক্রম করা বড় ধরনের সাফল্য।

২০২১-২২ অর্থবছরের ৫২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল ৪২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার, যা আয়ের ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশ। গত ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে নিটওয়্যার রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। ওভেন-গার্মেন্টস রফতানি আয় ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তৈরি পোশাক খাতের এ চমত্কার প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনগুলোয়ও দেশের রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি চলমান থাকবে।

২০২১-২২ অর্থবছরের রফতানি আয়ের যে দিকটি উল্লেখযোগ্য তা হলো এবার তৈরি পোশাক ছাড়া আরো চারটি খাতের রফতানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলস্টোন অতিক্রম করেছে। হোম টেক্সটাইল রফতানি ১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি ১ দশমিক ২৪ ডলার অতিক্রম করেছে, কৃষিজাত পণ্য রফতানি আয় হয়েছে ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার, আর পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা কমলেও ওই খাত থেকে রফতানি আয় ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এর পাশাপাশি কম্পিউটার সেবা খাতের রফতানি আয়ও এবার ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর মানে, রফতানি পণ্যের বহুধাকরণে (ডাইভারসিফিকেশন) এবার বেশ কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা খুবই প্রয়োজন ছিল।

২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গত ২০২০-২১ অর্থবছরের ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৫ শতাংশ কমে ২১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ এ বছর হুন্ডি প্রক্রিয়ায় রেমিট্যান্স প্রেরণ আবার চাঙ্গা হয়েছে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হওয়ার পর চাহিদা এবং সরবরাহ উভয় দিক থেকে হুন্ডি ব্যবসা অনেকখানি গুটিয়ে গিয়েছিল, যার সুফল হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমর্থ হয়েছিল। এ প্রবৃদ্ধির কারণেই ওই দুই অর্থবছরে বাংলাদেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্টে বড়সড় উদ্বৃত্ত হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বেড়ে ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। তারপর থেকে আমদানি ব্যয়ের ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে রিজার্ভে পতনের ধারা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২২ সালের ১২ জুলাই কত দাঁড়িয়েছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী এ রিজার্ভ ৩৯ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ ঘোষণা গ্রহণযোগ্য মনে করে না। কারণ রফতানি উন্নয়ন তহবিল বা এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) নাম দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সরকারের আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলারের ‘রিফাইন্যান্সিং স্কিমের’ অধীনে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের প্রভাবশালী রফতানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ দিয়েছে সেটাকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অন্তর্ভুক্ত না করতে বলেছে আইএমএফ। তার মানে, বাংলাদেশের প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩২ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।

২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয় ৩০ জুন শেষ পর্যন্ত কত দাঁড়াল তা সরকার এখনো প্রকাশ করেনি। কিন্তু ৪ জুলাই ২০২২ দ্য ডেইলি স্টারের খবরে জানা যাচ্ছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি ১৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাক্কলন করেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের দুঃসংবাদ। স্বাধীনতার ৫১ বছরে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্টে এত বড় ঘাটতি আর কখনই সৃষ্টি হয়নি। গত এপ্রিল থেকে আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্য সরকার নানা রকম ব্যবস্থা ঘোষণা করলেও সেগুলোর অভিঘাত এখনো নগণ্য সেটাই প্রমাণ করছে এ ঐতিহাসিক উচ্চতার ঘাটতি। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানির প্রবৃদ্ধির হার ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি হতে পারে। এতে রফতানির ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ব্যালান্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঘাটতি ১৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে। এ ঘাটতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে, চলমান ডলার সংকটকে আরো তীব্র করে তুলবে রিজার্ভের এ বিপজ্জনক পতন। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মুদ্রা টাকার বৈদেশিক মান প্রায় ১৬ শতাংশ অবচয়নের শিকার হয়েছে। এখন ১ ডলারের দাম ৯৮ টাকায় পৌঁছে গেছে। কার্ব মার্কেটে ১ ডলার কিনতে এখন ১০০-১০২ টাকা লাগছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন যে টালমাটাল অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সেটার জন্য দায়ী পাঁচটি প্রধান প্রক্রিয়া: ১) আমদানিতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধির আড়ালে ওভারইনভয়েসিং পদ্ধতিতে বিদেশে পুঁজি পাচার, ২) রফতানিতে ব্যাপক আন্ডারইনভয়েসিং পদ্ধতিতে পুঁজি পাচার, ৩) রফতানি আয় দেশে ফেরত না এনে ওই অর্থ দিয়ে বিদেশে ঘরবাড়ি-ব্যবসাপাতি কেনার হিড়িক, ৪) দেশের ব্যাংকঋণ নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীগুলো কর্তৃক হুন্ডিওয়ালাদের ঋণের টাকা প্রদানের মাধ্যমে এর সমপরিমাণ ডলার হুন্ডি প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার এবং ৫) সাম্প্রতিককালে চালু করা এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার। বর্তমান অর্থমন্ত্রী পুঁজি পাচারের এ ভয়াবহ বিষয়টিকে ‘সংকট’ হিসেবে স্বীকার করতেই নারাজ। সংসদে যেসব সদস্য পুঁজি পাচার সম্পর্কে অভিযোগ তুলেছেন তিনি তাদের বলেছেন পুঁজি পাচারকারীদের নাম-ঠিকানা তাকে সরবরাহ করার জন্য। পুঁজি পাচারের প্রধান প্রধান গন্তব্য কয়েকটি দেশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিম পাঠিয়ে পাচারকারীদের নাম-ঠিকানা কিংবা হালহকিকত সংগ্রহ করার কোনো ব্যবস্থা নিতে তিনি এখনো রাজি হচ্ছেন না! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও ইতালিতে আটটি তদন্ত টিম পাঠানো কিংবা গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ কি এতই ব্যয়বহুল যে সরকার সেটা এখনো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে নারাজ?

 শুধু নাম-ঠিকানা সংগ্রহ এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য হবে না। নিচে উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে: ১) পুঁজি পাচারকারীকে বিভিন্ন ব্যাংকের মালিকানা এবং পরিচালনা বোর্ড থেকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে; ২) অর্থ পাচারকারীকে ব্যাংকঋণ থেকে অবিলম্বে খারিজ করতে হবে; ৩) অর্থ পাচারকারীর কাছে যেসব ব্যাংকঋণ খেলাপি হিসেবে বছরের পর বছর আটকে আছে, সেগুলো আদায় করার জন্য অবিলম্বে ‘খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে; ৪) যেসব চাকরিরত আমলা, প্রকৌশলী, সামরিক অফিসার এবং কর্মকর্তার নাম-ঠিকানা পাচারকারী হিসেবে উদঘাটিত হবে তাদের অবিলম্বে বরখাস্ত করে চাকরি-পরবর্তী সব সুযোগ-সুবিধা বাতিল করতে হবে; ৫) যেসব রাজনীতিবিদের নাম পাওয়া যাবে তারা যদি সরকারে ক্ষমতাসীন দলের কেউ হন, তাদের পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার করতে হবে; ৬) যেসব রফতানিকারকের নাম উঠে আসবে, তাদের নামে খেলাপি ঋণ থাকলে সেগুলো আদায়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। উপরন্তু, তারা তাদের রফতানি আয় নিয়মিতভাবে দেশে ফেরত আনছেন কিনা, সেটা কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে হবে; ৭) যেসব আমদানিকারকের নাম পাওয়া যাবে তারা ওভারইনভয়েসিং করছেন কিনা, তা কঠোরভাবে পরখ করতে হবে; এবং ৮) যেসব পুঁজি পাচারকারীর নাম-ঠিকানা উদঘাটিত হবে সেগুলো সংসদে উত্থাপন এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে।

 পুঁজি পাচার বর্তমান পর্যায়ে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাজেটে অর্থমন্ত্রী পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য যে ‘টোটকা দাওয়াই’-এর প্রস্তাব করেছেন তা পুরো ব্যাপারটাকে লঘু করার প্রহসনমূলক পদক্ষেপ মাত্র, বছরের শেষে দেখা যাবে ফল শূন্য। সমস্যার সত্যিকার সমাধান চাইলে প্রথমে সরকারকে আন্তরিকভাবে সমস্যাটিকে স্বীকার করে নিতে হবে। আমার প্রস্তাবিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যা মোকাবেলার জন্য কার্যকর কিছু করতে চাইলে করণীয় কী হতে পারে, সেগুলোর দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সরকার ব্যাপারটি সমাধানে উদ্যোগী হবে কি?

 

ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ

অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়