আলু স্বল্পমেয়াদি হলেও বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দেশে এমন উপজেলা পাওয়া যাবে না যেখানে আলু চাষ হয় না। বিগত বছরগুলোয় অব্যাহত উৎপাদন সাফল্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ কোটি ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩৫ টন আলু উৎপাদন করে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম স্থানে আছে। এ সাফল্যের পেছনে কৃষকের নিরন্তর পরিশ্রম, সরকারের ইতিবাচক নীতিসহায়তা ও উৎপাদন অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। তবে রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে পেছনের দিকে। পাকিস্তান বাংলাদেশের তুলনায় মাত্র ৪০ শতাংশ আলু উৎপাদন করে। কিন্তু তাদের রফতানি অনেক বেশি। রফতানির দিক থেকে তাদের অবস্থান বিশ্বে দশম। কারণ তাদের আলুর জাত ভালো। রফতানিকারকরা বলছেন, বেশি উৎপাদন হলেও ভালো জাতের অভাব এবং উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে টিকতে পারছে না বাংলাদেশ। উৎপাদনে স্থায়িত্বশীলতা দিতে উৎপাদিত আলু দেশে ভোগের পাশাপাশি রফতানি সক্ষমতা বাড়ানো খুবই জরুরি। তবে বাংলাদেশ থেকে যথেষ্ট পরিমাণ আলু রফতানি হয় কিন্তু তা স্থিতিশীল বা ঊর্ধ্বমুখী নয়।
আলু রফতানিতে শীর্ষে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর। রফতানির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে মোট রফতানি হওয়া আলুর মাত্র দশমিক ৩১ শতাংশ রফতানি করতে পারে। বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে যে আলু রফতানি হয়, তার সিংহভাগের ভোক্তা রফতানীকৃত দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশী এবং একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসম্পন্ন দেশ, যেমন ভারত, নেপাল, মিয়ানমারসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের আলুর গুণাগুণ এসব দেশের আলুর গুণাগুণ ও মানুষের খাদ্যাভ্যাস প্রায় কাছাকাছি। বাংলাদেশের আলুর শীর্ষ আমদানিকারক মালয়েশিয়া (প্রায় ৮০ শতাংশ), সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। ইউরোপের দেশ রাশিয়া ও বেলারুশ সাম্প্রতিক সময়ে দুই বছর বাংলাদেশের আলু আমদানি করেছে। কিছু কারিগরি কারণে বর্তমানে তা বন্ধ আছে বা স্বল্প পরিসরে হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় আলু রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, শীর্ষে অবস্থানকারী দেশ চীনের সঙ্গে ব্যবধান ৩৮-৪০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে শেয়ার বাড়াতে পারলে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে যাবে এবং তা অসম্ভবও নয়। শ্রীলংকা বা সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশের বাজার কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিরূপণ করা দরকার। ইউরোপের বাজার কিন্তু এ দেশগুলোর মতো নয়; কারণ ইউরোপের ভোক্তার চাহিদা সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ সেসব দেশের আলুর গুণগত চাহিদা এশীয় দেশগুলোর মতো নয়। বিদেশে ভোক্তার শ্রেণীভেদ রয়েছে, এশীয় বা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল বিশেষ করে উষ্ণ ও অবোষ্ণ এলাকার ভোক্তার চাহিদা এবং শীতপ্রধান দেশের ভোক্তার চাহিদা ভিন্ন। তাদের কাছে আলুর নিজস্ব গুণগত মান এখানে বিবেচ্য বিষয়। শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষের আলুতে অবস্থিত এল এসপারজিন নামের যৌগটির প্রতি কেজি আলুতে ৭৫০ ন্যানোগ্রাম বেশি উপস্থিতি একটি নেতিবাচক চাহিদা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ থাকে খাদ্য পছন্দে, তা যথাযথ অনুসরণও করে এবং রাষ্ট্রও তা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের আলুর মূল ভোক্তা প্রবাসী বাংলাদেশী ও সমসংস্কৃতির দেশের প্রবাসীরা। এটাই বিদেশে বাংলাদেশী আলুর চাহিদা স্থিতিশীল করতে বড় শক্তি ও ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে রাশিয়াসহ লাতিন আমেরিকার কিছু দেশে আলুর চাহিদা রয়েছে সেগুলো পূরণে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো আলু প্রক্রিয়াজাত শিল্প যেমন চিপস ও চানাচুর তৈরি জোরদার করা উচিত। থাইল্যান্ড আলুর চিপস তৈরি ও তা রফতানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। বাংলাদেশেরও সে সুযোগ রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় আলু রফতানি বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর অধীনে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে বর্তমান রফতানি তিন বছরে দ্বিগুণ করার একটি রোডম্যাপও প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৮-১০ লাখ টন আলু রফতানি করে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। তবে আলু রফতানির প্রধান চাহিদাগুলো সর্বাগ্রে চিহ্নিত করা অতিজরুরি। আলু রফতানির অন্যতম বিবেচনা হলো এর জাত এবং অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য। আলু সতেজ ও সেমিপেরিসেবল কৃষিপণ্য, পরিবহনে তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল ৮-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সজীব থাকে দীর্ঘদিন, ফলে পণ্য পরিবহনে এয়ারকার্গোর চেয়ে সমুদ্রপথে শুধু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই রফতানি করা যায়। রফতানির সফলতা নির্ভর করে পণ্যের উৎপাদন স্থান থেকে কাঙ্ক্ষিত দেশে কম ব্যয়ে পৌঁছে দেয়ার ওপর। সেখানে আইনি বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়া সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্যাপ অনুসরণ করে চাষ করে তা প্রত্যায়িত করতে হয়। আলু রফতানিতে আমাদের প্রতিযোগী দেশও আছে। এগুলো হলো ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীন, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ইত্যাদি। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় গুণগত মান ও উন্নত জাত নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ থেকে আলু রফতানিতে কিছু বাধা এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। যেমন আলু রফতানির অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো আলুর শারীরবৃত্তীয় সমস্যা হলোহার্টের উপস্থিতি। রফতানিকারক সমিতি দাবি করছে বারি উদ্ভাবিত জাত ডায়মন্ড হলোহার্ট-প্রবণ। আলুর আকার বড় করা ও ফলন বাড়ানোর জন্য অনিয়ন্ত্রিত সেচ ও সার ব্যবহার এর প্রধান কারণ। বিবিএস সূত্রে জানা যায়, ডায়মন্ড জাতটি বাংলাদেশের মেগা ভ্যারাইটি, প্রায় সব ধরনের অংশীজনের কাছে চাহিদা আছে, জাতটি নিয়ে বারির বিভিন্ন বিজ্ঞানী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এমএস ও পিএইচডি করেছেন। কোনো উপাত্ত বা পাবলিকেশন পাওয়া যায়নি কিংবা মাঠ থেকেও বারিকে জানায়নি। ফলে কোনো বহুল প্রচলিত জাতকে কোনো বিশেষ অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল ঘোষণার আগে উপযুক্ত পদ্ধতিতে গবেষণা করে উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জনসমক্ষে বলা সমীচীন। তা না হলে একটি ভুল বার্তা ছড়াতে পারে, এতে আলুর সার্বিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে যেসব জাতের আলুর উৎপাদন হয় সেগুলো মূলত টেবিল পটেটো বা রান্নার জন্য। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের উপযোগী জাত উদ্ভাবন হয়নি। রাশিয়ার সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, এটি সম্ভাবনাময়। রাশিয়া অনেক আলু আমদানি করে। সেখানে রফতানি করতে পারলে বা তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারলে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত আলু নষ্ট হবে না। কারণ কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণের কারণে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। এসব দিকেও নজর দেয়া প্রয়োজন।
রফতানির ধারাবাহিক স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হলে একটি সংগঠিত সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ফসল উৎপাদনের কাজটি অবশ্যই চুক্তিবদ্ধ বা উদ্যোক্তা চাষীর মাধ্যমে করতে হবে, তা না হলে ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অনেক রফতানিকারক আছেন, যারা কনট্রাক্ট ফার্মিংয়ের বিপক্ষে, হয়তো তাদের এ সম্পর্কে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা আছে, তার পরও চুক্তিবদ্ধতার বিকল্প নেই। তাছাড়া উত্তম কৃষিচর্চার নিশ্চয়তা রফতানির জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, তার জন্যও চুক্তিবদ্ধতা দরকার। এটি বাস্তবায়নে সমবায়ভিত্তিক চাষ প্রবর্তন করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে জাপান বা কোরিয়ার এগ্রিকালচার মডেলটি বাংলাদেশে অনুসরণ করতে পারি, সে মডেলে চুক্তির লেনদেনের কাজটি ব্যাংক সম্পাদন করে, আর কৃষক তার পণ্য স্থিরীকৃত মূল্যে উৎপাদনের সময় কিছু অংশ অগ্রিম পান, মৌসুম শেষে পণ্যের দাম সরাসরি তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যায়। এতে সবাই লাভবান হন।
বাংলাদেশে কৃষির উন্নয়ন অভূতপূর্ব, প্রতি বছর কোনো না কোনো ফসল উৎপাদনে রেকর্ড করছে। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত। এ উদ্বৃত্ত পণ্য বিদেশে বিক্রয় করতে হবে। বিক্রি করার জন্য উপযুক্ত বাজার দরকার, যেখানে উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। বর্তমান বাজার মালয়েশিয়ায় প্রতিযোগিতা করে কীভাবে বাংলাদেশের শেয়ার বাড়ানো যায়, সংশ্লিষ্টদের সেদিকে নজর দেয়া দরকার। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব বাজারের বাংলাদেশের আলু বিক্রি করার সম্ভাবনা আছে, সেখানে রফতানির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। যেহেতু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সব আলু রফতানি হচ্ছে সেজন্য চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক প্যাক হাউজ স্থাপন করতে হবে, এতে রফতানিকারকরা সুবিধা বেশি পাবেন। এছাড়া বন্দরে আলু রফতানির ক্ষেত্রে জাহাজে কনটেইনার স্পেস অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে। অন্য বন্দর দিয়ে রফতানির জন্য বন্দরভিত্তিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে খুলনার বন্দরটিও সচল থাকবে। রফতানি বৃদ্ধির জন্য আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবর্তনের এখনই উপযুক্ত সময়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।










