ড. আনিসুজ্জামানের সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক পুরনো। বিশেষ করে আমার বড় ভাই আজিজ আহমেদের বন্ধু ছিলেন তার শ্যালক। এভাবে আনিসুজ্জামানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার সঙ্গে সরাসরি পরিচয় হয় ১৯৬৩ সালে। আমরা ভাইবোনেরা সবাই তাকে আনিস ভাই বলতাম। ১৯৬৩ সাল থেকে প্রায় সাত-আট বছর আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা নীলক্ষেতে ছিলাম। আমার পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। আনিস ভাই তখন বাংলা বিভাগের লেকচারার। আমাদের বাসভবন ও আনিসুজ্জামানের বাসভবনটি ছিল মুখোমুখি। বারান্দা থেকে দেখা যেত। তখন থেকে আমাদের সম্পর্ক মূলত ঘনিষ্ঠ হয়।

জ্ঞানতাপস তে বটেই, তিনি ছিলেন অত্যন্ত নির্লোভ, সংস্কৃতিমনা ও অনন্য ব্যক্তিত্ব। আমি বহু মানুষের সঙ্গে  মিশেছি, তিনি ছিলেন অনন্য। গত বছর গভর্নরের স্মৃতিকথা নামে আমার লেখা আত্মজীবনীমূলক পুস্তকটি প্রকাশিত হয়েছে, আমি সেখানে বিশেষভাবে যে কয়েকজন ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরেছি, তার মধ্যে ড. আনিসুজ্জামান অন্যতম। আমি তাকে বিরল ব্যক্তিত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেছি। আমিসহ আমার অন্য ভাইবোনদের জীবন গঠনে তিনি অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। আনিসুজ্জামান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, ভাষা আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

আমি কলেজ জীবন থেকে তাকে দেখেছি। ঢোলা পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরতেন। আবারো বলব, তিনি খুব নির্লোভ  ছিলেন। তার একটা ফক্সওয়াগন গাড়ি ছিল। তাতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করতেন। তার বাবার বাড়ি ছিল ঠাটারি বাজার। আর তার শ্বশুরবাড়ি ছিল স্বামীবাগে। যেহেতু তার শ্যালকের সঙ্গে আমার বড় ভাইয়ের বন্ধুত্ব ছিল, তাই তার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সঙ্গেই আমাদের জানাশোনাটা বেশি ছিল।

তার সহধর্মিণী সিদ্দিকা জামানকে আমরা কিন্তু ভাবী বলিনি, বুবু বলে ডাকি। আমাদের সম্পর্কটা এতই কাছের ছিল যে আমাদের ভাইবোনদের সবার কিন্তু একটা ডাকনাম আছে, আনিস ভাই আর বুবু আমাকে সবসময় আমার ডাকনামেই ডাকতেন।

আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হলাম, তখন ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় এসেছি। আনিস ভাইসহ অনেকেই আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আনিস ভাই আমার ডাকনাম ধরে সম্বোধন করে বলেন, ‘তুমি গভর্নর হয়েছো, অত্যন্ত খুশি হয়েছি। তোমার বুবুও অনেক খুশি হয়েছে।’ আমি আনিস ভাইয়ের কথায় ভীষণ উজ্জীবিত হলাম। সে সময় অনেকেই আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, কিন্তু আনিস ভাইয়ের কাছ থেকে অভিনন্দন পাওয়াটা আমার অনেক বড় পাওয়া।

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকার দিনগুলোয় দেখতাম সারাক্ষণ তিনি পড়াশোনায় নিমগ্ন থাকতেন। দোতলা ভবনটির বারান্দায় মাঝে মাঝে এসে দাঁড়াতেন। মাঝে মাঝে দেখতাম প্রফেসর আবদুর রাজ্জার সাহেবকেও। শীতের দিনগুলোয় গায়ে একটা সাদা চাদর জড়িয়ে তিনি আসতেন। আনিস ভাইয়ের বাসায় তারা দুজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করতেন। দুজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি আলাপ-আলোচনা করছেন, এটা আমি বুঝতে পারতাম।

আমি আনিস ভাইকে একদিন বললাম, রাজ্জাক সাহেব কম লিখেছেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘তিনি লিখতে চান না, লেখেন না, কিন্তু এমন কোনো তথ্য নেই, যা তিনি জানেন না। আমি ওনার কাছে কিছু জানতে চাইলে তিনি বলেন, আনিস তুমি ওই বইটা পড়ে দেখো কিংবা তুমি ওটা পড়েছ কিনা।’ শুধু আনিসুজ্জামানকে নয়, অন্যদেরও তিনি এটা বলতেন।

আনিস ভাইরা একবার দেশের বাইরে গেলে আমাদের কাছে বাসার চাবি রেখে যান। আমার বড় ভাই মাঝে মাঝে আমাদের তাদের বাসা দেখে আসতে বলেন। আমার মনে আছে, আমি শুধুই তার পড়ার ঘরে যেতাম, সেখানে প্রচুর বইপত্র। আমি মাঝে মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে বসে বই পড়তাম। একদিন দেখলাম ‘বাংলা সাহিত্যে  মুসলিম মানস’ নামে একটি লেখা। শিরোনামটি পড়ে আমি উৎসাহিত হয়েছিলাম। আমরা মীর মশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলামসহ অল্প কয়েকজন মুসলিম সাহিত্যিকের নাম শুনেছি শুধু, তিনি কিন্তু একেবারে আদ্যোপান্ত হিসাব করে বাংলা সাহিত্যে মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের অবদান নিয়ে সুন্দর একটা কাজ করেছেন।

তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা। সবার সঙ্গে সহজভাবে মিশে যেতেন। বস্তুজগৎ কিংবা পার্থিব বিষয়ে তার কোনো লোভ ছিল না। কারণ জাতীয় যে পর্যায়ে তিনি অধিষ্ঠিত হয়েছেন, ইচ্ছে করলে তিনি অনেক কিছু, গাড়ি-বাড়ি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। পার্থিব লোভ থেকে মুক্ত ছিলেন। এটা একটা বড় গুণ। আনিস ভাইকে বেশির ভাগ সময়ই ভাড়াবাড়িতে থাকতে দেখেছি। তার নিজস্ব বাড়িঘর আছে  কিনা, আমার জানা নেই।

তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে—রুচি, সূচি ও আনন্দ। রুচির কথা আমার মনে পড়ে বেশি, কারণ আমরা যখন নীলক্ষেতে থাকতাম, তখন ওর জন্ম।

আনিস ভাই তার ছেলে আনন্দের সঙ্গে থাকতেন। ছোট ছিমছাম একটা পরিবার। বুবুর ভাইবোন ও আনিস ভাইয়ের নিজের পরিবার সব মিলে অত্যন্ত সংস্কৃতি ও মুক্তমনা। অনেকেই তার নানা দিক নিয়ে লিখবেন, কিন্তু তার যে ব্যক্তিগত জীবন, তার যে সাংসারিক জীবন, তা যে অনেক সুন্দর ও স্বচ্ছ ছিল, সেটা আমি জোরগলায় বলতে চাইছি।

আমি বুবুকে টেলিফোন করে বলতাম, ‘আনিস ভাইকে এটা বলবেন।’ বুবু বলতেন, ‘এখন তিনি ফ্রি আছেন, তুমি তাকে ফোন দাও।’

১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত আমি বার্ডের মহাপরিচালক ছিলাম। আনিস ভাই মাঝেমধ্যেই সেখানে যেতেন। আনিস ভাইয়ের মতো সম্মানিত অতিথির জন্য ভিআইপি গেস্ট হাউজ বরাদ্দ থাকত। আনিস ভাই ওখানে থাকতেন। আমি কাজ শেষে সন্ধ্যাবেলা তার ওখানে যেতাম। আমি জিজ্ঞেস করতাম, আনিস ভাই, কী ব্যাপার, আপনি মাঝেমধ্যেই কুমিল্লা আসেন। তিনি বলতেন, দেখো, ঢাকায় আমি লেখালেখির সুযোগ পাই না, নানাজনের টেলিফোন। আমি কুমিল্লা এসে বার্ডের সুন্দর পরিবেশে লেখালেখি করি কিছুটা, যতটুক সময় পাই।

এমন নয় যে তিনি সবই বার্ডে গিয়ে লিখেছেন। ঢাকায় বসেও তিনি লিখতেন। তবে আমার বার্ডের কথাটা বিশেষ করে মনে আছে। আমার মনে হয়, সে সময় অনেকেই দেখেছেন তাকে কুমিল্লা একাডেমিতে গিয়ে পড়তে।

আনিস ভাইয়ের সঙ্গে আমার যখন কথা হতো, যোগাযোগ হতো, তখন কিন্তু সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের বেশি আলাপ হতো না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কথা হতো।

তত্কালীন পিজি হাসপাতাল বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ও আমার দুই বন্ধু আনিসুজ্জামানকে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি অসুস্থ হয়ে পিজিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন। কিছুদিন আগে শুনলাম তিনি আবার অসুস্থ। আমি প্রায়ই টেলিফোন করতাম, তার ছোট শ্যালক আমের ওহাবের সঙ্গে কথা বেশি হতো। তার মৃত্যুর আগের দিনও আমি তার শারীরিক অবস্থার কথা জানতে চাওয়ায় আমের ওহাব আমাকে জানালেন, হি ইজ সিংকিং। কথা বলতে পারছেন না।

আমি উত্তরে তাকে বললাম, আনিস ভাই ভালো হয়ে যাবেন, তিনি শোভন জীবনযাপন করতেন। কিছু কবি-সাহিত্যিক যেমন বেখেয়ালি জীবন যাপন করেন, তার মধ্যে এমনটা ছিল না। তিনি নিয়মানুবর্তী ও ছিমছাম জীবন যাপন করতেন।

তবুও তিনি চলে গেলেন। তার অনুপস্থিতি আমাদের সবসময় পীড়িত করবে। একবার তিনি আমাকে বললেন, লন্ডন মিউজিয়ামে এত কিছু আছে, আমাদের অনেক পণ্ডিতের ওখানে যাওয়া উচিত। কারণ পৃথিবীর অন্য জায়গায় সাহিত্য-শিল্পের এসব আর পাওয়া যাবে না। তিনি জ্ঞানপিপাসু ছিলেন। জ্ঞানতাপস ছিলেন। ছিলেন অত্যন্ত সংস্কৃতি ও মুক্তমনা। তার মধ্যে ধর্ম কিংবা কোনো জাতির প্রতি বিদ্বেষ ছিল না। তিনি ছিলেন খাঁটি সাদা মানুষ। আমরা অনেককেই খাঁটি মানুষ বলি। কিন্তু আমার মনে হয়, আনিস ভাই ছিলেন সাদা মানুষ।

আমরা তার শূন্যতা অনুভব করব। যারা তার সংস্পর্শে এসেছেন, তিনি যাদের শিখিয়েছেন, তার যারা শিক্ষার্থী ছিলেন, তারা সবাই তাকে মনে রাখবেন, তার উপদেশগুলো অনুসরণ করবেন। আমিও আনিস ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক পরামর্শ, অনেক উপদেশ পেয়েছি। পাশাপাশি অনেক উৎসাহ পেয়েছি। সেগুলো আমার মধ্যে চিরজাগ্রত থাকবে। আনিস ভাইয়ের আত্মা শান্তি লাভ করুক। তার শোকসন্তপ্ত পরিবার তাকে  হারানোর যে শোকে মুহ্যমান, আমরা সবাই সে শোকে সিক্ত। আনিস ভাই আমাদের কাছে চির অম্লান ও চিরজীবী হয়ে থাকবেন।

 

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক