অর্থনৈতিক নীতি বিতর্ক উসকে দিতে রেহমান সোবহান সিদ্ধহস্ত। রাজনীতিকদের প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা তার স্বভাব মজ্জাগত। সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকারের সুরক্ষাই হচ্ছে তার সব ধরনের সক্রিয়তার কেন্দ্রবিন্দু। অন্যায্যতার বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই উচ্চকণ্ঠের প্রতীক। তরুণ বয়সেই স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের নীতির বিরোধিতা করে তিনি তার প্রমাণ রেখেছিলেন। ১৯৫৭ সালের দিকে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জুনিয়র শিক্ষক। ষাটের দশকের রাজনীতিতে তখন নেমে এসেছিল স্বৈরশাসনের কালো থাবা। অধিকাংশ বাঙালি রাজনীতিবিদকেই জেলে বন্দি করা হয়। রেহমান সোবহান সে সময় ভরা মজলিসে পাকিস্তানের দুই অংশে বিরাজমান দুই অসম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা তোলেন, যেটা আইয়ুব খানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার নামান্তর। সে সময়ের অন্য অর্থনীতিবিদরাও এ নিয়ে আলোচনা করলেও রেহমান সোবহানের এই বক্তৃতা জাতীয়ভাবে প্রচার-প্রসার লাভ করে এবং রাজনীতিতে নতুন হাওয়া বইতে শুরু করে আস্তে আস্তে। বঙ্গবন্ধুসহ তত্কালীন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তৈরি হওয়া রসায়ন আর সাপ্তাহিক ‘ফোরাম’ সম্পাদনার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে তার ভূমিকা হয়ে ওঠে অনন্যসাধারণ। পাকিস্তান আমলের মতো বাংলাদেশেও রেহমান সোবহান নীতি বিতর্কে সরব আছেন। বাজার ব্যবস্থার নিষ্পেষণে সাধারণ মানুষ তখনকার মতো এখনো পিষ্ট। তবে পাকিস্তান আমলের মতো তার নীতি-সুপারিশগুলো বাংলাদেশ আমলের রাজনীতিবিদরা এখন আর আমলে নেন না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে অন্তত তিনটি বড় নীতি প্রণয়নের সঙ্গে রেহমান সোবহান সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সদস্য হিসেবে রেহমান সোবহান দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর যখন দেশে নতুন করে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন দেশের শীর্ষ চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে চার খণ্ডের টাস্কফোর্স প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে, যার নেতৃত্বে ছিলেন রেহমান সোবহান। মাত্র আট সপ্তাহের ব্যবধানে ১ হাজার ৫৬৩ পৃষ্ঠার এ খণ্ডগুলোয় বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপরেখা দারুণভাবে তুলে ধরা হয়। ২০০৬ সালে নাগরিক কমিটির উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ: রূপকল্প ২০২১’-এর আহ্বায়কও ছিলেন তিনি। তিনটি নীতিই প্রণীত হয়েছে বাংলাদেশ যখন বিশেষ সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুক্তি আর দেশজ প্রেক্ষাপটই ছিল এসব নীতির ভিত্তি ভূমি। বিদেশনির্ভর নীতি-কালচারের বিকল্প মডেল উপস্থাপনের সচেতন প্রচেষ্টা তিনটি নীতিতেই লক্ষণীয়।
যেকোনো প্রণীত নীতি বাস্তবায়নের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। একটি নীতি প্রণয়নে সুষ্ঠু প্রক্রিয়া অবলম্বন করা ও তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তা কীভাবে একটি রাষ্ট্রের চেহারা আমূল পাল্টে দিতে পারে তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে ইংল্যান্ডের বেভারেজ রিপোর্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে ব্রিটেন সরকার ১৯৪১ সালে দেশকে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের রংপুরে জন্মগ্রহণ করা ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও সমাজসংস্কারক উইলিয়াম বেভারেজকে (১৮৭৯-১৯৭৩) এ নিয়ে একটি নীতি কৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। তার প্রণীত রিপোর্টকেই বলা হয় বেভারেজ রিপোর্ট। একটি রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালে প্রণীত নীতি বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়া বোঝার মাধ্যমে আমরা রেহমান সোবহানের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রণীত নীতিগুলো বাস্তবায়নের বাধাগুলোও বুঝতে পারব। বেভারেজ রিপোর্টে দারিদ্র্য সীমারেখা অতিক্রমের জন্য রাষ্ট্রের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। রেহমান সোবহান এসব নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের অন্যায্য কাঠামো দূর করে সম্পদে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কথা বলেছেন সবসময়।
১৯৪২ সালে বেভারেজ রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার প্রথম বছরেই এর সংক্ষিপ্ত আর পরিপূর্ণ ভার্সন বিক্রি হয় ছয় লাখের বেশি। বেভারেজ নিজেও ব্রিটেনের বিভিন্ন জায়গায় মিটিং ও আলোচনা করেছেন। সে সময়ের এক জরিপে দেখা যায়, উত্তরদাতাদের মধ্যে ৯২ শতাংশ এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পরের দিনই এটি সম্পর্কে জেনেছেন। নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও গণবিতর্কের সংস্কৃতি বাংলাদেশে বিরল। রেহমান সোবহান প্রথম যে দুটি নীতি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখন বাংলাদেশে শিক্ষার হার, গণসচেতনতা ছিল অনুল্লেখযোগ্য। তবে ২০০৬ সালের ‘বাংলাদেশ: রূপকল্প ২০২১’ নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়া ছিল ব্যতিক্রম উদাহরণ। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের নাগরিক ডায়ালগ ও সংলাপের আয়োজন করা হয়েছিল। এসব আলোচনার ভিত্তিতে ২০০৭ সালে বাংলাদেশ কীভাবে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে, সেটার সম্মিলিত প্রস্তাব হিসেবে ‘রূপকল্প ২০২১’ প্রকাশিত হয়েছিল।
বেভারেজ তার রিপার্টের চূড়ান্ত সংস্করণে সামাজিক নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন সেবা, যেমন বয়স্ক ভাতা, বেকার ও অসুস্থ ভাতা, পারিবারিক ভাতা ইত্যাদির সুবিধার কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তী সময়ে সেটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্রিটেন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের আদর্শ মডেলে পরিণত হয়। রেহমান সোবহান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসারী। ৭ মার্চের ভাষণে অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক মুক্তি এবং চূড়ান্তভাবে মানবমুক্তির কথাই বলা হয়। রেহমান সোবহানও তার নীতিগুলোয় সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা তৈরি করেছিলেন, যেখানে গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত থাকবে, যা রাষ্ট্রকে একটি দরিদ্রবান্ধব মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত করবে।
বেভারেজ রিপোর্ট ১৯৪৩ সালে পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হয় এবং লেবার পার্টি এর পক্ষে সমর্থন জোগায়। অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টি এ নীতির ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। ধারণা করা হয়, এটি সমর্থনের ফলে লেবার পার্টি সেই নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত বিজয় পায়। কিন্তু বাংলাদেশে সংসদীয় ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি আশাব্যঞ্জক কিছু নয়। বিভিন্ন গবেষণায় রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে বাংলাদেশের সংসদের অকার্যকারিতা এবং বিরোধী দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কথা উঠে এসেছে। এমনকি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ নীতি ‘বাজেট’ আলোচনায়ও অর্ধেকের বেশি সংসদ সদস্য অংশগ্রহণ করেন না। এ রকম পরিস্থিতিতে যেকোনো নীতিই সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার স্বপ্ন বাতুলতা মাত্র। ১৯৯১ সালের টাস্কফোর্স অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন ও সেটি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর সে প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যায় তারা। ২০২১ রূপকল্প নাম অনুসৃত হলেও তার প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে এটা বোঝা যায় যে গুণগত দুর্বলতা নয়; জন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলিত কোনো নীতি-সুপারিশ বাংলাদেশে সফলভাবে বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।
নিঃসন্দেহে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিস্ময়জাগানিয়া। তবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্জনের কতটুক ভাগীদার সাধারণ মানুষ হতে পেরেছে, সে বিতর্ক এখনো অমীমাংসিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অনৈক্য প্রকট হলেও অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান অভিন্ন। উন্নয়নের নামে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের একাট্টা অবস্থান প্রকৃতপক্ষে মুষ্টিমেয় উপকারভোগীর হাত মজবুত করছে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিবকে আরো দুর্বল করছে। সেসব বিবেচনায় রেহমান সোবহানের নীতি-চিন্তা বাংলাদেশের জনগণের কাছে সম্পদের সুষম বণ্টন ও তাদের সম্ভাবনার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় যে স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেখেছিল, তা অধরা রয়ে যাবে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রেহমান সোবহান স্বপ্ন দেখা থামাননি। তাই তার নিরন্তর সংগ্রাম, সাধনা জারি রেখেছেন একটি ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের আকাঙ্ক্ষায়। তার স্বপ্নের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ুক রাষ্ট্রের পরতে পরতে, তার জন্মদিনে এই শুভকামনা। [মতামত লেখকের নিজস্ব]
আতাউর রহমান মারুফ: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে কর্মরত










