রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের, বিশেষ করে গমের দাম হু হু করে বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির লাগামহীন উচ্চমূল্যের প্রভাবে অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও ভীষণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। দেশের খাদ্যশস্যের তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকারী গমের আটা-ময়দার দাম মে মাসের শেষ সপ্তাহে ৪০-৬০ শতাংশ বেড়েছে। আটা-ময়দার দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করায় দেশে এখন চালের ব্যবহার বেড়ে যাবে। এখানে যে প্রশ্নটি উঠতে পারে তা হলো, চালের এ বাড়তি চাহিদা মেটানোর জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?

কৃষ্ণ সাগরীয় দেশগুলো হতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে খাদ্যশস্য বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেন বড় অংশ রফতানি করে। দেশ দুটি যৌথভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ গম রফতানি করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সেই সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে। ইউক্রেনের বন্দর থেকে জাহাজীকরণ বন্ধ হয়ে গেছে। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞায় দেশটি থেকে গম রফতানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে লাগামহীনভাবে বেড়েছে পণ্যটির দাম। এতে বিশেষ করে গমে আমদানিনির্ভর এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো পণ্যটির অতি উচ্চমূল্যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

দেশে খাদ্যশস্যের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গমের বার্ষিক চাহিদা যখন কম-বেশি ৭৫ লাখ টন, তখন দেশে উৎপাদিত গমের পরিমাণ কম-বেশি ১১-১২ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই দেশে গমের চাহিদা মেটানোর প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে আমদানি। বিশ্বের যে কয়টি দেশে সবচেয়ে দ্রুত হারে গমের আমদানি বাড়ছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশে গমের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পেছনের কারণগুলো হলো: জনসংখ্যা বৃদ্ধি, গম উৎপাদনে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হার, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের ফলে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত অর্থাৎ সব শ্রেণীর ভোক্তার খাদ্য তালিকায় গমের আটা-ময়দা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেয়া। কয়েক বছরে গম আমদানির তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে আমদানি করা গমের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫৬ লাখ ৯ হাজার, ৫৭ লাখ ৭৯ হাজার, ৫৫ লাখ ৩৬ হাজার ও ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার টন (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২১)। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৩ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন গম আমদানি হয়েছে বলে অন্য এক সূত্রে জানা যায়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২১ সূত্রে আরো জানা যায়, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৪৯৪, ১ হাজার ৪৩৬ এবং ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগেই আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দামে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়। যুদ্ধ শুরুর পর তা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের বাজারে নতুন করে বেড়েছে আটার দাম। দুই কেজি আটার প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ১০৮ টাকা থেকে ১১৫, যা আগের দামের চেয়ে ১২-১৭ টাকা বেশি। এ হিসাবে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ৬ থেকে সাড়ে ৮ টাকা। এতে পণ্যটির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

গমের সরবরাহ সংকট ও তুলনাহীন মূল্যবৃদ্ধিতে দেশে চালের ব্যবহার বাড়বে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞজনরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে (হায়েস)-২০১৬ মোতাবেক, দেশে জাতীয় পর্যায়ে মাথাপিছু দৈনিক গমের ব্যবহার ১৯ দশমিক ৮ গ্রাম। শহর ও গ্রামে পরিমাণ যথাক্রমে ২৬ ও ১৯ দশমিক ১ গ্রাম। অভিজ্ঞজনদের বক্তব্য হলো, আটা-ময়দার বর্তমান রেকর্ড ভঙ্গকারী উচ্চ দাম এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় পণ্যটির সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়া এবং ও দাম আরো বাড়ার সম্ভাবনায় ভোক্তারা গমের বদলে চালের দিকে ঝুঁকে পড়বেন।

এ অবস্থায় চালের সরবরাহ বাড়ানো যেতে পারে। এটা ঠিক, স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমাদের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। স্বাধীনতার সময়কালের কম-বেশি এক কোটি টন চালের উৎপাদন বর্তমানে সাড়ে তিন কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি (১ দশমিক ৩৭ শতাংশ), জনসংখ্যা বৃদ্ধি হারের তুলনায় চাল উৎপাদনে নিম্ন প্রবৃদ্ধি হার (২০১৭-১৮ অর্থবছর বাদ দিলে ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার ছিল নেতিবাচক থেকে ১ দশমিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত), বীজ হিসেবে সংরক্ষণ, পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার এবং কাটা-মাড়াই থেকে শুরু করে খাবার হিসেবে পরিবেশন পর্যন্ত অপচয় ইত্যাদি কারণে আমাদের উৎপাদিত চালে আমাদের চাহিদা মিটছে না। তাই আমাদের প্রায় প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চাল আমদানি করতে হচ্ছে।

আগেই বলা হয়েছে, আটা-ময়দার লাগামহীন উচ্চমূল্যের কারণে পণ্যটির ভোক্তারা চালের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। তাই বাজারে চালের সরবরাহ বৃদ্ধি ও দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে তাত্ক্ষণিক ও মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— এক. খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, চালকল মালিকরা চলতি বোরো মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে ধান কিনে মজুদ করলেও তারা তা চালে রূপান্তর করে বাজারে ছাড়ছেন না। তাছাড়া করপোরেট হাউজগুলো চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনে প্যাকেটজাত করে অনেক বেশি দামে বিক্রি করছে। খোলাবাজারে চালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় পণ্যটির দাম বাড়ছে। মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান শুরু করেছে। অভিযান জোরদার করা হলে খোলা বাজারে চালের সরবরাহ বাড়বে ও দাম কমে আসবে।

দুই.

চলতি বোরো মৌসুমে সরকার ৬ লাখ ৫০ হাজার টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা পূরণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। চলতি বোরো মৌসুমে যখন চালের উৎপাদন ২ কোটি ৭ লাখ টনের বেশি (যা ধানের আকারে কম-বেশি তিন কোটি টন) হবে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় আশা করছে, তখন ধান-চাল সংগ্রহের এ লক্ষ্যমাত্রা খুবই কম। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার বোরো ধান ও চাল সংগ্রহের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

তিন.

চালকল মালিকরা যেকোনো সময় কী পরিমাণ ধান-চাল তৈরির জন্য মজুদ রাখতে পারবে, সে সম্পর্কে ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫৬’, ‘অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদি নিয়ন্ত্রণ আদেশ, ১৯৮১’ এবং ‘দ্য ফুড গ্রেইন সাপ্লাই (প্রিভেনশন অব জুডিশিয়াল অ্যাকটিভিটি) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯’-এ সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা নেই। করপোরেট হাউজগুলো চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনে অধিক মূল্যে বিক্রি করতে পারবে না—এমন বিধান এসব আইনে নেই। মন্ত্রিপরিষদ ‘খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২২-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এটি বিল আকারে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে। উপর্যুক্ত বিষয়টি খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকলে সংসদে বিবেচনার সময় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

চার.

সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের জন্য চালকল মালিকদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরতা কমিয়ে আনা যায় কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। বিকল্প উপায় হিসেবে ২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্যনীতিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য কেনার বিধান রয়েছে। সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের জন্য চালকল মালিকদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে কিছু পরিমাণ চাল সংগ্রহ করা যায় কিনা তা ভেবে দেখা যেতে পারে।

পাঁচ.

আগামী ছয় মাসে দেশে চালের সম্ভাব্য মজুদ ও চাহিদা অবিলম্বে নির্ধারণের ব্যবস্থা নিতে হবে। চলতি মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় হাওরাঞ্চলে কম-বেশি ১০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এবং চলমান ঝড়-বৃষ্টির কারণে দেশের প্রায় সর্বত্র মাঠে পাকা বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কী পরিমাণ বোরো চালের উৎপাদন কমে যাবে, সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে। মজুদ ও চাহিদার পরিমাণ নির্ধারণের পর জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় চাল আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে। চালের আমদানি শুল্ক কমিয়ে বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে চাল রফতানিকারক দেশগুলো চালের রফতানি সাময়িকভাবে বন্ধ বা হ্রাস করতে পারে। সেক্ষেত্রে আরো উচ্চমূল্যে চাল আমদানি করতে হবে।

ছয়.

কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হার ঊর্ধ্বমুখী করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। বিবিএসের সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হার হবে ২ দশমিক ২০ শতাংশ, গত দশকে যা গড়ে ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ হার ছিল ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হার বাড়লে খাতটির প্রধান উপখাত শস্য উপখাতের প্রধান ফসল চালের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হারও বাড়বে। উল্লেখ্য, ভারত ও পাকিস্তানে হেক্টরপ্রতি চালের উৎপাদন বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

 

মো. আবদুল লতিফ মন্ডল: সাবেক খাদ্য সচিব