পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানির গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ও জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনতে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে এর বিস্ফোরণে ভয়াবহ দুর্ঘটনার হারও বাড়ছে। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার, সংযোজন, মাননিয়ন্ত্রণ ও পুরনো সিলিন্ডার রি-টেস্টিংয়ে সরকারি কিছু নিয়ম-নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা কেউই মানছে না। ক্রমেই যেন অরক্ষিত হয়ে উঠছে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল নিজ বাসগৃহটিও। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বছরে ১৮০০ এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪০ জন। সাধারণত একটি সিলিন্ডারের আয়ুষ্কাল ১৫ বছর। কিন্তু অভিযোগ আছে, ২৫-৩০ বছরের পুরনো সিলিন্ডারেও বিপণন হচ্ছে এলপিজি। মূলত মেয়াদোত্তীর্ণ এসব সিলিন্ডারে গ্যাস বিপণনের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা, ঘটছে হতাহতের ঘটনা। শুধু তা-ই নয়, অগ্নিদুর্ঘটনাও ঘটছে মানহীন, ঝুঁকিপূর্ণ এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে। এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার কেবল বাসাবাড়িতেই বাড়ছে না, যানবাহন, হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও এ অনিরাপদ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

এলপিজির নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সিলিন্ডারের উপযুক্ত মান নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে—এ অভিযোগও আছে। এ রকম সিলিন্ডার ব্যবহার আর সার্বক্ষণিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলা একই কথা। বর্তমানে এলপি গ্যাস বাজারের সিংহভাগের নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তি খাতের হাতে। এ খাতের বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস আমদানি করে সিলিন্ডারে ভর্তি করে বিপণন করছে। অনেক কোম্পানি সিলিন্ডারও তৈরি করছে, তবে চাহিদার তুলনায় তাদের জোগান এখনো কম। কোম্পানিগুলো সচেতন হলেও গ্যাসভর্তি এসব সিলিন্ডার বাজারে সরবরাহ এবং সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে রয়েছে গুরুতর অনিয়ম। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব সিলিন্ডার অনুমোদন ও ব্যবহারবিধি প্রচার করে বিস্ফোরক পরিদপ্তর। অথচ মুদি দোকান, মুরগির দোকান, এমনকি ফ্লেক্সিলোডের দোকান, কাপড়ের দোকানেও মিলছে রান্নার সিলিন্ডার গ্যাস। কোনো নিয়মনীতি না মেনেই চলছে এসব গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ক্ষমতাসম্পন্ন এ দাহ্য পদার্থের বোতল বাজারজাত করতে এখন লাগছে না বিস্ফোরক লাইসেন্স। যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই লাভের জন্য এ বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ বিক্রি করে চলছে। এতে বাড়ছে ঝুঁকি। এক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো দরকার। মানসম্মত, ঝুঁকিমুক্ত গ্যাস সিলিন্ডার আমদানির প্রতি অবশ্যই গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। সিলিন্ডারের মেয়াদ পর্যবেক্ষণ, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বদল ও ত্রুটিযুক্ত সিলিন্ডার বাতিলের পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে একটি শক্ত আইনি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। সরকার যখন রান্নার কাজে এলপিজি গ্যাসের বিস্তার বাড়াতে চাইছে, তখন এটি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। জরুরিভাবে সারা দেশে ত্রুটিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারগুলো চিহ্নিত করা দরকার। এজন্য ভোক্তাদের যেমন সচেতন করতে হবে, তেমনি সরকারিভাবে সিলিন্ডার টেস্ট ও বদলে নেয়ার সেবা চালু করা যেতে পারে। মানসম্পন্ন সিলিন্ডার তৈরিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এলপিজি সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঝুঁকি কমিয়ে আনতে সারা বিশ্বে প্রযুক্তিগত ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আবিষ্কার করা হয়েছে ব্লাস্ট প্রুফ সিলিন্ডার। এরই মধ্যে বড় একটি কোম্পানি এ প্রযুক্তির সিলিন্ডার উৎপাদন ও ব্যবহার করছে। বাকিদের ব্লাস্ট প্রুফ সিলিন্ডার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা প্রদান করতে পারে সরকার। সরকারি এলপিজি কোম্পানি সিলিন্ডার তৈরির নতুন একটি কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে যেন আধুনিক প্রযুক্তির সিলিন্ডার তৈরি করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি কোম্পানির কাছে এ প্রযুক্তি সহজলভ্য করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের মান বাড়াতে ও নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়াতে হবে। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বিধিমালা-২০০৪ (২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত) অনুযায়ী সিলিন্ডার নির্ধারিত মেয়াদের পরপর পরীক্ষা করার বিধান রয়েছে। তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর পরীক্ষার নিয়ম। বিধিমালার আওতায় গ্যাস সিলিন্ডারের আমদানি ও উৎপাদনের মান নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনকারীদের লাইসেন্সও দেয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত করে সংস্থাটি। দুর্ঘটনার দায় কিন্তু সংস্থাটির ওপরও বর্তায়। বাজারে ছাড়া প্রতিটি সিলিন্ডার পরীক্ষার জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের মনোনীত সংস্থা রয়েছে। তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

সরকারের বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি সিলিন্ডারের মেয়াদ ১০ থেকে ১৫ বছর। মেয়াদ শেষের পর সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। তাই মেয়াদ শেষ হলে সেগুলো বাতিল করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে কত বছর ধরে একটি সিলিন্ডার ব্যবহূত হচ্ছে, ব্যবহারকারীদের কাছে তার হিসাব থাকে না। যেসব গ্রাহক সিলিন্ডার ব্যবহার করেন কিংবা মাঠপর্যায়ে যারা ডিলার, তাদের অনেকেই সিলিন্ডারের ভালো-মন্দ বুঝতে পারেন না। এ অজ্ঞতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। আবার সিলিন্ডার ভালো থাকলেও নিম্নমানের রেগুলেটর ব্যবহার করা হলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। গ্যাসের চুলা ব্যবহারে সতর্কতা ও সচেতনতার অভাবে দুর্ঘটনা ঘটে। দেশে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাই এর নিরাপত্তার বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় সিলিন্ডার পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বটে, কিন্তু তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ১১ হাজার গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা করে সেগুলোর মধ্য থেকে আট হাজার গ্যাস সিলিন্ডার বাতিল করা হয়। অর্থাৎ বেশির ভাগ সিলিন্ডারই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডারের গুণগত মান নিশ্চিত এবং নিয়মিত পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপদে গ্যাস সিলিন্ডার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে এগুলোর ব্যবস্থাপনা করতে হয়, সেটা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। এলপিজি সেবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বাজারীকরণ ও মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে কোনো আইন বা নীতিমালা নেই। এক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দরকার। রেগুলেটরি অথরিটির মাধ্যমে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।