জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো। এরই মধ্যে অনেক দেশ ব্যবহৃত জ্বালানির ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে জোগান দিচ্ছে। বাংলাদেশে এক যুগে বিদ্যুৎ খাতে সাফল্য এলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সামান্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা অর্জিত হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, অর্জন করা গেছে তার এক-তৃতীয়াংশ। ফলে আর্থিক ক্ষতি বড় হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের নীতি-পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ হিসেবে সৌরবিদ্যুতের পরিচিতিই বেশি। এ সৌরবিদ্যুৎ ছড়িয়েছে প্রধানত গ্রাম, মফস্বল ও চরাঞ্চলে। সোলার সিস্টেমের ওয়াটপ্রতি দাম যখন ৪৫০ কিংবা ৫০০ টাকা ছিল, তখন থেকেই এটি ব্যবহারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সামাজিক গ্রহণযোগ্যতারই সাক্ষ্য দেয়। এর ফলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গেই বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের ব্যবহার শুরু হয়েছে। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম বিশ্বব্যাপী ৭২ শতাংশ কমে গেলেও বাংলাদেশে এ বিদ্যুৎ নীতিনির্ধারণী মহলে মূল ধারার ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। আর ঠিক এ কারণেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূর্বঘোষিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। অন্যদিকে প্রযুক্তি আর চিন্তার অভিনবত্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ দিনকে দিন পরিণত হচ্ছে, অতিক্রম করছে সব বাধা। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার জন্য এখন রয়েছে ভাসমান সৌরপ্রযুক্তি, কৃষিজমিতে ফলন আর সৌরবিদ্যুৎ একসঙ্গে করার জন্য ‘সোলার শেয়ারিং’ আর বিকেন্দ্রীভূত গ্রিড ব্যবস্থাপনার মতো সমাধান। অন্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সৌর কিংবা বায়ুবিদ্যুৎ করতে বিশাল এলাকা অধিগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। পতিত অকৃষিজমি, দখল হয়ে যাওয়া নদীর পাড় এবং বাড়ির ছাদের মতো স্থানে সোলার প্যানেল আর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী এবং অগভীর সমুদ্র এলাকা বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য খুবই উপযোগী। সেই সঙ্গে সৌর আর বায়ুবিদ্যুতের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য রয়েছে দাম কমতে থাকা ব্যাটারির সুবিধা। এভাবে শিল্প, কৃষি আর ব্যবসা-বাণিজ্যে এ বিদ্যুৎ ক্রমেই নিজের দখল বাড়াচ্ছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নবায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগিয়েই জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিচ্ছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যও পেয়েছে দেশটি। ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বেশ এগিয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মাত্র তিন বছরে ভারতে ১ লাখ ১০ হাজার সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প চালু হয়েছে। জার্মানিতে একক উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শীর্ষে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ নির্ভরশীলতা দিয়েই ওই বছর জার্মানি ইউরোপে শীর্ষ বিদ্যুৎ রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়। অন্যদিকে ভারতের চতুর্থ ব্যস্ততম কোচিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুরোটাই চলছে সৌরবিদ্যুতে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুবিধা মূলধারার অর্থনীতিতে আত্তীকরণ করতে দেশে দেশে ঘোষিত হচ্ছে নিত্যনতুন লক্ষ্যমাত্রা। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যেই ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ অজীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। আর জার্মানির ক্ষেত্রে এ লক্ষ্যমাত্রা ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। বিপরীতে ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ। এজন্য এ খাতে অর্থায়ন প্রয়োজন ২৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তবে এ খাতে বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ খাতের উন্নয়নের জন্য ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ৬ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন এসেছে।
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মহলের গবেষণাগুলোয় দেখানো হয়েছে, কোন উৎস থেকে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ কত টাকা বিনিয়োগে উৎপাদন সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যাচ্ছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকেই মেটানো সম্ভব; আর তাতে করে প্রতি বছর মাথাপিছু সাশ্রয় হবে ২ হাজার টাকা। কিন্তু এ সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সর্বব্যাপী উদ্যোগ আর রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। প্রচলিত কোম্পানিভিত্তিক মডেলে অধিক ব্যবসায়িক মুনাফার নিশ্চয়তা আসতে পারে, কিন্তু তাতে কখনই সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবে না। আর ঠিক এ কারণেই কমতে থাকা সৌরবিদ্যুতের কালে এসেও বাংলাদেশের কোথাও কোথাও গ্রাহককে ইউনিটপ্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। আর বর্তমানে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ১২ টাকা ইউনিটে বিদ্যুৎ কিনতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হচ্ছে, যার কারণে সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা সাধারণ মানুষ পাবে না। এমন নীতি বৈষম্য তৈরি করবে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের দেশে বিবিধ উদ্যোগ নেয়া হলেও অংশীজনদের মতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করা যায়নি। ঋণের সুদহার এখনো বেশি। আবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের বিনিয়োগ উঠে আসার সময়কাল অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে বেশি হলেও প্রায়ই আলাপ-আলোচনায় শোনা যায়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদি ঋণ দিতে উৎসাহী নয়। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বাংলাদেশে খুব ধীরে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রকল্পে সুবিধা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালে সুবজ প্রকল্পে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করে। এর আওতায় প্রথম দিকে সুদের হার বেশি ছিল, কিন্তু ধাপে ধাপে তা কমানো হয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময় সবুজ বিনিয়োগে প্রণোদনার অংশ হিসেবে, সুদের হার ৯ শতাংশের পরিবর্তে ৭-৮ শতাংশ এবং ঋণের মেয়াদ আট বছরের বেশি করার সুযোগ দেয়া হয়। জুলাই ২০২২-এ সুদের হার আরো একবার কমিয়ে ৫-৬ শতাংশ করা হয়। কাজেই বহুদিন যে সমস্যগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বিনিয়োগে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তা বহুলাংশে দূর হয়েছে বলা যায়। হয়তোবা সব অংশীজনের কাছে এ তথ্যগুলো এখনো পৌঁছেনি। এক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগ নিতে পারে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন ছাড়াও দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইডকল নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। উদ্যোক্তারা এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।
বড় প্রকল্প যেমন ৫০ মেগাওয়াট (পিক) বা তার বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন হলে কয়েকটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান একত্রে গোষ্ঠীবদ্ধ/সংঘবদ্ধ ঋণ দিতে পারে। বিভিন্ন খাতের বড় প্রকল্পে গোষ্ঠীবদ্ধ/সংঘবদ্ধ ঋণের অনেক সফল উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দেশে বাস্তবায়িত বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কাজের মানের ওপর ভিত্তি করে একটি তালিকা করতে পারে। সঙ্গে একটি রেটিংয়ের ব্যবস্থাও চালু করতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পর প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর রেটিং পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই দুরূহ হয়ে পড়ে। যে কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করার পরও অনেক প্রকল্প আলোর মুখ দেখে না। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বেশ কয়েকটি প্রকল্প ২০২২ সালে কিংবা ২০২৩-এর মাঝামাঝি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও সেগুলো এখনো পরিকল্পনাধীন। উপযুক্ত জমি না পাওয়া কিংবা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জমির যে মূল্য ধরা হয়েছিল পরবর্তী সময়ে তা অনেক বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে। এক্ষেত্রে সরকার জমি সংকুলানের দায়িত্ব নিলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে গতি আসবে বলা যায়। তবে সমীক্ষা করে দেখা যেতে পারে, কৃষি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কোন জায়গাগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা যায়। সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও আন্তঃসংযোগের দায়িত্ব সরকারি সংস্থা নিলে অনেক প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যাবে।
নিজস্ব উপায়ে সৌরবিদ্যুৎকে টেকসই করতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে সেচ কৃষির কাজটি যদি সোলারের মাধ্যমে করা যায় তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অনিশ্চয়তা হলেও তা কৃষির ওপর প্রভাব ফেলবে না। আর শহরাঞ্চলের জন্য করতে হবে নেট মিটারিং পদ্ধতি। এখন যেসব বিদ্যুৎচালিত বাহনগুলো গ্রামে চলে সেগুলো পুরোপুরো সৌরবিদ্যুতে নিয়ে গেলে চার্জ বাবদ মাসে বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে। এক্ষেত্রে সোলার যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমানো সময়ের দাবি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামী ১০ বছর কর রেয়াত সুবিধাসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিযোগিতা বাড়াতে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ আইন বাতিল করা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অকৃষিজ খাসজমি বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ও তহবিল গঠন করা যেতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে টেকসই বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিদ্যুতের ট্যারিফের ক্ষেত্রে যেন কোনো বৈষম্য না হয় সে নিশ্চয়তাও দিতে হবে।










