‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না, আমাকে মারবেন না’—ফ্লয়েডের এই আর্তনাদ শুনে মনে হলো করোনাই তার শ্বাসরোধ করছে, কারণ শ্বাস বন্ধ করেই করোনা তার কাজ শেষ করে। আসলে তা করোনা ছিল না, করোনার চেয়ে লাখো গুণ ভয়ংকর বর্ণবাদ ফ্লয়েডের ঘাড়ে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। তার ‘আমাকে মারবেন না, আমি মায়ের কাছে ফিরে যেতে চাই’—এই আকুতি কোনো কাজেই আসেনি। এই ফ্লয়েড একসময়ের বাস্কেটবল খেলোয়াড় হলেও মুখোশধারী মার্কিনি বর্ণবাদী সভ্যতার কাছে এর কোনো মূল্য নেই। কী তার অপরাধ? ফ্লয়েড নাকি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে একটি দোকানে কেনাকাটা শেষে ২০ মার্কিন ডলারের জাল নোট দিয়ে মূল্য পরিশোধ করেন। জাল নোট কি সে বানিয়েছে? খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে এই জাল নোট বানিয়েছে কোনো শ্বেতাঙ্গ পুঁজিবাদীরা। অথচ ঠুনকো অজুহাতে বুটের তলা দিয়ে ওর ঘাড় চেপে ধরা মানেই হলো, পাশ্চাত্য সভ্যতা যে গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের ফেরি করে চলছে তা একটা মুখোশ, বানোয়াট আর ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়।

আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য আর কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অবিচার, বৈষম্য, বঞ্চনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসায় আমাদের কাছে এটি হালকা মনে হতে পারে, কিন্তু সেই হালকা বিষয় যে কত ভারী, তা মার্কিন জনগণ দেশের প্রায় ৪০টি অঙ্গরাজ্যে বিক্ষোভ করে জানান দেয়। করোনাকালে করোনার আঘাতে আমেরিকার জনগণই সর্বাধিক মৃত্যুর শিকার, তবুও জনতা এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মাঠে নেমে যায়। পুলিশি দমন-পীড়ন আর কারফিউ জারি করেও জনতাকে ঘরে ফেরানো যায়নি। এর আগে ২০১৪ সালে মিসৌরির ফার্গুসন শহরে মাইকেল ব্রাউন, নিউইয়র্কে এরিক গার্নার, ২০১৫ সালে বাল্টিমোরে ফ্রেডি গ্রের মৃত্যুর পর একাধিক শহরে বিক্ষোভ হলেও এবারের মতো এত কঠিন ও ব্যাপক আকার ধারণ করেনি। অথচ সে সময় করোনার মতো মহামারী ছিল না, সামাজিক দূরত্বের বাধা ছিল না। এ থেকে বোঝাই যাচ্ছে মার্কিন জমানায় করোনার চেয়ে অধিক ভয়ংকর হলো মানুষের ওপর চেপে বসা নির্মম বর্ণবাদ। বর্ণবাদের অর্থনৈতিক রূপ বঞ্চনা, সামাজিক রূপ ঘৃণা ও স্টিগমা, আর রাজনৈতিক রূপ হলো ফ্যাসিবাদী দমন-নিপীড়ন। রাজনৈতিক নিপীড়নের আঁতুড়ঘর হলো বিচারালয় ও পুলিশি হেফাজতখানা। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যমতে, শ্বেতাঙ্গের চেয়ে তিন গুণ বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মারা যায় পুলিশের হেফাজতে। এর মানে বিচার ব্যবস্থা ও আইনি প্রয়োগ সেই বর্বর দশাতেই রয়েছে। এ কারণে লেভি স্ট্রস বলেছেন, আমরা যদিও আধুনিক, তবুও আমাদের মনে আমরা ধারণ করে চলছি বর্বর মন (savage mind)।

এতকাল ধরে এ সবই সহ্য করে আসছিল মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ। এবার যখন সরাসরি বর্ণবাদী চরিত্র নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসেন, তখনই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। ক্ষোভ আরো বেশি প্রকট হতে থাকে যখন জনগণ দেখল মার্কিন সরকার করোনার হাত থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি না নিয়ে পুঁজিবাদীদের স্বার্থকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। সেই ক্ষোভের মিশেলে মৃত্যুকে সাথী করে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ মাঠে নেমে যায়, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। যদিও আন্দোলন দমন করা গণতান্ত্রিক নৈতিকতাবিরোধী, তবুও পুলিশি দমন এমনভাবে চলছে যে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘চুপ থাকতে’ বলেছেন টেক্সাসের হিউস্টন শহরের পুলিশপ্রধান আর্ট আচেভেদো (সিএনএন)। কিন্তু পুলিশি দমন-নিপীড়নের তোয়াক্কা না করেই জনগণের আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। তোপের মুখে ট্রাম্পও বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকে।

এই রোষানলের তীব্রতা দেখে ট্রাম্প নিজেই সেনাবাহিনী নামানোর হুমকি দেয়, সঙ্গে সঙ্গে এও ঘোষণা করে ‘লুট শুরু হলে গুলি শুরু হবে’। এই হলো মার্কিন গণতন্ত্রের নমুনা আর ভোগবাদী সভ্যতার নৈতিকতা। হিটলার সেসময় উগ্র জাতীয়তাবাদের স্লোগান হাজির করে বর্ণবাদী যে ফ্যাসিবাদ জারি করেছিল, সেই বর্ণবাদী ফ্যাসিবাদ বিবর্তিত হয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে শক্তিশালী করে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ‘আমেরিকাই সেরা’—এ-জাতীয় জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে জনগণকে বোকা বানিয়ে জনগণের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে, সারা বিশ্বে লুটতরাজ করাটাই ওদের নীতি। চৌভিন যেভাবে ফ্লয়েডকে বুট দিয়ে চেপে মেরেছিল, মার্কিন সরকারও বিশ্বের দুর্বল দেশগুলোর ঘাড় চেপে সম্পদ লুটে নেয়। ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া এসব দেশে বুট চেপে লাখো মানুষ হত্যা করে জনগণের অধিকার হরণ করেছিল। মার্কিন সরকার ইসরায়েলকে দিয়ে ঘাড়ে হাঁটু গেড়ে এভাবেই হত্যা করছিল লাখো ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামীদের। ঘাড়ে হাঁটু গেড়ে হত্যা করতে চেয়েছিল ইরান, কিউবা, ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব।

এসব দেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের কাছে হেরে গেলেও এখনো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ হাঁটু গেড়ে মারার জন্য ওঁত পেতে আছে। সেই মার্কিন সরকার নিজ দেশের জনগণের যে বন্ধু, তা নয়। জাতীয়তাবাদের নাম দিয়ে ভোট নিলেও চারিত্রিকভাবে বর্ণবাদী। নিজ দেশে বর্ণবাদী চরিত্রের রাজনৈতিক দিক হলো, অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গ জনগণের আস্থা অর্জন, যেটাকে শাসকশ্রেণী ভোট ব্যাংক মনে করে। ভারতেও হিন্দুত্ববাদকে উসকে দিয়ে মুসলিমবিরোধী জিঘাংসার পেছনে একই কারণ জড়িত। এর মানে গণতন্ত্র নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থা। অধিকাংশের শাসন মানে গণতন্ত্র, সেই গণতন্ত্র নিজেই বর্ণবাদী ট্রাম্প, চৌভিনদের বুটের তলায় পিষ্ট হতে চলছে। আজকের বিশ্বে মার্কিন আনুগত্য মানে গণতন্ত্র, ইউরোপীয় সভ্যতা মানে শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ নয়, বরং মার্কিন একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদের কাছে নতজানুতা আর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতাই হলো পাশ্চাত্য সভ্যতার আসল রূপ। সেই রূপের ধরন প্রকাশ পায় বর্ণবাদী এমন আচরণে। অথচ আমরা পাশ্চাত্যের বাহ্যিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর ভোগবাদের উপাচার দেখে বিমুগ্ধ। কিন্তু ভোগবাদের এই মোড়কের ভেতরে যে বর্ণবাদ আর ফ্যাসিবাদের রক্তিম অস্তিত্ব আছে, তা মার্কিনিরা টের পেয়ে গেছে।

ফলে এই আন্দোলনকে শুধু বর্ণবাদবিরোধী না বলে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন বলা যেতে পারে।

‘লুট শুরু হলে গুলি শুরু হবে’—ট্রাম্পের এই কথায় ফ্যাসিবাদী চরিত্রের মুখোশ খুলে গেল। কেননা জাতীয়তাবাদের ট্রাম্পকার্ড খেলে জনগণকে ধোঁকা দেয়াই ছিল মার্কিন সরকারের আধিপত্যবাদী রাজনীতির কৌশল। এর মানে ডেমোক্রেসি, লিবার্টি, ফ্রিডম, হিউমিনিটি এসব মুখরোচক কথার ফুলঝুড়ি ছিল গণমানুষের অধিকার হরণের কুচক্রী কৌশল। নিটশের ভাষায়, জনগণ চায় ক্ষমতা। মার্ক্সের ভাষায়, জনগণ চায় পুঁজির শাসন থেকে মুক্তি, ফ্রয়েডের ভাষায় জনতা কামনার পূজারি হতে চায়। এর বিপরীতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ আর গণ আন্দোলন এই বার্তা জানিয়ে দিল যে জনগণ মুক্তি চায়, স্বাধীনতা চায়, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চায়, চায় ন্যায়বিচার, শান্তি ও নিরাপত্তা।

সে কারণে স্বাধীনচেতা জনগণের দাবি ক্ষমতা আরোহণ নয়, জনগণের ক্ষমতায়ন ও ক্ষমতার শিকল থেকে মুক্তি; কথিত সাম্য নয়, ন্যায়বিচার; বঞ্চনা নয়, অধিকার; মুখরোচক লিবার্টি নয়, নিরাপত্তা। কিন্তু সব দাবি নস্যাৎ হয়ে যায় বর্ণবাদের সামাজিক চরিত্র ও ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক চরিত্রের কারণে। কেননা বর্ণবাদ এমন এক অদ্ভুত রোগ, যা আদিকাল থেকে মানুষ লালন করে আসছে। ধর্মীয় পরিভাষায় ইবলিশ বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠত্বের বাহানায় মানুষকে সম্মান জানাতে রাজি হয়নি। সেই মানুষের হূদয়ে প্রোথিত হয় বর্ণবাদের বর্ণচোরা বীজ। অতঃপর কাবিল ফ্যাসিবাদী চরিত্র নিয়ে হাবিলকে হত্যা করে। সেই বর্ণবাদ আর ফ্যাসিবাদের আধুনিক রূপায়ণ মার্কিন গণতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু এ থেকে মুক্তির জন্য কি কোনো ভ্যাকসিন আমরা পেয়েছি? থমাস হবস ও অস্টিনের ভ্যাকসিন হলো ‘রাজার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা’, যেমনটা সৌদি আরবে দেখতে পাচ্ছি। জন লকের ভ্যাকসিন ‘গণতন্ত্র’, যেখানে শাসক ও শাসিত সার্বভৌমত্বকে ভাগ করে নেয়, যে চর্চা ইউরোপের কিছু দেশে দেখা যায়; রুশোর ভ্যাকসিন হলো ‘জনগণের পুরোপুরি সার্বভৌমত্ব’, যার বাস্তবায়ন পদ্ধতি অস্পষ্ট, কেননা পুঁজিবাদী কাঠামোতে জনগণের সাধারণ ইচ্ছার বিকৃতি ঘটে; মার্ক্সের ভ্যাকসিন হলো ‘ব্যক্তিমালিকানার উচ্ছেদ আর অর্থনৈতিক সাম্য’, কিন্তু ফ্যাসিবাদী চরিত্রটা থেকেই যায়; ফ্রয়েডের ভ্যাকসিন ‘ব্যক্তির কামনা-বাসনার মুক্ত চর্চা’, ফলে পুঁজিবাদী শিকলে বন্দি হয় মানুষ। হেবারমাসের ভ্যাকসিন হলো ‘পাবলিক স্ফেয়ার’, যেখানে মানুষ দমনহীন উন্মুুক্ত জ্ঞান বিতর্কের চর্চা করতে পারবে, কিন্তু অত্যাচারের বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ এখানে নিষ্প্রভ। নিটশের ভ্যাকসিন হলো সব প্রকার ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতা প্রত্যাখ্যান করে দুর্বিনীত অতিমানবীয় শাসন; যা ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে।

এভাবে হিসাব করলে আমরা দেখতে পারব পাশ্চাত্য ও পাশ্চাত্য অনুসারী বিশ্ব বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদের মোকাবেলা করতে তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও ব্যবহারিক ভ্যাকসিন সংকটে ভুগছে। করোনা আসছে নতুন করে, হয়তো চলে যাবে একদিন, ভ্যাকসিন আসবে কোনো একদিন। কিন্তু মানবসভ্যতার আদি থেকে সর্বত্র যে বর্ণবাদ আর ফ্যাসিবাদ চেপে বসে জনগণের সমাজকে নরক বানিয়ে রেখেছে, তা থেকে নিস্তারের জন্য ভ্যাকসিনের অনুসন্ধান জরুরি।

আমাদের দেখতে হবে সেই ভ্যাকসিন, যে ভ্যাকসিনে মানুষ নিজের চেয়ে গণমানুষের অধিকারকে অধিক গুরুত্ব দেবে; অভাবী-বঞ্চিত-নিগৃহীত-নিপীড়িত-অত্যচারিত জনগণের জন্য দায়িত্বশীলতা হবে উচ্চতর চেতনা, যে ভ্যাকসিনে অত্যাচারিত ক্ষমতাসীন হলেও ক্ষমতার প্রতি লালায়িত না হয়ে জনতার অধিকার থাকবে সমুন্নত; উচ্চতর মানবীয় গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হবে শাসক ও জনগণ; শাসক-জনগণে থাকবে না ক্ষমতার বিভাজন।

যতদিন আমরা সেই ভ্যাকসিন খুঁজে না পাব ততদিন জনগণকে দুর্দশাতেই কাটাতে হবে। বিজ্ঞানীরা খুঁজে পাবেন করোনার ভ্যাকসিন, কিন্তু মানবিক অধিকারের ভ্যাকসিন খুঁজে পেতে অতিবিজ্ঞানী অনুসন্ধান জরুরি।

 

আশেক মাহমুদ: সহকারী অধ্যাপক

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও

পিএইচডি ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব মালয়া

ashmahmud@gmail.com