ভারত যে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশে সবচেয়ে পুরনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তা নিয়ে গর্বের আমাদের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রত্যেকের বাক স্বাধীনতা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র আমাদের জন্য অনেক বাস্তবিক সুবিধাও নিশ্চিত করে। অবশ্য এখন যখন দেশ একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি ,তখন আমরা এর সদ্ব্যবহার করছি কিনা তা নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে পারি।
প্রথমে কিছুটা ইতিহাসে আলোকপাত করা যাক। ব্রিটিশ রাজের অবসান ঘটায় ভারতে নতুন প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র সোজাসুজিভাবে ভারত এর বাস্তবিক সুফল পাওয়া শুরু করে। দুর্ভিক্ষ— কর্তৃত্ববাদী ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসজুড়ে যা ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত হয়েছিল- একটি গণতান্ত্রিক ভারতের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দ্রুততর সময়ে থেমে গিয়েছিল। সর্বশেষ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ১৯৪৩ সালে। আমরা এটিকে তেতাল্লিশের মন্বন্তর বলি। একজন শিশু হিসেবে স্বাধীনতার ঠিক আগে এ দুর্ভিক্ষ প্রত্যক্ষ করেছি এবং এর কিছু বছর পরেই ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। এরপর থেকে ভারতে আর কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি এবং স্বাধীনতার প্রথম দিককার দশকগুলোয় একটি দুর্ভিক্ষ সংঘটনের হুমকি সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তা দৃঢ়ভাবে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছিল।
সেটি কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? গণতন্ত্র দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রম করতে সরকারকে খুব জোরালো প্রণোদনা দেয়। জন-আলোচনা এবং নির্বাচনের সম্মিলনের কারণে সরকারকে খুব দ্রুততার সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সাড়া দিতে হয়। অবশ্য নির্বাচন একাই কাজটি করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে, গণতন্ত্র কখনো শুধু মুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা হিসেবে বোধগম্য নয়; যা নিয়মিত বিরতিতে ঘটে, প্রায় একটি থেকে পরবর্তীটিতে বড় গ্যাপ দিয়ে, যা তাত্ক্ষণিক রাজনৈতিক প্রাসিঙ্গকতার উত্তেজনা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, যিনি ১৯৮২ ফকল্যান্ড যুদ্ধের আগের নির্বাচনগুলোয় খুব খারাপভাবে পিছিয়ে ছিলেন, যুদ্ধ থেকে বিপুল জনপ্রিয়তা পেলেন পেলেন এবং অনায়াসে ১৯৮৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন।
সংসদীয় ব্যবস্থায় সাধারণ নির্বাচন হলো প্রাথমিকভাবে সংসদের নিম্নকক্ষে সংখ্যাধিক্য আসন পাওয়া সম্পর্কিত। ভোটিং ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ বা অধিকার সম্বন্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক বিধি-নীতি নেই। এ বাস্তবতায় যদি সব মানুষকেই নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ অনুসারে ভোট দিতে হত, তাহলে একটি নির্বাচন দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা হত না; যেহেতু মানুষের একটি ক্ষুদ্র অংশকেই যেকোন দুর্ভিক্ষে না খেয়ে থাকতে হয়। তবে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং উন্মুক্ত জন-আলোচনা নাজুক দরিদ্রদের দুঃখ-দুর্দশা সামনে আনে এবং বৃহত্তর জনগণের কাছে বোধগম্য করে তোলে। ফলে এ ধরনের একটি বিপর্যয় ঘটা প্রতিরোধে সরকারের অবস্থানকে নাড়িয়ে দেয়। অবশ্য খোদ সরকার, যেহেতু এটি মানুষ এবং মানবিক সহমর্মিতা ও বোঝাপড়া সমর্থ দল দ্বারাও পরিচালিত হতে পারে, তথ্য এবং জন-আলোচনা থেকে উদ্ভূত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে যা জানা তা দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
এমনকি যদিও কেবল একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীই আসলে একটি দুর্ভিক্ষের বঞ্চনার সম্মুখীন হতে পারে, তবে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং জন-আলোচনা দ্বারা জ্ঞানলব্ধ একটি সংবেদনশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী সরকারকে দায়িত্বশীল (রেসপন্সিভ) করে তুলতে পারে। এটি ঘটতে পারে হয় সহমর্মিতার মাধ্যম (যখন সরকার পাত্তা দেয়), নতুবা নিষ্ক্রিয়তার কারণে সৃষ্ট বিরাগের মাধ্যমে (যখন সরকার আনকেয়ারিং থেকে যায়)। ‘আলোচনাভিত্তিক ব্যবস্থা’ হিসেবে গণতন্ত্র বিষয়ক জন স্টুয়ার্ট মিলের বিশ্লেষণ হুমকিতে থাকা দুর্ভিক্ষের ভুক্তভোগীদের উদ্ধারকর্তা চিহূিত করতে সাহায্য করে, বিশেষত স্বাধীন গণমাধ্যম এবং নিয়ন্ত্রণহীন আলোচনার বিষয় দুটিকে।
সামাজিক বিপর্যয়-দুর্যোগ মোকাবেলা যুদ্ধের লড়াইয়ের মতো নয়, যেটি সর্বোত্তম কাজ করে যখন একজন নেতা যেভাবে চায় সেভাবে সবাইকে শৃঙ্খলায় আনতে ওপর-নিচ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনো পরামর্শ প্রয়োজন হয় না। বিপরীতে, একটি সামাজিক দুর্যোগ মোকাবেলায় যা প্রয়োজন তা হলো অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা এবং সতর্ক জন আলোচনা। দুর্ভিক্ষের ভুক্তভোগীরা তুলনামূলক অধিক সচ্ছল জনগণ থেকে সামাজিকভাবে পৃথক হতে পারে এবং কাজেই বিভিন্ন সামাজিক দুর্যোগে অন্যরা ভুক্তভোগী হতে পারে, তবে জন আলোচনা শোনা নীতিনির্ধারকদের কী করা প্রয়োজন সে সম্পর্কে বোঝাপড়া তৈরি করে। নেপোলিয়ন শোনার চেয়ে নির্দেশ প্রদানে ( কমান্ডিং) অনেক বেশি ভালো হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু এটি তার সামরিক সফলতা ( বোধহয় তার রাশিয়া অভিযান ছাড়া) ব্যাহত করেনি। অবশ্য একটি সামাজিক দুর্যোগ মোকাবেলায় শোনাট একটি সদা-বিরাজমান একটি আবশ্যকতা।
এটি মহামারী সৃষ্ট বিপর্যয়ের বেলায়ও খাটে, যেখানে কিছু মানুষের ( অধিকতর সচ্ছল) শুধু রোগের সংক্রমণ থেকে বাঁচা নিয়ে চিন্তা করলে চলে; অন্যদিকে অন্যদের নিজেদের আয়-উপার্জন ( যা রোগ বা লকডাউনের মতো রোগবিরোধী নীতি দ্বারা হুমকিতে পড়তে পারে) নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় এবং অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বাড়ি থেকে দূরে থাকাদের বাড়ি যাওয়ার উপায় খোঁজা নিয়ে চিন্তা করতে হয়। এই ধরনের বিভিন্ন ধরনের দুঃখ-দুর্দশায় পড়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভোগান্তিকে অ্যাড্রেস করতে হবে এবং এটি একটি অংশগ্রহণমূঔশ গণতন্ত্র দ্বারা বেশ ভালোভাবে সম্পাদন করা যায়, বিশেষত যখন গণমাধ্যম মুক্ত থাকে, জনআলোচনা নিয়ন্ত্রণহীন থাকে এবং যখন সরকারি আদেশ-নির্দেশনা বিজ্ঞজনদের আলেচনা ও পরামর্শ শোনার মাধ্যমে জ্ঞাত হয়ে নেয়া হয়।
কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ সৃষ্ট ভারতে ঘটা হঠাত্ সংকটে সরকার যে রোগের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করছে, তা যথার্থ। রোগের প্রতিকারের কৌশল হিসেবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতিপ্রণেতারা তার পক্ষে নীতিগত অবস্থান নিয়েছেন, তা-ও ঠিক। সমস্যা হলো, রোগের বিস্তার ধীর করতে নেয়া এ রকম একমুখী নীতি একই উদ্দেশ্যে আরো বিভিন্ন যে পথ অবলম্ববন করা যেতে পাওে তার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য সৃষ্টি করেনা। ফলে কিছু নীতিকোনোটি কোটি মানুষের জীবনে বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে, কোনোটি আবার মানুষের দুর্ভোগ প্রতিকার করতে পারে।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষের মূল উদ্বেগ হলো কাজ ও আয় নিয়ে। কাজেই ওই দুটি যেখানে হুমকিতে পড়বে সেখানে তা সুরক্ষা করা নীতিপ্রণয়নের একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। আরো লক্ষ করার বিষয় হলো, এমনকি ক্ষুধা এবং দুর্ভিক্ষের সঙ্গে অপর্যাপ্ত আয় ও গরিবদের খাদ্য কেনার সক্ষমতার অভাবের একটি নৈমিত্তিক সম্পর্ক বিদ্যমান। নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি মাথায় রাখতে হবে। যদি হঠাত্ করে লকডাউনের কারণে লাখ লাখ শ্রমিকের আয়-উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কিছু মাত্রায় কিছু মানুষের ভুখা থাকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এমনকি মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারক-বাহক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বেকার ও গরিবদের সরাসরি টাকা ( ইনকাম সাবসিডি) দিচ্ছে ফেডারেল সরকার। দেশটিতে এ ধরনের সামাজিকভাবে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়ার পেছনে জন-আলোচনা ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভারতে দরিদ্রদের বঞ্চনা এবং দুস্থতা থেকে সুরক্ষা করতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি, জাতীয় খাদ্য সহায়তার পরিধি বাড়ানো এবং ফুড করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার গুদামে পড়ে থাকা ৬ কোটি টন চাল ও গম সরবরাহের মতো কিছু কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়া খুব কঠিন কোনো বিষয় নয়। এছাড়া কর্মহীন অভিবাসী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করে দেয়া, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, অসুখ ও স্বাস্থ্যসেবার প্রতি বিশেষ নজর দেয়াও সরকারের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং বিষয়। এক্ষেত্রে যথাযথ পরামর্শ ছাড়া কঠোর-অনমনীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার বদলে ভুক্তভোগীদের কথা শোনা জরুরি।
সামাজিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এখন সবার কথা শোনা সরকারের মূল কাজ। সমস্যাটা ঠিক কী, ঠিক কোথায় সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে, কীভাবে তা ভুক্তভোগীদের আক্রান্ত করে, এসব বিষয় শুনে ব্যবস্থা নিতে হবে। হবে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের হুমকি না দিয়ে সমৃদ্ধ জন-আলোচনা দ্বারা শাসনব্যবস্থা প্রভূতভাবে সাহায্য করা যেতে পারে, জনকল্যাণের স্বার্থে এটিকে অনেকটাই উন্নত করা যেতে পারে। মহামারি মোকাবিলা করা যুদ্ধের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এটা সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে বাস্তবিক প্রয়োজন এর চেয়ে অনেক বেশি।
অমর্ত্য সেন: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










