ফাগুনের আগুন ঝরা দিনের শেষে শীত নেমে আসে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে। এমনি এক কুয়াশাঘেরা সন্ধ্যায় চরফ্যাশনের লঞ্চে চেপে বসি আমরা ক’জন। উদ্দেশ্য চর মুজিবনগরের ভূমিহীন কৃষক নেতা আলম বাচ্চুর স্ত্রী হত্যার বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) দিচ্ছে নেতৃত্ব। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই চরফ্যাশন লঞ্চঘাট থেকে নেমে দুলার হাট থানার চর মুজিবনগরের গাড়িতে উঠি।
বহুদিন পর এমন মিষ্টি সকালের মুখোমুখি হলাম। দুদিকে খোলা মাঠ। মাঝে কংক্রিটের প্রশস্ত সড়ক। সূর্যি মামা জাগার অনেক আগেই গ্রামের কৃষকরা জেগেছেন। অত সকালে তারা ফসল বুনতেও শুরু করে দিয়েছেন। চর মুজিবনগরে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা ১০টা গড়িয়ে গেল। আমাদের টিম লিডার এএলআরডির অ্যাডভোকেট রফিক আহাম্মদ আসতে আসতে অনেক কিছু বলেছিলেন। এবার চোখে দেখার পালা।
চর মুজিবনগরকে স্থানীয়রা বলেন শিকদারের চর। খুব বেশিদিনের চর নয়। ১৯৯৬ সালে এখানে বসতির শুরু। চরটি জেগেছিল তারও কয়েক বছর আগে। তখন থেকেই চরটি ভূমিদসুদ্যের দখলে। আমরা আসব শুনে ২৫-৩০ নারী আগে থেকেই জমায়েত হয়েছিলেন। তাদেরই একজনের নাম জহুরা। বয়স ২৫ বছর। গায়ের রঙ ফ্যাকাশে ফর্সা। মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। দুই যুগ আগে মায়ের হাত ধরে এখানে আসেন ছোট্ট খুকি জহুরা। এখন জহুরা বড় হয়েছে। তার ছেলের বয়স নয় বছর। আজ জহুরা এসেছেন মা, খালা ও মামির সঙ্গে। জহুরার মামা মালেক মেম্বারকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে ভূমিহীন কৃষক নেতা আলম বাচ্চুর স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে। জহুরাদের দাবি, তার মামা নির্দোষ। মালেক বাচ্চুর মাও বলছেন, মেম্বার নির্দোষ। তার মেয়েকে মেরেছে চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা। বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন তারা। তবে পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। মালেক মেম্বারের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে হাতে।
সবাই সবার মতো করে ভিকটিমদের কথা শুনছে। আমিও শুনছি। কেন জানি না বারবার জহুরার ফ্যাকাশে চেহারা থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। জহুরাকে বললাম, ‘আপনি আর আপনার মায়ের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চাই।’ ভিড় ঠেলে বাড়ির উঠোনে চলে এলাম আমরা। প্রথমেই যে বিষয়টি জানতে চাইলাম, ‘জহুরা! ছোটবেলা থেকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখে দেখে বড় হয়েছেন। এখন আপনার সন্তানও সে অবস্থার মধ্যে বড় হচ্ছে। খারাপ লাগে না?’ বিষণ্ন গলায় জবাব দিল, ‘খারাপ তো লাগেই। সন্তানকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারছি না। আমরাও ভালোভাবে মানুষ হলাম না। ছোটবেলায় মাঠে খেলতে যেতাম, হঠাৎ মারামারি লেগে যেত। তখন কী করব বুঝতে পারতাম না। সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম।’
‘এখন ভয় লাগে না?’
‘ভয় তো লাগেই। আমার মামাকে (মালেক মেম্বার) পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। নির্যাতন করতেছে। ভূমিদস্যুরা আমাদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। আমার ছোটবেলা ভয়ে ভয়ে কেটেছে। আমার ছেলেও এখন ভয়ে ভয়ে বড় হচ্ছে।’
জহুরার মায়ের সঙ্গে কথা বললাম। তিনিও জানিয়েছেন, চরের জীবন মানেই সংঘাতের জীবন। এখানে টিকে থাকাই বড় কথা। শিশুদের নিয়ে আহ্লাদের সময় এখানে থাকে না। এর মধ্য দিয়েই শিশুরা বড় হয়। কেউ চর ছেড়ে চলে যায়। কেউবা চরের চোরাবালিতেই আটকে জীবন কাটিয়ে দেয়।
একজন শিশুর সঙ্গে কথা বলা দরকার। জহুরার ছেলে আসেনি। পাশের ক্ষেতে কাজ করছে কয়েকটি শিশু। একজনকে ডাক দিলাম। শারীরিক গঠন দেখে বোঝার উপায় নেই ওর বয়স ১৫ পেরিয়ে গেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চরের দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখে ভয় লাগে?’ আরো কয়েকটি প্রশ্ন করলাম। কোনো উত্তর পেলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কথা বলতে চাও না?’ এবার মাথা নাড়িয়ে জানাল, ‘না’। কিছুটা হতাশ হয়েই ক্যামেরা বন্ধ করে ভোলার উদ্দেশে রওনা হলাম।
বিস্তীর্ণ বালুরাশি পেরিয়ে স্পিডবোটে উঠতে হবে। বেলার ফিরোজ ভাই বারবার বলছিলেন, ‘আমাদের আবহাওয়াটা যদি সবসময় এমন থাকত তাহলে কত চমৎকার হতো তাই না? না ঠাণ্ডা, না গরম!’ এরই মধ্যে আরেকজন আবদার করে বসল, ‘চরে এসেছি ছবি তুলব না তা তো হয় না। কিছু ছবি তুলে দিন।’ ছবি তুলতে গিয়ে পড়ে গেলাম সবার পেছনে। বিস্তীর্ণ চরের মাঝে আমি আর ওই সঙ্গী দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি। ভিডিও করছি। এমন সময় দূর থেকে একটি ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে এল। কিছু বলার আগেই বলল, ‘স্যার! আমরা চরের শিশুরা ভালো নেই। আপনি আমার বন্ধুর ভিডিও করতে চেয়েছিলেন, ও ভয়ে কথা বলেনি। এ ভিডিও যদি আপনি কোথাও ছেড়ে দ্যান তাহলে আমাদের কল্লা কেটে ফেলবে।’ একদমে কথাগুলো বলে গেল সে।
ওই কিশোর তখন কেন কথা বলতে চায়নি এখন পরিষ্কার হলাম। এবার এ কিশোরকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী ধরনের ভয়ে থাকো তোমরা?’ চারদিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো আশপাশে পরিচিত কেউ নেই। তারপর বলতে শুরু করল কিশোরটি—‘দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা আমরা আতঙ্কে থাকি কখন মারামারি লেগে যায়! মারামারি লাগলে আমাদেরও ছাড়ে না। অনেক সময় বড়দের সঙ্গে না পারলে আমাদের নির্যাতন করে। এই যে আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি, তারা যদি জানতে পারে তাহলে আমাকে মেরে ফেলবে। এরা পুলিশকেও ভয় পায় না। কথায় কথায় বলে পুলিশ নাকি তাদের কাছে পানির মতো, গ্লাসে ঢেলে খেয়ে ফেলবে।’
জানতে চাইলাম, ‘তুমি কি স্কুলে যাও?’
সহজ গলায় বললাম, ‘জি না। এখানে একটা স্কুল আছে। কিন্তু স্যাররা ঠিকমতো পড়ায় না। ক্লাস শুরু করে তারা বাড়ি চলে যায়। কেউ ভাত রান্না করতে যায়। কেউ আবার গরু বাঁধতে যায়। শিক্ষকরাও আমাদের সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে পড়ায় না। আমরা চরের পোলাপান। বাবা-মায়েরাও ঠিকমতো আমাদের যত্ন নেয় না।’
বেশিক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক হবে না বুঝতে পেরে কিশোরটি বিদায় নেয়। বিদায় নেয়ার আগে বারবার অনুরোধ করে, আমার নাম-পরিচয় কোথাও প্রকাশ করবেন না। তা না হলে কিন্তু রক্ষা নেই। পুরো বিষয়টি টিম লিডার রফিক ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করলাম। তিনি বললেন, ‘যা শুনেছেন বাস্তব অবস্থা আরো ভয়াবহ। ভূমিদস্যুরা এখানে শিশু-নারীদের সঙ্গে কী বীভৎস আচরণ করে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। পুরুষরাও অসহায়।’
চর থেকে ফিরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করি আমরা। প্রতিনিধি দলের পক্ষে শুধু একটি কথাই বারবার বলা হয়েছে, ‘আমরা মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করি। সংবাদ লিখি। মামলা পরিচালনা করি। কিন্তু চর মুজিবনগরে যাদের দেখে এলাম তারা গায়েগতরেই শুধু মানুষের মতো, মানুষ হিসেবে একটি মৌলিক অধিকারও তারা পাচ্ছে না। অন্তত আলম বাচ্চুর স্ত্রী হত্যার মামলাটির যেন সুষ্ঠু তদন্ত হয় এটুকুই আমাদের দাবি।’ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। আমরাও ভূমিদস্যুদের প্রভাবমুক্ত তদন্ত দেখার অপেক্ষার প্রহর গুনছি।
আল ফাতাহ মামুন: সাংবাদিক










