তীব্র খাদ্য সংকট ধেয়ে আসছে আগামী বছর। বাংলাদেশও এ ঝুঁকির বাইরে নয়। এমন পূর্বাভাস বিশেষজ্ঞদের। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট জীবন, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকট যাপিত জীবনকে বড্ড একপেশে করে তুলেছে। সবচেয়ে কষ্টে আছে নিম্ন আয়ের মানুষ। তিন বেলার খাবার জোগাড় করতেই তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। এর ওপর জীবন ধারণের জন্য অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় নির্দিষ্ট আয়ে আর যেন কুলোচ্ছে না। সবখানেই নীরব এক হাহাকার। কিছুদিন ধরে জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রধান সংবাদ হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকটের খবর।
চোখের সামনেই বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। অভাবের ঢেউ এসে কখন যে হানা দিয়েছে, সেটি বুঝতেই পারছে না শহরে বসবাসরত মানুষ। তবে এর মধ্যেই বিলাস দ্রব্য কেনা বন্ধ হয়নি। এটাও ঠিক যাদের বিলাস দ্রব্য বিক্রি করে সংসার চলে, তাদেরও তো টিকে থাকতে হবে। আর মানুষের পেটের ক্ষুধার পাশাপাশি মনের ক্ষুধাও নিবারণ দরকার।
যা হোক, বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের পূর্বাভাসের বিষয়টি অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন। স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধান যখন খাদ্য সংকটের আভাস দিচ্ছেন তখন এটিকে সবার গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করতে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর এ কথাকে কতটা সতর্কতামূলকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে? কারণ রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে এখনো সার্বিকভাবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়েনি। আমাদের খাদ্য কেনার মতো পাঁচ মাসের রিজার্ভ আছে, এ তথ্যটি শ্রীলংকা নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করার সময় থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। কেননা কোনো দেশ সংকটে পতিত হলে তিন মাসের খাদ্য কেনার মতো রিজার্ভ আছে কিনা সেটি যাচাই করা হয়। সে বিবেচনায় আমাদের দেশ শ্রীলংকা হবে না, এটি এখন পুরনো চর্চিত বিষয়। বর্তমানে বরং যে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে সেটি হলো খাদ্য উৎপাদন ও সঞ্চয় প্রসঙ্গ।
প্রধানমন্ত্রী দেশের এক ইঞ্চি জমিও উৎপাদনের বাইরে না রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এ আহ্বান কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সেটিই বর্তমানে দেখার বিষয়। কারণ গ্রামে কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না, ফসল উৎপাদনের পর সেটি শহরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হওয়ার আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। এ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। কৃষক যেন ফসলের প্রকৃত মূল্য পান, সেজন্য কৃষকের উৎপাদিত ফসল প্রয়োজনে সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রির সুযোগ করে দিতে হবে। বেশ কয়েক মাস আগে দেখা গিয়েছে রাজধানী ঢাকার মানুষের জন্য পার্শ্ববর্তী জেলা শহর গাজীপুরের কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনার সুযোগ করে দিয়েছিল বেশ কয়েকজন তরুণ, উদ্যোগটি বেশ সাড়া পায়। এছাড়া রাজধানীর আজিমপুর, আদাবরসহ বিভিন্ন স্থানে সরকারের কৃষক বাজারের উদ্যোগও জনসাধারণের কাছে বেশ প্রশংসনীয় হয়েছে।
নিঃসন্দেহে এটি ভালো উদ্যোগ, এ উদাহরণটি দেয়ার কারণ কৃষক যেন বঞ্চিত না হয়। কৃষককে অবহেলা করে ধান কাটার মৌসুমে খেতে নেমে কিছু ধান কেটে ফটোসেশন করলে তাতে ফেসবুকে প্রচুর লাইক, কমেন্ট পাওয়া যায়। কিন্তু এর ফলে কার্যত কৃষকের কোনো উপকার হয় না। উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঢাকা শহরে ছাদ বাগানকে উৎসাহিত করার কর্মসূচি বেশ কয়েক বছর ধরেই নেয়া হয়েছে। শুধু তাই না, ছাদ বাগান করলে ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করার ঘোষণাও বেশ কয়েকবার দেয়া হয়। ছাদ বাগানের মাধ্যমে নিরাপদ ফলমূল এবং সবজি উৎপাদন করা যাচ্ছে, যা বাজার থেকে কেনার প্রয়োজন পড়ছে না।
গ্রামের উঠোনে শাকসবজি উৎপাদন করার প্রতি এখন অনেকেই মনোযোগী হচ্ছেন। এর মাধ্যমে পরিবারের খাবারের প্রয়োজন যেমন পূরণ হচ্ছে, তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। তবে খাদ্য উৎপাদনের প্রসঙ্গটি যদি বৃহৎ আকারে দেখা হয়, তাহলে একটি বিষয়ই ফুটে উঠবে যে কৃষিজমির পরিমাণ কিন্তু কমছে। নগরায়ণের প্রসারের ফলে কৃষিজমিতে বসতভিটা ও শিল্প-কারখানা স্থাপন হচ্ছে। এদিকে কৃষক ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ না পেলেও তামাক কোম্পানিগুলো কৃষককে প্রলোভন দেখিয়ে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করছে। এতে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তামাক কোম্পানিগুলোই লাভবান হচ্ছে, কারণ তামাক চাষের ফলে জমির উর্বরা শক্তি কমে যাওয়ায় কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ এখানে দীর্ঘমেয়াদে বেশি।
অন্যদিকে ২০০২ সালে আইন করে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও এর ব্যবহার পরবর্তী সময়ে কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। পলিথিনের সঙ্গে এখন প্লাস্টিক বোতলও বেশ সহজলভ্য। পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতল অপচনশীল হওয়ায় এগুলো মাটির উর্বরাশক্তি কমিয়ে দেয়। এজন্য মাটির উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার জন্য প্লাস্টিক বোতলগুলো রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে দানা হিসেবে তৈরি করে পুনরায় প্লাস্টিক বোতল উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে। পলিথিনের ক্ষেত্রেও ডাম্পিং এবং রিসাইক্লিং অব্যাহত রাখা উচিত।
এসব কিছুর সঙ্গে আরেকটি প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে খাদ্য অপচয় না করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি তথ্য ভেসে বেড়াচ্ছে যে, এক মুঠো ভাতের জন্য কৃষকের ১২০ দিনের খাঁটুনি রয়েছে। বাস্তবতাও সেটিই বলে, ধান গাছের চারা বপণ করার পর গাছের বৃদ্ধি, শীষ তৈরি হওয়ার পর সেখানে থাকা ধান, অতঃপর ধান সেদ্ধ করে চালকলে মাড়াইয়ের মাধ্যমে চাল তৈরি হয়। সে চাল রান্না করে আমরা ভাত খেয়ে থাকি। ক্ষুধা নিবারণের জন্য এ ভাত-তরকারি খেতে গিয়ে আমরা প্রায় সময়ই অপচয় করি। সবচেয়ে বেশি অপচয় হয় বিয়ে বা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে। খেতে না পারলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার প্লেটে নিয়ে খাবার নষ্ট করা এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এসব ফেলে দেয়া খাবার এক জায়গায় জড়ো করার পর সেগুলো পরে রাস্তায় বিক্রি করা হয়। নিম্ন আয়ের মানুষ এসব খাবার কিনে খায়। খুব স্বাভাবিকভাবেই খাবারগুলোর মধ্যে তখন আর কোনো পুষ্টিগুণ থাকে না এবং এসব খেয়ে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
তাই খাদ্য অপচয় থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিবেশ দর্শন অনুযায়ী যে খাবার মানুষ নিজে তৈরি করতে পারে না, সে খাবার তার নষ্ট করারও কোনো অধিকার নেই। খাবারের ক্ষেত্রে মানুষ শুধু ভোক্তা, এটি উৎপাদনের বিষয়টি পুরোপুরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী যা স্রষ্টার পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়। যা হোক, খাবারের পাশাপাশি বর্তমানে সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অবশ্য দ্রব্যমূল্যের বর্তমান অবস্থায় মানুষ এমনিতেই সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। তার ওপর কোনো কিছু সঞ্চয়ের আশা করাটা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য দুরাশায় পরিণত হয়েছে।
সব মিলিয়ে পুরো পৃথিবীই মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে, এমন পূর্বাভাসে আমাদের প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। এজন্য হিমাগারে যথাযথ খাদ্য সংরক্ষণ, কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহ, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং টিসিবিকে অধিক কার্যকর করতে হবে। এক্ষেত্রে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিবেচনা করে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ করে বাজার অস্থিতিশীল করে ফেলতে পারে সে বিষয়ে বিরোধী রাজনীতিবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীও সেটি আঁচ করতে পেরে তার দূরদৃষ্টি অনুসারে পণ্যমূল্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
এরই মধ্যেই চিনি ও পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে গিয়েছে, সবজির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছ-মাংসের বাজারেও স্বস্তি নেই। ডিমের দামও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গের পাশাপাশি বাসাভাড়াও বেড়ে গিয়েছে। মানুষকে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে, আঁচলে মুখ লুকিয়ে মধ্যবিত্তরাও টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিতে পারছে না ডাক বিভাগ। ব্যাংকে টাকা রেখেও লাভ হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির কারণে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমানতের বিপরীতে সুদের হার আগের মতো লাভজনক অবস্থায় নেই। প্রাপ্ত সুদ বা মুনাফা থেকেও কর কেটে রাখা হচ্ছে।
এদিকে সাধারণ মানুষকে সঞ্চয়ী হতে বলে সরকারি বিলাসী প্রকল্পগুলো বহাল রাখা হলে সেটি জনগণ সুনজরে দেখবে না। এছাড়া প্রয়োজনীয় প্রকল্পের কাজ সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। আর জনগণকে সঞ্চয়ী হতে বলার পর যদি সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ পায়, সেটিও জনরোষ তৈরি করতে পারে।
মোটকথা, জনস্বার্থের কথা চিন্তা করে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। এরই মধ্যে চলতি ২০২২-২৩ বর্ষে আমাদের প্রধান খাদ্য ভাতের ক্ষেত্রে চালের যেন ঘাটতি না হয়, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এক্ষেত্রে ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চাল কেনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে ১ লাখ টন চাল দেশে এসেছে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানিয়েছেন, এখন আমন মৌসুমের শুরুতে ১৭ লাখ টন চাল মজুদ রয়েছে।
আমরা এভাবেই আশাবাদী হতে চাই, সরকারি উদ্যোগে চালসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের পর্যাপ্ত মজুদ যেন সংকটকালীন সময়ে দেশের মানুষের চাহিদা মেটাতে পারে সেভাবে খাদ্যনিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে, সেটিই সবার প্রত্যাশা।
তৌফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক










