গত ১০ বছরে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা বেড়েছে ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। একই সঙ্গে দুধ ও মাংস উৎপাদন বেড়েছে ১৫০ শতাংশের বেশি। এটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এতে আমিষের স্থানীয় চাহিদা মিটছে বটে কিন্তু শঙ্কাও রয়েছে। কারণ একই গবাদিপশু থেকে অধিক দুধ ও মাংস পাওয়ার হার এক সময়ে কমে আসবে। ফলে উন্নত জাতের পাশাপাশি গবাদিপশুর সংখ্যা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। গরু পালনে বর্তমানের অর্জনকে ধরে রাখতে এবং টেকসই করতে হলে তিনটি উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, পশু পালনকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক খাত হিসেবে দাঁড় করাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। খামারিদের বাজার ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ পরিমাণে সুযোগ দিতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন বাড়াতে অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশের বাণিজ্যিক চাষকে উৎসাহের পাশাপাশি ক্ষুদ্র খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তাছাড়া বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ খাতে বিনিয়োগে আকর্ষণ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। ছোট খামারিদের নীতিসহায়তার মাধ্যমে সুরক্ষা করতে পারলে দেশেই সারা বছরের চাহিদা মেটানোর জন্য পশু উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আসবে।

গবাদিপশুর সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ উন্নত জাত। একই গরু থেকে আগের চেয়ে বেশি পরিমাণ দুধ ও মাংসের জোগান মিলছে। কিন্তু এরও সর্বোচ্চ সীমা আছে। গবাদিপশুর সংখ্যা না বাড়িয়ে শুধু দুধ ও মাংসের পরিমাণ বৃদ্ধির চিন্তা টেকসই নয়। এ খাতে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে কিছু কাঠামোগত, কিছু অর্থায়নসংশ্লিষ্ট, কিছু ব্যবস্থাপনাগত এবং কিছু খাতসংশ্লিষ্ট অন্তর্নিহিত প্রতিবন্ধকতা। দেশে গবাদিপশু পালনের উপযুক্ত জমি ক্রমেই কমছে। সীমিত হয়ে পড়ছে ঘাসের জমি। এ খাতে এটা অন্যতম বড় সংকট। অর্থায়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা। গবাদিপশু পালনে ঋণপ্রাপ্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হলেও খামারিদের অনেকেরই ব্যাংকঋণ পান না। বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক খামারিদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ঋণ পেলেও ক্ষুদ্র খামারিরা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে কোনো রকম আর্থিক সহায়তা পান না। ফলে খামারের অধিকতর উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে পারছেন না তাদের অনেকে। আছে বাজার ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিও। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে সরবরাহ সহজ হলেও বিশেষত ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য ভালো বাজার সংযোগ গড়ে ওঠেনি। রয়েছে কিছু অন্তর্নিহিত বাধাও। সেগুলোর মধ্যে পশু স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, পশু লালন-পালনে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাব এবং কৃেকৗশলগত অনগ্রসরতা প্রভৃতি অনেক উল্লেখযোগ্য। বলা চলে এগুলোয়ই খাতটির অধিকতর উন্নয়নের পথে চ্যালেঞ্জ। মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করা হলেও দেশে এখনো মাংস আমদানি হয় বলে খবর মিলছে। ফলে দেশে মাংসের চাহিদা ও স্থানীয় জোগানের ব্যবধান রয়েছে।

গবাদিপশু এবং দুগ্ধপণ্য খাতে বিশ্বে সুখ্যাতি রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের। পর্যাপ্ত চারণভূমি তো আছেই; তার ওপর নানামুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশ দুটি তাদের এ সাফল্য ধরে রেখেছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তারা মাংস ও দুধের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ রফতানিও করছে। তাদের সাফল্যের পেছনে উন্নত জাত ও গবাদিপশুর সংখ্যা উভয় ভূমিকা রেখেছে। ব্রাজিল, চীন ও ভারতও এ খাতে ভালো করছে। খাতটির উন্নয়নে দেশগুলো কী ধরনের নীতি নিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে, কীভাবে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে, তা আমাদের জন্য পর্যালোচনার দাবি রাখে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমিস্বল্পতার কারণে চাইলেও খামার বা গবাদিপশুর সংখ্যা বাড়ানো কঠিন। এ কারণে গবাদিপশু সীমিত রেখে দুধ ও মাংস বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এজন্য পশুর জাত উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক খাবার ব্যবহারের ওপর মনোযোগ দেয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এর সুফলও মিলেছে। গবাদিপশুর সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি সীমিত সত্ত্বেও দুধ ও মাংস উৎপাদন বেশি মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। তবে এরও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উৎপাদন বৃদ্ধির সূত্র অনুযায়ী সংখ্যা না বাড়লে এক সময়ে দুধ ও মাংসের উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়বে এবং প্রবৃদ্ধি কমতে থাকবে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী দুধ ও মাংসের জোগান মিলবে না। কাজেই গবাদিপশুর সংখ্যা বাড়ানোর দিকে আরো দৃষ্টি দিতে হবে। পশুখাদ্য নিয়েও এক ধরনের উদ্বেগ বিদ্যমান। সন্দেহ নেই, খাবারের স্বল্পতা থাকায় গবাদিপশু পালনে বাণিজ্যিক খাবারের বিকল্প নেই। কিন্তু অনেক সময় পশুখাদ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি কিংবা স্বাস্থ্যঝুঁকির খবর মিলছে। স্বভাবত প্রশ্ন উঠছে মাংস বা দুধের মান নিয়েও। এ অবস্থায় নিরাপদ পশুখাদ্য নিশ্চিতে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। সরকার এরই পশুখাদ্য তৈরিতে বিষাক্ত কিছু উপকরণ নিষিদ্ধ করেছে। অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কীভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পশুখাদ্যের জোগান বাড়ানো যায়, সেদিকে এখন মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের আরো এগিয়ে আসা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নজরদারিও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ হলো ছোট দেশ, কিন্তু বিপুল জনসংখ্যা। তাই পুরো জনগোষ্ঠীর আমিষের প্রয়োজন মেটাতে প্রাণিসম্পদের জোগান অবশ্যই ঠিক রাখতে হবে। এজন্য নতুন নতুন জাত উন্নয়ন তো অব্যাহত রাখতে হবেই; পাশাপাশি গবাদিপশুর মৃত্যুও কমাতে হবে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, কেবল অসুস্থতার কারণেই গবাদিপশুর অর্ধেক মারা যায়। বাস্তবতা হলো, পশুস্বাস্থ্যসম্পর্কিত সেবার কাভারেজ এখনো সীমিত। পশুর মৃত্যু কমাতে হলে তাই রোগ নির্ণয় সামর্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বাড়াতে হবে ভেটেরিনারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের সংখ্যা। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র খামারিদের কাছে এসব সেবা সহজলভ্য করতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। 

দেশ মাংস উৎপাদনে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণতা করেছে। তার পরও কোনো ধরনের উন্নত পরীক্ষা ছাড়াই আমদানীকৃত মাংস এখানে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ আছে। খামারিদের জন্য এটা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই খাতটির অগ্রগতির স্বার্থে মাংস আমদানি নিরুৎসাহিতকরণে নানা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। পশুর উৎপাদন যেহেতু বাড়ছে, সেহেতু যথাযথ মান নিশ্চয়তাপূর্বক কীভাবে মাংস রফতানি করা যায়, সেটি ভাবতে হবে। এর সম্ভাব্য বাজার অন্বেষণে সক্রিয়তা জরুরি। 

চাহিদার শতভাগ দেশে পালিত পশুর মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি রফতানি বাজারে মাংসের চাহিদা মেটানোর সুযোগ কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ। এজন্য খামারিদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করতে ঋণ ব্যবস্থাকে সহজ করতে হবে, স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করতে হবে। গরু পালনে খামারিদের খরচ কমিয়ে মুনাফা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। উৎপাদনশীল গরু জবাই বন্ধে আইন বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কম সময়ে বা কম খাবারে গরু উৎপাদনক্ষমতা যাতে বৃদ্ধি করা যায় সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। ভালো মানের ব্রিড ও সিমেন আমদানি করতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি পর্যায়েও সিমেন আমদানির মাধ্যমে গরু উৎপাদন ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। গরু মোটাতাজাকরণ কার্যক্রম আরো বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি তারা গরু মোটাতাজা করতে স্টেরয়েডজাতীয় (ডেকাসন, বেটামেথাসন ও পেরিঅ্যাকটিন), ডেক্সামেথাসন, পাম ট্যাবলেট ছাড়াও ইউরিয়া সার খাওয়ানো পন্থাগুলোকে কঠোর হস্তে বন্ধ করতে হবে।

শিক্ষিত অনেক তরুণই এখন গবাদিপশু খাতে আসছে। অনেকের কর্মনিয়োজন নিয়োজন হচ্ছে। তাই অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিরাজিত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। ঋণ ব্যবস্থাকে তাদের জন্য সহজ করার পাশাপাশি স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণের পরামর্শ খাতসংশ্লিষ্টদের। এটি আমলে বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জরুরি। এছাড়া পশুখাদ্যের অত্যধিক উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ, পানির বিল কৃষির আওতায় না আনার কারণে খামারিদের খরচ বাড়ছে। উপযোগ ও পশু পালনে প্রয়োজনীয় উপকরণের ক্ষেত্রে খরচ কমিয়ে তাদের মুনাফা বাড়াতে কীভাবে পৃষ্ঠপোষকতা জোগানো যায়, তার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপও প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক উপায়ে গরু লালন-পালন বিষয়ে খামারিদের প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে। সর্বোপরি এ উপখাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোও প্রয়োজন।