দেশের উন্নয়ন চাহিদা মেটাতে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিয়ে আসছে। আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগসহ বড় আকারের শিল্প স্থাপনে গুরুত্ব দিয়েছে। বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রতিষ্ঠাও করা হয়েছে। বেজা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যে কাজ করছে। অগ্রগতিও ছিল আশানুরূপ। কিন্তু করোনা এর গতি টেনে ধরেছে। বণিক বার্তায় তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এসবই তুলে ধরা হয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারির মধ্যে অর্থনৈতিক জোনের গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি, জমি ও রাস্তাঘাটের মতো জরুরি অবকাঠামো নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শিল্প স্থাপনে জমিপ্রাপ্তির সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়েছে।
ভালো পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেয়াই বড় কথা নয়, সেই পরিকল্পনা ও উদ্যোগ যথাসময়ে সুচারু ও মানসম্পন্নভাবে বাস্তবায়নের মধ্যেই প্রকৃত সাফল্য নিহিত। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা, সাফল্য এবং জাতীয় জীবনে তার সার্বিক ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে কারো কোনো দ্বিমত নেই। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রয়োজন। সম্ভাব্যতা যাচাই, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, রাস্তাঘাট, পরিবহন সুবিধা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংস্থানের পাশাপাশি কী ধরনের শিল্প-কারখানা করা হবে, উৎপাদিত পণ্যের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার কতটা অনুকূল প্রভৃতি দিক দেখতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো যেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়া হয়। চীনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রভূত সাফল্য লাভ করেছে, অন্তত সে দেশের সরকারি পরিসংখ্যান তেমনই বলে। ভারত সরকারও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছিল। দেশটিতে প্রথম দফায় মোট ৫৭৭টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়পত্র পায়। কিন্তু চীনের মতো সাফল্য তারা লাভ করেনি। ভারতে যে উদ্দেশ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো তৈরি হয়েছিল, তা তেমন সফল হয়নি বলেই দেশটি থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বলছে। মাত্র ১৭০টি অঞ্চল চালু হয়েছে। তাতেও উৎপাদন শিল্পে বৃদ্ধির জোয়ার আসেনি, বেশির ভাগ অঞ্চলে পরিষেবা খাতের বিনিয়োগ বেশি। সম্প্রতি দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আর নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল নয়। সিদ্ধান্ত এখনো কার্যকর হয়নি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে আপত্তি রয়েছে অনেক। অঞ্চলগুলো যে সুবিধা পায়, তার প্রতিদানে দেশের অর্থনীতি যথেষ্ট লাভ করছে কিনা, তা মূল প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হওয়া চাই। প্রথম কথা, অঞ্চল তৈরিতে জমি দেয়া হয় নামমাত্র মূল্যে। সেই জমির বাজারদর অনেক। তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা চাই। দ্বিতীয়ত, অঞ্চলের শিল্পগুলোকে যে বিপুল কর ছাড় দেয়া হয়, এই অঞ্চলগুলোয় শিল্পোৎপাদন তার চেয়ে বেশি হওয়া প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে শিল্পনগরীতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও নীতিমালায় পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এখন তাদের প্রকল্প পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। মহামারীর প্রাদুর্ভাব তাদের বিনিয়োগ ভাবনায় পরিবর্তন আনতে আরো বেশি বাধ্য করেছে। আবার বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও কেউ কেউ এখন পরিকল্পনা বদলে নিজ দেশের নিকটবর্তী দেশ বা স্থানে বিনিয়োগ শুরু করেছেন (নিয়ারশোরিং)। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি ভিয়েতনামে নতুন এমন অনেক বিদেশী বিনিয়োগ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, শুরুতে যার প্রকৃত গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ। বিনিয়োগ আকর্ষণে থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ টানতে নানা ধরনের ছাড় দিচ্ছে। থাইল্যান্ড নতুন শিল্প স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ১৩ বছরের জন্য কোনো জমির ভাড়া না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। একইভাবে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর জমির কোনো ভাড়া না নেয়ার কথা জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। বাংলাদেশকেও এমন পদক্ষেপ নিতে হবে। এরই মধ্যে কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশী-বিদেশী কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। কিছু কারখানা নির্মাণের কাজও চলছে। এক্ষেত্রে তাদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের পাশাপাশি পরিপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ করা চাই। পরিকাঠামোও উনিশ শতকে পড়ে আছে। এগুলোর দিকে নজর ফেরানো প্রয়োজন। বস্তুত কোনো বিচ্ছিন্ন অঞ্চল বেছে নয়, সামগ্রিক শিল্পোন্নয়নের চেষ্টা ছাড়া বাংলাদেশের উপায় নেই।










