‘কেউ আমাকে বুঝতে চায় না’—এমন ক্ষোভ, অভিমান এমনকি অভিযোগ প্রায়ই কানে আসে। আমার মতো করে অন্যরা কেন বিষয়গুলো দেখে না; কিংবা অনুভব করে না সেটা বুঝতে না পেরে কষ্ট পাওয়া লোকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ফল হিসেবে হয় নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, নয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। অনেকের ক্ষেত্রেই প্রবল নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয় এবং একাকিত্ব তাদের গ্রাস করতে থাকে। আমাদের চারপাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ বস্তুগত অসংখ্য সুযোগ-সুবিধার মাঝে থেকেও হতাশাগ্রস্ত জীবন কাটাচ্ছে! কেন এমনটা হয়, অন্যরা কেন আমাদের ঠিক সেভাবে বোঝে না? সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ভাবনাগুলো শেয়ার করাই আজকের নিবন্ধের লক্ষ্য।

গত কয়েক দশকে দেশের অধিকাংশ মানুষের আয় ও জীবনযাপনের জন্য দরকারি উপাদানের সরবরাহ বেড়েছে। ফলে মানসিক তৃপ্তির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে—আমরা কি বাপ-দাদার (কিংবা মা-দাদীর) চেয়ে বেশি তৃপ্ত জীবনযাপন করছি? আমাদের পূর্বপুরুষরা সামান্য আয়ে সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও যে তৃপ্তির ঘুম দিতে পারতেন, এখন কি সেটা সম্ভব হয়? যার বাবা হাজার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতেন, এখন সে চাইলেই লাখ টাকা বের করতে পারে; তার পরও মনের কোণে এক ধরনের অতৃপ্তি (বা অনেক কিছু না পাওয়ার জ্বালা) তীব্র হচ্ছে—কেন? চারপাশে অসংখ্য মানুষ গিজগিজ করলেও মাঝেমধ্যে নিজেকে ভীষণ একা লাগে কেন?

সমাজের অতি উচ্চ ও নিম্নস্তরের লোকদের এমন সমস্যা নেই বললেই চলে। মাসলোর Need of hierarchy অনুযায়ী তৃতীয় ধাপে থাকা ব্যক্তিরা এটা তীব্রভাবে অনুভব করেন। মৌলিক চাহিদা পূরণে তাদের খুব একটা টেনশন থাকে না। তাই সামাজিক স্বীকৃতি ও চারপাশের মানুষগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠেন। সম্মানজনক বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হতে থাকে। প্রতিবেশী, সহকর্মী, সহপাঠী বা আত্মীয়স্বজনের এমন অর্জনে ‘পিছিয়ে পড়া’র অনুভূতি হয়। আর সেখানেই সমস্যা—ভাবেন কেউ আপনাকে বুঝতে চায় না!  

অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের মতো দৃশ্যমান বস্তুর চাহিদা যেভাবেই হোক (প্রয়োজনে ধার করে) মেটানো যায়। কিন্তু প্রত্যাশিত বস্তু যখন ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট’ হয়, তখন তা পূরণ হওয়া মারাত্মক এক সমস্যা বটে। অনেক কিছু থাকার পরেও ‘অদৃশ্য বা কল্পিত না থাকা’ বিষয়গুলো আমাদের ‘কাঙাল’ করে তুলছে। আমরা একটা কিছু চাই। কিন্তু কী চাই, কেন চাই, তা স্পষ্ট নয়। ফলে এ-ডাল থেকে সে-ডালে ঝুলতে থাকি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলটা হাতে পাই না। জীবনের অসংখ্য অর্জন আমাদের তৃপ্ত করে না। লাগামহীন প্রত্যাশা আর অন্যদের মতো করে সুখী হওয়ার চেষ্টাই সম্ভবত এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।

ধরা যাক, ফেসবুকে একটা ছবি পোস্ট করলেন—বেশি লোক কেন সেটা লাইক দিল না কিংবা প্রশংসাসূচক মন্তব্য করল না? এমন চিন্তা থেকে উপসংহারে পৌঁছে গেলেন যে তারা আপনাকে পছন্দ করে না। কিংবা আপনার সফলতায় তারা বুঝি ঈর্ষান্বিত! অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এগুলো বিশ্লেষণ করে নানাজনকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন। পরবর্তী আচরণে তার বহিঃপ্রকাশও ঘটে। অথচ এই লাইক বা কমেন্ট আপনার জীবনে এমনকি আহামরি ভূমিকা রাখে যে তা না পাওয়ায় নিজেকে হতভাগা ভাবতে শুরু করলেন?

আড্ডায় বা ফোনালাপে অন্যরা আমাদের মতকে শ্রদ্ধা না করলে অথবা (আপনার দৃষ্টিতে) দারুণ এক আইডিয়াকে তারা একবাক্যে খারিজ করে দিলে এমন কষ্ট প্রবল হয়। কেন পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্রের মানুষগুলো আপনাকে বুঝে না বা ফিল করে না—এ প্রশ্ন পীড়িত করে। অনেকের ক্ষেত্রেই তা মনকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে দামি বিছানায় শুয়ে, শীত ও তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হাতের মুঠোয় নিয়ে, ইচ্ছেমতো বিনোদনের সুযোগ আঙুলের ডগায় থাকার পরেও মনে শান্তি পায় না। একবুক হতাশা ও কষ্ট নিয়ে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েও ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না!

অনেকে আবার চারপাশের মানুষগুলোকে অবিবেচক কিংবা হূদয়হীন ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু অন্যরা যে আপনার মতো করে সবকিছু দেখবে না কিংবা বুঝতে চেষ্টা করবে না, সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? কেউ কেউ বলেন, উচ্চশিক্ষিত মানুষ হয়েও তিনি আমাকে বুঝেন না কেন? আসলে শিক্ষিত মানুষের পক্ষে আপনার মতো করে বোঝা আরো কঠিন। কারণ তার বেড়ে ওঠার প্রতিটা ধাপে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রভাব থাকে অত্যন্ত প্রবল। ফলে কোনো ঘটনাকে আপনি যেভাবে দেখেন, তার পক্ষে তা সেভাবে দেখা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপনি পৃথিবীর কেন্দ্র নন যে সবাই আপনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে।

খুব সহজ এক পরীক্ষা আমাদের এটা বুঝতে সাহায্য করবে। সেটা হলো, বাসায় খাবার টেবিলে সাধারণত যে চেয়ারে বসেন, আজ তা বদলে অন্যটায় বসুন। দেখবেন নিজের ডাইনিং রুমটাকেও বেশ খানিকটা ভিন্ন রকম লাগবে। অথবা অফিসে নিজের ডেস্কে বসে চারপাশটা যেভাবে দেখেন, একবার অন্য এক সহকর্মীর চেয়ারে বসে দেখুন—অতি পরিচিত কর্মক্ষেত্রকেও অন্য রকম মনে হবে। তাহলে মুখোমুখি বসে সিক্স সংখ্যাটাকে দুজন দুভাবে দেখতেই পারে। আবার দুজনই ঠিকও হতে পারে! কারণ তারা ভিন্ন রকম বোধ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আজকের পর্যায়ে এসেছে, তাই না?

নগরজীবনে মানসিক অশান্তির এমন হাজারটা কারণ রয়েছে। আপনি অসুস্থ হলে অন্যরা কেন দেখতে আসে না, কেন মাঝেমধ্যেই ফোন করে খোঁজখবর নেয় না, বিপদের সময় কেন টাকা ধার দেয় না, জন্মদিনে কেন সারপ্রাইজ দেয় না, পদোন্নতি বা অন্য অর্জনে তারা কেন আন্তরিক অভিবাদন জানায় না...এমন অসংখ্য ‘না করা’র তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। কিন্তু খেয়াল করবেন, এ অভিযোগগুলো আমরা সাধারণত করে থাকি নিজেদের দুঃসময়ে। তাহলে সুসময়ে এমন অভিযোগ করি না কেন? তখন কি তারা বদলে যায়?

না, তারা একই রকম থাকে। তবে আমরা তখন নিজেকে নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত থাকি যে অন্যদের নিয়ে ভাবার সময়ই থাকে না! অসংখ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দিন-রাত ছুটে চলি। কোনো কারণে সে গতিতে ছন্দপতন ঘটলে তখন কেবল অন্যদের না করা কাজগুলো চোখে পড়ে! অন্যদের দোষারোপ না করে নিজেকে প্রশ্ন করি না—আমার সুসময়ে তাদের জন্য ঠিক কতটা করেছি? কখনো কি তাদের মতো করে বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করেছি? তাহলে আজ তারা আপনাকে বিশেষ কেয়ার করবে কেন?

এখন প্রশ্ন হলো, এর হাত থেকে রক্ষার কোনো উপায় আছে কি? প্রথম কথা হলো, আপনি সত্যিই সেটা চান কিনা। যদি তা চান, তবে জাস্ট গেমটা উল্টে দিতে হবে। অর্থাৎ আপনাকে কেউ বুঝুক, সেটা প্রত্যাশা না করে এখন থেকে আপনি তাদের বুঝতে চেষ্টা করবেন। তারা যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে, স্বতন্ত্র আচরণ করে, এর পেছনে তার জন্মস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। ফলে তার পার্থক্যের জায়গাটিকে সম্মান করা শিখতে হবে। আপনি ধনী-শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, এটা আপনার অর্জন নয়। সৃষ্টিকর্তা আপনাকে এই ফেভার করেছেন বলে তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। আর যে মানুষগুলো আপনার মতো সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বড় হয়নি, তাদের প্রতি রুঢ় বা রুক্ষ না হয়ে ভালো আচরণ দিয়ে কনভিন্স করতে চেষ্টা করুন।

মানসিক শান্তির সবচেয়ে বড় উপায় হলো, আপনার সম্পর্কে ‘অন্যরা কী ভাবছে’ তা অনুমান করা বন্ধ করা। জগতে আপনি এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন যে সবাই আপনাকে নিয়ে ভাবছে! নিজের কাজকর্ম নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, তারা আপনাকে ‘ভালো মানুষ’ ভাবলেই আপনি ভালো হয়ে যাবেন না। ঠিক তেমনিভাবে তারা আপনার সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করলেই আপনি একজন খারাপ লোকে পরিণত হবেন না। তাই তাদের নিয়ে ভাবার পরিবর্তে নিজেকে বা নিজের কাজ নিয়ে ভাবুন...বহু সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

কাঙালের মতো আপনিই কেন তাদের কাছে সবসময় প্রত্যাশা করবেন? আপনার জন্মদিনে তারা আপনাকে সারপ্রাইজ দেয়নি, তাদের জন্মদিনে আপনি চমকে দিন। আপনার দুঃসময়ে তারা পাশে দাঁড়ায়নি, আপনি দাঁড়ান। বিয়েবার্ষিকী তাত্পর্যময় করার দায়িত্ব শুধু আপনার পার্টনারের নয়, আপনি কেন সেই উদ্যোগটা নিয়ে তাকে দারুণ এক অনুভূতি উপহার দিচ্ছেন না? এভাবে কাজ করতে শুরু করুন, দেখবেন খুব দ্রুতই তারা এর প্রতিদান দিতে শুরু করেছে। কিন্তু এমন অভিযোগকারীদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা শুধু অন্যরা কেন করছে না, তা নিয়ে চিন্তা করে। আর তারা না করায় নিজেকে বঞ্চিত, উপেক্ষিত, অবহেলিত ভাবে। নিজেকে প্রশ্ন করে না—শুধু তারাই কেন করবে, আমি তাদের জন্য কতটুকু করেছি?

তাই আপনার ভেতরে যদি এমন লক্ষণগুলো প্রকট হয়, তবে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে—গা-ঝাড়া দিয়ে এখনই উঠে পড়ুন। শারীরিক পরিশ্রম হয় এমন কোনো কাজ শুরু করুন। ঘর পরিষ্কার, রান্না, গাছের পরিচর্যা করার মতো একটা কিছু করতে থাকুন। সেটা করার সুযোগ না থাকলে রাস্তায় নেমে হাঁটতে থাকুন। শরীরটাকে ঘামান, নিজেকে ক্লান্ত করে ফেলুন। দেখবেন দুশ্চিন্তার অনেকটাই কেটে গেছে। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা, তাই মস্তিষ্ককে কাজ দিন। কিচ্ছু করার না থাকলে হাতের কাছে থাকা যেকোনো বই পড়তে শুরু করুন। দেখবেন অন্যরা আপনাকে না বোঝার কষ্ট বহুলাংশে দূর হয়ে গেছে।

 

মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘পোস্ট ক্রাইসিস বিজনেস’ বইয়ের লেখক