মানবসভ্যতা বিকাশের সঙ্গে নানা রোগের উদ্ভব ঘটেছে, এক্ষেত্রে রোগ নিরাময়ে অ্যান্টিবায়োটিকের উপযুক্ত ব্যবহার না হওয়ায় তৈরি হয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর)। অতিমাত্রায় প্রয়োগের ফলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল (অণুজীব, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবী ধ্বংসকারী ওষুধ) প্রতিরোধী হয়ে উঠছে বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী অণুজীব ও পরজীবী। পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস এসব ভাইরাসকে শক্তিশালী করছে। এতে সংশ্লিষ্ট রোগের চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। সব মিলিয়ে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এএমআর।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, রক্ত আমাশয়ের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত চারটি ওষুধের (সিপ্রোফ্লক্সাসিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, মেসিলিনাম, সেফট্রিয়াক্সোন) বিরুদ্ধে এখন প্রতিরোধী শক্তি গড়ে তুলেছে শিগেলা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধির জন্য এ শিগেলা দায়ী। তবে শিগেলা বা রক্ত আমাশয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। এতে হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ভর্তি থাকতে হচ্ছে। রক্ত আমাশয়ের জন্য প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিক সিপ্রোফ্লক্সাসিনের বিরুদ্ধে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই জীবাণু তা সহ্য করতে শিখে গেছে। বিশেষ করে দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের চিকিৎসা করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হচ্ছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। রাজধানী ঢাকার মহাখালী ও চাঁদপুরের মতলবে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মলের নমুনা পরীক্ষা করে গবেষণাটি করা হয়।

এভাবে মানবশরীর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়টি খুবই শঙ্কাজনক। অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা রয়েছে। কেননা অণুজীব, ভাইরাস, ছত্রাক, পরজীবী প্রতিনিয়ত রূপ পাল্টায়। অতিরিক্ত প্রয়োগের ফলে অণুজীব ধ্বংস করার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণু অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। জীবাণুগুলো ধীরে ধীরে মানবদেহে এএমআর গড়ে তোলে। রক্ত আমাশয়ের জন্য প্রথম সারির ওষুধ সিপ্রোফ্লক্সাসিন কাজ না করলে দ্বিতীয় সারির ওষুধ অ্যাজিথ্রোমাইসিন ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অ্যাজিথ্রোমাইসিনের ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়েছে।

শুধু রক্ত আমাশয় নয়, অন্য রোগের ক্ষেত্রেও এএমআর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবাণু অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালবিরোধী নতুন স্ট্রেইন তৈরি করছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের তীব্রতা এখনই কমানো না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি ৩ সেকেন্ডে একজন মানুষ মারা যাবে। এটি এখন বৈশ্বিক সংকটে রূপান্তরিত হয়েছে। বড় ধরনের সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ঠেকাতে টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ নিতে হবে। এএমআরের কারণে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ প্রাণহানি হতে পারে। এটি প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এছাড়া এএমআর সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। 

আমাদের দেশের গ্রামগুলোয় শিগেলা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠার নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন না করা, পানির পাত্র উন্মুক্ত রাখা ও হাত ধোয়ার সাবান ব্যবহার না করার কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা শিগেলার ঝুঁকিতে পড়ে। নলকূপ বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সুপেয় পানির প্রাথমিক উৎস। একটি অগভীর নলকূপ পার্শ্ববর্তী দূষিত পানির উৎসের মাধ্যমে দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার গভীর নলকূপের পানি গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রেও প্লিসিওমোনাস ও এস সোনেইরের (শিগেলার এক ধরনের স্ট্রেইন) উপস্থিতি থাকে।

অ্যান্টিবায়োটিকের বিষয়ে গণসচেতনতার বিষয়টিও রয়েছে। আইসিডিডিআর,বির মতে, শিগেলা জীবাণুতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স গড়ে ওঠা খুব উদ্বেগজনক। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি মানুষ ও গবাদিপশুর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অপপ্রয়োগের সঙ্গে জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় আমাশয় চিকিৎসায় অ্যাজিথ্রোমাইসিন বেশি ব্যবহার করা হয়। ওষুধের দোকানদাররা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই রোগীদের অ্যাজিথ্রোমাইসিন দেয়। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে সিপ্রোফ্লক্সাসিন দিয়ে চিকিৎসা করা হতো। ব্যাকটেরিয়া এ ওষুধকে প্রতিরোধ করায় পরে অ্যাজিথ্রোমাইসিন ব্যবহার শুরু হয়, তাতেও রেজিস্ট্যান্স গড়ে উঠেছে। 

এছাড়া এএমআরের ক্ষেত্রে মানবদেহে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালসের অপপ্রয়োগের বাইরেও বড় কারণ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো না হলে সেখানে যারা অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে তা প্রকৃতিতে প্রবাহিত হয়। প্রকৃতিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া এ সামান্য অ্যান্টিবায়োটিকে ধ্বংস হয় না। এর বিপরীতে অ্যান্টিবায়োটিকের সংস্পর্শে এসে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। জীবাণুর জিন ওষুধের বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালী হয়ে যায়। এক্ষেত্রে শুধু অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে নয়, যেকোনো ওষুধের অতিমাত্রায় ও অপপ্রয়োগের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক প্রয়োগ না হলে তা মাটি বা পানিতে গিয়ে মাছ কিংবা বিভিন্ন পোকামাকড়ের মাধ্যমে মুরগি বা অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে গিয়ে আবার মানুষের পেটে ফিরে আসে। অ্যান্টিবায়োটিক আছে এমন মাটিতে থাকা গাছের ফল খেলেও মানুষের ভেতর প্রবেশ করে ব্যাকটেরিয়াটি। প্রকৃতিতে অ্যান্টিবায়োটিকের এ চক্রকে বুঝতে হবে। এজন্য সম্মিলিতভাবে কাজের ক্ষেত্রে পুরো চক্রকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা প্রয়োজন। এটি এখন আর শুধু ওষুধ ও চিকিৎসকের পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তবে অ্যান্টিবায়োটিকের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা জরুরি। এজন্য সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরামর্শ দিতে হবে। একজন ফার্মাসিস্টের উপস্থিতিতে মডেল ফার্মেসিরও যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আবার শুধু মডেল ফার্মেসির দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলে হবে না। সব ওষুধের দোকানেই যেন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া ওষুধ বিক্রি করা না হয় সেটি কঠোরভাবে তদারক করতে হবে। 

বিশ্বনেতাদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে বিষয়টিকে তুলে ধরার জন্য কাজ করা হচ্ছে, কিন্তু এক্ষেত্রে কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হলেও এটি স্পষ্ট যে এ ব্যাপারে আরো উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ দেশের এএমআর বিষয়ে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এসব বাস্তবায়নের জন্য অর্থপূর্ণ সহায়তা প্রয়োজন। এজন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতায় এএমআর গুরুত্ব পাওয়া উচিত এবং ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মাল্টি-পার্টনার ট্রাস্ট ফান্ড পছন্দের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এএমআরের জন্য বিশ্ব ও জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী বিনিয়োগ পরিস্থিতি তৈরি করা দরকার। বৈশ্বিকভাবে এএমআর মোকাবেলায় এ পদক্ষেপগুলো নিঃসন্দেহে জরুরি।

রোগের জীবাণুর নানা ধরন আবিষ্কার হওয়া রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে গবেষণা বৃদ্ধির তাগিদ দেয়। এক্ষেত্রে যেহেতু বিষয়টি আন্তর্জাতিক সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে, তাই উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশের সমন্বয়ে বিস্তারিত গবেষণা হওয়া উচিত। অণুজীব তার গতিপথ পাল্টাতেই পারে, কিন্তু জীবাণুর উত্থানে মানবসভ্যতা যেন পরাজিত না হয় সেটি সতর্কভাবে নজরদারি করা প্রয়োজন। এজন্য স্বাস্থ্য খাতের উন্নতিতে সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা প্রয়োজন, সেই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ভালো করতে হবে। সর্বোপরি সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।