বিশ্বের মোট আয়তনের ৭০ ভাগই জলবেষ্টিত হলেও অনেক দেশে বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতাই এখন একটি ভীষণ জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এক হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের চার বিলিয়ন মানুষ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পানি সংকটে ভোগে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি কিছুটা সত্য। নগরজীবন থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ, উপকূল—সর্বত্রই পানি সংকট বাড়ছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া তিনদিনের আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনে বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। সবার জন্য নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতে টেকসই পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। নীতিনির্ধারকদের এক্ষেত্রে সক্রিয়তা দরকার।
পুরো বদ্বীপটি জালের মতো অসংখ্য নদ-নদী দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় বাংলাদেশকে বস্তুত ‘পানির দেশ’ বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু এখানে দুই দশক ধরে পানির সংকটই প্রকট হয়ে উঠছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ দায়ী। এর মধ্যে অন্যতম জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখানেও বড় মাত্রায় বিরাজমান। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। এতে উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে লবণাক্ততার প্রকোপ তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বর্তমানে এটি অন্যতম সংকট হিসেবে উপস্থিত। এ কারণে সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ খুলনা বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলায় জনজীবনে নিরাপদ পানির দুষ্প্রাপ্যতা দেখা দিয়েছে। পরিবর্তিত জলবায়ুতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরম্পরা যেমন বাড়বে, তেমনি মিঠাপানির প্রাপ্যতাও আরো কমতে থাকবে। এটি উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ভবিষ্যতের বড় বিপদ চিহ্ন বৈকি। বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড এবং দূষণও একটি কারণ। দেশের নদ-নদী প্রভাবশালীদের বেদখলের পাশাপাশি নানাভাবে দূষণের শিকার। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত অবস্থায় শিল্পবর্জ্য নদ-নদীতে ফেলছে, মানববর্জ্যও বিভিন্নভাবে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদ-নদীতে যেটুকু পানিপ্রবাহ রয়েছে তাও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, যারই একটি মূর্ত রূপ আজকের সংকট। ভূগর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহারও এ সংকটের জন্য অনেকাংশে দায়ী। শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী ও জলাধারগুলো শুকিয়ে যায়। সেজন্য কৃষিকাজে সেচের জন্য সেখানকার মানুষ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে বেশি পানি উত্তোলন করে। দিন দিন এ নির্ভরশীলতা বেড়েই চলছে। এর সঙ্গে আঞ্চলিক পানি রাজনীতিও যুক্ত। আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুসারে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অভিন্ন নদীগুলোয় পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার কথা থাকলেও ভারত অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত মাত্রায় পানি ছাড়ে না। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলে নদীতে প্রবাহ সংকটের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছে। এতে আর্সেনিকের মতো স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বিশুদ্ধ পানির দুষ্প্রাপ্যতাও প্রকট হচ্ছে। দিন যত যাবে, নিরাপদ পানির সংকট বাড়বে বৈ কমবে না। কাজেই বিদ্যমান উন্নয়ন ডিসকোর্সে পানিকেন্দ্রিক সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার প্রতিফলন জরুরি।
পানি এমন এক মৌলিক প্রাকৃতিক সম্পদ, যা ছাড়া জীবন অচল। কৃষি, শিল্প ও মানুষের জীবনধারণ সবক্ষেত্রেই পানি তথা মিঠাপানি প্রয়োজন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নবতর রূপান্তরের সুবাদে এর চাহিদা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। এ অবস্থায় পানির আধারগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ প্রয়োজন। বিশেষত নদ-নদীগুলোতে প্রবাহ নিশ্চিত করতে এবং যতটুকু প্রবাহ রয়েছে, তা দূষণমুক্ত রাখার বিকল্প নেই। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনও যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা চাই। বাংলাদেশ যে বিশ্বের শীর্ষ দশ বৃষ্টিবহুল দেশের একটি, বৃষ্টির পানির ব্যাপারে আমাদের সাংস্কৃতিক ও কারিগরি প্রবণতা দেখে তা বোঝার অবকাশ নেই। অথচ এত পরিষ্কার ও সুপেয় পানি আর কোনো উৎস থেকে পাওয়া যায় না বলে বিশ্বজুড়েই বৃষ্টির পানির কদর সবচেয়ে বেশি। খাল, বিল, পুকুর ও শহরে ভবনে ভবনে সংরক্ষণাগার বাধ্যতামূলক করে বৃষ্টির পানি কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায়, তার উপায় সন্ধান করতে হবে। রোধ করতে হবে পানির অপচয়ও। নিত্যব্যবহার্য পানি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে পুনরায় ব্যবহার সিঙ্গাপুরসহ কিছু দেশে হচ্ছে। পানির অপচয় রোধ ও পুনর্ব্যবহারে এ ধরনের প্রযুক্তি বিনিময় করা যেতে পারে।
পানি সংকট মোকাবেলায় বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো পর্যালোচনার সময় এসেছে। ইসরায়েল তেল আবিবের দক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের সৈকতের ১০ মাইলজুড়ে সোরেক নামে একটি বৃহৎ লবণাক্ত নিরোধক প্লান্ট স্থাপন করেছে, যা বিপুল পরিমাণ পানি সরবরাহ করতে সমর্থ। এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ আধুনিক প্লান্ট, যা কিনা দেশটির জনগণের ২০ শতাংশ পানির চাহিদা পূরণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়ও লবণাক্ততা নিরোধক প্লান্ট নির্মাণ করা হয়েছে। পানিকেন্দ্রিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এসব বিষয় আমলে নেয়া যেতে পারে। অবশ্য তার জন্য চাই বিপুল বিনিয়োগ। পানি সম্মেলনে উপস্থিত বক্তারাও পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছেন। এটি বিবেচনায় রাখতে হবে। বারবার হাত ধোয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কভিড-১৯ মহামারী পানির অপরিহার্যতা আরো বেশি মাত্রায় নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের বিকল্প নেই।










