খাদ্যে মোটা দাগে ছয়টি উপাদান যেমন—শর্করা, আমিষ, চর্বি, খনিজ, ভিটামিন ও পানির কথা আমরা কম-বেশি জানি। দেহের বৃদ্ধি, উন্নয়ন ও কর্মক্ষমতায় এসব উপাদানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা আছে। তবে শুধু এ উপাদানগুলো কোনো খাবারে থাকাই যথেষ্ট নয়; এসব উপাদানের গুণগত মান, মানবদেহে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও পরিণতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেহের সংক্রমণ ও অসংক্রমণশীল রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী এসব উপাদান। খাবার ভোক্তার সামনে আসার আগে এসব উপাদানকে নানা রূপান্তরের মাধ্যমে আসতে হয়। আদিকাল থেকে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত যেতে অনেক উদ্ভাবন চলে আসছে। তবে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের যুগে খাদ্যের সঙ্গে নতুন একটি বিশেষণ ‘নিরাপদ’ যুক্ত হয়ে ‘নিরাপদ খাদ্য’ রূপ ধারণ করেছে। ঐতিহাসিকভাবে এটা জানা যে সবকিছুই অনিরাপদ; এটি কেবল মাত্রা (ডোজ), যা অনিরাপদ থেকে নিরাপদতাকে আলাদা করে। যেমন পানির আরেক নাম জীবন, তবে অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ে (২-৩ ঘণ্টা) যদি প্রচুর পরিমাণে (৪-৫ লিটার) পান করা হয়, তবে সে পানিও বিষাক্ত বা অনিরাপদ। পানির মতো, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ‘ভিটামিন-এ’র মতো খুব ভালো ফাইটোকেমিক্যালস তীব্র বিষাক্ত প্রভাব হতে পারে, যা হেপাটোক্সিসিটির দিকে পরিচালিত করে বা দীর্ঘস্থায়ী উচ্চস্তরের একটি প্রো-অক্সিডেন্ট প্রভাব ফেলতে পারে এবং ‘ভিটামিন-এ’র অতিরিক্ততায় মানবদেহে অস্টিওপরোসিস ত্বরান্বিত হয়। তাই নিরাপদ খাদ্য হলো খাদ্যগ্রহণের সময় তাতে মানবদেহে রোগ সৃষ্টিকারী ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক উপাদানের অনুপস্থিতি বা দেহের জন্য সহনীয় মাত্রার উপস্থিতি এবং এসব উপাদান অসহনীয় মাত্রায় থাকলে তা নিরাপদ নয়। এসব উপাদান খাদ্যে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃতভাবে আসতে পারে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু বাংলাদেশেই নয়, উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত সব দেশেই নতুন নতুন আইন হয়েছে। যেমন বাংলাদেশে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’, যুক্তরাষ্ট্রে ‘নিরাপদ খাদ্য আধুনিকায়ন আইন (এফএসএমএ), ২০১১’, ভারতে ‘ফুড সেফটি ও স্যান্ডার্ডস আইন, ২০০৬’ ইত্যাদি আইন রয়েছে, যা বাস্তবায়নের জন্য নানা কর্তৃপক্ষও গঠন করা হয়েছে। আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কতটুকু সফলতা পাওয়া গেছে তা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে, তবে পুরোপুরি যে সফল হয়নি, তা হলফ করে বলা যায়। সফলতা না পাওয়ার জন্য দেশ, সময়, জনগোষ্ঠী ও  খাদ্য সংস্কৃতির মতো বহু কারণ জড়িত। খাবার টেবিলে আসার আগে খাদ্য সরবরাহ শিকলের যেকোনো অবস্থানে কোনো কারণে অনিরাপদ হলে তা খাবার বলা কতটুকু সমীচীন, তা প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ খাদ্যের মাধ্যমে প্রত্যাশিত চাহিদা পূরণ না হলে খাদ্য হিসেবে তার উপযোগিতা থাকে না। এ প্রবন্ধে খাদ্য অনিরাপদ হওয়া যাচাই করতে খাদ্য ব্যবস্থা যেমন উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন, খাদ্য রূপান্তর, পরিবেশন, পুনর্ব্যবহারের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার ঝোঁক ও ঝুঁকির একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে, অংশীজনদের সচেতন করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।

খাদ্য উপাদানের মান: খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহূত জাত ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনাও নিরাপদ খাদ্যের জন্য জরুরি। যেমন আমাদের খাদ্যের মূল উপাদান শর্করার প্রধান উৎস ধান, গম ও আলু। আঁশের পরিমাণ দ্বারা শর্করার মান যাচাই করা হয়। যেমন লাল চাল বা সম্পূর্ণ দানার চাল বা আটায় আঁশ বেশি থাকে। কিন্তু বর্তমান সময়ের পলিশ করা সাদা চালে আঁশ কম থাকে। কম আঁশের চালের খাবার গ্রহণের পর খাদ্য দ্রুত হজম হয়, ক্ষুধাও পায় দ্রুত। খাদ্য ভাঙনের ফলে উৎপাদিত রিঅ্যাকটিভ কার্বন শরীরের অভ্যন্তরে লাইপোলাইসিস প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। এতে শরীরে দ্রুত অপ্রত্যাশিত ফ্যাট তৈরি করে, যার আধুনিক নাম স্থূলকায়তা। এখন প্রায়ই শ্রমজীবী মানুষেরও পেট মোটা দেখা যায়। সম্পূর্ণ দানার চাল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো হলেও খাদ্য সংস্কৃতি বিবর্তনে এখন ভোক্তাদের খাবার টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে কম আঁশের সাদা চাল। আধুনিক পুষ্টিবিদ্যায় গ্লাইসেমিক সূচক ও লোড নামে খাদ্য মূল্যায়ন নির্ণায়ক আছে। কোন খাবার কত দ্রুত রক্তে কতটা শর্করা বাড়াতে পারে তারই সূচক হলো গ্লাইসেমিক। ডায়াবেটিস রোগীর জন্য কোনটা খাওয়া ভালো কোনটা খারাপ, তা এ সূচকের ওপর নির্ভর করে। নিরাপদ গ্লাইসেমিক সূচকের মান ৫০ বা তার নিচে। সাদা চাল নিরাপদ নয়। ফলে অনেক ডায়াবেটিস রোগীকে বলতে শোনা যায়, আমি ভাত খাই না, রুটি খাই। অথচ বর্তমানে বাজারে যে আটা পাওয়া যায় তার গ্লাইসেমিক সূচক সাদা চালের (৭০-৭৫) চেয়েও বেশি (৭০-৮০)। আবার আটায় গ্লোটেন নামে বিষাক্ত উপাদান আছে। আবার বিশেষ বিশেষ সময়ে ফলাও করে বলা হয়, ভাতের পরিবর্তে আলু খান। এটা খুবই বিপজ্জনক পরামর্শ। কারণ আলুর গ্লাইসেমিক সূচক ৯০-১০০। আমাদের ব্রি-ধান ২৯ জাতের চালে গ্লাইসেমিক সূচক উচ্চ (>৭০)। আবার সাদা চাল আভিজাত্যের খাবার হিসেবে এ দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সম্পূর্ণ দানার চাল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো কিন্তু খাদ্য সংস্কৃতির এমন বিবর্তন হয়েছে যে এ চাল দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করলে বিড়ম্বনায় পড়া স্বাভাবিক। এমনকি বাড়ির গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর হয়তো সম্পূর্ণ দানার চালের ভাত খেতে চাইছেন, এ  বিষয়ে দেখা যায় যে একে অন্যের চাওয়ার ব্যাপারে নির্বিকার। আবার তাদের সন্তানরা হয়তো এ বিষয়ে একেবারে উল্টো। তাদের পছন্দ পিত্জা, বার্গার, স্যান্ডউইচ, ফ্রেঞ্চফ্রাই, চিকেন ফ্রাই ইত্যাদি প্রক্রিয়াকৃত খাবার। আবার কোনো গৃহকর্মীকে এ চালের খাবার দিলে নির্যাতনের অভিযোগ আসবে নিশ্চিত করে বলা যায়।

খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতি: হরেক রকমের তাজা সবজি খাওয়ার জন্য পুষ্টিবিদরা পরামর্শ দেন। কারণ সবজি ভিটামিন ও খনিজের সহজ উৎস। দেশে সবজি যেভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন হয়, তাতে নিশ্চিত করে বলা যায় যে উৎপাদিত পণ্য কোনো অবস্থাতেই নিরাপদ নয়। যেমন সবজি ও ফল উৎপাদনে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ব্যবহার হয়। এতে পাতাজাতীয় সবজি প্রক্রিয়াকরণের পর মুখগহ্বরে খাদ্যের অবস্থিত নাইট্রেট যৌগমূলক নাইট্রাইটসে রূপান্তরিত হয়, যা দেহের লোহিত কণিকার কার্যকারিতা কমায়। আবার এটা পরিপাকতন্ত্রে নাইট্রোসোঅ্যামাইনে রূপান্তর হয়, যা অন্ত্রে ক্যান্সারের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্ব্বিত করে। অতিরিক্ত নাইট্রাইট পানির সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে তা খাবার পানির নাইট্রেট ঘনত্ব বাড়ায়, যা পান করা বিপজ্জনক। আবার সবজি ও ফলকে বিভিন্ন বালাই থেকে রক্ষার জন্য অর্গানোফসফরাস ও কার্বামেট-জাতীয় কৃত্রিম বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। তথাকথিত আগাছা দমনের নামে উপকারী উদ্ভিদ ধ্বংস করে খাদ্য ও পরিবেশ ধ্বংসকারী দ্রব্য গ্লাইফসেট। খাদ্য ব্যবস্থায় এদের প্রভাবে কৃষিকর্মী ও শিশুর স্নায়ু কার্যক্রম হ্রাস পায়। শিশুর ক্যান্সার, অটোইমিউন রোগ, শ্বাসকষ্ট, মাংসপেশির খিচুনি, মাথাব্যথা ও ঝিমুনি হয়। মাছ, দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে ব্যবহূত অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। গবেষকরা অ্যান্টিবায়োটিকের এমন ব্যবহার বহু ড্রাগ প্রতিরোধিতার প্রমাণ পেয়েছেন। আবার ধান, সবজি ও মাছ উৎপাদনে শিল্পবর্জ্যের দূষণ নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তিতে বড় বাধা। প্রাকৃতিক জলাশয়ে তাজা ও জীবিত দেশীয় ছোট মাছ অনেকেই পছন্দ করেন। ভেবে দেখুন তো, ঢাকার আশেপাশের শিল্প অধ্যুষিত জলাভূমি থেকে সংগৃহীত দেশী মাছে কী থাকতে পারে?

প্রক্রিয়াকরণ মান: খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে নানা ধরনের উদ্ভাবনা অব্যাহত আছে। প্রক্রিয়াজাত আধুনিক খাবার ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই খুবই বিপজ্জনক। কারণ আমিষ ও শর্করা একসঙ্গে ১২০-১৪০ সেলসিয়াস তাপমাত্রার তেলে ভাজা হলে খাবার সুস্বাদু, সুগন্ধ ও মচমচে হয়। তবে এর সঙ্গে এক্রালিমাইড উত্পন্ন হয়। এই এক্রালিমাইড মানব জেনেটিক কোড পরিবর্তন ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানকে সক্রিয় করে তোলার ক্ষমতা বাড়ায়, যার প্রভাব আমাদের স্নায়ু, দেহ ও প্রজননের ওপর সরাসরি পড়ে। আবার দেশে যেভাবে সবজি বা অন্যান্য খাবার রান্না করা হয়, তাতে ফাইটোকেমিক্যাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানের প্রাপ্যতা নষ্ট হয়।

তথ্যবিভ্রাট ও প্রচারমাধ্যম: চর্বি ও ভিটামিনের কথাই ধরা যাক। সম্পৃক্ত চর্বি বা ফ্যাটি অ্যাসিড, ট্রাইগ্লিসারইড স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়। অসম্পৃক্ত চর্বি (ওমেগা ৩ ও ৬ ফ্যাটি অ্যাসিড) গ্রহণ অত্যাবশ্যক ও নিরাপদ। ফ্যাটি অ্যাসিড তাপ দিলে নানা ধরনের জটিল যৌগ উৎপাদন হয়, যার মাধ্যমে খাদ্য অনিরাপদ হয়। আবার পর্যাপ্ত ভিটামিন অত্যাবশ্যক হলেও অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করা নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ নিম্ন আয়ের মানুষের ‘ভিটামিন-এ’র অভাব আছে। ফলে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা সমস্যা সমাধানে বেপরোয়া হয়ে নানা কর্মসূচি নিচ্ছে। দেশে ভোজ্যতেলের মাধ্যমে ‘ভিটামিন-এ’ গ্রহণ করার কর্মসূচি আছে, যাতে ভোজ্যতেল বোতলজাত করে ‘ভিটামিন-এ’ নিম্ন আয়ের মানুষকে সরবরাহ করার লক্ষ্য হলেও তাদের এ ভোজ্যতেল ক্রয় করার সামর্থ্য বা প্রবণতাও নেই। ফলে যাদের ‘ভিটামিন-এ’ দরকার নেই, তারাই এই  তেল গ্রহণ করছে। অতিরিক্ত ‘ভিটামিন-এ’ গ্রহণের জন্য মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাবের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। আবার দেখা যাক চিনি খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিদিন একজন মানুষের ২৫ গ্রামের বেশি চিনি গ্রহণ করা নিরাপদ নয়। প্রতিদিন একজন মানুষ পাঁচ কাপ দুধ চা পান করলে ২৫ গ্রাম চিনি খাওয়া হয়। একটা মিষ্টি খেলে বা ৩৩০ মিলি কোমল পানীয় পান করলে ৩৫ গ্রাম চিনি খাওয়া হয়। এই অতিরিক্ত চিনিই শরীরের জন্য নিরাপদ নয়। দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন অনেক গুণ বেড়েছে। শহর-বন্দর-গ্রামে মানুষ প্রক্রিয়াজাত খাবার, পানীয় ও খাবার উপযোগী বিলাস পণ্য গ্রহণের দিকে ঝুঁকছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭ সালের তথ্য বলছে, দেশের মানুষের ২০ শতাংশ ক্যালরি বাইরের খাবার থেকে আসছে, কোমল পানীয় ও চিনিযুক্ত খাবার এর অন্যতম উৎস। এসব খাবার গ্রহণের মাত্রা নিয়ে উপযুক্ত তথ্য নেই। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে প্রায়ই প্রচার করা হয়, একটি ক্রিমে সব ধরনের ভিটামিন পাওয়া যায়। ফলে কোনো ভোক্তা যদি ক্রিম খাওয়া শুরু করে, তবে পুষ্টিবিদদের কিছুই করার থাকবে না। তেমনি একটি বহুজাতিক কোম্পানি শিশুদের দানাদার খাবারের বিজ্ঞাপনে সব পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে এমন প্রচার করছে। এতে শিশুদের মা-বাবাকে সে খাবার পরিবেশন করা থেকে বিরত রাখা কঠিন হবে।

আধুনিক বাসনকোসন ও মোড়কায়ন: পানি সরবরাহ, ব্যবহার ও পান করার পদ্ধতি আধুনিকায়ন হয়েছে। পানির মতো দুধ, জুস, কোমল পানীয় সরবরাহ থেকে মোড়কায়ন করে গ্রহণের আগ পর্যন্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার করা পানীয় কতটুকু নিরাপদ? প্লাস্টিকের মূল উপাদান বিসফেনল। এ উপাদান দেহের অ্যান্ড্রোক্রাইন গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত অ্যাস্ট্রোজেনকে সহজে বিতাড়িত করে তার স্থান দখল করে এবং বন্ধ্যত্বকে ত্বরান্বিত করে। দেশে খাদ্য প্রস্তুতকরণে অ্যালুমিনিয়ামের বাসনকোসনের ব্যবহার হয়। যেমন পানি ফুটানো, ভাত-তরিতরকারি রান্না ইত্যাদি। তাপে অ্যালুমিনিয়াম পানিতে বা খাবারে আসে। একজন ৬০-৭০ কেজি ওজনের মানুষের অ্যালুমিনিয়াম গ্রহণের নিরাপদ মাত্রা প্রতিদিন ৬০-৬৫ মিলিগ্রাম, দেশে গড়ে তা ২০০ মিলিগ্রামেরও বেশি। সহনীয় মাত্রার বেশি অ্যালুমিনিয়াম স্মৃতিভ্রমতা ও অন্ত্রের খাদ্য পরিশোষণ ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। আর পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতিতে অটিজমের ক্লিনিক্যাল প্রমাণ পাওয়া গেছে। ননস্টিক ফ্রাইপ্যানে ব্যবহূত PFOA তাপে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে আসে, এটি দেহে ক্যান্সার তৈরির উপাদান। বাংলাদেশে সে ফ্রাইপ্যান অহরহ ব্যবহূত হচ্ছে, আমেরিকায় নিষিদ্ধ হয়েছে ২০১২ সালে।

দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ১ হাজার ৫১৬টি আইন বিদ্যমান। তবু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হয়নি। পৃথিবীর কোথাও আইন প্রয়োগ করে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়নি। খাদ্য নিরাপদ করতে খাদ্য ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ (ব্যবহূত উপকরণ ও তার ব্যবহার পরিবেশ) যেকোনো মূল্যে নিরাপদ করতে হবে। এজন্য দরকার খাদ্য ব্যবস্থায় অংশীজনদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। সেখানে গৃহিণীর যেমন সচেতনতা দরকার, তেমনি একজন নীতিনির্ধারকের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন ধান আমাদের প্রধান ফসল কার্বোহাইড্রেটের সিংহভাগ জোগান দেয়। ধানের কোনো জাত অংশীজনদের কাছে দেয়ার আগে এর গুণগত মান বিশেষ করে এর সর্বশেষ রূপান্তর পর্যন্ত আঁশের মান ও গ্লাইসেমিক মান যাচাই করা উচিত। আবার ফসল উৎপাদনে ব্যবহূত বালাইনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সামাজিক ও আইনি সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি খাদ্য বিষয়ে বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু কী হবে, তার যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রাখা উচিত। খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং সুস্থ জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে। আমরা ২০৩০-এর মধ্যে স্থায়িত্বশীল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও ২০৪০ সালের মধ্যে জনমিতিক লাভের মোকাবেলা করতে খাদ্য হওয়া চাই নিরাপদ ও পুষ্টিসংবেদনশীল, যার মাধ্যমে একটি সুস্থ জাতি গড়ে উঠবে। এখানে কোনো ধরনের অবহেলা বা শৈথিল্য বড় বিপদ ডেকে আনবে। আমরা এরই মধ্যে টের পেতে শুরু করেছি। আমরা খাদ্যকে খাদ্য বলতে চাই। খাদ্যের আগে কোনো বিশেষণ দেখতে চাই না। সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনের জন্য শক্তিশালী ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা সবার প্রাণের চাওয়া।

 

ড. মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

জৈব কৃষি গবেষক, বারি, গাজীপুর