প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার স্বচ্ছতার জন্য উপযুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এর ধারাবাহিকতায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিধিবিধানের যথাযথ পরিপালন করা হচ্ছে না। বিষয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির দিকগুলোকে উৎসাহিত করে।

শিক্ষার্থী অনুপাতে দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় উচ্চশিক্ষা অবকাঠামো পর্যাপ্ত না হওয়ায় উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীর চাহিদা মেটাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। যদিও হাতে গোনা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকিদের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আইন অনুযায়ী ট্রেজারার ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজ মনোনীত কর্মকর্তার যৌথ স্বাক্ষরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল পরিচালিত হওয়ার কথা। অথচ অভিযোগ রয়েছে দেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তা মানছে না। বরং তহবিল পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রাস্টি চেয়ারম্যান কিংবা সদস্যদের স্বাক্ষরে। ফলে একক নিয়ন্ত্রণ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন অনেক ট্রাস্টি সদস্য। শিক্ষার্থীদের বেতন-ফির টাকায় নামে-বেনামে নানা সুবিধা ভোগ করছেন তারা। বলা যায়, এসব অনিয়ম ঢাকতেই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মনোনয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকা বিবেচনায় নিচ্ছে না অনেক প্রতিষ্ঠান।

আইন অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের আর্থিক হিসাব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে (ইউজিসি) জমা দিতে হয়। অথচ ২০১৮ সালে ৮৫ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই আইনে বর্ণিত নির্দেশনা মেনে আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেয়নি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের প্রমাণ মিলছে বিভিন্ন সময়ের ইউজিসির তদন্তেও। অভিযোগ রয়েছে, এসব তদন্ত প্রতিবেদন চাপা পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এমনকি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে করা তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ার সুযোগ নিচ্ছে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা, গবেষণার মানোন্নয়নে মনোযোগী হওয়ার বদলে পরিণত হচ্ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে আইনের অধীন পরিচালিত, সে আইনেই আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিশনে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্যই এ ব্যবস্থা। কেননা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে শিক্ষার্থীদের ফি-বেতনের টাকায়। সে অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তার নিরীক্ষিত হিসাব রাখা জরুরি। আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা একেবারেই কাম্য নয়। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক আর্থিক বিবরণী (বার্ষিক বাজেট) শিক্ষক, ছাত্র কারো কাছেই উন্মুক্ত ও প্রকাশিত নয়। এমনকি তারা এটাও জানে না যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের কত অংশ আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় হচ্ছে। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসিতে বার্ষিক আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয় না; এমনকি যা দেয় তার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনে বর্ণিত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট নীতি অনুসরণ করার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই নিশ্চিত করতে হবে।

উচ্চশিক্ষা কখনই বিনিয়োগ ও মুনাফা লাভের অন্যতম মাধ্যম নয়। বরং এখানে গুণমান সমৃদ্ধ শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, যারা অডিট রিপোর্ট দেবে না তাদের বিরুদ্ধে ৪৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। তাই যারা অডিট রিপোর্ট দিচ্ছে না, তাদের কড়া সতর্কবার্তা দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আইন অমান্য করার যে ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা গুণগত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হলে আর্থিক স্বচ্ছতা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। যারা আইন মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেক্ষেত্রে কে প্রভাবশালী, কে প্রভাবশালী নয়, তা মুখ্য না। কারণ কেউ স্বচ্ছতার বাইরে নয়। সবাইকে আইন মানতে হবে।