নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে দেশে কমিউনিকেটিভ সিস্টেমে মাধ্যমিকের ইংরেজি পাঠ্যপুস্তকে একটি শর্টকাট পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়েছিল। এ শর্টকাট পদ্ধতি অনলাইনে এখনো দেখা যায়। সেটি হলো, একটি রচনা বা প্যারাগ্রাফ মুখস্থ করলে তা দিয়ে আট-দশটি রচনা বা প্যারাগ্রাফ লেখা যাবে। যেমন অবসর, সামাজিক সমস্যা, নীতিকথা, জীবনের লক্ষ্য বা ভ্রমণকেন্দ্রিক একটি রচনা মুখস্থ করলে এটি দিয়ে কয়েকটি রচনা লেখা যাবে বলে কোনো কোনো কোচিং বা শিক্ষকরা তখন উপায় বাতলে দিতেন শিক্ষার্থীদের। একবার আমার এক পরিচিত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় মুখস্থ করে গেছে জার্নি বাই ট্রেন, যথারীতি পরীক্ষার সিটে বসেছে। প্রশ্নপত্র দেখে সে হতাশ, কারণ পরীক্ষায় এসেছে জার্নি বাই বোট। উপায় খুঁজে না পেয়ে পাশে বসা বন্ধুর কাছে জিজ্ঞাসা করল, কী করবে! ওই বন্ধু তাকে কোচিং থেকে শেখানো এক রচনায় অনেকগুলো লেখার ফরম্যাটের বুদ্ধি মনে করিয়ে দিল। এ বুদ্ধি ছেলেটির পছন্দ হলো। সে জার্নি বাই ট্রেন রচনায় ট্রেনের জায়গাগুলোয় বোট বসিয়ে পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরল। ফল প্রকাশের দিন শিক্ষক বেত হাতে নিয়ে ওই ছেলেকে ডেকে পাঠালেন। তাকে খাতা দেখানো হলো, সব প্রশ্নের উত্তরে সে মার্কস পেয়েছে, কেবল রচনায় পেয়েছে শূন্য। যখন বুঝতে পারল ট্রেন আর নৌকা এক নয়, তখন আর সংশোধনের সময় নেই। 

এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক ওই গৎবাঁধা ফরম্যাটের রচনার মতো হয়ে গেছে। আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব, মেডিকেলে পড়ব, ইংরেজি সাহিত্যে পড়ব কিংবা অর্থনীতি বা কৃষিতে পড়ি না কেন—এসব বোঝার সময় নেই, যেটা দরকার তা হলো সরকারি চাকরি এবং এর গাইড। যে গাইডে মিলবে সব সমস্যার সমাধান, সাফল্যের একমাত্র চাবি। আগে এক রচনা মুখস্থ করলে পাঁচটা লেখা যেত, আর এখন একটা গাইড মুখস্থ করে জীবন রচনায় সফলতা লেখা যাচ্ছে। যে বিষয়ে, যেখানেই পড়াশোনার সুযোগ হোক না কেন, ধ্যান-জ্ঞান-মননে প্রজন্মের চাহিদা গিয়ে ঠেকেছে সরকারি চাকরি গাইডে। আর এ চাকরিতে সর্বোচ্চ গন্তব্য হয়েছে বিসিএস। এখন যে শিক্ষার্থী রুয়েট বা কুয়েটের সিভিল বা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছে অথবা যে মেয়েটি মেডিকেল থেকে ডাক্তারি পাস করে বের হলো, তাকে কেন পুলিশ বা ইকোনমিক ক্যাডারে চাকরি করতে হবে! হ্যাঁ, ঝটপট উত্তর হিসেবে একটা কথাই বলতে পারেন ক্ষমতা, দেশের প্রেক্ষাপটে হয়তো এটিই প্রাধান্য পাচ্ছে। তাই বলে দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে অর্জিত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান লাভ করে সমাজ, পরিবার বা নিজের জন্য কি কাজে লাগছে? পরিস্থিতি অনেকটা খাঁজকাটা গল্পের মতো, আমাকে যে বিষয়েই কথা বলতে দেয়া হোক না কেন, বক্তব্যের শেষাংশে বলে দিলাম—‘আমার বাড়ির পাশে নদী, নদীতে একটা কুমির ছিল, কুমিরের চারটা পা, দুটো চোখ, কুমিরের গা খাঁজকাটা, খাঁজকাটা....খাঁজকাটা।’ যে বিষয়েই আমি পড়াশোনা করি না কেন, দিনশেষে আমাকে ক্যাডার হতে হবে, সরকারি চাকরি পেতে হবে। না হলে এ জীবন যেন বৃথা! একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বা পদার্থ বিজ্ঞানে, কিন্তু প্রথম বর্ষ থেকেই হাতে তুলে নিয়েছে বিসিএস প্রিলিমিনারির বই। যে শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস জীবনের শুরুতেই ধরে নিয়েছে চাকরিই সব, এটা ছাড়া গতি নেই। মূলত বিপত্তিটা আমাদের এখান থেকে শুরু।

একটা হিসাব কষা যাক, সর্বশেষ ৪৫তম বিসিএসে প্রায় তিন লাখ আবেদন জমা পড়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। এ বিসিএসে মোট ২ হাজার ৩০৯ জন ক্যাডার নেয়া হবে। আর নন-ক্যাডারে চাকরি পাবেন আরো ১ হাজার ২২ জন। সব মিলিয়ে চাকরি পাবেন ৩ হাজার ৩৩১ জন। বাকি ২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৬৯ জনের কী হবে? ধরলাম, এর অর্ধেক সংখ্যকই পরীক্ষায় কেবল হাজিরা দিতে যাবে, মানে প্রস্তুতি নেয়নি। বাকি অর্ধেক ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৩৪ জন, ধরে নিলাম এর মধ্যেও ৪৮ হাজার ৩৩৪ জন বিসিএস না হলে অন্য সরকারিতে চাকরি পেয়ে যাবে। এর পরও অবশিষ্ট থাকে এক লাখ, তাদের ভাগ্যে কী আছে? এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশই তো শিক্ষাজীবনে সবকিছু ত্যাগ স্বীকার করে কেবল বিসিএস গাইড নিয়েই মুখ ডুবিয়ে একটা বড় সময় পার করে দিচ্ছে। এসব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে আড্ডা দেয়ার সময় পায় না, ঘোরাঘুরির সময় পায় না, সৃজনশীল কাজ বা সংগঠন জাতীয় কিছু করার সময় পায় না, তারা তো সবকিছু থেকেই নিজেদের বঞ্চিত রেখে কেবল চাকরির গাইডটাই চিনেছে। তাদের চাকরি না হলে কী হবে উপায়! ডেসটিনির গল্প নিশ্চয় মনে আছে, এদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রচারণায় চমৎকার একটা ডায়ালগ থাকত, অমুক অমুক সার্কেল ফিলাপ করে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে আপনি লাখ টাকার মালিক হয়ে যাবেন। কী একটা তাজ্জব ফর্মুলা মানুষকে বোঝাত। ঘটনা কিন্তু একেবারে মিথ্যা না, লাখপতি কেউ না কেউ হতেনই। তবে এ সংখ্যা যে হাজারে একজন বা লাখে ১০ জন সেটা একবারও তারা স্বীকার করত না। ডেসটিনির এ স্বপ্নবাজরা সিস্টেমে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখাত, কিন্তু এক লাখের ১০ জন ছাড়া বাকি ৯০ হাজার ৯৯০ জনের পরিস্থিতি কী হবে বলত না। আমাদের শিক্ষার্থীরা সবাই যদি নিজেদের পাঠ্যবিষয় বা জায়গা ভুলে গিয়ে কেবল চাকরির গাইড মুখস্থ করতে বসে যায়, এর ভবিষ্যৎ কী হতে পারে সেটাও একটু ভাবনায় রাখা দরকার। এতক্ষণে হয়তো ধরে নিয়েছেন এ লোকটা বোধহয় কট্টর বিসিএস বিদ্বেষী বা সরকারি চাকরিবিরোধী। বিষয়টা আসলে মোটেও তা নয়। বিসিএস যেকোনো তরুণেরই ড্রিম প্রজেক্ট বা সর্বোচ্চ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য, স্বপ্ন। সুযোগ-সুবিধা, বেতন-ভাতাদি কিংবা অবসরকালীন পেনশনসহ যাবতীয় হিসাব-নিকাশে অবশ্যই সরকারি চাকরিকে এগিয়ে রাখব। কিন্তু তাই বলে সবাইকে সরকারি চাকরি করতে হবে? সবাই কি চাকরি পাবে? সবাই কি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার যোগ্যতা রাখেন? যারা উপযুক্ত বা যোগ্য, তারা তো যাবেনই। পাশাপাশি যাদের ইচ্ছা বা নিজেকে যাচাই করতে চান, তারাও পরীক্ষা দিতে পারেন, চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে সবাইকে কেন একদিকে যেতে হবে! এটা কি অস্বাভাবিক নয়? আপনি বিসিএসের প্রস্তুতি নিলেন কিন্তু হলো না, আবার অন্যদিকে যাওয়ার পথও আপনার বন্ধ। সেই সঙ্গে দেশের অন্যান্য সেক্টর বা উন্নয়নমূলক জায়গাগুলো যোগ্য লোক খুঁজে পাচ্ছে না। 

এই যে চাকরিকেন্দ্রিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই, এর ফলে আমাদের সামনের পরিস্থিতি কী হবে, তা একটু ভাবা দরকার। এ সমস্যায় আমাদের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই কেবল এককভাবে যে দায়ী, তা কিন্তু নয়। নিজের বিদ্যাপীঠ, কথিত সিস্টেম, পরিবার, ছাত্র-অপরাজনীতি কিংবা নিকটজনের ভূমিকাও ওতপ্রোতভাবে প্রভাব ফেলছে। প্রথমত মূল সংকটটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু। একজন শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠিত এবং সুনাগরিক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ব্যাপক। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক যে কারণে ‘বিশ্ব বিদ্যালয়’ হয়ে ওঠে, তা দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই নেই। সেটি হলো গবেষণা। গবেষণায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা বেহাল দশায় আছে, প্রতি বছরের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে এটা স্পষ্ট বোঝা যায়। বলে রাখা ভালো, বর্তমানে দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ৫৮টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, আর সে তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাটাও কম নয়। দায়সারা প্রশাসন, গবেষণাহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থী জীবনের জন্য কী পেতে পারে? উপায়ান্তর না পেয়ে তাই শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েই নিজের মতো করে জীবন গোছাতে নেমে পড়ছে। পাশাপাশি পছন্দের ক্যারিয়ার গড়ার বিষয়ে আমাদের অধিকাংশ পরিবার থেকেই নিরুৎসাহিত করার এ রকম প্রবণতা বরাবরেরই। এর সঙ্গে আমাদের ছাত্ররাজনীতির বেহাল সংস্কৃতি তো রয়েছেই। কেউ ভালো কিছু করতে চাইলে, এগোতে চাইলে জোর করে কান ধরে পার্টি অফিস চেনানোর সংস্কৃতি কিন্তু অপরিচিত নয়। এর পরও ওই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কতটুকু সুস্থ ভাবনা আমরা প্রত্যাশা করতে পারি?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘দ্য গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ট্রেন্ডস ফর ইয়ুথ ২০২২’ প্রতিবেদনে গত বছর বলা হয়, বাংলাদেশী তরুণদের বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে যুবগোষ্ঠীর বড় অংশ আর্থসামাজিক ঝুঁকির মধ্যে আছে। বৈষম্য আর গুণগত শিক্ষার অভাবে ৭৮ শতাংশ তরুণ মনে করেন, পড়াশোনা করে তারা চাকরি পাবেন না, গরিব শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ৯০ শতাংশ। চাকরি, পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণে নেই ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ। 

সাধারণত ১৫-২৯ বছর বয়সীদের তরুণ-যুব জনগোষ্ঠী ধরা হয়। এ বয়সীদের সংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ। ২০২২ সালের ডিজিটাল জনশুমারির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ১৫-২৯ বছর বয়সী এ দেশের যুবকদের সংখ্যা ৪ কোটি ৫৯ লাখ। দেশে প্রতি বছর শ্রমশক্তিতে যোগ হচ্ছে ২০-২২ লাখ তরুণ। মানসম্মত ও সর্বজনীন মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এসডিজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে তিন কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব অবসানে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ সময়ের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতি বছর দেশের অভ্যন্তরে ১৮ লাখ ৪ হাজার এবং বিদেশে পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। যদিও শিক্ষায় লব্ধ জ্ঞান ও কর্মসংস্থানে প্রয়োজনীয় দক্ষতায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। বারবার বলা হচ্ছে, শিক্ষাকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী প্রায় ১৪ শতাংশ, যা ২০৩০ সাল নাগাদ ৩০ শতাংশ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রমকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাত, যেমন তৈরি পোশাক, চামড়া শিল্প, এগ্রো ফুড প্রসেসিং, অটোমোবাইলের মতো শিল্প চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করে এগোলে সুফল পাওয়া যাবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কারিগরি শিক্ষায় ভূমিকা রাখার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি হচ্ছে? বিশেষ করে আমাদের এখন যে শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে, তার সঙ্গে চাকরির বাজারের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিল নেই। সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে কর্মমুখী শিক্ষাকে তাই দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষাই পারে বেকার সমস্যা কমাতে। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে পুরো বিশ্ব যখন কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ হয়ে উঠছে, তখন আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। আমাদের তারুণ্য এক অনিশ্চিত চাকরির গাইডে জীবনকে নিমজ্জিত করে ফেলছে। এই ‘সিস্টেম লস’কে সিস্টেমে আনা গেলে তারুণ্যও হবে মুক্ত, চাকরির বাজারে আসবে বৈচিত্র্যকরণ। পাশাপাশি সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশের গন্তব্যে পৌঁছানোটাও সহজ হবে।

আনিসুর সুমন: সাংবাদিক