বিশ্বযুদ্ধের
পর ইউরোপের
দেশগুলোর মধ্যে
রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা
সৃষ্টি হলেও
রাশিয়া আর
আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ
শুরু হয়।
বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ
থেকে আমেরিকার
আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত
হলেও তত্কালীন
সোভিয়েত ইউনিয়ন
সেই আধিপত্যের
পথে বাধা
হয়ে ছিল।
সেই বাধা
স্নায়ুযুদ্ধে রূপ
নেয়। কেননা
আমেরিকা নিজেই
সোভিয়েত ইউনিয়নের
বিশাল সাম্রাজ্য
মেনে নিতে
পারেনি। কারণ
সেখানকার সমাজতান্ত্রিক
রাজনীতি ও
অর্থনীতিকে সারা
বিশ্বে পুঁজিবাদী
অর্থনীতি বিস্তারের
প্রতিবন্ধক হিসেবে
দেখে আসছিল
মার্কিন শক্তি।
পরবর্তী সময়ে
সোভিয়েত ইউনিয়নের
সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা
পতনের ফলে
মার্কিন-রাশিয়া
দ্বন্দ্ব আরো
বেগবান হয়।
বিশেষ করে
রাশিয়া থেকে
যে ১৫টি
নতুন রাষ্ট্রের
উদ্ভব, তার
জন্য মার্কিন
সাম্রাজ্যবাদী নীতিকে
দায়ী করেছিল
রুশ সরকার।
সেই দায়ের
যে যৌক্তিক
ভিত্তি আছে
তা ইউক্রেনের
ওপর চলমান
মার্কিন প্রভাবের
মধ্য দিয়ে
আরো স্পষ্ট
হয়ে গেছে।
রাশিয়া লক্ষ
করেছে ইউরোপ
আর আমেরিকা
জোটবদ্ধ হয়ে
ইউক্রেনকে নিজেদের
আয়ত্তে নিতে
অতি তত্পর।
রাশিয়া প্যান
ন্যাশনালিজমের (পুরো
সোভিয়েত ইউনিয়নকে
এক জাতি
ভাবার নীতি)
জায়গা থেকে
হারানো দেশগুলোর
ওপর প্রভাব
বিস্তারে প্রয়াসী,
অন্যদিকে আমেরিকা
ইন্টিগ্রেটেড ন্যাশনালিজমের
(আধিপত্যের সম্প্রসারণবাদী
নীতি) জায়গা
থেকে সংঘাতে
জড়িয়ে পড়েছে।
এর মানে
প্রান্তিক রাষ্ট্রের
ওপর কেন্দ্র
রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে
কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার
প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতা
থেকে ইউক্রেন
যুদ্ধের সূত্রপাত।
যদিও এর
প্রেক্ষাপট অনেক
আগেই সৃষ্টি
হয়। ইউক্রেনের
মতো সম্পদশালী
দেশ যাতে
আমেরিকার হস্তগত
না হয়,
সেই উদ্বেগ
রাশিয়াকে তাড়িয়ে
বেড়াত। এ
তাড়না থেকেই
ইউক্রেন ২৮
বছর আগে
তার আঞ্চলিক
অখণ্ডতার নিশ্চয়তা
পেয়েছিল জাতিসংঘ
ও রাশিয়ার
কাছ থেকে।
২০০৮ সালে
তত্কালীন মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনকে
ন্যাটোর সদস্য
করার ব্যাপারে
আশ্বস্ত করলে
ইউক্রেন সরকার
আমেরিকার অধীনস্থ
হতে আরো
বেশি আগ্রহ
দেখায়। ইউক্রেনে
রুশ বিদ্রোহীদের
দমন করতে
ইউক্রেন সরকার
মার্কিন নীতির
দ্বারস্থ হয়।
এর পর
থেকেই রাশিয়া
ইউক্রেন সরকারের
ওপর ক্ষুব্ধ
হয়। এর
প্রতিক্রিয়ায় যুদ্ধের
জন্ম। যুদ্ধ
চলাকালীন ইউরোপ
ও আমেরিকা
ইউক্রেনের পক্ষ
নিয়েই ক্ষান্ত
হয়নি। রাশিয়ার
বিরুদ্ধে মার্কিন
অবরোধ বিস্তৃত
হয়। রাশিয়াকে
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল
করতে ইউরোপের
দেশগুলোর মধ্য
থেকে ইতিবাচক
সাড়া পায়
আমেরিকা।
এদিকে ইউক্রেনের
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি
ইউরোপের দেশগুলোকে
রাশিয়ার বিরুদ্ধে
ঐক্যবদ্ধ হতে
যে আহ্বান
জানায়, তা
যে মার্কিন
সুর, এটি
বুঝতেও কারো
অসুবিধা হয়নি।
এর মানে
ইউক্রেন সরকারও
চায় না
যুদ্ধ বন্ধের
কূটনৈতিক সমাধান
আসুক। ইউক্রেনের
সরকার যে
সে দেশের
জনগণের প্রতিনিধিত্ব
করছে না,
তা জনগণ
বুঝলেও তারা
এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
জনগণের এ
দৈন্য নিয়ে
কেউ চিন্তিত
নয়, কারণ
চলমান গণতন্ত্র
সাম্রাজ্যবাদী নীতির
বেড়াজাল থেকে
মুক্ত হতে
পারেনি। সে
কারণে মার্কিন
আধিপত্যবাদের পক্ষে
প্রকাশ্যে কাজ
করে চলছে
ইউরোপের প্রভাবশালী
দেশগুলো। ইউক্রেনকে
সহায়তা করার
জন্য পোল্যান্ডে
ব্রিটিশ ক্ষেপণাস্ত্র
ব্যবস্থা চালু
করা হয়েছে।
ন্যাটো জোটের
ফ্রান্স, জার্মানি,
বেলজিয়াম, রোমানিয়াসহ
আরো কয়েকটি
দেশ ইউক্রেনকে
সহায়তার অঙ্গীকার
করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের
অস্ত্র প্রস্তুতকারী
করপোরেশনস থেকে
ইউরোপের দেশগুলো
অস্ত্র ক্রয়ের
চুক্তিতে নেমে
পড়েছে।
এদিকে ইউক্রেনের
জন্য বরাদ্দ
১ হাজার
৪০০ কোটি
ডলারের তহবিল
থেকে ৮০
কোটি মার্কিন
ডলারের সামরিক
সহায়তার ঘোষণা
দেয় মার্কিন
সরকার। এ
থেকে স্পষ্ট
ইউরোপ-আমেরিকা
ইউক্রেন যুদ্ধের
বিরোধী নয়,
বরং মার্কিন
আধিপত্য সম্প্রসারণের
জন্য ‘ইউক্রেন’
একটা রাজনৈতিক
পুঁজি। এ
রাজনৈতিক পুঁজি
মার্কিন পুঁজিবাদ
ও ইউরো-মার্কিন
আধিপত্যবাদের অন্যতম
শক্তি। যুদ্ধের
ক্ষেত্র প্রস্তুতের
প্রক্রিয়ায় এ
শক্তির বিকাশ।
এখানে জেলেনস্কি
রাষ্ট্রীয় সহায়ক
মাত্র। এদিকে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট
বাইডেন পুতিনকে
যুদ্ধাপরাধী আখ্যায়িত
করলে উত্তেজনাকর
পরিস্থিতির সৃষ্টি
হয়। উত্তেজনার
প্রেক্ষাপটে ক্রেমলিন
পারমাণবিক হামলার
দিকে চলে
যেতে পারে—এ
আশঙ্কার কথা
উচ্চারিত হচ্ছে।
সত্যিকার অর্থে
রাশিয়াকে উত্তেজিত
করার কৌশল
হাতে নিয়েছে
ইউরো-মার্কিন
অক্ষশক্তি। এসব
নীতি কৌশলের
মধ্যে অন্যতম
হলো: ১.
অবরোধ দিয়ে
রাশিয়ার অর্থনীতি
দুর্বল করা;
২. প্রান্তিক
দেশকে (ইউক্রেন)
রাজনৈতিক পুঁজিতে
পরিণত করা;
৩. যুদ্ধ
জারি রেখে
মার্কিন অস্ত্র
বিক্রির সুযোগ
বৃদ্ধি করা;
৪. মার্কিনবিরোধী
জোট ভেঙে
দিতে কূটনৈতিক
তত্পরতা বৃদ্ধি
করা।
এর মানে
যুদ্ধ জারি
রাখাটাই শেষ
কথা নয়।
রাশিয়া যাতে
আলাদা কোনো
বৈশ্বিক জোট
গঠন করতে
না পারে
সেজন্য কূটনৈতিক
পদ্ধতির আশ্রয়
নিচ্ছে মার্কিন
সরকার। রাশিয়ার
ওপর ইউরোপের
নির্ভরতা কমাতে
আমেরিকা তেলসমৃদ্ধ
দেশগুলোর সঙ্গে
দেনদরবার চালিয়ে
যাচ্ছে। ইরান
ও ভেনিজুয়েলা
আমেরিকার বৈরী
রাষ্ট্র হলেও
আমেরিকা চায়
তাদের রাশিয়াবিরোধী
করতে। তবে
ইরান ও
ভেনিজুয়েলা আমেরিকাকে
কখনো বিশ্বাস
করতে পারছে
না বলে
রাশিয়ার সঙ্গে
তাদের আগের
সম্পর্ক বহাল
আছে। এদিকে
চীন যেন
রাশিয়ার অবরোধ
উত্তরণে এগিয়ে
না আসে
সেজন্য মার্কিন
নিরাপত্তা উপদেষ্টা
হুমকির ভাষায়
কথা বলেন।
এ থেকে
বোঝা যায়,
মার্কিন আধিপত্যবাদ
সম্প্রসারণ করতে
রাশিয়ার পক্ষশক্তির
মধ্যে ফাটল
ধরানোর কাজে
ব্যস্ত হয়ে
পড়েছে মার্কিন
রাজনীতি। সারা
বিশ্বে মার্কিন
একাধিপত্য জারি
রাখার এ
অঙ্গীকার যে
বাইডেনের একার,
তা নয়।
এ অঙ্গীকার
সব মার্কিন
সরকারের মধ্যেই
জীবন্ত ছিল।
২০০৮ সালে
নির্বাচিত মার্কিন
প্রেসিডেন্ট তার
‘দি
অডাসিটি অব
হোপ’ বইতে
বলেন, ‘আমরা
ছাড়া পৃথিবীতে
আর অন্য
কোনো দেশ
নেই, যার
বিশ্বব্যবস্থাকে বিন্যাস
করার মতো
বড় রকমের
শক্তি-সামর্থ্য
রয়েছে।’
এ চেতনার
অর্থই হলো
আমেরিকার একাধিপত্য
মেনে নিতেই
হবে। আধিপত্য
বিস্তারের এ
ধৃষ্টতাকে যে
প্রশ্ন করবে,
তাকে অবরোধে
বেঁধে ফেলা
হবে। অথচ
এ ধরনের
অডাসিটি মেনে
নিলে বিশ্ব
তার ভারসাম্য
হারাবে। অথচ
বিশ্ব ব্যবস্থা
পারস্পরিক নির্ভরশীলতার
সূত্রে গ্রথিত
না হলে
বৈশ্বিক শান্তির
সম্ভাবনা থাকে
না। তেলসমৃদ্ধ
দেশ রাশিয়া,
ইরান, সৌদি
আরব, ভেনিজুয়েলার
মধ্যে যদি
ঐক্যবোধ থাকত
তাহলে ইউরোপ,
আমেরিকা কি
আধিপত্যবাদের নীতিতে
চলতে পারত?
বৈশ্বিক ভারসাম্য
প্রতিষ্ঠার এ
উদ্যোগ ব্যাহত
হচ্ছে এককেন্দ্রিক
রাজনীতি ও
অর্থনীতির আওতায়
বিশ্বকে নিয়ে
আসার তাগিদ
থেকে। এক্ষেত্রে
চীন, রাশিয়া,
ইরান, উত্তর
কোরিয়া, কিউবা
এই এককেন্দ্রিক
নীতির বেড়াজাল
থেকে মুক্ত
করে নিজস্ব
শক্তি-সামর্থ্য
তুলে ধরতে
প্রচেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছে।
যুদ্ধনীতি কোনোভাবেই
কাম্য নয়,
তবে এককেন্দ্রিক
আধিপত্যের বিপরীতে
রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ
জোট গঠনের
প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এ জোট
ডলার অর্থনীতির
বিপরীতে আলাদা
মুদ্রা ব্যবস্থা
চালু করলে
মার্কিন অবরোধের
প্রভাব কমে
যাবে। এমনকি
ইয়েমেন, ইউক্রেনের
মতো প্রান্তিক
দেশগুলোর ওপর
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত
গ্রহণকে নৈতিক
মানদণ্ডে নিয়ে
আসার জন্য
এ জোটের
ভূমিকা থাকবে।
উপরন্তু, তেল
ও জ্বালানি
সম্পদনির্ভর দেশগুলোকে
এ জোটে
অন্তর্ভুক্ত করার
মধ্য দিয়ে
কূটনৈতিক পন্থায়
সিদ্ধান্ত গ্রহণের
সুযোগ বাড়ানো
সম্ভব।
আমরা চাই
ইয়েমেন, ইউক্রেনের
মতো দেশগুলোর
ওপর বিদেশী
শক্তির প্রভাব
বন্ধ করার
কূটনৈতিক প্রয়াস
জোরালো হোক।
এতে অন্যান্য
দেশ নিজেদের
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব
রক্ষার প্রত্যাশা
করতে পারবে।
এককেন্দ্রিক বিশ্বায়নকে
যদি গণতান্ত্রিক
বিশ্বায়নে রূপান্তর
করা না
যায়, পারস্পরিক
নির্ভরশীলতার আলোকে
নিরপেক্ষ কূটনীতিক
পন্থা জারি
রাখা সম্ভব
না। সেই
চিন্তা থেকে
বৈশ্বিক রাজনীতিতে
নয়া মেরুকরণের
রূপরেখা তৈরি
করা এখন
অতিজরুরি।
ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী
অধ্যাপক
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা










