[গতকালের পর]

আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস: বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের  ‘Promoting Prosparity and Fostering Inclusiveness’ শীর্ষক অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (জুলাই ২০২০-জুন ২০২৫) ‘Regional Distribution of Poverty’ উপ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ সব অঞ্চলে সমানভাবে হয়নি।’ সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী দেখা যায়, রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। এর পরে ময়মনসিংহ বিভাগ ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। জাতীয় দারিদ্র্যের হার যেখানে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। একই পরিসংখ্যান অনুযায়ী কুড়িগ্রাম জেলার ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, সেখানে দারিদ্র্যের পরিমাণ সবচেয়ে কম ঢাকার পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জ জেলায়, যা ২ দশমিক ৬ শতাংশ। সমীকরণটা খুব পরিষ্কার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সুবিধা না থাকায় দারিদ্র্যের হার বেশি। সরকারি ব্যয় বরাদ্দ এ অঞ্চলের জন্য কম। এ অঞ্চলে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলে অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে যাওয়ায়  সৃষ্টি হয়েছে নতুন দারিদ্র্য।

সুপারিশ: ক. বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর উন্নয়নের জন্য নিয়মিত এডিপির অতিরিক্ত একটি নির্দিষ্ট শতাংশিক হারে গ্রহণযোগ্য এডিপির বরাদ্দ দেয়া। এ বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। খ. প্রবৃদ্ধির বণ্টন অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। গ. বঞ্চিত এলাকায় বেশি পরিমাণ সরকারি ব্যয় করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো উচিত। নিম্ন আয় ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য উৎপাদনশীল সম্পদের ওপর মালিকানা এবং আয়বর্ধনমূলক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। ঘ. পশ্চাত্পদ অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন করে শিল্পায়ন করা প্রয়োজন।

অবকাঠামো উন্নয়ন: এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের উন্নয়ন করতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। বর্তমানে দ্রুততার সঙ্গে চলছে প্রবৃদ্ধি সঞ্চালক মেগা প্রকল্পের কাজ। ভবিষ্যতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার ভিত্তি রচনার ক্ষেত্রে মেগা প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পদ্মা বহুমুখী সেতু, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, মাতারবাড়ী আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার, রামপাল থার্মাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক, বাস র্যাপিড ট্রানজিট, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে অন্যতম। এছাড়া নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের লক্ষ্য নিয়ে রিজার্ভের অর্থ দিয়ে গঠিত ‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’-এর যাত্রা শুরু হয়েছে।

সুপারিশ: ক. মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন চালু রাখতে হবে। খ. ‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’-এর প্রকল্পগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ-সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নেও নেয়া যেতে পারে। গ. কানেক্টিভিটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।

কৃষি খাত: কভিড-১৯-এর কারণে কৃষি খাতের সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার ফলে কৃষকরা উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাননি, সার-বীজ সরবরাহ ছিল অপ্রতুল। মত্স্য খামার কিংবা পোলট্রি খামারের মালিকরা তাদের পণ্যের সরবরাহ সংকটের কারণে যথাযথ মূল্য না পাওয়ায় অনেকেই পুঁজি হারিয়েছে। কৃষি খাতে শস্য ও ফসল চাষের জন্য কৃষকদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষি রিফাইন্যান্স স্কিম গঠন করা হয়েছে।

এ প্রণোদনায় কৃষকরা এখন ৪ শতাংশ সুদে প্রণোদনা ঋণ পাচ্ছেন। আবার করোনা সংকটের মুখে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরেও কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

সুপারিশ: ক. কৃষি খাতের অর্জন ধরে রাখতে ও বাড়াতে হলে কৃষি খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি, কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে ভর্তুকি বৈষম্য হ্রাস করতে হবে। খ. ব্যাপক মাত্রায় গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় ছাড়া প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বৈষম্য হ্রাস ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন। এজন্য গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

শিল্প খাত: করোনাকালে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে রফতানি আয়ের প্রধান খাত পোশাক শিল্প। শুরুতে ভাইরাসটির উত্পত্তিস্থল চীন থেকে কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় সমস্যায় পড়েন শিল্প মালিকরা। পরে দুর্বল চুক্তির কারণে বিদেশী ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি উদ্যোক্তারা। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা ভাব দেখা দেয়ায় সব শিল্পমালিক সমস্যায় পড়েন। তবে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় শিল্প ও রফতানি খাত ঘুরে দাঁড়ায়।

সুপারিশ: ক. শিল্পে সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অতিমারী মোকাবেলার উপযোগী করতে হবে, যাতে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো প্রণোদনার অর্থ পায়, রেয়াতি সুদে ঋণ নিতে পারে। খ. স্টার্টআপদের জন্য ট্যাক্স হলিডে বাড়াতে হবে। গ. শিল্পোন্নয়নের জন্য ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ঘ. বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও সংস্থা ‘ইনোভেটিভ আইডিয়া’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচন করে তরুণ জনগোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হওয়ার উৎসাহ, আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ঙ. স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পৃথক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। চ. বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম পথ হলো অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধিসহ ‘ব্যবসায় ব্যয় কমিয়ে আনা’ এবং ‘ব্যবসায় প্রক্রিয়া সহজীকরণ’ করা। এ বিষয়ে বাজেটে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কৌশলগুলো নির্দেশ করা প্রয়োজন। ছ. রফতানিমুখী উন্নয়ন কৌশলে রফতানি বাস্কেট বহুমুখীকরণ এবং সেই সঙ্গে যারা উচ্চমূল্যের রফতানি পণ্য উৎপাদন করবেন, তাদের যুক্তিসিদ্ধ প্রণোদনা প্রদানের বিষয় বাজেট বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন। জ. রফতানির জন্য নতুন গন্তব্য দেশ অনুসন্ধান উৎসাহিত করতে হবে। ঝ. গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে অধিকতর ও কার্যকর অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণে বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব কর্মকৌশল নির্ধারণ ও তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ঞ. চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে বিবেচনায় রেখে শিল্পনীতি ঢেলে সাজিয়ে তা দেশজ বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব ও টেকসই অর্থনীতি বিনির্মাণবান্ধব করতে হবে। তাই নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে, ট্রেড লাইসেন্সের বিকল্প হিসেবে ‘উদ্যোক্তা কার্ড’ গ্রহণ করে সরকারি ঋণ প্রণোদনায় ই-কমার্সকে যুক্ত করার সুপারিশ করা হলো।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বা আইসিটি খাশ: কভিড-১৯ অতিমারী ডিজিটাল বাংলাদেশের বা আইসিটি খাতের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে কভিড-১৯ মোকাবেলায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সামাজিক নিরাপত্তা খাত সব ক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বেড়েছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে অনলাইন ক্লাস পরীক্ষা, ভার্চুয়াল বিভিন্ন সভা, দেশব্যাপী ই-মিউটেশন, ই-জুডিশিয়ারি বাস্তবায়ন হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের নগদ অর্থ উপকারভোগীর মোবাইল ব্যাংক হিসেবে সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে জিটুপি  পদ্ধতিতে অর্থ প্রেরণ করা হচ্ছে। ডিজিটাল ডিভাইসের প্রয়োজন আজ বাস্তবতা। সমাজের সব ব্যক্তি যেন এ সুবিধা পায়, সেজন্য এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন। শহর ও গ্রামে ডিজিটাল ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। করোনা অতিমারী আমাদের দেখিয়েছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আর্থিক সেবার বিকল্প নেই। এজন্য ‘মাইক্রো মার্চেন্টদের’ ডিজিটাল অবকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। ‘ডিজিটাল ট্রানজেকশন’ উত্সাহিত করার জন্য আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের সুপারিশ করা হলো। ক্যাশলেস সোসাইটি এখন বাংলাদেশের স্বপ্ন। কৃষিপণ্যের সাপ্লাই চেইন অবকাঠামো তৈরির জন্য বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করা যায়, এখানে ডিজিটালাইজেশন করার বড় সুযোগ রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের জন্য ১ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

সুপারিশ: ক. ডিজিটাল ডিভাইস সহজলভ্য করতে হলে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। খ. সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রণোদনা দিতে হবে। গ. ডিজিটাল যন্ত্রপাতির সম্পূরক কর ও সারচার্জ প্রত্যাহার করতে হবে। ঘ. বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশী তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ঙ. যারা বিদেশে গিয়ে রেমিট্যান্স আনেন, তারা যেমন ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাচ্ছেন, তেমনি যারা দেশে বসে ফ্রি-ল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন, তাদেরও নির্দিষ্ট হারে প্রণোদনা দেয়া উচিত।’

রাজস্ব আহরণ 

২০২০-২১ সালের বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে বাজেটের রাজস্ব আয়ের একটা বড় অংশ আসে এনবিআরের মাধ্যমে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে জুলাই-মার্চ আদায় হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে বাকি তিন মাসে আদায় করতে হবে ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। করোনাকালে লক্ষ্যমাত্রার কতটা আহরণ সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। বর্তমানে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা। সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ভ্যাট প্রদানের ক্ষেত্রে কিছুটা অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের কাছে ভ্যাট প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল মনে হয় এবং এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হলে তাদের যে ধরনের হিসাবপত্র রাখতে হবে, সেটিকে তাদের ব্যবসার দিক থেকে কাঙ্ক্ষিত বা উপযুক্ত মনে করেন না। ফলে তারা ভ্যাট প্রদান থেকে পিছিয়ে আছেন। এ গবেষণার জন্য পরিচালিত জরিপ থেকে দেখা যায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই ২০১২ সালে প্রণীত ভ্যাট আইন সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না এবং এ বিষয়ে তাদের প্রস্তুতি নেই। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। যেখানে কর-জিডিপির অনুপাত নেপালে ১৯ শতাংশ, ভুটানে ১৬ শতাংশ, ভারতে ১২ শতাংশ, শ্রীলংকায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১১ শতাংশ, আফগানিস্তানে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ, মালদ্বীপে ৯ দশমিক ১ শতাংশ। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কর-জিডিপির অনুপাত গড়ে ৩৬ শতাংশ। জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম মানুষ আয়কর দেন—মাত্র ১ শতাংশ।  বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি পেরিয়ে গেছে। দেশে প্রায় ৫২ লাখ মানুষের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) আছে। কিন্তু বছর শেষে আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দেন মাত্র ২০-২১ লাখ। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১০ শতাংশ রিটার্ন দেন কিন্তু কর দেন না। সে হিসাবে মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ শতাংশ মানুষ আয়কর দেন। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে ভুটানে এ হার ১১ শতাংশ ও নেপালে ৭ শতাংশ। আবার দেশে ৭৫ হাজার করদাতা প্রতিষ্ঠান কর শনাক্তকরণ নম্বর নিয়েছে। এর মাত্র অর্ধেক অর্থাত্ ৩৬ হাজার প্রতিষ্ঠান রিটার্ন দিয়ে করপোরেট কর দেয়।

রাজস্ব আহরণের সুপারিশ

ক. রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠীর ৮ লাখ টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে আয়করের হার ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৩০ শতাংশ করা যেতে পারে। খ. তামাক, তামাকজাত পণ্য, কোমল পানীয় ইত্যাদির ওপর কর বাড়ালে একদিকে সরকারের আয় বাড়বে, অন্যদিকে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে। গ. বিভাগ, জেলা, উপজেলা, গ্রাম পর্যায়ে অনেক বিত্তশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা আয়করের আওতায় নেই। তাদেরও আয়করের আওতায় আনতে হবে। আয়কর, মূসক ও শুল্ক বিভাগকে আরো ডিজিটালাইজড ও অটোমোটেড করতে হবে। কর প্রদানের জন্য আয়কর, মূসক ও কাস্টমস বিভাগে ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা। ঘ. ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে নতুন অর্থবছর থেকেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) মেশিন চালু করা প্রয়োজন। ইএফডি ব্যবহার করে পণ্য কেনাবেচায় স্বচ্ছতা আসবে এবং ভ্যাট ফাঁকি অনেকাংশে কমে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এত দিন ধরে যথাযথ ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যে সারা দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) মেশিন ব্যবহার হতো। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-সংবলিত এ ইএফডি মূলত ইসিআরের উন্নত সংস্করণ। ইএফডি এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তাহলে ভ্যাট ফাঁকি দেয়া সহজ হবে না। ঙ. ভ্যাট ও ট্যাক্স আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও অধীনে উপজেলা/থানা রাজস্ব অফিস প্রতিষ্ঠা জরুরি। ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, আর অন্যদিকে শিক্ষিত যুবগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানও বাড়বে। আবার ভ্যাট-ট্যাক্স-সংক্রান্ত বিষয়াদিও হালনাগাদসহ জাতীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট তথ্যভাণ্ডারও গড়ে উঠবে। উন্নত দেশে উত্তরণের জন্যও এসব জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। চ. এ দেশে বছরে ১ কোটি টাকা বা তদূর্ধ্ব ব্যক্তিগত আয়কর দেয়ার সংখ্যা অনেক কম বলে জানা যায়। কিন্তু এ সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার হওয়া উচিত। এটি প্রযোজ্য হলে এ খাত থেকে ৫০ হাজার কোটি আয় সম্ভব, যা দিয়ে অনেক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য নিরসন প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। এছাড়া সম্পদ ও সম্পত্তি কর প্রবর্তন করতে হবে। ছ. কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান অথবা যোগ্য পরামর্শক সংস্থা নিয়োগ করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘করদাতা শুমারি’ ও ‘সম্পদ শুমারি’ সম্পন্ন করা জরুরি। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি ‘রাজস্ব কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন। এ কমিশন প্রতি বছর বাজেট প্রণয়নের আগে আয় বৃদ্ধির পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি, রাজস্ব সংগ্রহ, সরকারি ব্যয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। জ. প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিকের, যাদের এনআইডি কার্ড আছে, তাদের সবার টিআইএনধারীর নম্বর থাকা প্রয়োজন (ব্যক্তিগত ও কোম্পানি), আইন প্রণয়নের মাধ্যমে রিটার্ন জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা উচিত এবং প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট ফি প্রদানের মাধ্যমে টিআইএন নবায়ন করার প্রচলন করা যেতে পারে। অনলাইনভিত্তিক কর প্রদান ব্যবস্থায় সবাই কর প্রদানে উত্সাহিত হবে, এজন্য ডাটাবেজের মাধ্যমে সবার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। ঝ. সম্প্রতি ভ্যাট আইন কার্যকর হয়েছে। এখন আয়কর আইন ও কাস্টমস আইন সংস্কার ও বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। ঞ. বর্তমানে নিবন্ধিত করদাতা প্রতিষ্ঠান ৮ লাখ ৬৪ হাজার কিন্তু দাখিলপত্র জমা দেয় ৩২ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। আবার এনবিআর ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ভ্যাট লাইসেন্সধারীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। কিন্তু মাত্র ১ লাখ লাইসেন্সধারীর কাছ থেকে (মোট ভ্যাট লাইসেন্সধারীর ১০%) বর্তমানে ভ্যাট আদায় হয়। এ সংখ্যা বাড়াতে হবে। অনেক ব্যবসায়ী ভোক্তাদের কাছ থেকে ঠিকই ভ্যাট আদায় করছেন কিন্তু সেটা সরকারের খাতে যাচ্ছে না। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে ইসিআর নেই। ভ্যাট রশিদ দেয়া হয় না। মেমো দেয়, যা নিজেদের ছাপানো আবার মেমোতে নম্বর নেই। প্যাকেজ ভ্যাটও ঠিকমতো দেয়া হয় না। এজন্য মনিটরিং ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ট. মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোনো কাঁচামাল আমদানি করতে পারে না বা করার সামর্থ্য নেই। ফলে তারা অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে, যার রশিদ রাজস্ব বোর্ডের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে তারা রেয়াত পায় না। তাই নতুন ভ্যাট পদ্ধতি অনুযায়ী একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে বাজার থেকে কাঁচামাল কেনার সময় বিক্রেতাকে মূসক ১১ চালু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মূসকের রেয়াত, কনসেশন—এ সবকিছুর সুবিধা দিতে হবে।  ঠ. প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যক্তি ও করপোরেট পর্যায়ে ব্যাপক কর-রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা ও কর-নেটের আওতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর প্রশাসনের সংস্কারসহ বাজেটে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপের দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। ড. রাজস্ব বোর্ড আহরিত মোট রাজস্ব আয়ে আয়করের অবদান মাত্র ৩৫ শতাংশ। এ সংখ্যা অনেক গুণ বাড়ানো যেতে পারে। নতুন করদাতা ইচ্ছে করে কর অফিসে আসবেন না। রাজস্ব বোর্ডকে নতুন করদাতা শনাক্তের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন করদাতা শনাক্তের জন্য প্রচার-প্রচারণা, জনসংযোগ, শুমারি, ফিল্ড ভিজিট, অপারেশন, সারা বছর আয়কর মেলা, প্রণোদনা প্রদান, সম্মাননা প্রদান, করদাতা নাগরিকদের সুবিধা প্রদান আইন প্রয়োগসহ নানা ধরনের কার্যক্রম চালাতে হবে।

রাজস্ব আহরণের ভ্যাট ও করসংক্রান্ত সুপারিশমালা

ক. ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতার করমুক্ত আয়করসীমা ৩ লাখ টাকা। বর্তমানে কভিড-১৯-এর কারণে অর্থনীতিতে আয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে, উত্পাদন-বিপণনে মন্দা দেখা দেয়ায় করদাতারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই করমুক্ত আয়কর সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হলো। খ. ৬৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগী নাগরিক, যাদের আয়ের একমাত্র উত্স পেনশন বা জমা সঞ্চয় থেকে প্রাপ্ত সুদ তাদের আয়কর রিটার্ন জমা দেয়া থেকে অব্যাহতি দেয়া। গ. বর্তমানে বাংলাদেশে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করহার ২৫ শতাংশ; শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন প্রতিষ্ঠানের ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ; ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে ৩৭ শতাংশ ও তালিকাভুক্ত না হলে ৪০ শতাংশ হারে করপোরেট কর দিতে হয়। এছাড়া সেলফোন অপারেটরদের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে করারোপ করা হয়। এ করহার এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি। যেমন ভারতে করপোরেট করহার ২৫-৩০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ২২ শতাংশ ও থাইল্যান্ডে ২০ শতাংশ। এছাড়া বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও রফতানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামে এ হার ২০ শতাংশ। করপোরেট কর কমালে বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণেও তা সহায়তা করবে। ২০২৬ সালে এলডিসির তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এ সময়ের মধ্যে অর্থনীতির সক্ষমতা আরো বাড়াতে স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর সুপারিশ করা হলো। ঘ. কোম্পানির করপোরেট শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশের ওপর আয়কর ২০ শতাংশ, অনেক দেশ লভ্যাংশের ওপর করারোপ করে না। লভ্যাংশের ওপর করহার কমানো হলে কোম্পানির অর্থ সাশ্রয় হবে। এতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে। তাই কোম্পানির করপোরেট শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ অর্থাত্ শেয়ার ডিভিডেন্ডের ওপর আয়কর ১০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হলো। ঙ. কভিড-১৯-এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় উত্পাদনমুখী শিল্পের চলার পথ মসৃণ করার জন্য আমদানি পর্যায়ে শিল্পের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম আয়কর ৪ শতাংশ ও আগাম ভ্যাট দিতে হয় ৪ শতাংশ। অগ্রিম আয়কর ও আগাম ভ্যাট এক বছরের জন্য প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হলো। চ. রফতানির ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ উেস কর দিতে হয়। রফতানিমুখী শিল্প বিকাশের প্রয়োজনে উেস কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ করার সুপারিশ করা হলো। ছ. মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ১ শতাংশ শুল্কারোপ থাকলেও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৬০-৭০ শতাংশ শুল্ক কর দিতে হয়। এটি কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হলো। জ. কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে যে করোনাভাইরাস টেস্টিং কিট, মাস্ক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) আমদানি এবং হ্যান্ডস্যানিটাইজার, মাস্ক ও পিপিই উত্পাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির ওপর প্রযোজ্য সমুদয় শুল্ক মওকুফ করা হয়েছিল, তা ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটেও বজায় রাখার সুপারিশ করা হলো। ঝ. খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কভিডের কারণে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য চাল, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, সয়াবিন, মসলা ইত্যাদি ক্রয় করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব পণ্য আমদানিসংক্রান্ত উেস কর, আগাম কর ও ভ্যাট হ্রাস করার সুপারিশ করা হলো। ঞ. কভিড-১৯-এর কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা খাতের শিক্ষার্থীদের মোবাইল, ল্যাপটপ ও কম খরচে ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানের জন্য ইন্টারনেট সেবায় ১৫ শতাংশ সম্পূরক কর ও সারচার্জ ১ শতাংশ প্রত্যাহার করার সুপারিশ করা হলো। ট. ডিজিটাল পদ্ধতির উন্নয়নের স্বার্থে যেসব তথ্য-প্রযুক্তি কাজ করছে, তাদের আগের মতো কর অব্যাহতির সুপারিশ করা যায়। ঠ. আগামী বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার ক্ষেত্রে যদি কোনো ব্যক্তি বিনিয়োগের মাধ্যমে ১০০  থেকে ৫০০ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে, তাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ, আবার যদি ৫০১ থেকে ১ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে তাকে আরেক নিদির্ষ্ট পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখানে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ঘাটতি ব্যয়ের অর্থসংস্থান: ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ শতাংশ। এর মধ্যে বৈদেশিক উত্স থেকে অর্থায়ন ৮০ হাজার ১৭ কোটি টাকা (জিডিপির ২.৫%) এবং অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে অর্থায়ন ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৫%) ধরা হয়েছিল। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে মোট রাজস্ব আয় ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। এ সময়ে মোট ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। ফলে ২০২০-২১ অর্থবছরে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সামগ্রিক ঘাটতি (গ্রান্টস-বহির্ভূত) হয়েছে ৮ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ৩৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এর কারণ হিসাবে বলা যায়, সরকারের ব্যয় কমে গেছে। কভিড-১৯-এর আঘাত ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাবে এডিপি ও নন-এডিপি উভয় ব্যয় কম হয়েছে। বলা যায়, কভিডের অভিঘাত থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে যেখানে বাজেট সম্প্রসারণ প্রয়োজন, সেখানে উল্টোটা হচ্ছে। এ সময়ে ঘাটতি অর্থসংস্থান হয়েছে মূলত অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে, যা গত অর্থবছরের এ সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণ সরকার ব্যাংক খাত থেকে গত অর্থবছরের এ সময়ের চেয়ে কম গ্রহণ করেছে। কিন্তু এনএসডি সার্টিফিকেট এ সময়ে গত অর্থবছরে ছিল ৫ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা, যা এ অর্থবছরে ২১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

জানা যায়, আগামী বাজেট হবে সম্প্রসারণমূলক। এতে ঘাটতি ধরা হবে জিডিপির ৬ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ ঘাটতি পূরণে বড় ধরনের বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন। যদিও চলতি অর্থবছর ২০২০-২১-এর এডিপিতে বৈদেশিক উত্স থেকে ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তা না পাওয়ায় সংশোধন করে বৈদেশিক উত্স থেকে ৬৩ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ইআরডির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত দাতা সংস্থা ও দাতা দেশগুলোর কাছ থেকে নতুন প্রতিশ্রুতি পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক চারটি উত্স থেকে ৬ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। মার্চ ২০২১ পর্যন্ত মাত্র ১ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে, যা প্রতিশ্রুতির মাত্র ২৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আবার প্রতিশ্রুত ঋণ খরচ করতে না পারায় প্রতিশ্রুতির প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার অর্থাত্ ৪ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অব্যবহূত পড়ে আছে। ইআরডির তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত যে পরিমাণ ঋণ পাইপলাইনে জমা হয়ে আছে, তা কমিয়ে আনতে প্রতি বছর ১ হাজার কোটি থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার খরচ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতি বছর ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলারের বিদেশী ঋণ খরচ করতে পারছে। বাকি অর্থ পাইপলাইনে অলস পড়ে থাকছে। তবে খরচ করতে না পারলেও বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এজন্য প্রতি বছর বাজেটে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাড়ছে।

এ অবস্থায় এ ঘাটতি ব্যয়ের অর্থসংস্থানে নিম্নোক্ত সুপারিশ করা হলো:

ক. ঘাটতি অর্থায়নের একটা বড় অংশ ব্যাংকঋণের মাধ্যমে নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকে অনেক অলস অর্থ থাকায় বেসরকারি বিনিয়োগে সমস্যা হবে না। খ. এনএসডি সার্টিফিকেট বিক্রি করে বড় ধরনের অর্থায়ন করা যেতে পারে। গ. বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি ও ছাড়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বৈদেশিক সাহায্য যথাসময়ে ও যথাযথভাবে খরচ করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতা সৃষ্টি করতে হবে। ঘ. প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর জন্য চেষ্টা চালাতে হবে। 

উপসংহার

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো কভিড-১৯-এর প্রভাব সামলে নিয়ে এর সময়মতো এবং মানসম্মত বাস্তবায়ন। এ লক্ষ্যে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা, সমন্বয় ও পরীবিক্ষণ দক্ষতা বৃদ্ধির পথনির্দেশ বাজেটে থাকতে হবে। বাংলাদেশে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (জুলাই ২০২০-জুন ২০২৫), এসডিজি, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১) ও ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ অর্জনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ার যে প্রত্যয় রয়েছে, তা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন সঠিক বাজেট প্রণয়ন এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন।

ড. মো. মোরশেদ হোসেন: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর