‘নদীর কূল নাই, কিনার নাই রে, আমি কোন কূল হতে কোন কূলে যাব কাহারে শুধাইরে।’
নদীসংক্রান্ত আলোচনা সাধারণত ভূবিজ্ঞানের বিষয়, আংশিক ইতিহাসেরও। তাছাড়া নদী-বিজড়িত জীবন-জীবিকা নিয়ে রচিত হয়েছে অমর সাহিত্য—উপন্যাস, কবিতা, চলচ্চিত্র।
শিলাইদহে
থাকতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন অনেক কবিতা, যার প্রত্যেকটিতে নদীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি
লক্ষণীয়; নদীপ্রেমে
জীবনানন্দ দাশও কম হাবুডুবু
খাননি। বাংলার
নদী এবং নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা নিয়ে রচিত হয়েছে
অনেক চলচ্চিত্র,
যেমন নদী ও নারী, তিতাস একটি নদীর নাম, পদ্মা নদীর মাঝি ইত্যাদি।
কিন্তু যখন কোনো অর্থনীতিবিদ নদীর আদ্যোপান্ত নিয়ে কলম ধরেন, তখন অবাক হওয়ার অবকাশ থাকে বৈকি। অমর্ত্য সেনের সদ্য প্রকাশিত আত্মজৈবনিক বইতে (Home in the
World A Memoir) নদী নিয়ে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ রীতিমতো বিস্ময় জাগায় পাঠককে। শুধু নদীর উত্পত্তি বা গথিপথ, ভাঙনের খেলা কিংবা মানুষের দুর্ভোগ নয়, তার লেখায় অনন্যভাবে ফুটে উঠেছে বাংলার নদীর সঙ্গে যুক্ত এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি।
এক. ‘বাংলার নদী’ নামে অধ্যায়টা শুরু হয়েছে নদীর উত্পত্তি, বিস্তার ও বিশালতার ব্যাখ্যা দিয়ে। বিখ্যাত গঙ্গা নদী বেনারস, পাটনাসহ উত্তর ভারতের প্রাচীন শহরগুলো পেরিয়ে যখন বাংলায় প্রবেশ করে, তখন সে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বড় অংশ পদ্মা নদী (সংস্কৃত পদ্মা অর্থাৎ লোটাস) সাবলীল মন্থর গতিতে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে শেষ হয়। অন্যদিকে ভাগীরথী নামে ক্ষুদ্রতর শাখাটি আরো সরাসরি দক্ষিণে কলকাতা অতিক্রম করে এবং বেশ সংক্ষিপ্ত সফর শেষে উপসাগরে যোগ দেয়। যেমন করেই হোক, ক্ষুদ্রতর শাখাটি পুরনো গঙ্গা নাম ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে—অদলবদলে যেটা ভাগীরথী এবং ইদানীং হুগলি নামে সমধিক পরিচিত। ভাগীরথী ও পদ্মা উভয়ই পুরনো বাংলা সাহিত্যে প্রসিদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের নিজ নিজ মহিমা নিয়ে খানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথাও শোনা যায়।
ঢাকা থেকে কলকাতায়
যাওয়া অমর্ত্য
সেন বন্ধুদের
মশকরা করে বলতেন, ‘ছলচাতুরী
করে তোমাদের
লোটাসরূপী পদ্মার
বিশালতাবঞ্চিত একটা নিকৃষ্ট নদী দেয়া হয়েছে’,
যদিও তার গর্ব করার ভিত্তি খুব সুদৃঢ় ছিল না।
যা-ই হোক, গঙ্গার পানি বণ্টন একটা অধিকতর গভীর এবং প্রচণ্ডভাবে রাজনীতিক বিষয় ছিল, যেটা ১৯৭০ সালে ভারত সরকার নদীটির ওপর একটা বড় বাঁধ (ফারাক্কা বাঁধ) নির্মাণ করলে প্রকট আকার ধারণ করে। ওই বাঁধটি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল পুঞ্জীভূত পলি সরিয়ে কলকাতা বন্দরকে নাব্যতা দেয়ার জন্য ভাগীরথীকে বেশি পানিপ্রবাহ দিয়ে পুষ্ট রাখা। কিন্তু বাঁধটি পলি পরিষ্কার করতে সফল হয়নি, তবে পূর্ব বাংলায় বোধগম্য বৈরিতা ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। অমর্ত্য সেনের ধারণা, শিশুকালে রাজনৈতিক বৈরিতা সুদূরপ্রসারী থাকলেও পানিসংক্রান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এর আগে বলীয়ান হয়ে ওঠে।
দুই. কেউ মনে করে কয়েকশ বছর আগে ঢাকা ছিল পদ্মার তীরে। তা হয়তো ঠিক কিন্তু ঢাকা এখন অপেক্ষাকৃত ছোট নদী বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত। সময়ের বিবর্তনে পরাক্রমশালী পদ্মা এখান থেকে সরে গেছে এবং এটাই বাংলার নরম পাললিক মাটির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য যে নদীগুলো ঐতিহাসিক সময়ে প্রায়ই গতি পরিবর্তন করে। তবে ঢাকা থেকে সংক্ষিপ্ত সফরে সহজেই চমকপ্রদ পদ্মার সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব। নদীটা আরো চমত্কার হয়ে ধরা দেয় যখন শহর থেকে সরে গিয়ে অন্যান্য নদীর প্রবাহিত পানিসমেত সে উপমহাদেশের অন্য এক বড় নদ ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়। বাংলার এ অংশে ব্রহ্মপুত্র যখন যমুনা নাম ধারণ করে তখন উত্তর ভারতীয়রা অনেকটাই বিভ্রান্ত হয়, কারণ আরো উত্তরে অন্য এক বিখ্যাত যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে আছে দিল্লি ও আগ্রা (তাজমহল)। আবার অধিকতর নিচের দিকে পদ্মা মেঘনা নামে অন্য এক নদীর সঙ্গে যোগ হয়ে বিশালাকার মিলিত প্রবাহ সৃষ্টি করে।
বিস্ময়করভাবে রাজকীয় নদীটির এক পাড়ে দাঁড়িয়ে অন্য পাড় দেখতে না পেয়ে শিহরিত অমর্ত্য তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এটা কি সত্যি একটা নদী? এর জল কি লবণাক্ত? এখানে কি হাঙর আছে?’
অমর্ত্য
সেন হয়তো এখন জেনে খুশি হবেন যে শৈশবে
তাকে অবাক করা নদীগুলো
নিয়ে বাংলাদেশের
ফরিদা পারভিন
গেয়েছেন বিখ্যাত
গান—
‘এই পদ্মা এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তটে/ আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায়/ এই আমার দেশ এই আমার প্রেম/ আনন্দ বেদনায় মিলন বিরহ সংকটে।’
তিন. তত্কালীন পূর্ব বাংলায়, এখন বাংলাদেশ, অমর্ত্য সেনের পরিবারের জীবন ছিল অনেকটাই নদী-বিজড়িত। ঢাকা থেকে কলকাতা যাওয়ার কালে প্রথমে ট্রেনে চড়ে সংক্ষিপ্ত যাত্রায় নারায়ণগঞ্জ এবং তারপর স্টিমারে করে পদ্মা নদী দিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ। উভয় কূলের পরিবর্তনীয় দৃশ্য তৃপ্তিসহকারে উপভোগ শেষে নদী জংশন নামে খ্যাত গোয়ালন্দ ঘাট এবং সেখান থেকে সরাসরি ট্রেনে চড়ে কলকাতা।
স্টিমারে চড়ে পদ্মা দিয়ে যাতায়াতকালে দুই কূলে দেখা প্রাণচঞ্চল ব্যস্ত গ্রাম এবং অব্যাহত পরিবর্তনশীল ভূদৃশ্য সবসময় মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত বালক অমর্ত্য সেনকে। বেদনার ব্যাপারও ছিল যখন দেখতেন শিশুরা বিলীয়মান বিনোদন হিসেবে চলমান স্টিমার এবং তাদের দিকে তাকিয়ে আছে এবং এই শিশুরা হয়তো কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি। তার সহজাত দুশ্চিন্তা শুরু হতো স্কুলে অনুপস্থিত এ শিশুদের ঘিরে। বাবা আশুতোষ সেন ব্যথিত ছেলেকে বলেছিলেন, ভারতের অধিকাংশ শিশুর জন্য স্কুল নেই এবং একই সঙ্গে আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে স্বাধীনতার পর পরিবর্তন হতেই হবে। কিন্তু ওই নিশ্চয়তা অমর্ত্য সেনের উদ্বেগ খুব একটা উপশম করতে পারেনি। তিনি জানতেন না যে এমনকি স্বাধীনতার পরও অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটবে না এবং ভারত ও অন্যান্য জায়গায় বিদ্যালয় শিক্ষার বিস্তৃতি তার জীবনের অঙ্গীকার হিসেবে অবতীর্ণ হবে। এবং হয়েছিল তাই। অন্যদিকে স্টিমারে যাতায়াত অমর্ত্য সেনকে প্রথমবারের মতো প্রকৌশল পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করায়। বাবার সঙ্গে ইঞ্জিন রুম দেখতে গিয়ে নজরে আসে পাশাপাশি স্টিলের রড উপর-নিচ করছে, পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান চাকার ঘূর্ণনশীল গতিময়তা এবং তার সঙ্গে ইঞ্জিনের তেল আর গ্রিজের সৌরভে বিস্ময় জাগত অমর্ত্য সেনের। এখন ভাবেন, জাহাজের ইঞ্জিন যে কী জটিল কাজ করে, সেটা জানার আগ্রহের সূত্রপাত ওখান থেকেই।
চার. ঢাকা-গোয়ালন্দ
নৌভ্রমণ ছিল শৈশবে অর্জিত
নদী নিয়ে অভিজ্ঞতার মাত্র
একটা দিক। সাধারণত পূর্ব
বাংলায় মৌসুমি
ছুটি জলভরা
ব্যাপারস্যাপার হয়। ঢাকা থেকে পৈতৃক গ্রামের
বাড়ি মানিকগঞ্জের মাত্ত পানিপথে খুব বেশি দূরে নয় কিন্তু
যাওয়া-আসায় দীর্ঘ সময় নিত। একই সময় বাবা-মা আর ছোট বোন মঞ্জুকে নিয়ে ঢাকার সন্নিকটে
বিক্রমপুরের সোনারাঙ মায়ের পৈতৃক
পরিবারের কাছে পৌঁছতেও নৌকায়
লম্বা সময় নিত।
সুতরাং
বাংলার নৌকা আর নদী অমর্ত্যের জন্য স্মৃতি নিরবধি।
সেই স্মৃতির
ভাণ্ডারে রক্ষিত
কিছু ঘটনা না বললেই
নয়। তার বয়স যখন প্রায় নয় বছর তখন খবর পেলেন
বাবা আশুতোষ
সেন গ্রীষ্মের
ছুটিতে ভ্রাম্যমাণ
নৌকা-বাড়িতে
(ছোট ইঞ্জিনচালিত ‘হাউজ বোট’) করে বিভিন্ন নদী ভ্রমণের পরিকল্পনা
করছেন। শোনামাত্রই
রোমাঞ্চিত অমর্ত্য
ভাবলেন তার জীবনের অন্যতম
মহান মুহূর্তগুলো বুঝিবা আগত। বস্তুত
তা-ই হলো।
ধীরগতিতে
চলা নৌকায়
শিহরিত বালক ও তার পরিবার নিয়ে নৌকাটি প্রথমে
পদ্মায় এবং পরে অন্যান্য
নদীতেও পড়ল—মুগ্ধকরভাবে নিষ্প্রাণ
ধলেশ্বরী থেকে চমকপ্রদ মেঘনা।
উত্তেজনাপূর্ণ এই ভ্রমণকালে শুধু পানির প্রান্তসীমায় নয়, ভূপৃষ্ঠের নিচে লতাগুল্মও তার দেখা এ-যাবত্কালের অদ্ভুদ
দর্শনীয় দৃশ্য
হয়ে দাঁড়াল।
মাথার ওপর চক্রাকারে পাখি ওড়া অথবা নৌকায় নেমে পাখির বিশ্রাম
নেয়া অবিরত
চোখে পড়ত আর পাঁচ বছর বয়সী ছোট বোন মঞ্জুর কাছে তিনি কয়েকটার
নাম তুলে ধরতেন। ভাবতেন
ঢাকার নিস্তব্ধ
বাগান থেকে এখনকার একটানা
প্রবাহিত পানির
শব্দ কত আলাদা! যেদিন
বাতাস থাকত, ঢেউ এসে সশব্দে নৌকার
পার্শ্বদেশে পড়ত আর নৌকায়
পানি ছিটিয়ে
উঠত। নানা রকমের মাছ দেখা যেত, তার মধ্যে
ছোট মাছ খেকো কালো ও উজ্জ্বল
ডলফিন (বাংলায়
শুশুক) ডাঙায়
আসত নিঃশ্বাস
নিতে এবং তারপর স্নানের
জন্য বেশ লম্বা ডুব দিয়ে দৃষ্টির
আড়ালে চলে যেত।
অমর্ত্য সেনের করোটিতে গেড়ে বসে গতিপথ পরিবর্তনশীল নদী ঘিরে জীবন- জীবিকার চ্যালেঞ্জগুলো। নদীর তীর ধরে গ্রামের পর গ্রাম—কিছু সমৃদ্ধিশালী, কিছু প্রপীড়িত এবং কিছু মনে হতো পানির প্রান্তে আশঙ্কাজনকভাবে অপসৃত ভূমির ওপর দণ্ডায়মান (যে বর্ণনা হেমন্ত কুমারের কণ্ঠে শুনতে পাই):
এ কূল ভেঙে ও কূল তুমি গড়ো/যার একূল-ওকূল, দুকূল গেল, তার লাগি কী করো?/ও নদী রে।
নদীভাঙনের
বিষয়ে অনুসন্ধিত্সু অমর্ত্য একবার মার কাছে জানতে
চেয়েছিলেন, যেমন দূর থেকে দেখা যায়, আসলে অবস্থা
অমন নাজুক
কিনা। তার মা বলতেন,
দৃশ্যমান পরিস্থিতির
চেয়ে অদৃশ্যমান
পরিস্থিতি আরো ভয়ানক। কারণ আপাতদৃষ্টে নদীর তীর ঘেঁষে
ভূতল শক্ত মনে হলেও নদীর গতিপথ
পরিবর্তন জমিটা
ক্ষয়ে যাওয়ার
পথ প্রশস্ত
করতে পারে।
অমর্ত্য সেন তাত্ক্ষণিক বুঝে নিলেন যে এ অঞ্চলের
নদীগুলো সমৃদ্ধির
সনাতনী উৎস হলেও মানবিক
জীবন ও নিরাপত্তার জন্য অনিশ্চিত ঝুঁকিস্বরূপ। সেই থেকে নদীর গতি পরিবর্তন
ঘিরে আবর্তিত
চ্যালেঞ্জগুলোর চিন্তা
তার মাথায়
ঘুরপাক খেতে থাকে এবং সৌন্দর্য আর সর্বনাশের এ সংমিশ্রণ তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ
করে চলে। একই সঙ্গে
নদীর ভৌত বিশালতা ও এদের ঘিরে জীবনের উত্তেজনা
তাকে বেদনাহত
করত। মোট কথা, অমর্ত্য
সেনের কাছে ধীরে ধীরে প্রতীয়মান হতে থাকে যে সৌন্দর্য আর সংকট নিয়ে নদীর গতিপথ
পরিবর্তনপ্রসূত পরস্পরবিরোধী প্রকৃতি পূর্ব বাঙালিদের
মনে সহজাত
ঘটনা মাত্র।
পাঁচ. লক্ষণীয় বিষয় হলো, স্বাভাবিক শান্ত নদীর সৃষ্টিশীল সৌন্দর্যে বাংলার যেমন বিমুগ্ধতা আছে, তেমনি তার সমান্তরাল উন্মত্ত নদীর ধ্বংসাত্মক আচরণের প্রতি মোহ কোনো অংশে কম নয় এবং উভয়ের প্রতিফলন দেখা যায় সযত্নে কুশলী স্মৃতিজাগানিয়া নাম রাখার মধ্য দিয়ে।
নদীগুলোর খুব সুন্দর আকর্ষণীয় নামের মধ্যে আছে ময়ূরাক্ষী (ময়ূরের চোখ), রূপনারায়ণ (স্বর্গীয় সৌন্দর্য), মধুমতী (মধুর মতো মিষ্টি) ইছামতী (আমাদের ইচ্ছার পূরণ) এবং বহুল পরিচিত পদ্মা (লোটাস-সদৃশ)। অন্যদিকে ধ্বংসাত্মক নদীও, যা প্রায়ই বন্যা এবং অব্যাহত গতিপথ পরিবর্তন করে চিহ্নিত গ্রাম ও শহর তলিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে, নাম দিয়ে চেনা যায়। যেমন পদ্মার আরেক নাম ‘কীর্তিনাশা’ (মানুষের অর্জন ধ্বংসকারী)। অমর্ত্য যখন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে শান্তিনিকেতনের স্কুলে গেলেন, সেটা ছিল কীর্তিনাশার প্রায় কাছ থেকে অজয়ের (অপরাজেয়) নিকটতম হওয়া, যে অজয় সারা বছর শান্ত থাকে কিন্তু বর্ষা মৌসুমে অকল্পনীয়ভাবে তলিয়ে দেয় আশেপাশের অনেক শহর ও গ্রাম। তার কাছে নদীর এই স্ববিরোধী আচরণ সমাজের আচরণের মতোই প্রতিভাত হয় এই অর্থে যে একটা সমাজ তার ওপর ভরসা করা মানুষকে সাহায্য এবং সংহার উভয়ই করতে পারে।
যা-ই হোক, নৌকায় করে ছোট নদী থেকে বড় নদী যাওয়ার
কালে চোখে পড়ত পানি যেন রঙ বদলায়—নিষ্প্রভ
সাদা থেকে নীল। ধলেশ্বরী
নাম নেয় তার রূপ ধলা থেকে, যা কালোর
বিপরীত এবং মেঘনা অন্ধকারপূর্ণভাবে সুন্দর মৌসুমি মেঘ। বালক বয়সে গোগ্রাসে গিলেছিলেন
নদী নিয়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের লম্বা কবিতা ‘নদী’। ওই কবিতায় একটা নদীঘেরা মানুষের
জীবন বর্ণনা
করা আছে এবং সম্ভবত
সেটা হিমালয়
থেকে বিভিন্ন
মানববসতি পেরিয়ে
সাগরে পড়া গঙ্গা নদীর কথা। এ কবিতা পাঠ শেষে তিনি অনুভব করলেন
আসলে নদী কী এবং মানুষ কেন নদীগুলো নিয়ে অতটা অস্থির
হয়ে ওঠে।
একদিন
এক অভাবনীয়
ঘটনা ঘটল। ভ্রমণের সময় বাবার সঙ্গে
থাকা মানচিত্র
ঘেঁটে প্রকাণ্ড
এক ‘আবিষ্কার’
করে ফেললেন
নয় বছর বয়সী বালক অমর্ত্য সেন। তিনি ভেবেছিলেন,
তার আবিষ্কারটা
ভূগোল ক্লাসে
বিশেষ গুরুত্ব
দিয়ে বিবেচিত
হবে কিন্তু
তা আর হলো না। আবিষ্কারটা হলো, সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন
দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা গঙ্গা
ও ব্রহ্মপুত্র উভয়ের উৎসস্থল হিমালয়ের
উঁচুতে থাকা একই হ্রদ মানস সরোবর
(Manas Sarovar meaning mind-generated lake)। দুই সম্পূর্ণ আলাদা
পথ দিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ
শেষে তারা উৎসস্থল থেকে অনেক দূরে বাংলায় এসে পরস্পরের সঙ্গে
মিলিত হয় যেন দীর্ঘকাল
পর হারিয়ে
যাওয়া বন্ধুর
সাক্ষাৎ পাওয়া।
এ মনোভাবের
সঙ্গে যুক্ত
হলো স্কুলে
পড়া দ্বীপসংক্রান্ত সংজ্ঞা—দ্বীপ হচ্ছে
পানিঘেরা ভূমিখণ্ড।
অতএব, শিশুসুলভ
পণ্ডিতিপনায় অমর্ত্য
আবিষ্কার করলেন,
দ্বীপ মানে যদি হয় পানিঘেরা ভূমি, তাহলে তো এ উপমহাদেশের
সবচেয়ে বড় দ্বীপ শ্রীলংকা
বা সিলন নয়, এটা হবে গঙ্গা,
ব্রহ্মপুত্র ও মানস সরোবরের
ফাঁদে পড়া বিশাল ভূমিখণ্ডটি।
তার ধারণা ছিল ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে এই নতুন ‘আবিষ্কার’ জাহির করার সাহস হতো না আর তাই শান্তিনিকেতনের শমিত পরিবেশে ভূগোল ক্লাসে অবারিত করার সুযোগ পেয়ে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ক্লাসের শিক্ষক ও সহপাঠী উভয়ই যেন তার প্রধান সাফল্যকে অস্বীকৃতিদানে অবিচল থাকল। তারা দ্বীপের সংজ্ঞা—জল দ্বারা বেষ্টিত স্থলভাগ—নাকচ করে বলল, দ্বীপ হচ্ছে অবশ্যই সাগর অথবা মহাসাগরের জলরাশিবেষ্টিত ভূখণ্ড; এটা নদী বা হ্রদের পানিবেষ্টিত নয়। অমর্ত্য সেন দমবার পাত্র নন এবং পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে জানতে চাইলেন, তাহলে যে প্যারিসের সিনে নদীর মাঝে দ্বীপের কথা বলা হলো মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, তাহলে কি কুমিরও একটা দ্বীপ হতে পারে? যাই হোক, অমর্ত্য যুক্তিতে জিতলেন না এবং সিলন রয়ে গেল উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ হিসেবে। তবে তিনি মনে করলেন, ‘অপ্রাপ্য’ একটা ‘খ্যাতি’ জুটল তার কপালে—স্পষ্ট প্রতীয়মান বাদ দিয়ে অস্পষ্টের ওপর অতিবেশি মনোযোগ এবং উদ্ভট যুক্তি উপস্থাপন।
ছয়. শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় অমর্ত্য সেন জানতেন যে রবীন্দ্রনাথ চারপাশের অর্থনীতি ও সমাজের ওপর নদীর গুরুত্ব পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিলেন এবং এগুলো তার বিভিন্ন রচনায় স্থান পেয়েছে। তবে পথপ্রদর্শক অর্থনীতিবিদরা যে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে ভূমিকা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে নদীর তাত্পর্য যুক্ত করেছেন,ু একথা তার জানা ছিল না। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন বাজার অর্থনীতি উন্নয়নে নদীর ভূমিকা নিয়ে পড়তে গিয়ে অ্যাডাম স্মিথের পর্যালোচনা পাঠ করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছে, অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী হওয়ার কারণ শুধু স্থানীয় দক্ষ শ্রমিকদের সিল্ক নয়, তার সঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল নদী আর নৌ-চলাচলের সৃষ্ট সুযোগ। মোটা দাগে, অ্যাডাম স্মিথ অগ্রসরতা ও অনগ্রসরতার কারণ হিসেবে এবং প্রাচীন সভ্যতার প্রসারণে নদীর অনুপস্থিতি ও উপস্থিতিকে দায়ী করেছেন, যথা ইউরোপের বাল্টিক ও অ্যাড্রিয়াটিক সাগর, এশিয়া ও ইউরোপের ভূমধ্য ও ইউজিন সাগর এবং আরব, পার্সিয়া ইন্ডিয়া, বাংলা ও সিয়ামের উপসাগর, যা মহাদেশের অভ্যন্তরে পণ্য হস্তান্তরে সাহায্য করে। যদিও স্মিথ কখনো দেখেননি, তিনি বুঝেছিলেন কীভাবে বাংলায় এঁকেবেঁকে চলা নদীগুলো মানুষের কল্পনায় এবং বাস্তব জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীগুলো এবং তার চারপাশে বসতি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য হাজার বছরের ওপর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে রসদ জুগিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সাহায্য করেছে। উত্তর আফ্রিকার সভ্যতায় নীল নদের ভূমিকা রয়েছে, তবে আফ্রিকার অভ্যন্তরে (এবং এশিয়ারও কিছু) অধিকাংশের ‘ঐতিহাসিক অনগ্রসরতার’ পেছনে কাজ করেছে নদীবাহিত সুযোগ-সুবিধার অনুপস্থিতি।
উদাহরণ
হিসেবে উল্লেখ
করা হয়েছে
বাংলাকেও। সপ্তদশ
শতকের শেষে বর্তমান কলকাতার
নিকটবর্তী গঙ্গার
মুখ ছিল অনেক ভারতীয়
পণ্যের রফতানির
উৎস, বিশেষ
করে বিশ্বখ্যাত
বাংলার সুতি বস্ত্র। এ অঞ্চলের আকর্ষণীয়
ব্যবসা-বাণিজ্যের
প্রসার বিদেশে
বাণিজ্য কোম্পানিগুলোকে এখানে আসতে আমন্ত্রণ
জানায়, যেমন ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি, যা ব্রিটিশ ভারত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা
করে। ফরাসি,
পর্তুগিজ, ডাচ এবং অন্যান্য
ইউরোপীয় কোম্পানিও
কলকাতায় আসে নদীমাতৃক বাংলায়
ব্যবসা করার জন্য ।
অবশ্য শুরুর বছরগুলোয় নৌবাহ সমস্যার জন্য পূর্ব বাংলার বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়। কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ বলছে যে বাণিজ্য সম্ভাবনার উন্নতি ঘটে যখন কলকাতা অতিক্রম করে হুগলির মাধ্যমে গঙ্গার পানির আদি প্রবাহ পলির জন্য হ্রাস পায় এবং পূর্বমুখী এখনকার বাংলাদেশের জন্য প্রবাহ বাড়তে থাকে। প্রসঙ্গত, মাটির প্রকৃতি এবং অব্যাহত পলি সাপেক্ষে পূর্বমুখী প্রবাহিত গঙ্গা তার নদীগর্ভ ছলকে দিয়ে নতুন বাহক তৈরি করে, যেমন ভৈরব, মাথাভাঙা, গড়াই, মধুমতী ও অন্যান্য। যখন ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশাল পদ্মা আবির্ভূত হয়ে গঙ্গার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলো, তখন এটা দাঁড়াল পুরনো গঙ্গার প্রধান শাখা, যা পূর্ব বাংলার বিপুল পরিমাণ পানিপ্রবাহের বাহক হয়ে উঠল। এ পরিবর্তন পূর্ব বাংলাকে শুধু উপমহাদেশের সঙ্গে নয়, এমনকি বিশ্ববাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটায় এবং সেই সূত্রে মোগল কোষাগারে দ্রুত বর্ধনশীল রাজস্ব জমা হতে থাকে।
উপসংহার: বুঝতে বাকি থাকে না যে শৈশবে দেখা বিশেষত বাংলাদেশের নদীগুলোর সৃষ্টি এবং ধ্বংস অমর্ত্য সেনের পরবর্তী জীবনে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলেছে। আগামীতেও ওইসব নিয়ে কথা হবে।
আবার আসিব আমি ফিরে/বাংলার ক্ষেত মাঠ নদী ভালোবেসে।/জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এই/এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।/আবার আসিব ফিরে,/ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়।
(জীবনানন্দ দাশ, ‘আবার আসিব ফিরে’)
পাদটীকা: কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি ইলিশ আসে পদ্মা প্রসঙ্গে, বিশেষ করে অমর্ত্য সেনের পছন্দের ইলিশ—‘has to be
cooked in proper Dhaka style with ground mustard’.
আব্দুল বায়েস: অর্থনীতির অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক










