বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সম্পদগুলোর মধ্যে মানবসম্পদ অন্যতম। তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি করার ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার বড় একটা অংশ বেকার। এর কারণ দক্ষতার ঘাটতি। শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয় বিদেশেও দক্ষ জনশক্তির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সেটি পূরণ করতে পারছে না। যার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত ঘাটতি ও দক্ষ শিক্ষকের অভাবের কথা বলছেন। স্বল্প পড়ালেখা জানা মানুষের বিরাট একটা অংশ সঠিক প্রশিক্ষণ ও কারিগরি শিক্ষার অভাবে গুণগতভাবে দক্ষ হয়ে উঠতে পারছে না। এ অবস্থার পরিবর্তনে শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো প্রয়োজন।
দেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক, কারিগরি, কৃষিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষাপ্রযুক্তির সার্বিক প্রয়োগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, বিজ্ঞান ও গণিতের জ্ঞান খুবই কম বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। যে কারণে তারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। সময় এখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের। নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে, দ্রুতই পরিবর্তিত হচ্ছে কর্মপরিবেশ। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতাও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অর্জন করতে পারছে না। এটি তো গেল সাধারণ শিক্ষার প্রেক্ষাপট। দেশে কারিগরি শিক্ষার চাহিদা ও গুরুত্ব রয়েছে। তবে এ দেশে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি শিক্ষার প্রসার কম। শিল্পনির্ভর অর্থনীতি একটি দেশের উন্নতির নিয়ামক। আর এজন্য দরকার দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও দক্ষ টেকনিশিয়ান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ও জার্মানি সময়ের প্রয়োজন বুঝতে পেরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধুনিকীকরণের পাশাপাশি তারা সব প্রযুক্তিবিদ্যায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করে। এসব দেশে কারিগরি শিক্ষার হার এখন ৫০ শতাংশেরও ওপরে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয়ও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষার হার দিন দিন বেড়ে চলেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার হার মাত্র ১০ থেকে ১১ শতাংশের মতো। পাশের দেশ ভারতেও কারিগরি শিক্ষার হার ২০ শতাংশের ওপরে। তাই দেশ ও জাতির প্রকৃত কল্যাণের স্বার্থে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রতি তরুণ সমাজের আগ্রহ থাকলেও সে আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ব্যাপকভাবে ঘটানো যায়নি। বিশ্বে গণিতে দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার্থীরা ব্যাপক সুনাম অর্জন করছে। এর পেছনে রয়েছে দেশটির সফল কর্মপরিকল্পনা। তারা গণিতে দক্ষতা ও বিজ্ঞানে দক্ষতা বৃদ্ধিরে লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে কয়েক দশক আগে। যার ফল তারা এখন পাচ্ছে। বাংলাদেশ যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করেছে, তাও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মানবসম্পদেরই অবদান। এখন মধ্যম আয়ের দেশ ও উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে টিকে থাকতে হলে দরকার দক্ষ মানবসম্পদ, যা বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের স্বল্প শিক্ষিত মানুষ বিদেশে কর্মরত। তারা দক্ষ না হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে কম বেতন পাচ্ছেন। এছাড়া দেশে দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক অভাব থাকায় বহু প্রতিষ্ঠানে বিদেশী দক্ষ কর্মীরা এসে দেশ থেকে অর্থ নিয়ে যাচ্ছেন। অর্থনীতির উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করে এ ঘাটতি রোধ করা সম্ভব। দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে অন্যতম বাধা শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বাজেটের কম বরাদ্দ থাকা। এছাড়া সময়োপযোগী ও সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের অভাব দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বাধাস্বরূপ। আধুনিক বিশ্বের কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দক্ষ শিক্ষকের অভাব তো রয়েছেই। সময়ের প্রয়োজনে ও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোন খাতে কী পরিমাণ দক্ষ জনগোষ্ঠী দরকার উন্নত দেশগুলোয় সে হিসাব করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে ধরনের জরিপ ও গবেষণা খুব একটা করা হয় না। এতে শিক্ষিত তরুণ জনশক্তির অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সরকার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রসারের জন্য কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার তৈরি করেছে। কিন্তু যুগোপযোগী কারিকুলাম ও দক্ষ শিক্ষকের অভাবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে পরিকল্পনায় ত্রুটি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনে বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণপূর্বক দক্ষতা অর্জনে জোর দেয়া প্রয়োজন। একদিকে শিল্পে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেকার। এটি কাঠামোগত ত্রুটির বহিঃপ্রকাশ, যার সমাধান প্রয়োজন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিশ্বে বর্তমানে সফল দেশগুলোর অনুকরণে স্থানীয় উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে দৃষ্টি দেয়া জরুরি।
বাংলাদেশ ২০১২ সালে ডেমোগ্রাফিক বোনাসে (কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি) প্রবেশ করেছে। জনসংখ্যার সোনালি ধাপ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ দক্ষ এবং কর্মক্ষম শ্রমশক্তি প্রাপ্তির সুযোগ করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে হলে দক্ষ মানবসম্পদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য প্রথমেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষা হতে হবে বাস্তবমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তুলতে হবে। পাশাপাশি শ্রমবাজারের দিকে লক্ষ রেখে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভাষা ও যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম প্রতিষ্ঠানকে সর্বদা কার্যকর রাখতে হবে। উচ্চশিক্ষায় গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। সর্বোপরি সময়োপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে জোর দেয়া প্রয়োজন।
এ কথা সবাই স্বীকার করবে যে সস্তা শ্রমের ওপর একসময় বাংলাদেশে শিল্পের বিকাশ হলেও এখন দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে হবে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, বাজার সম্প্রসারণ ও নিজস্ব ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য দরকার দক্ষতা অর্জন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যতিরেকে এটি অর্জন সম্ভব নয়।










