উন্নয়নের ইসলামী বিশ্বরূপটি সবচেয়ে ভালো বোঝা এবং সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপটে এবং যেখানে ‘উন্নয়ন’ ধারণাটির একটি সংজ্ঞা বা এটিতে যা অন্তর্ভুক্ত থাকে তা আপেক্ষিকই থেকে যায় এবং কিছুটা হলেও বিতর্কিত হয়। মূলধারার অর্থনীতিবিদরা উন্নয়নকে নিখুঁত পরিমাণগত দৃষ্টিকোণে দেখে থাকলেও উন্নয়নের ওপর রচিত সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে মানবিক উপাদানকে অনেক বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। উন্নয়নের সংজ্ঞা প্রদানেও এমন সব পছন্দ প্রাধান্য পেয়েছে যার মাধ্যমে সমাজের ব্যক্তিরা তাদের জীবনের মান উন্নত করতে পারে। উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করতে যেয়ে ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেন, উন্নয়ন হলো ‘...মানুষ যে সত্যিকারের স্বাধীনতা উপভোগ করে তা প্রসারিত করার প্রক্রিয়া’ (সেন, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা,৩)। এভাবে ক্রমবর্ধমানভাবে উন্নয়ন ধারণাটির সঙ্গে মনোভাব, পছন্দ, মূল্যবোধ ও নৈতিক বিচারের মতো ধারণাগুলোকে যুক্ত করা হচ্ছে।

উন্নয়ন সর্বোপরি মানবিক মূল্যবোধ এবং মনোভাব, সমাজের দ্বারা সংজ্ঞায়িত লক্ষ্যসমূহ এবং পরিবর্তনের পথে কী সহনীয় ব্যয় বহন করতে হবে এবং কাদের দ্বারা বহন করা উচিত তা নির্ধারণের মানদণ্ডের প্রশ্ন। এগুলো সর্বাপেক্ষা কাম্য সম্পদ বরাদ্দের মডেল বিনির্মাণ, দক্ষতার মান বৃদ্ধি বা প্রশাসনিক পদ্ধতির যৌক্তিকীকরণের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামে উন্নয়ন (কল্যাণ) ধারণার কেন্দ্রবিন্দু হলো মানব উন্নয়ন, যেখানে উন্নয়নকে দেখা হয় মানবের আধ্যাত্মিক অর্জনের পাশাপাশি আর্থসামাজিক কল্যাণ অর্জনের চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে (আহমদ, ১৯৮৪)। ওয়াটস (১৯৯৫) ‘উন্নয়ন’ ধারণাটির বৈধতা ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তারই মতো করে, সর্দার (১৯৯৭, পৃষ্ঠা, ৫১) ‘উন্নয়ন’কে একটি ধারণা ও অনুশীলন হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং যুক্তি দিয়েছিলেন যে ‘উন্নয়ন ধারণাটি মুসলিম সমাজের জন্য কোনো অর্থ বহন করতে পারে না’ এবং কখনই এটিকে ইসলামীকরণ করা যেতে পারে না। তিনি আরো ব্যাখ্যা করেছিলেন যে অভিজাত মুসলমানরা, ‘উভয় প্রথাগত এবং আধুনিক’, উন্নয়নের ধারণাটি ইসলামের নামে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন, যাতে তারা তাদের শাসনতন্ত্রকে ন্যায়সংগত করা এবং বৈধতা দেয়ার পাশাপাশি তাদের বিচিত্র এজেন্ডা চালিয়ে যেতে পারেন।

উন্নয়ন ধারণাটির ইসলামী বিকল্প হলো ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে কল্যাণ (ফালাহ)। সৃষ্টিকর্তার একতা (তাওহিদ) ইসলামী বিশ্বাসের চেতনা গঠন করে, যার ভিত্তি হলো সৃষ্টিকর্তার একত্ব এবং তার সৃষ্টির মধ্যকার ঐক্যের ধারণা। প্রতিটি মানুষ তার সৃষ্টির প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান। জাতি, লিঙ্গ, গায়ের রং, সম্পদ, শ্রেণী, শক্তি বা যেকোনো আকার বা গঠনের জাতিগত উৎসের ভিত্তিতে ইসলাম কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বরদাশত করে না। সুতরাং, মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য একটি প্রাকৃতিক অধিকার, যা আধিপত্য বা প্রকটতার শর্তে ব্যাখ্যা করে না বা করতে দেয় না। মুমিনদের মধ্যে সম্পর্ক ভ্রাতৃত্ব দ্বারা সর্বাধিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত করা যায়, যেমনটি বলা হয়েছে, ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই’ (কোরআন, ৪৯, ১০)। মহানবী (সা.) তার সাহাবিদের মধ্যে এ ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘ঈমান (বিশ্বাস) না আনা পর্যন্ত তোমরা জান্নাতে যেতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার (বিশ্বাসী) হতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা একে অপরকে ভালোবাস’ (মুসলিম)। নবী করিম (সা.) এ ভালোবাসার স্বরূপ ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে’ (আল-বুখারি, মুসলিম)। আনসারী (১৯৭৭, পৃষ্ঠা ৩৭১) উল্লেখ করেছেন, ‘বিশ্বাসীদের ভ্রাতৃত্বের ধারণাটি একটি শ্রেণীবিহীন সমাজের ধারণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।’ ব্যক্তিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র তাকওয়ার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়, যেমনটি বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি’(কোরআন, ৪৯, ১৩)।  মহানবী (সা.) তার সর্বশেষ ভাষণেও একই বার্তা দিয়েছিলেন:

অনারবদের ওপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তদ্রূপ সাদার ওপর কালোর কোনো প্রাধান্য নেই। আল্লাহ ভীতিই শুধু শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার মানদণ্ড। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মাঝে সে শ্রেষ্ঠ যে চরিত্রের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ। জেনে রেখো যে প্রত্যেক মুসলমানই প্রতিটি মুসলমানের ভাই এবং মুসলমানরা একটি ভ্রাতৃত্বের সমন্বয়ে গঠিত। (আল-বাইহাকি ও আল-বাজাজ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ খুতবার সংক্ষিপ্ত বিবরণ)

মানুষকে অবশ্যই কৃতজ্ঞ হতে হবে যে আল্লাহ আমাদের স্রষ্টা, তিনিই পৃথিবী এবং এর মধ্যকার যে অধিবাসী ও সম্পদ রয়েছে তার চূড়ান্ত মালিক, ন্যায়নিষ্ঠ পরিচালক এবং প্রতিপালক। সুতরাং মানুষের সব কাজকর্ম ও জীবন পরিচালনার ভিত্তি হতে হবে এ বোঝাপড়ার ছাঁচে। আল্লাহ মানবজাতিকে একক উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই উদ্দেশ্য হলো সর্বশক্তিমানের উপাসনা, যেমনটি বলা হয়েছে, ‘আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এই জন্য যে তারা আমারই ইবাদত করবে’ (কোরআন, ৫১, ৫৬)। উপাসনার কাজ (ইবাদাহ) তাদের প্রতিদিনের কাজকর্ম সম্পাদন করার সময় ব্যক্তিদের কাজ ও কর্মে নিজেকে প্রকাশ করে। যেকোনো কাজ ইসলামে ইবাদাহ, যা মুসলমানদের পুরস্কৃত করে, হিসাবে গণ্য হবে যদি তা ইসলামের নির্দেশিকা এবং নীতিমালা অনুসারে সম্পাদন করা হয়। এভাবে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ করা ইবাদাহ বিবেচিত হতে পারে, যদি তা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়ে থাকে। এভাবেই শিল্পোদ্যোগকে, ব্যক্তি ও জাতীয় পর্যায়ে আয়ের উৎসের মধ্যে সবচেয়ে পছন্দনীয় উৎস হিসেবে বিবেচিত, ইসলাম বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে এবং ইবাদাহ বলে গণ্য করা হয়েছে।

মানুষেরা আল্লাহর বান্দা এবং পৃথিবী ও এর সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে তার প্রতিনিধি (আমানতদার) এবং তাদের জবাবদিহি করতে হবে এবং কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে তারা কীভাবে এ প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করেছে। সুতরাং, আমানতদারিতার অপব্যবহার বা অবমাননা করা উচিত নয়, যেমনটি বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! জেনেশুনে আল্লাহ ও তার রাসুলের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও বিশ্বাস ভঙ্গ করো না’ (কোরআন, ৮, ২৭)। লোকদের সুযোগে সমান প্রবেশাধিকার পাওয়া উচিত, যাতে তারা সমভাবে হালাল আয়ের উপার্জন এবং আর্থসামাজিক ন্যায়বিচার উপলব্ধি করার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারে। দুষ্প্রাপ্য সম্পদগুলো কীভাবে সবার মধ্যে ব্যবহার করা এবং বিতরণ করা হচ্ছে তার দ্বারা সবার আর্থসামাজিক কল্যাণ প্রভাবিত হয়। এজন্য অপচয়, অতিব্যয় ও আড়ম্বর ব্যতিরেকে ‘আল্লাহ-প্রদত্ত সম্পদগুলো’ যথাযথভাবে নিযুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ যাতে সব মানুষ সৎ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পায়।

উদাহরণস্বরূপ, ইসলাম উদ্বৃত্ত উৎপাদিত পণ্যগুলো ধ্বংস করার মাধ্যমে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে পণ্যের দাম একটি নির্দিষ্ট স্তরের নিচে নামতে না দেয়ার চর্চাকে মন্দ কাজ হিসেবে বিবেচনা করে। এ ধরনের অনৈতিক চর্চা (যেমন ব্রাজিলে কফি এবং আমেরিকায় কমলা ও কলা ধ্বংস করার চর্চা) ঘটে এমন সময় যখন মহাদেশজুড়ে লাখ লাখ লোক অনাহারে দিনাতিপাত করছে। সুতরাং, মুসলমানরা পরিবেশের যত্ন নেয়া এবং পৃথিবীর মূল্যবান সম্পদের টেকসই নিশ্চিত করাকে তাদের ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করে, অন্যদিকে পরিবেশ সম্পর্কে অন্যদের উদ্বেগকে অর্থনৈতিক বা মানবিক প্রয়োজনের বেশি কিছু নয়—শর্ত যদি অনুমতি দেয় তবে আমরা তা কাজে লাগাতে পারি। আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর তোমরা এতে বিপর্যয় ঘটিয়ো না, তাকে [আল্লাহ] ভয় ও আশার সঙ্গে ডাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর অনুগ্রহ সত্কর্মশীলদের সর্বদা নিকটে’ (কোরআন, ৭, ৫৬)।

আল্লাহ মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং এর অগণিত সম্পদকে অনুধাবন করা এবং এর থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য মানুষকে তার সুপ্ত গুণাবলি বা সম্ভাব্যতা প্রসারিত করার মাধ্যমে প্রচেষ্টা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মানুষকে পৃথিবীর দায়িত্বও অর্পণ করেছিলেন এবং এটিকে শাসন করার ও এর সম্পদ থেকে উপকার লাভ করার সাময়িক ও শর্তযুক্ত অধিকার দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, আল্লাহর সাজ-সজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্যবস্তুকে কে হারাম করেছে? আপনি বলুন, এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্যে। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্যে যারা বোঝে। (কোরআন, ৭, ৩২)

বৈষয়িক কল্যাণের ওপর পশ্চিমা জোরের বিপরীতে, ইসলাম আধ্যাত্মিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয় এ যুক্তিতে যে বস্তুগত কল্যাণ আর্থসামাজিক ন্যায়বিচারের আকারে আধ্যাত্মিক চাহিদা ও বাধ্যবাধকতা পূরণের ফলে অর্জন করা যায়। মুসলিমের লক্ষ্য হলো একটি ‘ভালো ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবন’ উপলব্ধি করা, যেখানে অর্থনৈতিক মাত্রা এর একটি অংশের বেশি কিছু নয়। এ পৃথিবীতে একটি ভালো ও নৈতিক জীবনকে পরকালে সফলতার (ফালাহ) এক ধাপ হিসেবে দেখা উচিত। মানুষ এ পৃথিবীতে অস্থায়ীভাবে বাস করে এবং চূড়ান্ত গন্তব্য হলো ‘পরকাল’, তবে পার্থিব জীবনে ও পরকালে তাদের কল্যাণের জন্য ইসলামের উদ্বেগ অবিচ্ছেদ্য। পরকালে মানবকল্যাণ পুরোপুরি এ পার্থিব জীবনে মানুষের কাজ ও কর্মের ওপর নির্ভর করে, যা পালাক্রমে অন্যের কল্যাণ সাধনে যুক্ত হয়। এ ন্যায়নিষ্ঠ লক্ষ্য আল্লাহর আদেশ অনুসরণ এবং অন্যের প্রতি দায়বদ্ধতা পূরণে আন্তরিক নিষ্ঠার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।

 

ড. এম কবির হাসান: ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সে ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের ইথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স কমিটি ও এডুকেশন বোর্ডের সম্মানিত সদস্য