কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। কীভাবে এই শিরোনামে আখ্যায়িত হয়েছে আমাদের দেশ? উর্বর মাটির দরুন এবং এসএম সুলতানের কল্পনার কিংবা বাস্তবের বলিষ্ঠ কর্মঠ কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আমাদের ভূখণ্ডে অঢেল ফসল উৎপন্ন হয় হাজার বছর আগে থেকেই। চতুর্দশ শতাব্দীতে তৎকালীন বাঙ্গালা—বর্তমান বাংলাদেশে ভ্রমণ করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। তিনিও তাঁর ভ্রমণনামায় উল্লেখ করেছিলেন যে এই দেশে বিপুল পরিমাণে চাল উৎপন্ন হয়। এমনকি তাঁর লেখা থেকে জানা যায় যে সেকালে পুরো পৃথিবীর তুলনায় বাংলাদেশেই সবচেয়ে স্বল্পমূল্যে উৎপাদিত কৃষিপণ্য পাওয়া যেত। বিপুল ফসল উৎপাদন করে যুগে যুগে এ অঞ্চলের মানুষদের যারা খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাদের জীবনের দশা সম্পর্কে আমরা কতটুকু অবগত?

গত ২৬ জুন বৃহস্পতিবারে সিরাজগঞ্জের তাড়াশে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। কৃষকের পরিবারের কাছ থেকে জানা যায় যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঋণগ্রস্ত এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। একই জেলায় গত এপ্রিল মাসে ঋণগ্রস্ত হয়ে আরেকজন কৃষক আত্মহত্যা করেছিলেন। প্রায় একই সময়ে মেহেরপুরে একজন পেঁয়াজচাষীর আত্মহত্যার খবর শোনা যায়। তিনি এনজিও এবং সারের দোকান থেকে ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। উল্লেখিত প্রতিটি আত্মহত্যার তথ্য খবরের কাগজে এসেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু কৃষকদের অগণিত আত্মহত্যা ঘটনা যা মিডিয়ার বাইরে রয়ে গেছে। তাদের গল্প আমরা কী কখনো জানতে পারব?

ঘরে ঘরে মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়া এই মানুষগুলোর থাকার কথা সর্বোচ্চ মর্যাদায়। দিনশেষে তাদের জন্যই আমরা বেঁচে আছি। নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সব কাজ থেকে শুরু করে সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্কেও অংশগ্রহণের জন্য আমরা যে শক্তি পাচ্ছি তা সঞ্চারের প্রধান কারিগর আমাদের দেশের কৃষক। এসব বিবেচনায় হলেও আমাদের রাষ্ট্রে কৃষকদের স্থান হওয়া উচিত উচ্চ-মর্যাদাসম্পন্ন। অথচ প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলের কৃষকরা নিপীড়িত শ্রেণীর মানুষ; নিপীড়কদের কাছে যারা নিম্নবর্গের মানুষ। প্রাচীন বাংলার সময়কাল থেকে রাজা-বাদশাদের আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তানি আমল, এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশেও কৃষকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। পার্থক্য কেবল– সেকালের শাসকগোষ্ঠী দ্বারা নির্যাতিত কৃষকরা এখন একালের ক্ষমতাধরদের নিপীড়নের শিকার।

পুঁথিগত ইতিহাসের বাইরেও সাহিত্য থেকে সমকালের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা যায়। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের মাধ্যমে সেকালের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেয়া যায়। প্রাচীনকালেও এই ভূখণ্ডে তথাকথিত “উচ্চ” এবং “নিম্ন” শ্রেণীর বিন্যাস ছিল। নিম্ন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল তাঁতি, মাঝি, জেলে, শিকারি, কৃষকসহ অন্য শ্রমজীবীরা। অন্যদিকে এই তথাকথিত নিম্ন-শ্রেণীর শ্রমের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা পরজীবীরা-ই ছিল সেকালের উচ্চ শ্রেণীর ব্যক্তিরা। এই দুই শ্রেণীকে কিঞ্চিত ভিন্ন আঙ্গিকেও ব্যাখা করা যায়। প্রাচীনকালের উচ্চবর্গীয় ছিল সেকালের শাসকগোষ্ঠী এবং নিম্নবর্গীয়রা ছিল শাসকগোষ্ঠী দ্বারা নিপীড়িত জনগোষ্ঠী। প্রাচীন বাংলার উচ্চবর্গীয়রা কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের একটি বৃহত্তর অংশ ভোগ করত। অন্যদিকে কৃষকরা ছিল অবহেলিত এবং দারিদ্র্যে জড়জড়িত।

লিখিত ইতিহাস থেকে জানা যায় বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ কৃষি ব্যবস্থা ছিল সুলতানি আমলে। কিন্তু তার জন্য কৃষকদের জীবনমানের কোনো দৃষ্টান্তমূলক উন্নতি হয়নি। বরং সর্বোচ্চ সমৃদ্ধির কালেও কৃষকরা শাসক শ্রেণীর অর্থনৈতিক নিপীড়নের স্তূপে বন্দি ছিল। প্রথমত, কৃষকদের নিজস্ব কোনো জমি ছিল না। তারা মূলত উচ্চবর্গীয় বিত্তশালীদের জমিতে বর্গাচাষ করতেন। কিন্তু জমির মালিকরা যেকোনো সময়ে জমির ফসল দাবি করতে পারত। শুধু তাই নয়, উৎপাদিত কৃষিপণ্যের অধিকাংশ-ই ভোগ করত সেকালের ক্ষমতাধররা। অন্যদিকে কৃষকদের ফলিত কৃষিপণ্যের ওপর রাজস্ব আদায় করতো সুলতানি শাসকগোষ্ঠী। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ভিন্ন কোনো কারণে রাজস্ব প্রদান করতে না পারলে শাসকের নির্যাতনের শিকারও হতে হতো কৃষকদের। সুলতানি আমলে উচ্চবর্গীদের জীবনযাত্রার মান ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। আর কৃষকদের জীবনমান কেমন ছিল—তার বিবেচনা পাঠকদের বোধশক্তি কাছে-ই তুলে দিতে চাই।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবগত। ব্রিটিশ আমলের এই দুর্ভিক্ষের উৎস মোটেও কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে হয়নি। বরং ব্রিটিশ শাসকদের ভূমিদস্যুতা, কৃষিসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দমন-নিপীড়ন এবং মাত্রাহীন রাজস্ব আদায়ের নীতির মধ্য দিয়েই জন্ম হয়েছিল সেই দুর্ভিক্ষের। ধারণা করা হয়– ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়াও অন্যভাবে আক্রান্ত হয়েছিল আরো অগণিত প্রান্তিক মানুষ। আক্রান্তদের অধিকাংশ-ই ছিল কৃষক ও কৃষক-পরিবার। কেননা সেকালে অধিকাংশ মানুষ-ই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই দুর্ভিক্ষের পরে বাংলার অধিকাংশ আবাদি জমি পতিত হয়ে পড়েছিল।

পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসকরা পাঁচসালা, দশসালা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তসহ অন্যান্য যত রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতি-ই গ্রহণ করেছিল—তার প্রতিটি-ই ছিল কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের পরিপন্থী। উল্লেখ্য, প্রতিটি অর্থনৈতিক নীতি-ই ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর কোলে জন্ম পাওয়া স্থানীয় প্রভু-ভূস্বামীদের জীবনমান উন্নতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে খাদ্যশস্য থেকে ক্যাশ ক্রপ উৎপাদের জন্য বল প্রয়োগ, মাত্রাহীন রাজস্ব আদায়, স্থানীয় ভূস্বামীদের শারীরিক-মানসিক অত্যাচার ও ভূমি দখল, উচ্ছেদ প্রকল্পসহ আরো নানামাত্রিক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বাংলার কৃষকদের। কৃষকদের সেকালে প্রতিবাদের ভাষা ছিল দুটি: বিদ্রোহ অথবা সপরিবারে আত্মহত্যা।

১৯৫০ সালে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের উপনিবেশ থাকাকালীন সময়ে, ব্রিটিশ আমলের জমিদারি প্রথা বাতিল করা হয়। সেসময়ে জমিদার বিপুলসংখ্যক জমির বৃহৎ অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত হয়ে যায়। তার মধ্যে থেকে স্বল্পসংখ্যক জমি কৃষকরা পেলেও তার পরিমাণ এতই কম ছিল যে কৃষকদের দিনশেষে বর্গাচাষের ওপরেই নির্ভর করতে হতো। এছাড়াও কৃষকদের ওপরে রাজস্বের ভার বহাল ছিল। কেবল বদলেছিল রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি। মধ্যস্বত্বভোগী জমিদারদের পরিবর্তে রাজস্ব আদায়কারী হয়ে উঠেছিল স্বয়ং রাষ্ট্র। রাষ্ট্র তাদের সরকারি কর্মচারীদের মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করত। জমিদারদের মতোই সেই কর্মচারীরা অতিরিক্ত কর আদায় করত। বিপুল গ্রামাঞ্চলে ঘুস ও দুর্নীতির চর্চাও বৃদ্ধি পেয়েছিল সেকালে। অন্যদিকে কৃষকরা কর প্রদান না করতে পারলে তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনও চলত। এছাড়া সমাজের এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতাশালীদের ভূমি দখল, ঋণ ও সুদের ব্যবসা, জোরপূর্বক কৃষিপণ্য নিম্নমূল্যে ক্রয় ও বাজেয়াপ্ত করা এবং রপ্তানি থেকেও কৃষকের কোনো আয় না থাকায় তাদের জীবনমানের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকল। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই স্বল্পমাত্রার ভূমি থাকা কৃষকরাও ভূমিহীন হয়ে পড়তে শুরু করল এবং ভূমিহীন কৃষকরা গিয়ে দাঁড়াল অতিদারিদ্র্যের কাছাকাছি। লিখিত ইতিহাসের বাইরেও একাত্তর পূর্ববর্তী সময়ে লেখা বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে কৃষকদের আর্থ-সামাজিক জীবনের বিধ্বস্ততা থেকে আত্মঘাতীর কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে।

এ দেশের প্রতিটি ধূলি-কণায় যেমন উচ্চবর্গীয় দ্বারা কৃষক নিযার্তন-নিপীড়নের গল্প আছে, তেমন-ই আছে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বহু কৃষক বিদ্রোহের পদচিহ্ন। তবে এ অঞ্চলের কৃষকদের সবচেয়ে বড় বিদ্রোহের ইতিহাস হলো ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস। একাত্তরে বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের বিপুল অংশগ্রহণ ছিল বটে। কিন্তু জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭১-৭২ সালে বাংলাদেশের পেশাজীবীদের ৭৫ শতাংশই কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল। তাই সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিপুলসংখ্যক কৃষক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন– সম্ভবত এমন একটি দেশের স্বপ্ন নিয়েই যে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষ সমানাধিকার ও সমমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকবে; কৃষক-শ্রমিক, নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ কিংবা অন্য যেকোনো পরিচয়ের মানুষের-ই আর কখনো উচ্চবর্গীয় শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নের শিকার হতে হবে না।

স্বাধীনতা অর্জনের ৫৩ বছর পার হয়ে গেল। কৃষকরা কী এখনো বিশেষ ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিপীড়ন থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? পেয়েছে কী তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ? যদি পেয়ে-ই থাকে, তাহলে প্রশ্ন রয়ে যায়– এখনো কেন কৃষি-প্রধান বাংলাদেশে কৃষকরা আত্মহত্যা করে?

উত্তরের খোঁজে একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। চলতি বছরের এপ্রিলে মেহেরপুরে সাইফুল শেখ নামক একজন পেঁয়াজচাষি বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। মূল কারণ তিনি ঋণগ্রস্ত ছিলেন এবং তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পাননি। খাদ্যনিরাপত্তা নেটওয়ার্কের সহসভাপতি রেজাউল করিম সিদ্দিক তাদের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, ‘ফসল যখন কৃষকের ঘরে থাকে, তখন এর দাম থাকে না; কিন্তু ফসল যখনই মহাজনের হাতে যায়, তখনই দাম বেড়ে যায়। মেহেরপুরের কৃষক সাইফুল শেখ যখন পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আত্মহত্যা করছেন, তখন পেঁয়াজের মণপ্রতি দাম ছিল ৬০০ টাকা। ঠিক তার দুই সপ্তাহ পর মণপ্রতি পেঁয়াজের দাম উঠেছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। অথচ এখন আর কৃষকের ঘরে পেঁয়াজ নেই। মুনাফা লুটছেন ব্যবসায়ীরা।’ তিনি আরো বলেন, ‘কৃষকরা মহাজনের কাছ থেকে, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। প্রতি সপ্তাহে তাঁকে তা পরিশোধ করতে হয়। যখন ফসল ঘরে আসে, তখন মহাজন ও এনজিও প্রতিনিধিরা এসে হাজির হয় ঋণের টাকার জন্য। তখন বাধ্য হয়ে তাকে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিতে হয়।’

কেন কৃষকদের-ই প্রতিবার ঋণগ্রস্ত হতে হয়? কেন পরিশ্রমের ফসলে তাদের-ই বারবার লোকসানের শিকার হতে হয়? একদিকে ঋণ দেয়া এনজিও কিংবা দাদন ব্যবসায়ীরা বহাল তবিয়তে শক্তিশালী আর্থ-সামাজিক অবস্থানে টিকে থাকে। অন্যদিকে কৃষকের ফসলের ওপর হস্তক্ষেপকারী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বিপুল লাভে কৃষিপণ্য বাজারে বিক্রি করে। ঋণ, লোকসান এবং আর্থিক বিপর্যয়ের বোঝা সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা পথ বেছে নেয় আমাদের কৃষকরা।

রাষ্ট্রকে কখনই কৃষি খাতে এনজিও, দাদন ব্যবসা, কিংবা মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মতো নিপীড়নমূলক চর্চার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না। কৃষকদের জীবনমান উন্নতিকরণের ক্ষেত্রে কোনো নীতিও গ্রহণ করতে দেখা যায় না। কৃষিখাত উন্নয়নের নামে রাষ্ট্র যে দু-একটা নীতির প্রবর্তন করে তা সবসময়-ই কৃষকদের জন্য প্রহসনমূলক এবং আত্মঘাতী হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য প্রচলিত নিপীড়নমূলক অর্থনৈতিক রীতি নিরসন করে প্রহসনহীন কৃষকবান্ধব নীতির প্রবর্তন করা কি অসাধ্য কিছু? এক্ষেত্রে মনে রাখা আবশ্যক যে রাষ্ট্রের মতো সম্পদ-সম্বল-সংস্থান অন্য কোনো গোষ্ঠীর-ই নেই। রাষ্ট্র চাইলেই এরূপ নিপীড়নমূলক প্রচলন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে এবং বিলুপ্তি ঘটাতে পারে। কিন্তু তেমন কোনো উদ্যোগ-ই রাষ্ট্রকে নিতে দেখা যায় না, পূর্বেও কখনো দেখা যায়নি।

আত্মহত্যা করা সেই কৃষকের মেয়ে রোজেফা খাতুন জাতির সামনে একটা প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘আমার আব্বার মতো কৃষকরা যদি এভাবে ঠইকা আত্মহত্যা করে, তাইলে দেশের মানুষের মুখে খাবার তুইলা দিব কারা?’ যেখানে এককালে এ অঞ্চলের ৯০ শতাংশ কর্মজীবীই কৃষিপেশায় নিযুক্ত ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাত্র ৪৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ (২০২২) মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। কর্মসংস্থান হিসেবে কৃষির বিপুল হ্রাসের পেছনে দায়ী কৃষকের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এ নিপীড়নই মানুষকে কৃষিকাজে নিরুৎসাহিত করে তুলছে। চলমান নিপীড়ন এভাবেই বহাল থাকলে বাংলাদেশের শক্তিশালী কৃষিখাত ভেঙে পড়তে আর বেশি দেরি নেই। বর্তমানে দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থায় কৃষি খাতের বিলুপ্তি কেবল অর্থনীতির জন্যই নয়, পুরো রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ দুর্যোগ ডেকে আনবে। তখন রোজেফার প্রশ্নটি কেবল প্রশ্ন থাকবে না, বাস্তবতায় পরিণত হবে।

রাশিক তাহির: লেখক ও প্রাবন্ধিক