জীবনের নিরাপত্তার জন্য একজন ভোক্তার অধিকার রয়েছে তার প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবাটি যথাযথ, সঠিকভাবে, সঠিক মাপে এবং সঠিক মানে পাওয়ার। তাই পণ্যের উপাদান, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, বিক্রয়মূল্য, পণ্যের মান, পণ্যের কার্যকারিতা এসব সম্পর্কে জানার অধিকার একজন ভোক্তার রয়েছে। আবার কোনো পণ্য বা সেবা ব্যবহারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ক্ষতিপূরণ পাওয়াটাও ভোক্তার অধিকার। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ জীবনের জন্য কী পরিমাণ ক্ষতিকর তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই বলতে পারেন। এসব মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ গ্রহণের ফলে অনেককেই অকাল মৃত্যুবরণ করতে হয়। ওজনে কারচুপি, ওজনযন্ত্রে কারচুপি, পরিমাপে বা পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপির দৃশ্য আমরা প্রায়ই হাটবাজারে দেখে থাকি। পণ্যের গায়ে পণ্যের উপাদান, বিক্রয়মূল্য, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, পণ্যের কার্যকারিতা ইত্যাদি না লিখে পণ্য উৎপাদকরা ভোক্তাকে ঠকাচ্ছে প্রতিনিয়ত যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও প্রতি বছর ভোক্তা অধিকার দিবস পালিত হয়। ভোক্তারা অসংগঠিত বিধায় তাদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

একুশ শতকের জটিল বাজার ব্যবস্থার যুগে নিরাপদ, মানসম্পন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য ও সেবা পাওয়া প্রত্যেক ভোক্তার অধিকার। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও ক্রমবিকাশমান বাজার ব্যবস্থাপনার দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ রোধ করা খুবই জরুরি। দেশের ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ প্রণয়ন করা হয় এবং ২০১০ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দেশের ১৬ কোটি ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জনবল খুবই নগণ্য। জনবল সংকট থাকায় প্রতিনিয়ত বাজার মনিটরিংসহ ভোক্তা স্বার্থরক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা অধিদপ্তরের পক্ষে চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। আইনে দেশের প্রচলিত পণ্যের গ্রাহকদের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের গ্রাহকদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। সম্প্রতি বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি, ডিজিটাল আর্থিক খাতে প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা, অনলাইনে অবৈধভাবে ঋণদানের নামে প্রতারণা, ই-টিকেটিংয়ের ক্ষেত্রে মনগড়া সার্ভিস চার্জ আদায় এরই প্রমাণ। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিভিন্ন উদ্যোগ ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি দেশের ডিজিটাল মাধ্যমে একটি বিশাল ভোক্তাগোষ্ঠী সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় ই-কমার্স সেবা, অনলাইন রাইড-শেয়ারিং, অনলাইন ফুড ডেলিভারি সিস্টেম, ই-টিকেটিং, বিভিন্ন সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট ও অ্যাপের ক্রেতা, অনলাইনে বিভিন্ন সেবার গ্রাহক, মোবাইল ব্যাংক খাতের গ্রাহক ও টেলিকম সেক্টরের ভোক্তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে আইনের মাধ্যমে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।

আইন থাকলেও আইনের বাস্তবায়ন না হওয়ায় অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ভোক্তা সাধারণ, যা বাস্তবিকভাবে প্রমাণিত। শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের পাশাপাশি এটি যথার্থ জোরদার করতে হবে। কেননা আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আবার এ আইন মান্য করাও প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, আইন প্রণয়নের ফলে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও ভোক্তা তথা জনগণ এর সুফল পাচ্ছে, যদিও তা আশানুরূপ নয়। উন্নত দেশগুলোয় ভোক্তা অধিকারকে নাগরিকদের সাধারণ অধিকার হিসেবে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। এর মাধ্যমে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্র আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই দেশের উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব। বাংলাদেশে নাগরিক অধিকারের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব তেমনভাবে পায় না, যার ফলে ভোক্তা অধিকারও প্রায় গুরুত্বহীন একটি বিষয় হিসেবে পরিগণিত রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে। যদিও এ ধারণা বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসের তাৎপর্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বে ‘ভোক্তা অধিকার’ নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, দেশে এখনো এটি অধিকার হিসেবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন আছে। বহুদিন থেকে তারা এ ধরনের আইন বাস্তবায়ন করার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ ও জনগণ উভয়ই সুফল পেয়ে আসছে। নাগরিকদের ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্য রাষ্ট্র বিভিন্ন পদক্ষেপও নেয়। একটি কার্যকর ভোক্তা আইনের ফলে সেসব দেশে জনস্বার্থ তথা ভোক্তা অধিকার আজ একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয়। ব্যবসা-বাণিজ্য তথা ভোক্তা অধিকারের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

১৯৮৬ সালে ভারতে ভোক্তা সুরক্ষা আইন পাস হয় এবং সেই সঙ্গে ভারতের ভোক্তা বিষয় মন্ত্রণালয়, খাদ্য ও বিতরণ দপ্তর ঘোষণা করে ভোক্তার মূলত ছয়টি অধিকার রয়েছে—সুরক্ষার অধিকার, সঠিক তথ্য জানার অধিকার, পছন্দের অধিকার, প্রত্যুত্তর শোনার অধিকার, প্রতিকারের অধিকার এবং ভোক্তার উপযুক্ত শিক্ষার অধিকার। এসব অধিকার জাতিসংঘেরও স্বীকৃত। শুধু তা-ই নয়, ভোক্তাদের সুরক্ষার্থে কিছু অধিকারও ঘোষণা করে ভারত সরকার। এর মধ্যে রয়েছে জীবন ও সম্পদের জন্য বিপজ্জনক পণ্যের বিক্রি বন্ধ করার অধিকার; পণ্যের মান, পরিমাণ, বিশুদ্ধতা এবং দাম সম্পর্কে অবগত করে অনুপযুক্ত বিপণন থেকে ভোক্তাকে রক্ষা করা এবং অন্যায্য বিপণন ও ভোক্তাদের হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগের অধিকার। এসব বিষয়ের অন্যথা ঘটলে উপভোক্তা মন্ত্রক জেলা, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় আদালতে বিশেষ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। দেশটির আইন এত শক্তিশালী যে একটি বহুজাতিক কোম্পানির পণ্যের ক্ষতিকর দ্রব্যের উপস্থিতি পাওয়ামাত্র পণ্যটি উৎপাদনে লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছিল। কিছু সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ২০১৯ সালে ভোক্তা সুরক্ষা আইনটি পরিমার্জন করে ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি ভারতের কেন্দ্রীয় ভোক্তা সুরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনা হয়। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে থেকে শুরু করছে, আইন পাস হলেও স্বতন্ত্র কোনো মন্ত্রণালয় তৈরি করা হয়নি। অধিদপ্তর তৈরি করা হলেও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় জনবল দেয়া হয়নি। ফলে কিছু অভিযান পরিচালনা আর কয়েকটি অভিযোগ নিষ্পত্তির মধ্যেই ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার কাজটি সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। শুধু ভারত নয়, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় স্বতন্ত্র কমিশন রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ উন্নত দেশগুলোয়। তাদের ক্ষমতা এতই বেশি যে সরকারকেও তারা জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসে।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে এসব নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। সরকারি মালিকানাধীন অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই এসব সংস্থার ব্যবস্থা অনুসারে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি কিংবা বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। আসলে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থাটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা না সরকারের বিভাগীয় দপ্তর হবে তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকলেও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সরকার জনগণের স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক ও যত্নবান। সরকার আন্তরিক না হলে ভোক্তার অধিকার কখনই আদায় হবে না। উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ভোক্তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব আইন ও আইনের আঙ্গিকে প্রণীত নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব হচ্ছে কনজিউমারস কমিশন বা ভোক্তার স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের। ভোক্তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট আইনি বিষয়গুলো বিবেচনা করার জন্য দরকার হাইকোর্টের ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ আদালত। অস্ট্রেলিয়ার কম্পিটিশন ট্রাইব্যুনাল এসব আদালতের অন্যতম।

পণ্য কিনে প্রতারিত হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে অভিযোগ করে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পরম দুঃখের বিষয় হলো, দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন বলে যে একটা গুরুত্বপূর্ণ আইন রয়েছে সেটার কথা দেশের অধিকাংশ মানুষই জানেন না। কিন্তু এর পেছনে কারণ কী? প্রধান কারণ হলো এ আইনের প্রচার-প্রচারণার অভাব। তাই দেশের জনসংখ্যার বৃহৎ একটা অংশ এ আইন সম্পর্কে জানেন না। তাই জনস্বার্থে এ আইনের প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণকে এ আইন সম্পর্কে অবহিত করতে হবে, পণ্য কেনাকাটায় সচেতন করতে হবে। সর্বোপরি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভেজালমুক্ত পণ্যের বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। কেনাকাটা, ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন এখন অনেক কিছুই ডিজিটাল বা অনলাইনে সম্পন্ন এবং প্রতিদিন এ খাতে ভোক্তাদের ঝুঁকির নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। তাই অনলাইন কেনাকাটা বা আর্থিক লেনদেন যেন স্বচ্ছ হয়, এখানে যেন কোনো ধরনের প্রতারণা বা অনিয়ম না হয় এবং গ্রাহকরা যেন তাদের ন্যায্য অধিকার পান, সে বিষয়ে সরকার, সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উৎপাদক, বিক্রেতা ও সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ যেন দায়িত্ববান হন, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দরকার রাষ্ট্র ও জনগণের বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসের ইতিহাস ও তাৎপর্য যথাযথভাবে অনুধাবন করা। শুধু অনুবাধন করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করতে হবে।