বৈদেশিক কর্মসংস্থান অনুসন্ধানে আবারো তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘‌আমাদের নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র এবং নতুন দেশ (জনশক্তি পাঠানোর জন্য) খুঁজে বের করতে হবে। আমরা এমন ধরনের প্রশিক্ষণের (কর্মীদের জন্য) ব্যবস্থা করব, যা একটি দেশের প্রয়োজন।’ বাংলাদেশ বিপুল জনশক্তির দেশ। এ জনশক্তিকে সম্পদে পরিণত করার কথা বহু বছর ধরে বলা হচ্ছে। সরকারও তাতে কণ্ঠ মেলায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। বিদেশে নতুন বাজার অনুসন্ধান, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরির জোরালো ও কার্যকর উদ্যোগ লক্ষযোগ্য নয়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে রয়েছে। হুন্ডির দৌরাত্ম্যে রেমিট্যান্স কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে আসছে না। এমন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্য বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্যাশা থাকবে নতুন বাজার অনুসন্ধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। শুধু বাজার অনুসন্ধান করলেই হবে না, সেখানকার চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি রফতানির দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। 

নতুন শ্রমবাজার এবং নিরাপদ ও আইনানুগ অভিবাসনের দিকেই বেশি নজর দিতে হবে। বলা প্রয়োজন এখনো আমাদের শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যের দেশের ওপরই বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু সময় এসেছে এ বৃত্ত থেকে বের হওয়ার। তবে কখনই ঘরে বসে শ্রমবাজার তৈরি করা যাবে না। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন ব্যাপক কূটনৈতিক অনুসন্ধান। তবে এটি সত্য, এ খাত নিয়ে আগে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। ফলে অনেক কিছুই অন্তরালে থেকে যেত। কিন্তু এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে এখন সবাই সোচ্চার। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সবাই এখন এ খাতের মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিয়ে যথেষ্ট কনসার্ন। সর্বশেষ বছরে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসে মূল স্লোগান ছিল ‘অভিবাসীর অধিকার-মর্যাদা ও ন্যায়বিচার’। একসময় অভিবাসীদের মর্যাদা ও ন্যায়বিচার বিষয়টি ছিল একেবারেই উপেক্ষিত। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক যাওয়া এখনো বন্ধ। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি শ্রমবাজারে অস্থিরতা চলছে। সেখানে শ্রমিকরা হয়রানি-ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এদিকে পুরো শ্রমবাজারের চালচিত্র পাল্টে যেতে শুরু করেছে। সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশ এখন নিজস্ব শ্রমশক্তি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী হচ্ছে। সৌদি আরব ১২টি সেক্টরে কোনো বিদেশী শ্রমিক নেবে না। ওইসব খাতের বিদেশী শ্রমিকরা ফিরে যাচ্ছেন। এ প্রবণতা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার এখনই সময়। 

নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ এবং আরো নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি অভিবাসনপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে কারিগরি ও প্রাযুক্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গন্তব্য দেশের ভাষা-সংস্কৃতি, আবহাওয়া ও খাদ্যাভ্যাসসহ আনুষঙ্গিক বিষয়েও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বর্তমান পৃথিবীর প্রযুক্তি খাত দ্রুত পরিবর্তনশীল। শুধু প্রযুক্তির বিকাশকে মাথায় নিলেই দেখা যাবে আগামী ১০ বছর যুদ্ধটা হবে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের। তাই এ সময়ে প্রযুক্তির জ্ঞান শ্রম অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মাঝে ঢুকিয়ে না দিতে পারলে আমাদের শ্রমবাজার হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। হয়তো ১০০ শতাংশ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক আমরা পাঠাতে পারব না, তবে সত্যিকার অর্থে যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করা সম্ভব হলে কিংবা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক তৈরি করা সম্ভব হলে দেশেও তাদের জন্য কাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে।

বাস্তবতা আমলে নিয়ে দক্ষ শ্রমিক তৈরি প্রচেষ্টার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমানো, অভিবাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর তদারকি বৃদ্ধি এবং শ্রম রফতানিতে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধের জন্যও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রবাসী এক বাংলাদেশী ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগসাজশে একটি চক্র ১০টি এজেন্সিকে নিয়ে সিন্ডিকেট বানিয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে দুই বছরে ২০০ কোটি রিঙ্গিত হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠার পরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন থেকে কেবল মালয়েশিয়া নয়, কোনো দেশের শ্রমবাজারই যাতে এমন সিন্ডিকেটের কবজায় চলে না যায় সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নতুন করে বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার খবর ইতিবাচক ও উৎসাহব্যঞ্জক। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত জনশক্তি রফতানি। আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখনো জনশক্তি রফতানির প্রধান টার্গেট। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় জনশক্তি রফতানির বাজার দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। তবে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে রোমানিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ২০টি দেশ। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, সরকার চলতি বছর রেকর্ডসংখ্যক শ্রমিক বিদেশে পাঠাতে চায়। গ্রিস, ইতালি, রোমানিয়ার মতো উন্নত দেশে নতুন করে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরাও চাই, সরকারের উদ্যোগে কর্মী প্রেরণের পথ সুযোগ হোক। 

করোনা-পরবর্তী সময়ে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা লক্ষণীয়। এরই মধ্যে জাপান, ব্রাজিল, রোমানিয়াসহ বেশকিছু নতুন শ্রমবাজারের খোঁজ মিলেছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলেও সত্য, ওই বাজারে জনশক্তি পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। কারণ চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবলের স্বল্পতা। তাই নতুন বাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাজার অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতেও মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। 

এমডিজির সাফল্যের আলোকে এসডিজিতে টেকসই উন্নয়নকে এবার দার্শনিক ভিত্তি দেয়া হয়েছে। সেখানে সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা হয়েছে—কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন করতে হবে। কেউ উন্নয়নের ধারা থেকে পিছিয়ে থাকবে না। একই সঙ্গে মানুষের স্বাধীনতা, সাম্য, সুশাসন, সুরক্ষা, মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর অধিকতর নজর দিতে হবে। প্রতি বছর ২০ লাখ কর্মী নতুন শ্রমবাজারে যোগ দিচ্ছে। কিন্তু এদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের জন্য টেকসই কোনো অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং একই সঙ্গে নিরাপদ অভিবাসন আমাদের বেকারত্বের সব বন্ধ্যত্ব ঘুচিয়ে দিতে সক্ষম। একই সঙ্গে স্বল্প বিনিয়োগে অধিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান আরো বেশি টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোয় বটেই, বিশ্বের উন্নত সব দেশ গ্রহণ করে ব্যয় সংকোচন নীতি। দেশে দেশে বড়-ছোট প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই চলছে কর্মী ও শ্রমিক ছাঁটাই। এরই মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে। বৈদেশিক জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার মতে, আমাদের প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। প্রতি বছর বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ২২ থেকে ২৩ লাখ মানুষ যুক্ত হচ্ছে। দেশে তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ফলে নতুন করে শ্রমবাজার খোঁজা নিয়েও কাজ করতে হবে। আর বাংলাদেশ যদি বিদেশের শ্রমবাজার ধরে রাখতে চায়, তাহলে বিদেশের চাহিদা মতো দক্ষ শ্রমিক রফতানির দিকেই মনোযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। নতুন নতুন জনশক্তির বাজার খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্টদের তৎপর হতে হবে।