বিদেশে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি প্রবাসী শ্রমিকরা। গত কয়েক মাসে সেগুলো সমাধানে প্রধানমন্ত্রী এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কিছু প্রচেষ্টা নিয়েছে। আমাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে প্রক্রিয়াটি শুধু বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, দেশে বিপুল রেমিট্যান্সপ্রবাহ আসতেও সাহায্য করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে বিদায়ী বছরে (২০২১) মোট ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন শ্রমিক বিভিন্ন দেশে গেছেন। ২০২০ সালজুড়ে কভিড মহামারী প্রভাবিত দৃশ্যপটের বিপরীতে এটা ছিল একটা লক্ষণীয় অগ্রগতি।
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি কীভাবে মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসনের ভয়াবহ প্রভাব যারা বাইরে যেতে চাইছেন, তাদের জন্য হুমকির কারণ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এটা হাজারো অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীকে বিপজ্জনক সাগরপথের মধ্য দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় লাভে বা অনুপ্রবেশে প্ররোচিত করছে। এতে অনেকের যেমন মৃত্যু হচ্ছে, তেমনি অনেকেরই জেল-জরিমানাও হচ্ছে। এটা হাজারো অভিবাসন প্রত্যাশীকে ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে। এটা মর্মান্তিক। এক্ষেত্রে প্রায়ই প্রস্থান পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে লিবিয়া ও তুরস্কের সমুদ্র উপকূলবর্তী বেলাভূমি। গত ডিসেম্বরের চতুর্থ সপ্তাহের দিকে একটা নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে এবং তাতে গ্রিসের এজিয়ান সাগরে ৩০-এর বেশি অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু ঘটে।
বর্তমানে বিরাজমান দুঃখজনক অবস্থার আরো অবনতি হচ্ছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অসামর্থ্যের কারণে। শরণার্থীদের সুরক্ষায় নিয়োজিত ইউএনএইচআর ও এর সহযোগী এজেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) এ নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা, বিশেষত জিম্মি দশার কেন্দ্রগুলোয় কোনো সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে অভিবাসীদের প্রবেশ প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে এটা অবৈধ অভিবাসীদের প্লাবন কিছুটা কমিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ বিষয়ে একটা বিবৃতি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘সংস্থাটি বৈশ্বিক অভিবাসন বন্ধ করতে চায় না; বরং তারা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সুচারুভাবে সামলাতে আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে, অভিবাসীদের মানবাধিকার নিশ্চিত, মানব পাচারকারীদের মাধ্যমে অনিয়মিত বিপজ্জনক যাত্রা প্রতিরোধ এবং আইনসম্মত ও বৈধ পথের সুযোগ সৃষ্টি করতে চায়।’ তারা ‘বিভিন্ন চ্যানেল এবং একটি বহুপক্ষীয় কৌশলের মাধ্যমে বৈশ্বিক অভিবাসনের বিষয়টি সমাধানের’ ওপরও দৃষ্টি দিয়েছে।
এ দুর্ভাগ্যজনক প্যারাডাইমের মধ্যে আরেকটা দিকও রয়েছে। সেটি হলো বাংলাদেশী অনেক নারী শ্রমিক বাইরে গিয়েছেন এবং পরে ত্রস্ত-বিধ্বস্ত স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। গত ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) গবেষণায় এ বিষয়ে কিছু অনুসন্ধান উঠে এসেছে। ওই গবেষণায় আমাদের ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের অবস্থার ওপর বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয়েছে। ৩২৩ জনের মধ্যে ৫৫ শতাংশ অভিবাসী নারী শ্রমিক হয় অপ্রত্যাশিত অথবা বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। বড় কথা, ২২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী কর্মী অভিবাসনের এক বছর শেষ হওয়ার আগেই চলে এসেছেন। অন্যদিকে প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী শ্রমিক এক ও দুই বছর এবং ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ দু-তিন বছরের মধ্যে চলে এসেছেন।
তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল ২০২০ সালের জুলাই ও ডিসেম্বরের মধ্যে। এসব অভিবাসী নারী কর্মীর অনেকেই দেশে ফিরে আসার কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন মাত্রায় নির্যাতনের দুঃখজনক ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন। ফিরে আসাদের প্রায় ৩৮ শতাংশই তাদের গন্তব্য দেশে শারীরিকভাবে নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। আবার ৫২ শতাংশই বলপূর্বক শ্রমের শিকার হয়েছেন। অনেকেই ফিরে এসেছেন খালি হাতে, আগে থেকে ঝুলে থাকা ঋণের ভার নিয়ে। বিলসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিদেশফেরত নারী কর্মীদের প্রায় ৬১ শতাংশেরই জনপ্রতি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৬ হাজার ৭৩৬ টাকা। দেশেই তাদের দুর্গতি শেষ হয়নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের অধিকাংশই সামাজিক কলঙ্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দুরবস্থার নতুন চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হচ্ছেন। এটাকে একটা গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ প্রাধিকার প্রদানের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অভিবাসী কর্মীদের সেবা প্রদানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-বিষয়ক সংসদীয় কমিটি এবং অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৃহত্তর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশের নারী অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা, সামাজিক সুরক্ষা ও সম্মান সমুন্নত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টিও আমাদের উপেক্ষা করা চলবে না।
গত ডিসেম্বরে ইতিবাচক প্যারাডাইমে পরবর্তী যে তাত্পর্যজনক অগ্রগতি ঘটেছে, সেটি হলো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি। প্রায় তিন বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধের পর দেশটির শ্রমবাজার নতুন করে আবার উন্মুক্ত হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রম রফতানি শুরু হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। ২০০৯ সাল নাগাদ সব রিক্রুটিং এজেন্সিরই বাধা ছাড়া দেশটিতে জনশক্তি রফতানির সুযোগ ছিল। বিএমইটির তথ্য বলছে, ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশ মোট ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন দক্ষ, অর্ধদক্ষ ও অদক্ষ কর্মী রফতানি করেছিল।
গত ১০ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল গৃহ শ্রম, কৃষি, উৎপাদন, সেবা, মাইনিং, নির্মাণ প্রভৃতি খাতে এবার দেশটি শ্রমিক নেবে। সঠিকভাবেই এ সিদ্ধান্তে দ্রুত অগ্রগতি ঘটে ১৯ ডিসেম্বর দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের শ্রম কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে।
পরবর্তী সময়ে ওই দেশে কাজ করতে যেতে চাওয়া বাংলাদেশীদের দালাল বা অননুমোদিত কোনো এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ না করতে বা আগাম কোনো অর্থ না দিতে বলা হয়েছে। তাদের বরং এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজে তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এটি বোধগম্য যে দালালদের তৈরি করা অনিশ্চিত পরিবেশ সৃষ্ট দুর্ভোগের পরিবর্তে সরকারি ডিজিটাইজড চ্যানেলের মাধ্যমে অভিবাসনের বিষয়টি অভিবাসন প্রত্যাশীদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। সরকার সার্ভিস ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা অভিবাসন প্রত্যাশী কর্মীর তিন মাসের বেতনের চেয়ে বেশি নয়। ফলে অভিবাসন ব্যয় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার নিচে থাকবে, মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে যা আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। এটিও উঠে এসেছে যে নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে বেশির ভাগ অভিবাসন ব্যয় মেটাতে মালয়েশিয়া রাজি হয়েছে। এসব ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে বিমানভাড়া, মানসম্মত আবাসন, বীমা ও স্বাস্থ্য সুবিধা ইত্যাদি। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তাদের অভিবাসী কর্মীদের পাসপোর্ট নিজেদের জিম্মায় রাখা বা জব্দের বিষয়েও বারণ করা হয়েছে।
আমরা আশা করি, নির্যাতন-শোষণ দূর করতে সমঝোতা স্মারকের সব দিকই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে। চলতি বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝিতে নতুন প্রক্রিয়ায় জনশক্তি রফতানি হওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ওই দেশে অবৈধভাবে যাওয়া বাংলাদেশীদের ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়া হবে। আশা করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে সুনির্দিষ্টসংখ্যক কর্মী আইনসম্মতভাবে বৈধ হবে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। সেটি হলো মালদ্বীপে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন। দেশটির প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সেখানে সফর করে এসেছেন। তিনি বিদায়ী বছরের ২২ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখার প্রত্যয় ছাড়াও সফরকালে প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারেও মনোযোগ দিয়েছেন। বেশ কিছুদিন ধরে দেশটিতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের বসবাসের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হয়েছে, তবে কর্মপরিবেশ-সংক্রান্ত এবং তাদের কর্মসংস্থান ম্যাট্রিক্সের নানা দিকে তারা বিভিন্ন জটিলতার মুখোমুখি হয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী এসব সমস্যা সমাধানে দেশটির প্রেসিডেন্টকে আহ্বান জানিয়েছেন।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শুধু দেশটির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের সঙ্গেই নয়, অন্যদের সঙ্গেও কীভাবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সংযোগ উন্নয়ন করা যায় সেসবের বিভিন্ন উপায় সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। তিনি দেশটিতে ১৩টি সামরিক যান উপহার দিয়েছেন। অধিকন্তু, তিনি বাংলাদেশী অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। তিনি দালালদের বাদ দিয়ে বৈধ ও আইনসম্মত পথে বিদেশী কর্মসংস্থানে যাওয়ার জন্য প্রবাসীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, অবৈধ পথে গেলে তাতে তাদের প্রত্যাশিত চাকরি না-ও মিলতে পারে এবং বেতনও কম হতে পারে। এটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ দেখিয়েছে তারা মালদ্বীপকে সাহায্য করতে চেয়েছে, তবে একই সঙ্গে চায়নি নিজের নাগরিকরা যেন কোনো রকম ঝামেলায় না ভোগে, যখন সেখানে কাজ করবে।
সাম্প্রতিক সফরে যোগ্য স্বাস্থ্য পেশাজীবী নিয়োগ এবং যুব ও ক্রীড়া উন্নয়নে সহযোগিতার দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছেন। আয় করে দ্বৈত করায়ন এবং কর ফাঁকি রোধবিষয়ক একটি চুক্তি ওই সময়ে সই হয়েছে। আশা করা যায়, ওই দেশে বাংলাদেশী অভিবাসীদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। ব্যাংকিং খাতে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকেও অভিবাসী শ্রমিকদের দেশে টাকা পাঠানোর জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে আহ্বান জানিয়েছে।
পরিশেষে বলব, অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বিশেষ জোর দিতে হবে। দক্ষতা বাড়াতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নের পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে বিদেশে আমাদের কর্মীদের জন্য বাড়তি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এ দিকটি ডিজিটালাইজড বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যেখানে কোনো সীমানা নেই। আমার বিশ্বাস এক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, উত্তর আমেরিকাসহ এশিয়ার অন্য উন্নত দেশগুলোয়ও বাংলাদেশী নাগরিকদের চাহিদা বাড়বে বৈকি।
মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত; বৈদেশিক বিষয়াদি, তথ্য অধিকার ও সুশাসন বিশ্লেষক










