রাজধানীর ভেতরে থাকা আন্তঃজেলা বাস কাউন্টার ও টার্মিনালগুলো সরিয়ে নেয়ার কথা হচ্ছে কয়েক বছর আগে থেকেই। কিন্তু কথা আর পরিকল্পনার মধ্যেই সব কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। অগ্রগতি নেই কোনো। এর অন্যতম কারণ নতুন টার্মিনালে যেতে মালিকদের অনীহা। নতুন টার্মিনালগুলোও প্রস্তুত নয়। আবার টার্মিনাল ব্যবহার করাও যাত্রীদের জন্য কষ্টকর। কারণ টার্মিনালগুলোর সঙ্গে নেই কোনো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। মানসম্পন্ন কোনো সেবাও মেলে না টার্মিনালে। অপর্যাপ্ত বিশ্রামাগার থেকে শুরু করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ যাত্রীদের অসুস্থ করে তোলে। ফলে ঢাকার ভেতরে গাড়ির কাউন্টার ও বাস টার্মিনাল সরছে না। ঢাকার ভেতরে দূরপাল্লার গাড়ির কাউন্টার থাকায় যানজটসহ পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। যাত্রীবান্ধব টার্মিনাল নির্মাণ ও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যাত্রীরা যেন টার্মিনাল ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনটি বাস টার্মিনালের পাশাপাশি রাজধানীর প্রায় অর্ধশত স্পটে মূল সড়কের যেখানে সেখানে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, লেগুনা সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি দিনের পর দিন রাখা হচ্ছে। আর বছরের পর বছর ধরেই রাজধানীর সড়কগুলোয় সিটি বাসসহ দূরপাল্লার বাসের টার্মিনাল তৈরি করেছে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। এভাবে নগরীর মূল সড়কে বাসের টার্মিনাল বানিয়ে আদায় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। সারা রাজধানীর প্রতিটি রাস্তায়ই রয়েছে এমন বাসের কাউন্টার ও টার্মিনাল। দিনে-রাতে এসব সড়কে গণপরিবহন রাখার কারণে সৃষ্টি হয় যানজট। এতে ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। মূল রাস্তার ওপরই বাসের সারিবদ্ধ লাইন করে টিকট বিক্রি করা হয়। এখান থেকেই যাত্রীরা বাসে ওঠে। রাতে বড় গাড়ি দিয়ে সেবা দেয়া হয় আর দিনের বেলায় শাটল বাসে যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হয় টার্মিনালে। এমনিতেই নগর পরিবহন চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, তার ওপর বাড়তি হিসেবে আন্তঃজেলা বাস চলাচল করলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
রাজধানী থেকে শহরের উপকণ্ঠে প্রস্তাবিত টার্মিনালে যেতে নগরবাসীর জন্য এখনো গণপরিবহনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে যাতায়াতের ব্যবস্থা না করে টার্মিনাল স্থানান্তরে জনভোগান্তি বৃদ্ধির শঙ্কাই বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তঃজেলা টার্মিনাল স্থানান্তরের পরিকল্পনা ভালো। কিন্তু নিশ্চিত করতে হবে রাজধানীর বাইরে নেমে যাত্রীরা যেন গণপরিবহন পায় এবং যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে শহরে ঢুকতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য টার্মিনালে যাওয়ার ক্ষেত্রে। যাতায়াত ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা আবশ্যক। ঢাকার যানজট নিরসনের মহাপরিকল্পনা সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) ছয়টি নতুন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে বটে। সড়কপথে ঢাকার সঙ্গে দেশের ৬৩টি জেলার যোগাযোগ হয় ছয়টি মহাসড়কে। যেসব স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে মহাসড়কে সরাসরি উঠবে গাড়ি। যানজট কমাতে ঢাকা শহরের বাইরে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের যে পরিকল্পনা সরকার করছে, তা বাস্তবায়নে প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা দরকার। শুধু ছয়টি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণে এ ব্যয় হবে। লোকাল বাস ও ট্রাক টার্মিনাল রাজধানীর বাইরে নিতে পাঁচটি ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে খরচ আরো বাড়বে। ঢাকা শহরের বাইরে বা টার্মিনালে টিকিট কাউন্টার স্থানান্তর করা হলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। নাগরিকরা তখন ঢাকার যানজট ঠেলে একবার টিকিট কাটতে আরেকবার যাত্রা করতে যেতে হবে। এতে অর্থ ও সময়ের অপচয় হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া এটি কোনো টেকসই সমাধান দেবে না। যত বড়ই টার্মিনাল নির্মাণ করা হোক না কেন, একসময় তার সক্ষমতা কমে আসবে। যেমনটি গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালের ক্ষেত্রে ঘটেছে। ঢাকার অভ্যন্তর থেকে গাড়ির কাউন্টার ও অস্থায়ী টার্মিনাল অপসারণে যাত্রীসেবার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলে সেটি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজধানীর ভেতরে থাকা দূরপাল্লার বাস কাউন্টার ও টার্মিনাল সরিয়ে নিতে ঢাকার চারপাশ ঘিরে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। একটা রাজধানী এবং মেগাসিটিকে ঘিরে এমন বাইপাস ও সার্কুলার রোড মূল সিটিকে অপ্রয়োজনীয় যানবাহনের চাপ থেকে রক্ষা করে এবং দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করে। বাস টার্মিনালের অবস্থান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, শহরের অভ্যন্তরে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থাকার প্রয়োজন নেই। আরেক দল বিশেষজ্ঞ বলেন, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মূল মহানগরের বাইরে হবে এটা বিজ্ঞানসম্মত নয়। বিশ্বের যেকোনো বড় মহানগর এমনকি একালের সবচেয়ে পুরনো মহানগর লন্ডনেও নগরকেন্দ্রেই বাস টার্মিনাল থাকে। কিন্তু তারা বাংলাদেশের মতো এত মেগা টার্মিনাল নির্মাণ করে না। বাংলাদেশে মুখে বলা হচ্ছে টার্মিনাল। আসলে এগুলো একই সঙ্গে বাসের ডিপো বা পার্কিংয়ের জায়গা, মেরামতের ওয়ার্কশপ সবই। এমনটি হওয়ার কারণ হলো শত শত কোম্পানির অসংখ্য বাসের এ মালিকরা ছোট বিনিয়োগকারী। তাদের কেউই নিজের বিনিয়োগে পার্কিং বা ওয়ার্কশপ তৈরির ক্ষমতা রাখেন না। এসব কারণে পিক টাইমে টার্মিনালগুলোয় যানজট লেগে যায়, বাস ঢুকতে-বেরোতে পারে না। তখন মনে হয় টার্মিনালগুলোয় জায়গা হচ্ছে না। জনগণ দেখে টার্মিনালগুলোর কারণে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতেও যানজট লেগে যায়। কিন্তু টার্মিনালে বাস ডিপো হওয়ার কথা নয়। ডিপো থাকবে রাজধানীর বাইরে।
সমস্যা মূলত টার্মিনাল নয়, গণপরিবহনের পরিকল্পনা ও পরিচালনা নীতি। নগরের গণপরিবহনই বলা হোক বা আন্তঃজেলা গণপরিবহন আসল সমস্যাটা হলো হাজার হাজার পরিবহন মালিক আর হাজার হাজার বাস কোম্পানি। সরকার যদি ঢাকায় এবং সারা দেশে একটি-দুটি কিংবা অল্প কয়েকটা কোম্পানির গণপরিবহন ফ্র্যাঞ্চাইজি তৈরি করে পরিচালনা করতে পারত তাহলে এ সমস্যা থাকত না। ইংল্যান্ড-লন্ডনে এখনো সারা দেশে একটাই পরিবহন সেবা ন্যাশনাল এক্সপ্রেসওয়ে। ইউরোপের দেশগুলোয় একটি বা দুটি কোম্পানিই আন্তঃদেশীয় বাসসেবা দিয়ে থাকে। ইউরোলাইন ও ফ্লেক্সিবাস নামক বাস কোম্পানি পুরো ইউরোপে বাসসেবা দিয়ে যাচ্ছে। তারাই সর্ববৃহৎ, এছাড়া মাঝারি ও ছোট আকারে চার-পাঁচটি কোম্পানি রয়েছে। এমন সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সবাই সেবা দেয় এবং যার যার মুনাফার অংশ বুঝে নেয়। ফলে এক বাসের সঙ্গে আরেক বাসের কোনো প্রতিযোগিতাও থাকে না এবং সে কারণে কোনো বিশৃঙ্খলাও তৈরি হয় না।
ঢাকা বা এমন মেগাসিটি থেকে টার্মিনালগুলো বাইরে ঠেলে দিলে কী হবে? মানুষ বিভিন্ন জেলা থেকে সেসব টার্মিনালে আসবে এবং তারপর নিজের কিংবা ভাড়া করা ছোট ছোট পরিবহনে চড়ে মূল মহানগরের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে বাধ্য হবে এবং তখন মহানগরের ভেতরে বাড়তি যানজট তৈরি হবে। এতে যাতায়াত ব্যয়ও বেড়ে উঠবে। তাই টার্মিনাল মহানগরের ভেতরেই হওয়া উচিত। কিন্তু সেটাকে ডিপো-ওয়ার্কশপ বানানো যাবে না। ছোট ছোট টার্মিনাল হবে এবং সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো ছাড়া ১ মিনিটও বাস দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। যে কারণে সায়েদাবাদের মতো মেগা টার্মিনাল বানিয়েও সরকার জায়গা দিতে পারছে না, সমস্যাটা সমাধান করতে পারছে না। ঢাকার অদূরে আরো টার্মিনাল নির্মাণ কোনো সমাধান দেবে না যতদিন না এর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সমস্যাটা নীতিনির্ধারণী জায়গায়, পরিকল্পনায় ও ব্যবস্থাপনায়। এগুলোর সমাধান করতে হবে। ঢাকার বাইরে বাস ও ট্রাকের ডিপো নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার ভেতর থেকেই বাস ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সেক্ষেত্রে সড়কে চাপ কমাতে আন্তঃজেলা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি করা আবশ্যক। এতে রাজধানীর ভেতরে গাড়ির কাউন্টার সংখ্যাও কমে আসবে।










